পাল ছেঁড়া,ভেসে যায়…” (অপ্রেমের প্রবেশ পথ)
সম্পর্ক কাকে বলে!এই প্রশ্নটা বরাবরই মনের মধ্যে বিভিন্ন সময় ঘোরে।কোনো সম্পর্ক কি চিরস্থায়ী নাকি যে সম্পর্কগুলো মনে করা হয় খুব কাছের আদৌ তারা কাছের?কিছু সম্পর্ক না চাইলেও টেনে নিয়ে যেতে হয়,কিছু সম্পর্ক ভালোবেসে বজায় রাখা আর কোনো কোনো সম্পর্ক যা কখনো মনে হয় আছে, ঠিক আছে, না থাকলেও ক্ষতি নেই। সম্পর্কের মধ্যে নানা টানাপোড়েন। বাবা বলতেন, প্রতিটি সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছু দূরত্ব রাখতে হয়।একেবারে নালেঝোলে করলে সেগুলোর মধ্যে মাধুর্য হারিয়ে যায়।বাবার কথায় টেবিল ডিসট্যান্স।কিন্তু সেই টেবিলের দূরত্ব কতটা?
আবার এই প্রতিটি সম্পর্ক বলতে কারা? মা বাবা ভাই বোন সন্তান এদের সঙ্গে দূরত্ব রাখা যায় কি?আবার স্বামী,শ্বাশুড়ি, শ্বশুর এদের সঙ্গে দূরত্ব রাখব? বন্ধু বা আত্মীয় পরিজন তাদের সঙ্গে? অভিজ্ঞতায় দেখেছি যারা রক্তের নয়,শুধু বন্ধু তারা অনেক সময় এতটাই আপন যে তাদের সঙ্গে কতটা দূরত্ব রাখব তা নিয়ে সন্দিহান।আবার হয়তো কাউকে ভাবা হয়েছে আরে এতো আমার মেয়ের বয়সী, মানে মেয়ের মত,কিংবা ছেলের মতো, কিংবা নিজের দিদি নেই, দিদির মত,সহসা আবিস্কার করা আসলে এরা সেই জায়গায় কখনোই পৌঁছাতে পারেনি।সামান্য কিছু এদিক ওদিক হলেই ফোঁস।
আবার একটা মেয়ে বা ছেলে যখন অন্য একটা বাড়ির সঙ্গে সামাজিক বা বৈবাহিক বন্ধনে যুক্ত হয়ে কোনো পরিচয় নিয়ে আসে, চেষ্টা করে সব কিছু হাসিমুখে মানিয়ে নিতে সেখানেও বুঝতে পারে সবার সঙ্গে অলিখিত একটা দূরত্ব রয়েই গেছে। সেটা ভাঙার চেষ্টা না করাই ভালো।অনেক মানুষ, যারা রক্তের সম্পর্ক হীন এমনকি কোনো সূত্রেই আত্মীয়ও নয় তারাও হয়তো এতটাই আপন,সুখ দুঃখের সাথী যে তাদের সঙ্গে নিবিড় যোগ তৈরি হয়ে যায়।
আমি ভাবি সম্পর্ক তাহলে কি?কোন সম্পর্কগুলো টিকিয়ে রাখার আর কোনগুলি না থাকলেও প্রাত্যহিক জীবনে কোনো পরিবর্তন আসবে না। সম্পর্ক আসলে কাচের মত,আবার অনেক সময় বৃষ্টির মত।কিছুক্ষণের স্বস্তি তারপর ভ্যাপসা গরম অথবা জলে কাদায় মাখামাখি..
তাহলে সম্পর্কগুলো ঠিক কখন তৈরি হয়?যখন আমাদের দেখা হয়?
নাকি দেখা হওয়ারও বহুকাল আগে থেকেই সম্পর্ক নির্ধারিত হয়ে থাকে।
কে কার সাথে কোন পথে বাধাঁ পড়বে
সব পূর্ব নির্ধারিত ?দেখা হলে আমরা শুধু নাম দিই?এই নামটাই কি নির্ধারণ করে আমাদের পরবর্তী সম্পর্ক কোন স্রোতে বইবে?
—-“আমি তাকে নাম দিতে চাই
দেখি
যন্ত্রণা নামে কিছু
চোখের ভাষায় ডুবে আছে
নোনা এক স্বাদ মনে পড়ে…”
এই নোনা স্বাদ না থাকলে বুঝি সমস্ত সম্পর্কগুলো পানসে হয়ে যায়।তখনি তৈরি হয় বিদ্বেষ রাগ।কিন্তু অভিমান! সেতো অধিকারবোধ থেকে জন্ম নেয়।ঠিক যেমন কালের গহ্বর থেকে উঠে আসে আমাদের প্রতিটি আবেগ।এই আবেগ দ্বারাই পরিচালিত আমরা।তার জন্যেই মান অভিমান রাগ অনুরাগ ভালোবাসা ঘৃণা।
এগুলো না থাকলে যার সঙ্গে সম্পর্কের বন্ধনে আবদ্ধ হলাম সেগুলোর মধ্যে কোনো দায় থাকে না।
তাহলে কী দায় থাকার জন্য সম্পর্ক? দায় না থাকলে যে সুগন্ধি এতক্ষণ আমাদের ঘিরে ছিল তা হঠাৎ করে উবে যায়?যে আলোর বৃত্তে এতক্ষণ আমরা ডুব দিলাম তা অন্ধকারে নিমজ্জিত হবে?
আলো কোথায়? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন –
“কোথায় আলো, কোথায় ওরে আলো!
বিরহানলে জ্বালো রে তারে জ্বালো ।
রয়েছে দীপ, না আছে শিখা,
এই কি ভালি ছিল রে লিখা-
ইহার চেয়ে মরণ সে যে ভালো ।
বিরহানলে প্রদীপখানি জ্বালো ।”
বিরহ হলে তবেই কি তাহলে সম্পর্কের গুরুত্ব বোঝা যায়! কিন্তু যে সম্পর্কগুলো কেবল প্রয়োজনের তাগিদে ডালাপালা মেলে,মিটে গেলে গুটিয়ে নেয় সেগুলো ?
এই যে হঠাৎ যে মেয়েটিকে মনে হল আমার মেয়ের মত,তাকে বুকে জড়িয়ে ধরলাম পরম মমতায়,কিংবা ছেলেটি যাকে ভাবলাম আহা আমার ছেলেও হতে পারত এরকমই, কিংবা এতো আমার ভাই বা দিদিও হতে পারত, এক বৃষ্টির রাতে দেখলাম আসলে এরা আমার কেউ নয়,এরা ছেঁড়া ঘুড়ির সুতো তখন মন কেমন করে,মন বলে-
“মন, তুমি মনের চরিত্র জানো?
সাত রঙ খেলা করে-
যদি হদিশ না পাও…”
এই হদিশ পাবার জন্যই সম্পর্ক ঘুরে ফিরে আসে নানা রঙ নানা নাম ও আলো ছায়া নিয়ে।
আমরা অপেক্ষায় থাকি।ঠিক যেমন ভোর হবে বলে রাতের প্রতীক্ষা।
“নিঃসঙ্গ প্রেমিকের মত
আকন্ঠ হিম মেখে
নেশায় পড়ে থাকি
আলোকবর্ষ দূরের
ভোরের প্রত্যাশায়।”
ভোর হলে তবেই তো মিঠে রোদ ছুঁয়ে যাবে আবার সম্পর্ক নামক গাছটিকে।যা একসঙ্গে ধারণ করবে ঘৃণা ও ভালোবাসা,অভিমান ও অনুরাগ, দূরত্ব ও ভীষণ কাছে পাবার ইচ্ছে। আর মুছে দেবে মনের মধ্যে জমে থাকা মেঘ।বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে যাবতীয় বিষাদ নিয়ে। তারপর আবার মাটি সিক্ত হবে নতুন কোনো স্পর্শে।
তাই সম্পর্কের কোনো শেষ হয় না,শুরুও হয় না।তা কেবল বহমান এক স্রোত।পছন্দ না হলে চুপি চুপি স্রোতটাকে এড়িয়ে পাড়ে গিয়ে বসে থাকলেই সমুদ্রের আসল সৌন্দর্য দেখা যাবে।
বাকিটা থাক…