সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ১৭)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
ছেলে মেয়ে দুটি অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এল তখন অনুষ্ঠানের প্রথম পর্ব শেষ ঘোষিত হল। পরবর্তী পর্বে রয়েছে নাটক। নাটকের নাম “ডাকঘর “। ছুটি তো আজ উইলসন ইশকুলে পুরস্কার পেয়েছে “ডাকঘর”। তার বেশ গর্ব হলো, বইটা তার কাছে আছে। তবে পড়া থাকলে খুব ভালো হত। সে পাশের মেয়েটিকে বলল – জানো আমি আজ আমাদের উইলসন ইশকুলে “ডাকঘর” পুরস্কার পেয়েছি।
– তাই? কি করেছিলে?
-নাচ।
-তুমি নাচতে পারো? কোনটা করেছ “ধানের ক্ষেতে “?
-“খরবায়ু বয় বেগে ”
-অহো ওইটা দারুণ। আমার কোন জায়গাটা ভালো লাগে বলোতো হেই মারো মারো টান হেইও হেইও।
– একদম ঠিক।
মেয়েটি হেসে ছুটির হাত ধরে। বলে আমিও আজ নাচ করেছি আমাদের পাঠশালায়। তবে আমি করেছি “ধানের ক্ষেতে রৌদ্রছায়ায়” বলে মেয়েটি কিছু নাচের মুদ্রায় হাত নাচাল।
-আচ্ছা তোমার নাম কি?
– শিউলি। তোমার নাম?
-ছুটি।
-বাহ কি সুন্দর নাম।
-তোমার নামও খুব সুন্দর।
এদিকে অর্জুন স্যার ছেলেমেয়ে দুটিকে বললেন -এভাবে তো দেওয়া যাবে না। এরা তো একদিনও রিহার্সাল অবদি দেয় নি।
যে স্যার এদের নিয়ে এসেছেন উনি কী একটা বললেন ঠিকঠাক শোনা গেল না।
ততক্ষণে সৃজন স্যার এসেছেন। জিজ্ঞেস করলেন -কোন গানটা গাইবে?
-আমরা দুজনেই খুব ভালো গাই স্যার।
অর্জুন স্যার বললেন -সেটা আগে ভাবা দরকার ছিল।
সৃজন স্যার বললেন -নাটকের শেষে একবার দেওয়া যায় অর্জুন? তবে কোন গানটা গাইবে সেটা বলতে হবে।
-গেয়ে শোনাই স্যার এখানে? শুনলে আমি চান্স পাবো ঠিক।
তখন দর্শক আসন এলোমেলো। মঞ্চে স্ক্রিন টেনে রাখা হয়েছে।
মেয়েটি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিল। ছেলেটি হাতছানি দিয়ে ডাকল। মেয়েটি এগিয়ে এলে ছেলেটি বলল – আভি একসাথ,বাদ মে য্যায়সে হমলগ ত্যায় কিয়া, ঠিক হ্যায়?
বলে অর্জুন স্যারের সামনে রাখা মাইক্রোফোনটা একটু টেনে নিয়ে সবাইকে দারুণ চমকে দিয়ে গেয়ে উঠল-
৷ নিসুলতানা রে প্যার কা মৌসম আয়া
আরে হ্যায় রে হ্যরি হ্যরি ছায়া
বলো ন বলো মু সে গোরি
চুড়ি তুমহারি বোলে…
সবাই এতটাই চমকিত হয়েছে যে চারপাশে একটা পিনপতন নীরবতা। বাইরে যারা ছিল তারা ছুটে ছুটে হলের ভেতর ঢুকতে শুরু করেছে। স্যাররা বাকহারা। অবশ্যই দুজনে বেশ ভালো গাইছে। সৃজন স্যার বললেন – হয়েছে হয়েছে। থামো।
দর্শক আসনে তখন হাসি শুরু হয়েছে। গানের স্যার এগিয়ে এসে বললেন -তোরা আমার সাথে আয়, বুঝিয়ে দিচ্ছি। ওরা মিউজিক স্যারের সাথে বেরিয়ে গেল। সৃজন স্যার ও অর্জুন স্যার দুজন দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠলেন।
একটু পর মিউজিক স্যার এসে বললেন -ওদের বুঝিয়েছি অন্য ফাংশানে ওই গান করে নিস। আর আজ সমাপ্তি সঙ্গীতে ওদের মঞ্চে উঠিয়ে দেব, ওই “আনন্দলোকে মঙ্গলালোকে “।
অর্জুন স্যার বললেন -খুব ভালো ম্যানেজ করেছ। ছুটি শুনেছে ওই গানটা নাকি সকালের প্রার্থনা অনুষ্ঠানে গাওয়া হয়, তার মানে সবাই জানে। সুতরাং অসুবিধে নেই।
ছুটিরা এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় “ডাকঘরের” জন্যে।
নাটক শুরু হল। একটি বাচ্চা ছেলে কী সুন্দর করে কথা বলছে। তার নাম অমল। কিন্তু অমলের অসুখ কেন? কী অসুখ? কেন এই কবিরাজ আর এই মাধবদত্ত অমলকে ঘরের ভেতর আটক করে রেখেছে? ঘরে আটকে রেখে বলছে তুমি বড় হলে পন্ডিত হবে, এই বড় বড় পুঁথি পড়বে।অমল কী সুন্দর করে বলল – সে পন্ডিত হতে চায় না। সে শুধু চারদিক দেখে বেড়াতে চায়। সে ওই উঠোনের কাঠবেড়ালিটার কাছে যেতে চায়। সে পাহাড় ডিঙোতে চায়। সে অই কাঁধে লাঠির আগায় পুঁটলি বাঁধা অই লোকটার মত কাজ খুঁজতে যেতে চায়। তবে সব তো বুঝা গেল না। ওই ডাকঘর প্রহরী মোড়ল সুধা ঠাকুরদাদা রাজার চিঠি সব মিলে কেমন একটা ব্যথাভরা অনুভব। আজই বাড়ি ফিরে ছুটি তার পুরস্কার পাওয়া ডাকঘর খুলে পড়বে। না বুঝলে দিদিদেরকে কিম্বা মা-কে কিম্বা বাবাকে জিজ্ঞেস করে বুঝবে।
৷ অনুষ্ঠান শেষে সবাই বাড়ি ফিরছে, সবাই হই হই করছে কে কেমন করল কে কি পুরস্কার পেল, রাস্তার পাশে ঝিলটার ওপর সন্ধ্যার ছায়া ঘনিয়েছে। পাশের বড় বড় গাছগুলোর ভূতুড়ে মাথায় পাখিদের কলকাকলি। অমলের জন্যে মনটা কেমন করে উঠল। অমল কি ঘুমিয়েছে? রাজা এসে ডাকলে সে উঠবে। কখন আসবে রাজা? সুধা তার জন্যে ফুল দিয়ে গেল। বলে গেল – তোমরা একটা কথা ওর কানে কানে বলে দিও, বলো যে সুধা তোমায় ভুলে নি। ইস, অমল তখন জেগে থাকলে কত খুশি হত! এমনটা কেন হয়? অমল কি সত্যিই জাগবে? সত্যিই রাজা আসবে? কিন্তু মনটা এমন করছে কেন? কেন মনে হচ্ছে অমলের ঘুম থেকে আর হয়তো জাগবে না?
এই সন্ধ্যায় সবার সাথে বাড়ি ফেরার পথে পথে অমলের ছায়া পড়ে আছে কেন?
ক্রমশ