প্রতিটি মানুষের স্কুল নিয়ে অনেক গল্প থাকে,আদিখ্যেতা থাকে,স্মৃতি তো থাকেই।সেই সব স্মৃতি যে সবসময় সুখের তা নাও হতে পারে।তবু থাকে।কারণ প্রথাগত শিক্ষার জীবনের বেশিরভাগ অংশটাই একটা বাচ্চার কাটে স্কুলে।
স্কুল থেকেই শুরু হয় তার জীবনের দর্শন,মূল্যবোধের পাঠ,গুরুজনদের প্রতি ব্যবহার কেমন হবে তারও একটা পরিচয় ঘটে স্কুলের শিক্ষক শিক্ষিকাদের মাধ্যমেই।আমি যে অঞ্চলে বড় হয়েছি সেখানে কাছাকাছির মধ্যে মেয়েদের স্কুল ছিল দুটো।নবজাতক আর রামকৃষ্ণ সারদা বিদ্যামন্দির। ক্লাস ওয়ান থেকে এই রামকৃষ্ণ সারদা স্কুলেই আমার পাঠ শুরু।অজস্র ঘটনা তারপর গোটা স্কুল জীবন জুড়ে। খারাপগুলো মনে পড়ে বেশি। ভালোগুলো কম।যেমন মনে পড়ে আমাদের স্কুলের বিশাল মাঠ।সেখানে টিফিন পিরিয়ডে আমরা বন্ধুরা গোল হয়ে বসে গল্প করতাম,খেলতাম।সেখানেই পিটি ক্লাস হত।আবার ক্লাস শুরুর আগে প্রতিদিন পুরো এক ঘন্টা প্রার্থনা। এখন মনে হতেই পারে এই একঘন্টা ধরে কি প্রার্থনা করতাম আমরা!
তাহলে বলি, আমাদের প্রার্থনা সংগীত শুরু হত রামকৃষ্ণের স্তব দিয়ে। তারপর একের পর এক ঠাকুরের নামগান,রবীন্দ্রসংগীত যেগুলো পুজো পর্যায়ের সেগুলো,তারপর রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দ সম্পর্কে বড়দির ভাষণ,বিভিন্ন উক্তি ও তারপর আবার রামকৃষ্ণ শরণাম। আমরা লাইন দিয়ে শীত গ্রীষ্ম বর্ষা হাত জোর করে এভাবেই শিখেছিলাম জীবনের নানা স্তরে মনিষীদের অবদানের কথা। শিখেছিলাম আগে মানুষ হতে হয়,পরে বাকিগুলো। আর শিখেছিলাম নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য ক্ষমতা অর্জন করতে হয়।সেই ক্ষমতা সবার মধ্যে কম বেশি থাকে।তার চর্চা করা দরকার।
আমাদের স্কুল বাড়িটা ছিল মাঠের চারদিক জুড়ে। বাইরের গেট দিয়ে ঢুকে একদম মাঝামাঝি জায়গায় মন্দির। রামকৃষ্ণ সারদা বিবেকানন্দর।প্রতিদিন সেখানে মায়ের শাড়ি বদলানো হত।সে দায়িত্বে থাকতেন স্কুলের দিদিমনিরা। আমি ছোট্ট থেকেই দেখেছি অনিতা দি,কৃষ্ণা দি,রুবি দি,এরাই মূলত এই কাজটা করতেন।সেই সময় যদি ছাত্রীরা থাকতাম কেউ তার কপালে নকুল দানা,বাতাসা, ফলের কুচি কিংবা মিষ্টির টুকরো জুটত।
আমাদের আরেকবার প্রার্থনা হত ছুটির সময়।তবে তখন নিজেদের ক্লাসেই।
জানি না কেন বহু দিদিমনির মনে হত আমি পরীক্ষায় কখনো পাস করব না।বিশেষ করে বিজ্ঞান বিষয়ে ও অঙ্কে।
অংক বিষয়টা সত্যিই আমার কাছে ভয়ের ছিল।তার একটা কারণ ক্লাস ফাইভের এক ঘটনা।অঙ্ক পড়াতেন শুক্লাদি।তিনি বরাবরই খুব রাগী ও যাদেরকে পছন্দ করতেন না তাদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতেন না।আমি ছিলাম তার অপছন্দের তালিকায়।অঙ্ক যদি একটুও ভুল হত সঙ্গে সঙ্গে এমন বাক্য বানে নিষ্পেষিত করতেন যে আমার আর ইচ্ছে করত না অঙ্ক করতে।একদিন তাকে খাতা জমা দিতে গেছি,সেই সময় আমার বন্ধু অপর্ণা পিছন থেকে বলল,আমারটাও একটু জমা দিয়ে দে।আমি ঘাড় ঘুরিয়ে যেই তার খাতাটা নিতে গেলাম,চুলের মুঠি ধরে এমন করে মাথাটা ঘুরিয়ে দিলেন যে কদিন আমি ঘাড় সোজা করতে পারিনি।কিন্তু এসব মাকে বলার সাহস ছিল না।মা নিজেও আমার পড়াশোনা নিয়ে নানা অভিযোগ শুনতেন।যদিও কখনো খারাপ রেজাল্ট করিনি।প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় না হলেও দশমের মধ্যে থাকতামই বরাবর।কিন্তু কপাল।বুঝতে পারতাম না এত আক্রোশ কিসের!
আরেকজন ছিলেন ছন্দাদি।আমাদের ফিজিক্স পড়াতেন,কখনো কখনো অঙ্কও।তিনি তো আমার ভবিষ্যৎ বাণী করেছিলেন কোনোদিনই মাধ্যমিক পাস করব না।সর্বসমক্ষে বলতেন,হাঁড়ির একটা চাল টিপলেই বোঝা যায়,ভাত সেদ্ধ হবে কিনা!আমার মাথা দেখে উনি পরিস্কার বুঝতে পেরেছিলেন আমি কখনোই পড়াশোনা শেষ করতে পারব না।এই ভবিষ্যৎ বাণী অবশ্য আমাদের পাড়ার এক শখের জ্যোতিষি কাকুও করেছিলেন।আমার পড়াশোনা মাধ্যমিকেই শেষ হবে।
যাইহোক,এই দুজনের মিলিত প্রচেষ্টায় আমার অঙ্ক সম্পর্কে একটা মারাত্মক ভীতি তৈরি হল।যা আজও তাড়া করে বেড়ায়।
কিন্তু দিদিমণিরা একটা জিনিস জানতেন না জীবনটা শুধু প্লাস মাইনাস লাভ ক্ষতির সমন্বয় নয়।হয়তো আমার ভালোর জন্যই তারা এমন বলতেন।কিন্তু আমি কোনো রোবট ছিলাম না যাতে যা যা ইমপুট করা হবে,সব ঠিক সময় জলের মতো নেমে আসবে।
অবশ্য অঙ্ক নিয়ে আমার এই আতঙ্ক কিছুটা উত্তরাধিকার সূত্রেও পাওয়া।মামা দাদু, ঠাম্মা,এমনকি বাবার স্কুলের বন্ধুদের থেকে গল্প শুনেছি,বাবা কোনোদিন অঙ্ক করেননি।এমনকি অঙ্ক ক্লাসেও অনুপস্থিত থাকতেন।যখন স্কুলের ফাইনাল বোর্ডের পরীক্ষা সম্ভবত তখন তাকে ম্যাট্রিক বলা হত তখন তিনি গঙ্গার ধারে বসে তন্ময় হয়ে কবিতা লিখছিলেন। মামা দাদু পরীক্ষার গার্ড ছিলেন। তিনি দেখেন তার ভাগ্নে পরীক্ষা হলে নেই। তন্ন তন্ন করে খুঁজে তাকে পাওয়া গেল নদী তীরে।তিনি ওই পুরো সময়টার প্রথম দু’ঘন্টা ধরে একটি দীর্ঘ কবিতা লিখেছেন।ধরা পড়া আসামীকে পরীক্ষা হলে নিয়ে এলে তিনি সগর্বে ঘোষণা করলেন,অঙ্ক একটি বিমূর্ত বিষয় যার শুরু ও শেষ শূন্য দিয়ে। সেই হিসেবে সারা বিশ্ব দাঁড়িয়ে আছে একটি বৃহৎ শূন্যের উপর।কাজেই নতুন করে কিছু আবিষ্কার করার নেই। অতয়েব এই পরীক্ষা না দিলেও পৃথিবীর কোনো ক্ষতি হবে না।
মামা দাদু তখন তার ভাগ্নেকে পাস করাবার জন্য ব্ল্যাকবোর্ডে পাসমার্ক তোলার মত অঙ্ক কষে দেন।এবং তার নির্দেশে একটি ছাত্র বাবার খাতায় তা কপি করেন।বাবার বন্ধুরা বলেছিল,ভাগ্যিস, তোর বাবা পালিয়েছিল,তার কৃপায় আমরাও অঙ্কে পাস করে গেলাম।
এতো গেল বাবার কথা। তার আদরের বোনটিও এ ব্যাপারে ব্যতিক্রম ছিল না।সেজকা গার্ডকে চা দেওয়ার নাম করে চা কর্মী সেজে ক্লাসে ঢুকে বোনের খাতা নিয়ে চলে এসে অঙ্ক কষে আবার সে খাতা তার কাছে পৌঁছে দিয়েছিল।এই বোন পরবর্তী কালে এক বিখ্যাত সংবাদপত্রে নাম করা সাংবাদিক, সাতটি বিদেশী ভাষায় অনর্গল কথা বলা ও লেখায় পারদর্শী, অভিনেত্রী, লেখিকা ও দূরদর্শন,রেডিওর স্বনামধন্যা। কাজেই ওই অঙ্ক যখন তাদেরকে কোনো ক্ষতি করতে পারেনি তখন আমার বয়ে গেল অঙ্ক করতে।
কিন্তু আমি তো হেরে যেতে রাজি নই,আর আমার হয়ে পরীক্ষা হলে কেউ এসে অঙ্ক করে দেবে না।তাই এক অভিনব পদ্ধতি অবলম্বন করেছিলাম।একটা আস্ত টেস্ট পেপারের যত অঙ্কের প্রশ্ন আছে তার সমাধান ও উত্তর মুখস্থ করে ফেলেছিলাম টেস্টের পর।
অবশ্য এর পিছনে একটা গল্প আছে। টেস্টে আমি তিন পেয়েছিলাম অঙ্কে।বাকি সব বিষয়ে লেটার মার্কস।সেই সময় দূর্ভাগ্যবশত বাবার হার্ট এ্যাটাক হল।সবাই দেখতে আসছেন। সেই দিদিমনিরাও এলেন।বাবার জন্যেই আমাদের স্কুল গভর্নমেন্ট স্যাংসন স্কুলে পরিণত হয়েছিল। ফলে খানিকটা দায়বদ্ধতা ছিল।তাছাড়া অধিকাংশ শিক্ষয়ত্রী যে পার্মানেন্ট হলেন তাও বাবার দৌড় ঝাঁপের ও রেকমেন্ডসনের জন্য। কাজেই দেখতে আসাটা বাধ্যতামূলকও ছিল।
বিপদে পড়লাম আমি।তারা এসে বললেন,আমার রেজাল্ট এত খারাপ দেখে বাবার মনের ওপর খুব চাপ পড়েছিল। তাই এমন হল।এমনও শুনলাম বাবা এই আঘাত সহ্য করতে না পেরে চলেও যেতে পারেন যে কোনো দিন।
প্রথম সন্তান আমি।বাবা অন্ত প্রাণ।আমার কারনে বাবার মৃত্যু হবে!এ যে অসম্ভব। কাজেই একটাই পথ খোলা,কিছু না বুঝে ঝাড়া মুখস্থ করে ফেলা।এ বিষয়ে অবশ্য আমার দুই বন্ধু, যারা মনে করেছিল এমন অভিযোগ আমার সম্পর্কে হওয়া একেবারে উচিত নয়,তারা খুব সাহায্য করেছিল।প্রতি দুদিন অন্তর নিয়ম করে এসে দেখে যেত আমি কতটা মুখস্থ করতে পেরেছি।অবশেষে মাধ্যমিকে ৭৮নম্বর পেয়ে বাবার প্রাণ বাঁচালাম।প্রথম বিভাগের ও লেটারের কথা আর বলছি না।
এর বহু পরে একদিন বাবা বলল,হনা(বাবা আজীবন এই নামে ডেকেছেন আমাকে) তুই তখন এতদিন বাড়িতে বসেছিলি কেন?তোর স্কুল বন্ধ? নাকি শেষ হয়ে গেছে!কোন ক্লাসে পড়ছিস তুই এখন?
আমি অবাক হয়ে বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম।মা বলল,মনা তো ইলেভেনে পড়ছে।তুমি কিগো?এতটুকুও জানো না?তখন তো প্রিপারেসন নেবার জন্য ছুটি ছিল।তাই বাড়িতে ছিল।
আমি সেই মুহূর্তে অনুভব করলাম,বাবা আমার ক্লাস, রেজাল্ট কোনো কিছুই জানত না।কিন্তু দিদিমনিরা আমাকে এমন ভাবে বাক্য বাণে বিদ্ধ করেছিল যে আমি বোকার মত টেস্ট পেপার মুখস্থ করে পরীক্ষায় বসেছিলাম।
অবশ্য তাতে একটা উপকার হয়েছিল।কলেজে ভরতি হওয়া গেল।নইলে হয়তো সত্যি স্কুলের গন্ডীতেই আটকে থাকতাম।আর তাই ওই দুই দিদিকে ক্ষমা করে দিয়েছি।
তবে ভয় বা অভিমান বা দুঃখটা আজও রয়ে গেছে।ডাস্টার ছুঁড়ে মাথায় মেরে কপাল ফেটে যাওয়া,অথবা সাতদিন মাথা ঘোরালেই যন্ত্রণা অথবা নাচনী ওয়ালী হয়ে ভিক্ষা করে খেতে হবে, পড়াশোনা তো হবে না,এই কথাগুলো বুকের ভিতর স্থায়ী ক্ষতের মতো রয়ে গেছে।