সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিতস্তা ঘোষাল (পর্ব – ১৭)

কু ঝিক ঝিক দিন

১৭.

“বাদলা হাওয়ায় মনে পরে ছেলেবেলার গান
বৃষ্টি পরে টাপুরটুপুর নদে এলো বান…”
বৃষ্টি নিয়ে আমাদের আদিখ্যেতার শেষ নেই। স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ যত গান লিখেছেন তার বেশিরভাগটাই বর্ষার। ‘রিমঝিম ঘন ঘন রে… “বা “মন মোর মেঘের সঙ্গী… ” কিংবা ছোটো বেলায় যারা গান করত বা নাচ তাদের শেখানো হবেই পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে অথবা বাদল বাউল বাজায় বাজায় বাজায় রে একতারা…।হলফ করে বলতে পারা যায় বাংলা ভাষী এমন কোনো শিশু নেই যারা এই দুটি গান শোনেনি।
তবে শুধু এখানেই তো থেমে থাকা নয়,’ঝরো ঝরো বরিষে বারিধারা… “-যেখানে ছবির মতে আঁকা হচ্ছে
“হায় পথবাসী, হায় গতিহীন,   হায় গৃহহারা ॥
ফিরে বায়ু হাহাস্বরে,   ডাকে কারে জনহীন অসীম প্রান্তরে–
রজনী আঁধারে॥
অধীরা যমুনা তরঙ্গ-আকুলা অকূলা রে,   তিমিরদুকূলা রে।
নিবিড় নীরদ গগনে   গরগর গরজে সঘনে,
চঞ্চলচপলা চমকে–   নাহি শশীতারা ॥”
অর্থাৎ পুরো দৃশ্যটা চোখের সামনে বৃষ্টির দিনের।
তবে শুধু রবীন্দ্রনাথ কেন এর বহু আগেই তো লেখা হয়েছে “আষাঢ়ষ্য প্রথম দিবসে মেঘমাসৃষ্টসানুং/বপ্রক্রীড়াপরিণতগজ প্রেক্ষণীয়ং দদর্শ।’ -(মেঘদূত।) বহুকাল আগে এভাবেই কালিদাস মুগ্ধ হয়েছিলেন আষাঢ়ের রূপে। আষাঢ় শব্দটার মধ্যে কেমন একটা গুরুগম্ভীর ভাব আছে, আছে স্বপ্নাবিষ্ট এক মোহময়তা।
বার বার গানে-কবিতায় বাংলার কবিরা করেছেন বর্ষা-বন্দনা। গ্রীষ্মের খরতাপে অতিষ্ঠ প্রাণকে শীতলতা দানে জুড়ি নেই বর্ষার। প্রকৃতিপ্রেমিক মানুষের কাছে তাই বর্ষা নিয়ে আসে অভিনব ব্যঞ্জনা আর কবিদের ক্ষেত্রে তো কথাই নেই।
‘বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল’ দিয়ে যেখানে প্রণয় নিবেদন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ সেখানে নজরুলের কাছে বর্ষাকে মনে হয়েছে ‘বাদলের পরী’।
তর্পন কবিতায় তিনি লিখেছেন –
“আজিও তেমনি করি
আষাঢ়ের মেঘ ঘনায়ে এসেছে
ভারত-ভাগ্য ভরি।
আকাশ ভাঙিয়া তেমনি বাদল
ঝরে সারাদিনমান।
দিন না ফুরাতে দিনের সূর্য
মেঘে হলো অবসান।”
আবার যে শুধু কবিতা বা গানেই বৃষ্টি আষাঢ় বর্ষা সীমাবদ্ধ তা কিন্তু নয়।প্রেমপত্রেও বৃষ্টির বা শ্রাবণী মেঘের ছোঁয়া দেখা যায়।রবীন্দ্রনাথকে যদি বাদও দিই নজরুলও লেখেন চিঠি তাঁর প্রথমা স্ত্রী মতান্তরে প্রেয়সী নার্গিস, আসার খানম ওরফে সৈয়দা খাতুনকে –
“তোমার পত্র পেয়েছি- সেদিন নববর্ষার নব-ঘন-সিক্ত প্রভাতে। মেঘ- মেদুর গগনে সেদিন অশান্ত ধারায় বারি ঝরছিল। পনের বছর আগে এমনি এক আষাঢ়ে এমনি বারিধারার প্লাবন নেমে
ছিল- তা তুমিও হয়তো স্মরণ করতে পার। আষাঢ়ের নব মেঘপুঞ্জকে আমার নমস্কার। এই মেঘদূত বিরহী যক্ষের বাণী-বহন করে নিয়ে গিয়েছিল কালিদাসের যুগে, রেবা নদীর তীরে,
মালবিকার দেশে তাঁর প্রিয়ার কাছে। এই মেঘপুঞ্জের আশীর্বাণী আমার জীবনে এনে দেয় চরম বেদনার সঞ্চয়।”
রবীন্দ্র নজরুল বাদ দিয়েও অজস্র কবির কবিতা, গীতিকারের গানে বৃষ্টির আমেজ।
বলাবাহুল্য সিনেমায় তো বৃষ্টির জয়জয়কার।যখনি কোনো রোমান্টিক মুহূর্ত তৈরি হচ্ছে তখনি নীল সিফনের শাড়ি পরে নায়িকা আর নায়কের নৃত্য।
প্রথমেই মনে পড়ে রাজ কাপুরের “শ্রী ৪২০” ছবির ‘প্যার হুয়া ইকরার হুয়া’ গানটি। ভারতীয় সিনেমার এই ক্লাসিক গানে ছাতা নিয়ে দাঁড়ানো রাজ কাপুর ও নার্গিসের ছবি, শৈলেন্দ্রর লেখা আর শঙ্কর – জয়কিষান এর সুরে মান্না দে ও লতা মঙ্গেশকরের গানটি অনেককেই গুনগুন করেন।
“চলতি নাম কা গাড়ী” ছবির ‘এ লেড়কি ভিগি ভাগিসি’ গানের মাধ্যমে নায়ক কিশোর কুমার ও বৃষ্টিস্নাত মধুবালার ভালোবাসার শুরু। “১৯৪২ এ লাভ স্টোরি” র অনিল কাপুর ও মণীষা কৈরালা অভিনীত ‘রিমঝিম রিমঝিম’ কিংবা যশ চোপড়া র “দিল তো পাগল হে” ছবির ‘কোই লেড়কি হে’ গান দুটি সত্যি সত্যিই ভালোবাসার গান। আরও একটি ভালোবাসার গান যা আমি আজও খুব মন দিয়ে শুনি সেটা হল “মঞ্জিল” ছবির ‘রিমঝিম গিরে শাওন’। ছয় ফুট দু ইঞ্চির অমিতাভ আর ছোটখাটো মৌসুমীর বৃষ্টিতে ভেজার দৃশ্য আর সঙ্গে প্রায় পঞ্চাশ বছর আগের ভাঙা ফুটপাথের ম্যারিন ড্রাইভ গানটির বাড়তি পাওনা।
চামেলি সিনেমাতে নায়িকা করিনা কাপুরের সঙ্গে নায়ক রাহুল বোসের দেখা হয় এক বৃষ্টিমুখর রাতে। ঋতুপর্ণ ঘোষের ‘‘রেইনকোটে’’ সিনেমাতেও সিনেমা জুড়েই বৃষ্টির দৃশ্য। নায়িকা ঐশ্বরিয়া রাই ও নায়ক অজয় দেবগনের অতীতের স্মৃতিচারণে বোঝা যায় তাদের অতীত প্রেমের সময়টা আনন্দময় হলেও বর্তমান জীবন শ্রাবণধারার মতোই বেদনাময়।
আমির খান আর নীলমের “অফসানা প্যার কা” ছবির ‘টিপ টিপ টিপ বারিশ শুরু হোগেয়ী’ অমিত কুমারের গাওয়া গানটি আমার আজও একটি পছন্দের গান।
আবার যশ চোপড়ার ‘‘মশাল’’ সিনেমায় প্রবল বৃষ্টির রাতে দীলিপ কুমার তার মৃত্যুপথযাত্রী স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো যানবাহন পান না। এখানে বৃষ্টি যেন বিপদ ও অসহায়ত্বের প্রতীক। যশ চোপড়ার আরেক সুপারহিট ছবি “চাঁদনি”র সুরেশ ওয়াদেকারের গলায় ‘লগী আজ শাওন কি ফির বো ঘড়ি এ’ গানটি বিনোদ খান্নার নিঃসঙ্গ জীবনের বেদনা তুলে ধরেছে।
বৃষ্টি এখানে বিরহের প্রতীক। “লাগন” সিনেমায় বৃষ্টি এসেছে জয়ের প্রতীক হয়ে। খরা ও দুর্দশা পীড়িত গ্রামে শেষ দৃশ্যে বৃষ্টি নামে সব প্রতিকূলতাকে জয় করে বেঁচে থাকার ও নতুন জীবনের প্রত্যাশা নিয়ে।
কিংবা “মিঃ ইন্ডিয়া” ছবির ‘কাটে নেহি…’ গানে শ্রীদেবীর নীল সিফনে নাভি ও বুকের বিভাজনে কিংবা “ফুল আর কাটে” ছবির ‘পেহলি বারিশ ম্যায় ওর তু…’ কি ভোলা যায়!কত যুবক যুবতী কিশোর কিশোরীর হৃদয় যে উত্তাল হয়েছে এসব গানে তার হদিশ কে রাখে!
আমাদের কিশোরী বেলায় আর একটি ছবির গান খুব জনপ্রিয় হয়েছিল।মোহরা ছবিতে অক্ষয় কুমার আর রবিনা ট্যান্ডনের নাচ আপামর ভারতীয়কে পাগল করে তুলেছিল। টিপ টিপ বারষা পানি পানি পে আগ লাগ গয়া… হলুদ সিফনের শাড়ির চাহিদা এই গানের পর একধাপে বেড়ে গেছিল।
শুধু কী হিন্দি গানেই বৃষ্টি! বাংলা গানেও তার ব্যতিক্রম দেখি না।যদিও বেশিরভাগ বাংলা ছবি এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথকে আশ্রয় করেছে,কিন্তু ব্যতিক্রম তো আছে।
যেমন সুধীন দাশগুপ্তের সুরে গৌরীপ্রসন্ন র লেখায় বিশ্বজিতের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের কন্ঠে শেষ পর্যন্ত ছবির ‘এই মেঘলা দিনে একলা, ঘরে থাকে না তো মন’ শুনে মন সত্যি ঘর ছেড়ে বাইরে যেতে চায়।সেই সঙ্গে মনে এল, হেমন্ত-কন্যা রাণু মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘ঝির ঝির ঝিরঝির বর্ষায়, কিংবা ‘রিমঝিম এই শ্রাবণে’। আবার সতীনাথ মুখোপাধ্যায়ের গাওয়া ‘এল যে বরষা মনে তাই’—রিম ঝিম ঝিম, রিম ঝিম ঝিম, গান গেয়ে যাই। ও দিকে মান্না দের গাওয়া ‘রিম ঝিম ঝিম বৃষ্টি’ এবং চলচ্চিত্রে নজরুলের সেই বেদনা মাখা গানটা ‘শাওন রাতে যদি স্মরণে আসে মোরে।’
তালাত মাহমুদের গাওয়া বর্ষার গান ‘এই রিম ঝিম ঝিম বরষায়’ বা ‘মুখর বাদল দিনে’। সুধীন দাশগুপ্তের স্বরে ‘থই থই শ্রাবণ এলো ওই’, ‘আকাশ এত মেঘলা যেও না কো একলা’, ‘টাপুর টুপুর সারা দুপুর নূপুর বাজায় কে’, ‘শ্রাবণ চলো চলো’। হৈমন্তী শুক্লার গাওয়াও একটা ভারি মিষ্টি গান ‘বর্ষা তুমি চোখের পাতা ছুঁয়ো না’।
লতা মঙ্গেশকরের গাওয়া বাংলা চলচ্চিত্রে অপর্ণা সেনের লিপে ‘বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ সৃষ্টি’। আবার ‘বৃষ্টি তুমি ঝোরো না’কো ওমন করে’, ‘এই বৃষ্টিতে ভিজে মাঠে চলো চলে যাই’।
মোট কথা বৃষ্টি বা এই শ্রাবণ নিয়ে একটা আদিখ্যেতা রয়েছে সব জায়গাতেই। সেই কোন ছোটো বেলায় মুখস্থ করতে হয়েছিল –
Rain, rain, go away
Come again another day
Daddy wants to play
Rain, rain go away…
আরও বড় হয়ে এডওয়ার্ড থমাসের ‘রেন’ কবিতাটা-
Rain, midnight rain, nothing but the wild rain
On this bleak hut, and solitude, and me
Remembering again that I shall die
And neither hear the rain nor give it thanks
For washing me cleaner than I have been
Since I was born into this solitude.
Blessed are the dead that the rain rains upon …
কিন্তু আমার কাছে বৃষ্টি মানে এগুলোর বাইরেও একটা নিজস্ব জগত।যেমন বৃষ্টি হলেই রায়পাড়া মোড় থেকে আমাদের সিঁথি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘ সারদা বিদ্যামন্দির মানে হাঁটা পথে ছয় সাত মিনিটের রাস্তায় কোমড় অবধি জল।সেই জল ভেঙে শাড়ি বা স্কার্ট ভিজিয়ে জুতো ছপছপ করতে করতে স্কুল যাওয়া। জলেতে ভেসে আসা বিভিন্ন ময়লা,স্কুলে ঢুকে ভিজে শাড়ি খুলে পিছনের বেঞ্চে মেলে দেওয়া,দিপ্তী মাসির থেকে শাড়ি যদি পাওয়া গেল তো ভালো,নইলে ব্লাউজ আর সায়া পরেই ক্লাস।ক্লাস বলতে সেদিন আর পড়াশোনা নয়,দিদিরা নিজেদের মতো গল্প বলতেন,আমরা কেউ গান গাইতাম,কেউ কবিতা বলতাম। কখনো কখনো আবার রেনি ডে হয়ে যেত।সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফেরার বদলে যতটা ঘুরে ঘুরে জল পাড়িয়ে বাড়ি ফেরা যায় ততই মজা।আবার বৃষ্টি হলে মা অনেকসময় নিজে থেকেও ভিজতে বলতেন।কারন বৃষ্টির জলে ঘামাচি মরে যায়।
বৃষ্টির দিনে আরও মনে পড়ে সিঁথির বাড়িতে আমি আর আমার মেজবোন এক ঘরে শুতাম।হঠাৎ বিদ্যুৎ আর বৃষ্টির আওয়াজে ঘুম ভেঙে এক দৌড়ে বাবার ঘরে।জানতাম বাবা চুপ করে বসে থাকবেন জানলা খোলা রেখেই। ঠিক তাই। গিয়ে দেখতাম চারদিক দিয়ে জল ঢুকছে।বাবা চুপ করে মশারির ভিতর বসে।আমরা যেতেই বললেন, ভাগ্যিস এলি।আমি তো বুঝতেই পারছিলাম না কী করব!
তারপর সারা রাত সেই বৃষ্টি গায়ে মেখেই বারান্দায় বসে বাবার একটার পর একটা সিগারেট খাওয়া,বোনের গান আর বাবার কবিতা চলত।যতক্ষণ না মা সকালে ঘুম থেকে উঠে চা করতে গিয়ে আমাদের না দেখতে পেয়ে বাবার ঘরে আসতেন।
আসলে বৃষ্টি মানে শুধু তো মেঘে মেঘে ঘর্ষণ নয়,সমুদ্র থেকে জলীয় বাস্প আকাশে মিশে বিন্দু বিন্দু হয়ে ঝরে পড়া নয়,বৃষ্টি হল না বলা অব্যক্ত কথামালা,সেই সব কথারা যা দীর্ঘদিন ধরেই বলার জন্য অপেক্ষায় ছিল, কিন্তু প্রকাশ করতে পারছিল না,তাই একদিন হঠাৎ করেই সব বাঁধন ছিন্ন করে নেমে এল দল বেঁধে, আর তাতেই সিক্ত হলাম আমরা,লেখা হল না বলা অজস্র শব্দের মালা। সেই মালার সুতোটা যে যেভাবে বাঁধতে পারে তার কাছে বৃষ্টি ততই নতুন রূপ নিয়ে ধরা দেয়।
ক্রমশ…
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!