সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ১)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
মন্থর ছিল সে দিনরাত। বড় সুখ ছিল। দু:খকষ্টগুলোতেও মায়াবী আঁচড় ছিল। পৃথিবীটা তখন নতুন, অনেককিছু দেখা হয়নি, অনেককিছু রহস্যে মোড়া – ঐ সামনের খোলা জায়গা পেরিয়ে টিলাভূমির কোল ঘেঁষে নীচে, অনেকটা নীচে খোলা অবাধ ধানক্ষেত, ধানক্ষেত পেরিয়ে, অনেকটা পেরিয়ে সবুজ গাছপালা ঘেরা দিগন্ত, আর দিগন্তের ধোঁয়াশা মাখা ঝাপসা কুয়াশার বিস্তার, বিশাল লাল বলের মত সূর্য পাটে যাওয়া, তার লালিমা ছড়ানো লজ্জারুণ মুখশ্রী, এসবই ছিল বর্তমানের দ্রুতগামিতার বাইরে এক আলাদা জগত। মনে হয় পূর্বজন্মকথা। তবে পূর্বজন্ম তো নয়, সে তো এ জন্মের ই কথা। সেটা ষাটের দশক।
এখন বড় কষ্ট হয় ভাবলে যে ধেয়ানিবস্তিতে যাওয়া হয়নি। কেন যাওয়া হয়নি? ঐ হলুদ শস্যে ভরা কিম্বা সবুজ শস্যে ভরা অথবা শুকনো খড়ে ছাওয়া কিম্বা ন্যাড়া প্রান্তরের আলপথ আজকাল মাঝেমাঝেই উঁকি দেয়। মনে হয় ঐ ধানক্ষেত ধরে এগিয়ে গেলেই তো ধেয়ানি বস্তিতে যাওয়া যেত।
‘ধেয়ানি’ এক উপজাতি, খুব সম্ভব অসমীয়া সম্প্রদায়ের। অসমীয়া ভাষারই এক আঞ্চলিক রূপ ছিল ধেয়ানি উপজাতির মাতৃভাষা। খুব ছোট জনগোষ্ঠী। লোকজন কত সরল। চা বাগানে পুজোর সময় তারা বাংলাভাষাতেই যাত্রাপালা করত। ছুটির তো বাবার সাথে সেখানে যেতে হবেই। যাত্রাপালা আর কি! এক রাজা আর এক রানী, তাদের আছে অনেক সোনাদানা হিরেজহরত অনেক সম্পদ আর আছে প্রতিবেশী প্রতিপক্ষ রাজ্যের সাথে যুদ্ধ। যুদ্ধ ছাড়া হবেই না। ওটা যাত্রাপালাতে অতি আবশ্যক মানে মেন্ডেটরি। যুদ্ধ ক্ষেত্রে দু’ চারটে হত্যা দৃশ্য তো থাকতেই হবে। ধেয়ানিরা ‘ত’ কে ‘ট’ বলত। একটা সংলাপ ছিল এইরকম, “রাজা রাজা হট্টা করো হট্টা করো হট্টা হট্টা হট্টা “…তারপর কী তরবারির ঝনঝন। সারারাত জেগে যাত্রা পালা দেখার অন্যরকম অনুভূতিগুলো এখনও গায়ে আঁচড় কাটে। যাত্রা শেষ হতে হতে ভোর হয়ে যেত। মাঝে ছুটির একটু ঘুমও হয়ে যেত। কিন্তু একটু একটু করে যখন আঁধার কেটে ভোরের আলো ফুটে উঠত তখন ছুটির শৈশবের চোখ অবাক হয়ে দেখত, কীভাবে পৃথিবীতে আলো কেটে অন্ধকার নামে।
যাত্রাপালা শেষ করে ওরা বাবার কাছে এসে বলত – কেমন হয়েছে মাস্টারবাবু? -এখনের ভাষায় বলা চলে ওরা বাবার কাছে ফিডব্যাক চাইত।
অসমীয়া বাংলা ওড়িয়া এই তিনটি ভাষার মা এক। তাই শব্দপ্রয়োগে চেনা অন্তরঙ্গতা উঁকি মারে। ক্রিয়াপদ বলে আমরা কাছাকাছি, তবে এক নই। আর আঞ্চলিক ভাষা, তার তো কত রূপ!
কত সরল ছিল ধেয়ানি উপজাতির মানুষেরা। আজও কি আছে? হয়ত নেই। স্বাজাত্যবোধের সূক্ষ্ম সুতো মাকড়সার জালের মত সহজ সরল আদিবাসীদেরও জড়িয়েছে হয়ত।
ধেয়ানি উপজাতির ফুলচাঁদ ছুটিদের কোয়ার্টারে চাল নিয়ে আসত। সাদা ফুলের মত ধবধবে নরম ভাত মুখে দিলে মনে হত ফুলচাঁদের সরল হাসি এই ভাতে মিশে আছে। সরলমনা ধেয়ানিরা ভালবাসতে জানত, ভালবাসার সুতো ছুটিদেরও পাকে পাকে জড়িয়েছিল।
আসামের কাছাড় জেলার চা বাগানের অক্সিজেন ফুসফুসে ভরে নিয়ে এই আলোহাওয়ার দুনিয়ায় পথচলা ছুটির। আসামের কাছাড় জেলায় চা বাগানের পত্তন করে ব্রিটিশরা। পশ্চিমবঙ্গ, বিহার, উড়িষ্যা, দক্ষিণভারত থেকে কুলিকামিন নিয়ে এসে এদের শ্রমিক হিসেবে কাজে ঢোকায়। চাগাছ এদের ঘাম নুনে সবুজ হয়ে ওঠে। এদের প্রাণান্ত খাটুনিতে চায়ের উৎপাদন বাড়ে। কিন্তু পীড়নের কষ্ট হয়ে যায় এদের নিত্যসঙ্গী। কী করে যে সাদা চামড়ার মানুষেরা তাদের এসব কাজে ঢোকাল তার কথা বলত দুখিরাম। এর পেছনের ইতিহাস নাকি দারুণ মিথ্যাচারের। দুখিরাম কাজ করতে করতে যখন বিরাম নিত তখন ছুটিকে ঐসব পুরনো কথা বলত, কীভাবে মিথ্যে বলে ভুলিয়ে ভালিয়ে চা বাগানের কাজে তাদের পূর্বজদের জুতে দেওয়া হয়েছিল। দুখিরাম নাকি এ গল্প শুনেছে তার দাদার মানে ঠাকুরদাদার কাছে, দাদা এই গল্প শুনেছে তার বাবার কাছে। নদীর মত এই কাহিনির স্রোত বইছে হাওয়াবাতাসের আনাচকানাচে প্রজন্মের সুতো ধরে। ছুটি তখন ছোট, দুখিরাম আসত ঘাস সাফাই করতে, কোয়ার্টারের লম্বা উঠোন, পাথুরে টিলাজমিতে হলেও কচি কচি ঘাস মাথা উঁচু করত বৃষ্টির মরসুমে। ছুটি তার পায়ে পায়ে ঘুরত। দুখিরাম বলত -বুঝলে খোঁকি, সাদা চামড়ার সাহেবরা বুঝিয়েছিল জোছনারাতে চাগাছে পরী নামে। নেমে গাছে গাছে রূপোলি পয়সা ছড়িয়ে যায়। তখন গাছ ধরে ঝাঁকুনি দিলে ঝুরঝুর করে রূপোর পয়সা ঝরে পড়তে থাকে। সরল মানুষগুলো সব বিশ্বাস কইরল।
-তারপর?
– তারপর আর কি, একগিলাস জল দেবে খোঁকি?
ছুটি ছুটে গিয়ে জল নিয়ে আসে।
মা এসে যান তখন। বলেন – দেরি হয়ে যাচ্ছে দুখিরাম। বেলা পড়ে আসছে। এই ছুটি, এখন যা তো।
ছুটির মনটা খারাপ হয়ে যেত। সে দুখিরামের পায়ে পায়ে ঘুরতে চায়। সে জানতে চায় পরীদের কথা। সে দেখতে চায় রূপোলি জ্যোৎস্নারাতে চা-গাছে নাড়া দিয়ে ঝুরঝুর করে রূপোর পয়সা ঝরে পড়ে কিনা। কিন্তু দুখিরাম জিরিয়ে নিতে গেলে যে জিরোতেই থাকে, তাকে তাড়া না দিলে সে যে আবার কখন উঠে কাজে লাগবে কে জানে! টিঙটিঙে তার দুটো পা আর চোখের কোলে ঘন আঁধার জমাট বেঁধে আছে। গায়ের জোরে নয়, মনের জোরে কাজ করতো দুখিরাম।
কাজ শেষ করে দুখিরাম রুটি খায়। রুটির সাথে নুন আর কাঁচালঙ্কা। বেশি কিছু চাহিদা নেই দুখিরামের, শুধু রুটি মোটা হওয়া চাই। খাবার সময় কিন্তু সে কথা বলে না। ছুটি এটা ওটা প্রশ্ন করে দেখেছে সেই সময় সে কথাই বলতে চায় না।
চা বাগানে জ্যোৎস্না নামত ভরপুর হয়ে। এই পাগলপারা জ্যোৎস্না যখন চা গাছের ঘন সবুজ পাতার ওপর পড়ত মনে হত মাইলের পর মাইল চকচকে সবুজ গালিচা বিছানো রয়েছে আর সত্যিই তা যেন পরীর রাজ্য। এই চা গাছ নাড়া দিলে সত্যিই কি রূপোর পয়সা ঝরে পড়বে? কিছুই অসম্ভব নয় হয়ত। নাহলে এসব কথা বৃটিশরা কেন বলবে! কিন্তু সেই রূপকথার গল্পের মায়াজাল ভেঙে পড়ল যখন দুখিরাম তাকে বলল সবটাই মিথ্যে আর বানানো গল্প ছিল।
– যদি সবটাই সত্য হত, যদি এমনটাই হত তাহলে কী হত, ধরো জ্যোৎস্নারাতে চাগাছ ধরে ঝাঁকুনি দিলে ঝুরঝুর করে রূপোর পয়সা ঝরে পড়তে থাকল…
দুখিরাম হাসে। বলে – এমন হলে খোঁকি আমি তোমাদের এই লম্বা উঠোনের ঘাস এই সবজিক্ষেত এক চুটকিসে সাফ করে দিতাম।
– কি করে?
– খেয়েদেয়ে শরীরে তাগদ হত জব্বর। হাতে তো তাহলে পয়সা থাকত বহোত।
ছুটির তখন মনে হত – “রোজ কত কী ঘটে যাহা তাহা/এমন কেন সত্যি হয় না আহা… ”
হয় না, সত্যি হয় না। কতকিছুই তো হতে পারত যা কাঙ্ক্ষিত কিন্তু হয় না…শুধু অবচেতনে স্বপ্নের কিছু দুর্লভ সাঁকো তৈরি হয়।
দুখিরামের নাম দুখিরাম কেন? বাবা মা নাম দুখিরাম রাখল কেন?
ছুটি এই প্রশ্ন করেছিল মাকে। আর মা-র প্রশ্নের উত্তরে আরও অনেক প্রশ্নচিহ্ন ছুটে এসেছিল তার দিকে যার উত্তর সে গোটা জীবন জুড়ে খুঁজে চলেছে। মা যে উত্তরটা দিয়েছিল তা এই – লোকে বলে দুঃখের পর সুখ আসে কিন্তু যারা খুব গরীব তাদের ক্ষেত্রে এমনটা হয় না। তাই বাবা মা সন্তানের নাম রাখে দুখিরাম।
ক্রমশ