বাবা গিয়েছিল আগেই । আর মা যে কোথায় চলে গেল । বুঝতেই পারলাম না । বলেছিল – দোকান যাচ্ছি । তারপর বিকাল ঢলে পড়ল রাত্তিরের দিকে । অন্ধকার এল । মা এলনা । মা এবং বাবা দুজনের চলে যাওয়ার ধরন আলাদা । বাবা যুদ্ধে গিয়েছিল আর ফেরেনি । মা দোকানে ।
আমরা প্রতিমুহুর্ত যুদ্ধের ভেতর থাকি । আমি , আমার দাদা , ভাই । বাবার মতো আমাদের হাতে বন্দুক নেই । বাবা যাদের সাথে লড়াই করত তাদের দস্যু বলে । সারা দেশ বলে । সরকার বলে । তারা দাপিয়ে বেড়ায় এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত । তাদের ভয়ে আমরা পালিয়ে বেড়াচ্ছিলাম । কিন্তু কতদূর যাব । কোথায় যাব । দুরের পৃথিবী তো আমরা চিনি না ।
মা খবর পেয়েছিল দোকানে তেল পাওয়া যাচ্ছে । ছুটে গিয়েছিল শোনামাত্র । কতদিন ভালো করে রান্না হয়নি । আমরাও ভুলে গিয়েছিলাম রান্নার স্বাদ । শুধু নুন মাখানো খাবার খেতে খেতে জিভের উপর শ্যাওলা জমে যাচ্ছিল । অনেক কসরত করে অনেক ঠেলাঠেলি আর ধাক্কাধাক্কির পর মা তেল পেয়েছিল কিন্তু কারা যেন তাকে রাস্তায় ফেলে তেলের বোতলটা কেড়ে নিয়েছিল । হয়তো দস্যুরা । মা আর ফিরে আসেনি ।
আমরা বাইরে যেতে ভয় পেতাম । এই বুঝি দস্যুরা তাড়া করল আমাদের । অবশ্য এখন আর সে ভয় ততখানি নেই । তিন বার ওরা আমাদের বাড়িটা আক্রমন করেছিল । প্রথমবার যখন ওরা আসে তখন প্রাণ হাতে নিয়ে আমরা ঝোপের মধ্যে লুকিয়ে ছিলাম । ঘরে যা ছিল ওরা সব নিয়ে চলে গেছিল । দ্বিতীয়বার যখন এল তখন বাড়িতে কিছুই পেল না , না খাবার না তেল । রাগে ওরা আগুন লাগিয়ে দিল আমাদের ঘরে । দাউ দাউ করে জ্বলছিল বাড়িটা । মা অনেক কষ্টে কিছু টিন জোগাড় করে চারপাশ ঘিরে বাড়ির আদল দিয়েছিল । মাথার উপর আকাশ । এরপর ওরা যখন আসে তখন ব্যর্থ হয়ে ফিরে গিয়েছিল । ভেবেছিল এখানে নিশ্চয়ই কোন লোকজন নেই ।
মা নেই । ভয় আরও পেয়ে বসল । মাথার উপর দাদা আছে । কিন্তু সে ও তো তেমন কিছু বড় নয় । ছোট ভাইটা সব সময় কাঁদত খিদেতে । আমি পেটের সাথে তাকে গামছা দিয়ে বেঁধে রাখতাম । যেমন ভাবে ক্যাঙ্গারুর বাচ্চাকে তার থলিতে রাখে মা । এভাবেই কেটেছিল । তারপর আমাদের ঠাকুরদা এবং ঠাকুমা এল গ্রাম থেকে । আমরা একা আছি বলে । মা তেল কিনতে গিয়ে আর ফেরেনি । চিন্তায় অস্থির লাগছিল ঠাকুমার চোখমুখ । তবু ঠাকুরদার চেয়ে ঠাকুমাকে দেখে আমাদের সাহস কিছুটা হলেও বেড়ে গেল । আসলে আমাদের দাদুর চেয়ে ঠাকুমার শারীরিক উচ্চতা এবং গঠন এবং মুখের মধ্যে তেজস্বী ভাব আমাদের মনে জমে থামা ভয় মুছে দিল । ঠাকুমা বলল – এখানে আর কিসের জন্য থাকবি ? চল আমার সাথে চল । আমি মায়ের কথা ভেবেছিলাম যদি ফিরে আসে আর আমাদের দেখতে না পায় । ঠাকুমার নাছোড় আবেদনের কাছে তা ধোপে টেকে নি । আমাদের প্রায় জোর করেই তার বাড়িতে নিয়ে এল । ভাই ঘুমোচ্ছিল ঠাকুমার পিঠে । দাদা ধরেছিল ঠাকুরদার হাত । আমি আস্তে আস্তে ওদের পিছু পিছু হাঁটছিলাম । আমরা সবাই ভয় পাচ্ছিলাম দস্যুদের । ভাই ভয়ের বয়সে পা দেয়নি বলে নিশ্চিন্তে ঘুমিয়েছিল । অনেকদিন সেখানে থাকতে হয়েছিল । মা তবু ফিরে আসেনি । এখানে এসেও খাবারের কষ্ট আমাদের কমেনি বরং বেড়েছিল । ভাইকে মাঝে মাঝে একজন মহিলা এসে দুধ খাইয়ে যেত । আমরা বুনো শাক খুঁজতে চলে যেতাম নদী পেরিয়ে গাছের ছায়া পেরিয়ে । কিন্তু আমরা সেখানে যাবার আগেই কেউ তুলে নিয়ে গেছে শাকপাতা ।
ঠাকুরদার কিছু ভেড়া , গবাদি পশু আর শস্যক্ষেত ছিল । দস্যুরা তা লুট করে নিয়ে যাওয়ায় এখন সর্বস্বান্ত । ফলে জল খেয়ে আমাদের উপোষ করে থাকা ছাড়া আর কোন রাস্তা ছিলনা । আমরা কাঁদতাম । জমিতে বীজ ফেলার সময় এল । ঠাকুরদা তাও পারল না । কারন ঘরে কোন বীজ অবশিষ্ট ছিল না । তার অশক্ত শরীরের মত বাড়িটাও ভেঙেচুরে যেতে লাগল । তখন ঠাকুমা ঠিক করল এভাবে দিন কাটতে পারে না । দেশ ছাড়ার সিদ্ধান্ত আমাদের নিতেই হল । ঠাকুরমাই অবশ্য সিদ্ধান্তটা নিল । আমাদের ঠাকুরদা গুনগুন করে মৃদু স্বরে প্রতিবাদ জানাল । ঠাকুমা পাত্তা দিল না – এই শিশু বাচ্চাগুলো কি অকালে মারা পড়বে ?
আমরা সেই দেশ খুঁজতে লাগলাম যেখানে যুদ্ধ নেই , যেখানে দস্যু নেই । দূরে , অনেক দূরে সেরকম জায়গা নিশ্চয়ই আছে । ঠাকুমা চার্চের পোশাক দিয়ে দিল একজনকে তার বদলে পেল কয়েক মুঠো শুকনো দানা । তা সেদ্ধ করে ঠাকুমা বেঁধে নিল কাপড়ের খুঁটে । আমরা অবাক চোখে তাকালাম তার দিকে – তুমি চার্চে যাবে কীকরে ?
ক্ষিদের চেয়ে বড় ধর্ম কিছু নেই । তাছাড়া বহুদূর যেতে হবে আমাদের । জিনিস যত কম হয় ততই মঙ্গল ।
আমরা ভেবেছিলাম পথে নদী পাব । জল আমাদের তৃষ্ণা মেটাবে । কিন্তু কোন জলধারা চোখে পড়ল না । ঠাকুরমা তার জুতো জোড়া বিক্রি করে এক বোতল জল কিনল ।
আমরা ক্রুগার পার্ক পেরিয়ে এগিয়ে যাব । এতদূর অবধি রাস্তা আমাদের জানা ছিল । আমাদের সাথে আরও অনেক লোক এসে জুটল । একজন লোক আমাদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল । আমি ক্রমাগত ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করছিলাম – ক্রুগার পার্ক এল ? লোকটি বলল – না আসেনি । সারাদিন ধরে হাঁটতে হাঁটতে আমাদের ক্লান্ত লাগছিল । রাস্তায় আমরা বাঁদর দেখলাম , কচ্ছপ দেখলাম । লোকটা কচ্ছপটিকে ধরল মেরে রান্না করবে বলে । আমার খুব খিদে পাচ্ছিল । কিন্তু একসময় বাধ্য হয়ে কচ্ছপ টাকে সে ছেড়ে দিল । এখানে আগুন জ্বালালে ধুয়ো হবে । আর ধুয়ো দেখলেই পুলিশ আর বনরক্ষক ছুটে আসবে । দস্যুরা ছুটে আসবে । তখন অনেক হ্যাপা । তাই সাদা মানুষদের আস্তানা দূরে রেখে আমরা ক্রমাগত হেঁটে যেতে লাগলাম ।
একটা হরিণ দৌড়ে গেল আমাদের পাশ দিয়ে । এত উঁচুতে লাফ দিল মনে হল আকাশে উড়ে যাচ্ছে । জলের সন্ধান না জানায় আমাদের তৃষ্ণা বেড়ে যাচ্ছিল । মুখ শুকিয়ে যাচ্ছিল আমার । জন্তুদের পিছু পিছু গিয়ে আমরা জলাশয় দেখে নিচ্ছিলাম । নদীতীরের গাছগুলোতে থোকা থোকা ডুমুর ধরে আছে । পিঁপড়ে ভর্তি । তবু আমরা পেড়ে খেলাম । আর কোনকিছুই যা জন্তুরা পারে , আমরা খেতে পারলাম না । যুদ্ধও বোধ হয় মানুষকে পুরোপুরি জন্তু বানিয়ে দিতে পারেনা ।
দিনেরবেলায় সিংহগুলো ঘুমিয়ে ছিল । ওদের গায়ের রঙ ঘাসের রঙের সাথে মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে তাই আমরা দেখতে পাচ্ছিলাম না । সে আমাদের দেখিয়ে দিল । বলল – সাবধানে , আমাদের অনেকটা পথ ঘুরে যেতে হবে । আমার খুব ক্লান্তি লাগছিল । ইচ্ছে করছিল সিংহগুলোর মতন ঘুমিয়ে থাকি। আমার ছোট ভাই দিন দিন দুর্বল হয়ে যাচ্ছিল । কিন্তু আমি যখন পিঠে চাপিয়ে তাকে বহন করতাম মনে হত ওজন একবিন্দু কমেনি । আমরা দিনে হাঁটতাম , আমরা রাতেও হাঁটতাম । হাঁটতে হাঁটতে দেখতে পেতাম সাদা মানুষেরা তাদের আস্তানায় রান্না করছে । মাংসের ঝোলের গন্ধ ভেসে বেড়াত বাতাসে । আমি নাকের ভেতর বাতাসটাকে অনেকক্ষন বহন করতাম । একজন আমাদের দলের একজন মহিলা ওদের দিকে যেতে চাইল । বলল- ওদের কাছে কিছু খাবার চাইবে । ঠাকুমা বাধা দিল ।
মাঝে মাঝে আমরা থামতাম । সবাই মিলে জড়াজড়ি করে ঘুমিয়ে নিতাম । আমাদের জিনিস্পত্র যা কিছু ছিল সব ভরে রাখতাম ঝোপের নীচে । একদিন সেরকমই ঘুমিয়েছিলাম । যেখানে ঘুমিয়েছিলাম তার অল্পদুরেই হাতিঘাসের জঙ্গল । হাতির সমান উচ্চতা এক একটা ঘাসের । ঘন হয়ে আছে ঘাসগুলো । সকালবেলায় দাদুর খুব পায়খানা পেয়েছিল । সে তো আর আমার ভাইএর মতো সবার সামনে করতে পারে না । দাদু হাতিঘাসের জঙ্গলে আড়াল খুঁজে নিয়েছিল । অনেকক্ষন হয়ে গেলেও দাদুর ফিরে আসার নাম নেই । সঙ্গীরা অস্থির হয়ে পড়ছিল । তবু উৎকণ্ঠা নিয়ে তারা অপেক্ষা করছিল । আমি ঘাসগুলোর দিকে তাকিয়েছিলাম । দাদু ঘাস সরিয়ে ঠিক এসে পড়বে আমাদের কাছে । কিন্তু আসার কোন শব্দ পেলাম না । ছোট আকারের মানুষ বড় বড় ঘাসের জমিতে ঢাকা পড়ে গেছে তার অবয়ব কিন্তু সে আসছে । আমরা খুব নীচু গলায় দাদুকে ডেকে যাচ্ছিলাম । যাতে শুধুমাত্র দাদুই শুনতে পায় কিন্তু কোন দস্যুর কানে শব্দ না যায়। সারাদিন সেখানে রইলাম । সারা রাত্রি । তবু দাদু এলনা । স্বপ্নের ভেতর দাদু এসে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে একটা ঝোপের কাছে , যেখানে কোন মানুষ যেতে পারে না । ঘুম ভাঙলে দেখলাম তখনও ঠাকুরদা ফেরেনি । আমরা আবার সন্ধান শুরু করলাম । কতকগুলো বিটকেল পাখি উড়ে গেল আকাশে । যে লোকটা আমাদের রাস্তা দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সে ঠাকুমার দিকে তাকাল – এখানে বেশিক্ষন আটকে থাকলে বাচ্চাগুলো না খেয়ে মরে যাবে । ঠাকুমা ঝোপের দিকে শেষবারের মতো তাকাল তারপর ভাইকে তুলে নিল কোলে । তুলতে গিয়ে তার কাপড়ের উপরের অংশ ছিড়ে স্তন উন্মুক্ত হল । কিন্তু সেখানে ভাইয়ের খাবার মতো কোন উপাদান নেই । আমার চোখ দিয়ে জল পড়ছিল । বুঝতে পারছিলাম এই জায়গাটা এবার খালি হয়ে যাবে । আমি লম্বা ঘাসের জমিটার দিকে তাকিয়েছিলাম । ঠাকুমা আমার হাত ধরে টান দিল – চল ।
একটা তাঁবুর কাছে এসে আমরা থামলাম । তাঁবুটা পুরো একটা গ্রামের সমান । বাড়ির বদলে প্রত্যেক পরিবার অল্প অল্প করে জায়গা নিয়ে আছে । ভেতরে অন্ধকার জমাট বেঁধে রয়েছে । মাথার উপর ছাঁদ আছে । পাহাড়ের মতো এই তাঁবুর ভেতর কত কত মানুষ , শিশুর কান্না । এর মধ্যেও কেউ কেউ পার্টিশান দিয়ে নিজের নিজের পরিবারের জন্য ব্যক্তিগত ঘেরাটোপ রচনা করেছে । সেই আড়াল এতটাই ভঙ্গুর যে একটি মাঝারি উচ্চতার বাচ্চা উঠে দাঁড়ালেই তার নজরে পড়বে সবকিছু । তবু এখানেও জীবন আছে , আছে সদ্যজাতের কান্না ।
ভাইয়ের শরীর খারাপ হয়েছিল ঠাকুমা ওকে হাসপাতালে নিয়ে গেল । সেখানে একজন ডাক্তারবাবু আসে নিয়মিত । আর একজন সিস্টার । তার মুখের হাসি এত মিষ্টি যে আমার বারবার তাকে দেখতে ইচ্ছে করছিল । সে আমার মাথার চুল নেড়ে আদর করল । জানতে চাইল আমরা কোথা থেকে আসছি ।ভাইকে কোলে নিল । আদর করল খুব । তারপর আমাদের গুড়ো পাওডারের প্যাকেট দিল । আমি আর দাদা দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে সেই ফেললাম সেই প্যাকেট । আমার খুব খিদে পেয়েছিল । আমি জিব দিয়ে চেটে চেটে খেতে লাগলাম । আমার মুখের চারদিকে লেগে যাচ্ছিল গুড়োগুলো । আমি চেটে নিচ্ছিলাম সারামুখ । খাবারটা আমার পেটের মধ্যে সাপের মতো খলবল করে নেমে যাচ্ছিল । আমি টের পাচ্ছিলাম । তারপর আমাকে ডাকা হল একটা রুমে । আমার শরীরে ছুঁচ ফুটিয়ে একটা শিশিতে রক্ত টেনে নেওয়া হল । আমার মনে হচ্ছিল আমার শরীরে কোন জোর নেই । অথচ আমার ঠাকুমা তখনও নির্বিকার দাঁড়িয়েছিল । সইসাবুদ করে যাচ্ছিল সমস্ত কাগজে । তারপর আস্তে আস্তে আমরা উঠে দাঁড়ালাম । হাঁটতে শুরু করলাম বাড়ির দিকে ।হাসপাতাল থেকে ফিরে আসার পথে একজন মহিলার সাথে ঠাকুমার খুব ভাব হল । ঠাকুমা জিজ্ঞেস করল – হ্যাঁ , গো , মাদুর বানাবার ঘাস কোথায় পাওয়া যায় ? বউটি দুরের দিকে আঙুল বাড়িয়ে এক জঙ্গল দেখিয়ে দিল । আমাদের ঘুমনোর জন্য কয়েকটা মাদুর বুনেছে ঠাকুমা । আমরা সেই মাদুরে বসে খেলবার চেষ্টা করতাম । দাদা কেমন মনমরা হয়ে থাকত সবসময় । আমার মনে হত দাদা নয় আমার ঠাকুরদাই যেন বসে আছে আমার সামনে ।
ঠাকুমা একটা কার্ড পাঞ্চ করে আমাদের জন্য আমাদের জন্য পোশাক নিয়ে এল । আমি দুটো পোশাক পেলাম , একটা জামা আর একটা প্যান্ট । আমার স্কুলে যাওয়ার পোশাক । খুব আনন্দ হল আমার । ঠাকুমা বলল – আমার নাতনীটি সবকিছুর মধ্যে আনন্দ পায় । ও সারা দুনিয়াতে আনন্দেরই সন্ধান করবে কেবল ।
গ্রামের লোকেরা আমাদের স্কুলে যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিল । এই গ্রামের সব মানুষ আমাদের ভাষায় কথা বলে । তাই আমার খুব ভালো লাগছিল । সহজেই ভাব হয়ে গিয়েছিল ওদের সাথে । ঠাকুমা বলল – ওরাও একদিন আমাদের মতো পালিয়ে এসেছিল । তখন ক্রুগার পার্ক ছিল না ।
অনেকদিন হল আমরা এই তাঁবুতে । প্রায় দুবছর । আমি এখন এগারো । ভাইএর চার । ওর শরীর বাড়েনি । মাথাটাই বাড়ছে কেবল । এখনও স্বাভাবিক হয়ে ওঠেনি সে । ঠাকুমা তাঁবুর চারদিকে অল্পস্বল্প বীন আর বাঁধাকপির চাষ করেছে । কিন্তু এতেই সে পরিতৃপ্ত নয় সে আরও কাজ খুঁজে বেড়ায় এবং পায়ও । বাড়ি তৈরি হচ্ছে যেখানে , সেখানে গিয়ে ঠাকুমা মাথায় করে ঝুড়িতে ইট , সিমেন্ট , পাথর বয়ে নিয়ে আসে । এতে আমাদের চিনি চা দুধ আর সাবান কেনার পয়সা হয় । আমি মন দিয়ে পড়াশোনা করি । ঠাকুমা বিশ্বাস করে এই মেয়েটা একদিন পড়তে পড়তে বড় হবে । দোকানের বাইরে ফেলে দেওয়া বিজ্ঞাপনের কাগজ কুড়িয়ে এনে বইয়ে মলাট দিই আমি । অন্ধকার হওয়ার আগেই ঠাকুমা আমাদের পড়তে বলে । মোমবাতির অনেক দাম । তবু আমার জন্য একটা মোমবাতি জ্বেলে দেয় রাতে । আমি পড়ি । চার্চে যাওয়ার জন্য জুতো আর কেনা হয়নি তার । আমাদের নতুন জুতো কিনে দিয়েছে স্কুলে যাওয়ার । সেগুলো পরিষ্কার করার জন্য সুন্দর পালিশ । ঠাকুমা আমাদের জুতো পরিয়ে দেয় ।এই তাঁবুতে আমাদের ছাড়া আর কারো জুতো নেই । টানটান করে ফিতে বেঁধে দিতে দিতে ঠাকুমা আমাদের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । তখন তার শরীর থেকে ভালোবাসার গন্ধ পাই আমি । মনে হয় কোথাও কোন যুদ্ধ চলছে না আমরা নিজেদের বাড়িতেই আছি ।
একদিন হল কি কয়েকজন সাদা মানুষ আমাদের তাঁবুর সামনে এসে দাঁড়াল । আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম । ওরা তাঁবুর বাসিন্দাদের ছবি তুলতে লাগল । সবার ছবি তুলতে লাগল , আমারও । তারপর ঠাকুমার কাচে এল । প্রশ্ন করতে লাগল নানারকম । ঠাকুমা বুঝতে পারছিল না ওদের ভাষা । ওরা একজন দোভাষীকে ডাকল । সে ই সবকিছু বুঝিয়ে দিচ্ছিল ঠাকুমাকে – তোমরা এখানে আছো কেন ?
-যুদ্ধ চলছে । আমাদের তো বেঁচে থাকতে হবে ।
কতদিন আছো ?
– দু বছর ।
ভবিষ্যতে তুমি কী স্বপ্ন দেখ ?
– কিছুনা । আমি শুধু বর্তমান নিয়ে ভাবি ।
কিন্তু এই বাচ্চাগুলো , এদের নিয়ে তোমার কি কোন চাওয়া নেই ?
আছে । আমি চাই ওরা বড় হোক । পড়াশোনা করে ভালো চাকরি করুক ।পয়সা রোজগার করুক । নিজেদের জীবন আনন্দে কাটাক ।
দেশে ফিরতে চাও না ? তোমাদের সেই মোজাম্বিকের গ্রামে ? সেই মাটির রাস্তা ধরে …
আমি আর ফিরে যাব না ।
যখন যুদ্ধ থেমে যাবে ? যখন এই তাঁবু থাকবে না ?
ঠাকুমা বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকল অনেকক্ষন , এ কথার কোন উত্তর দিচ্ছিলনা । বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে একসময় বলে ফেলল – আমাদের কিচ্ছু নেই , কিচ্ছু নেই , সব ছিঁড়ে গেছে , শেকড়টাও ।
আমার কান্না পাচ্ছিল । ঠাকুমা এরকম বলল কেন ? আমি ফিরে যাব নিজেদের দেশে । ঠিক ফিরে যাব একদিন । যখন দস্যুরা থাকবে না চারপাশে । যখন বোমা বারুদ আর অস্ত্রশস্ত্রের শব্দ থেমে যাবে । তখন আমি আমরা সবাই ক্রুগার পার্কের পাশ দিয়ে যে রাস্তা চলে গেছে গ্রামের দিকে আমাদের দেশের দিকে ।সেই রাস্তা দিয়ে হেঁটে হেঁটে আমরা আমরা আবার ফিরে আসব দেশে । শেকড় মানে যেখানে ঘাসের ভেতর রয়ে গেছে আমার ঠাকুরদা । দেশ মানে যেখানে কোথাও না কোথাও অপেক্ষা করে আছে আমার মা ।
নাদিন গর্ডিমার
১৯২৩ সালের ২০ নভেম্বর তিনি দক্ষিন আফ্রিকার গোয়েটনে জন্মগ্রহণ করেন । বিশ্বের বর্ণবাদবিরোধী সরব যোদ্ধাদের মধ্যে তিনি অন্যতম । বর্ণবাদকেন্দ্রিক এবং পরবর্তী সময়ের সমস্যা এবং শঙ্কাগুলোই তাঁর সাহিত্যের উপজীব্য বিষয় ।লিখেছেন ছোটগল্প , উপন্যাস এবং প্রবন্ধ । প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্য তিরিশটিরও বেশি । তার মধ্যে পনেরটি উপন্যাস ।বার্গার্স ডটার , দ্য লেট বুর্জোয়া অয়ার্ল্ড , জুলাই’স পিপল এবং মাই সানস স্টোরি ইত্যাদি তাঁর জনপ্রিয় এবং সফল উপন্যাস । ১৯৭৪ সালে দ্য কনজারভেশনিস্ট উপন্যাসের জন্য তিনি বুকার পুরস্কার পান । ১৯৯১ সালে সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার লাভ করেন ।নোবেল কমিটি তাঁকে একজন মহৎ মহাকাব্যিক উপন্যাস রচয়িতা হিসেবে আখ্যায়িত করেন । বর্নবাদী সরকারের হাতে বারবার নিষিদ্ধ হয়েছে তাঁর বই । তবু আদর্শে অবিচল থেকেছেন তিনি । ২০১৩ সালে নব্বই বছর বয়সে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন ।