সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ১০)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
আমার চারপাশে ভিড় করে থাকে যাঁরা, যাঁরা আমার পরিপার্শ্ব রচনা করে তাঁদের কথা যখন ভাবি কিম্বা যখন বলতে যাই তখন চোখের সামনে কতকিছু ভাসে। মনে হয় একটা বৃহৎ দেশ ছিল, সেদেশের মাটি ছিল সুফলা, সেদেশের নদীর জল ছিল মিঠে, সেখানের সুবাতাসে যে খোলা হাওয়া বইত সেই হাওয়ায় ভাসতো আমাদের পিতামাতা পিতামহ পিতামহীর মাতামহ মাতামহীর উত্তরীয়, শাড়ির আঁচল। কিন্তু সেই মাটিকে, দেশকে আমরা ধরে রাখতে পারিনি, খন্ড বিখন্ড হয়েছি,ছিন্নভিন্ন হয়েছি। আমরা নিজের মাটি নিজের দেশ হারিয়েছি। এই অচিনপুরের বাসিন্দাদের অন্যদেশ ছিল অন্য মাটি ছিল। আমারও তাই ছিল, যদিও সে দেশ সে মাটি আমি দেখিনি কিন্তু বাবা মা -কে এনিয়ে কথা বলতে শুনেছি। শুনেছি অনেক জায়গার নাম যেখানে আমি যাই নি, আমি চিনি না সেইসব জায়গার নাম। খুব স্বপ্নময় সেসব জায়গার নাম। ভেতরে ভেতরে তৈরি হয়েছে স্বপ্নিল সাঁকো। সেখানের মাঠঘাট অবারিত প্রান্তর এবং এই অচিনপুরের মানুষের বেঁচে থাকার যুযুধান প্রয়াস কাঁটাতারের বেড়ার ওপারের ও এপারের গল্প তৈরি করেছে মুহুর্মুহু, যে গল্পে কোনও কল্পনা নেই, আছে রুক্ষ ও নিষ্ঠুর ও ভয়াবহ বাস্তব।
. এখন আমার সামনে বসে আছে এক মহিলা। মহিলাটি স্মরণ করছে অতীত, তার ফেলে আসা বাড়ি, আত্মীয় পরিজন। আমি ফিরেছি ইশকুল থেকে। ক্লান্তি সারাদেহে। সারাদিনের কাজ, দায় দায়িত্বএর চাপ সামলে এসেছি। দেহটা বিছানায় এলিয়ে দিলে এই মুহূর্তে দেহ বেঁচে যায়। তবু সোফায় গা এলিয়ে বসে মহিলাটির কথা শুনছি। মহিলাটি কিছু শাড়ি নিয়ে এসেছে। গিয়েছিল নাকি ফুলিয়ায়। কিছু তাঁতের শাড়ি, কিছু সিল্কও আছে। তার পূর্ব দেশ ছিল হবিগঞ্জ, সিলেট। তার বাবা নাকি একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশ ছেড়ে অচিনপুরে আসেন। শহরের উপান্তে একটি ঘর ভাড়া নেন তারই পূর্বপরিচিত এক ব্যক্তির বাড়িতে যার বাবা দেশভাগের সময় এই শহরে এসে অনেক যুদ্ধের পর ব্যবসা শুরু করেন। মহিলাটির বিয়ে হয়নি। বিয়ে করেনি নয়, হয়নি। সে একটি প্রেসে কাজ করত। পুরনো সেসব লেটার প্রেসের যুগ তখন। বাবা মারা গেল, ভাইকে পড়াতে হল। অসুস্থ মা-কে দেখতে হল। তারপর প্রেসে এল যুগান্তকারী পরিবর্তন। তার মত প্রেসকর্মীর আর তেমন উপযোগিতা রইল না। ভাই লেখাপড়া শিখে সংসার করল, এখন ওখানে আর তার কোনও জায়গা নেই। সে থাকে তার এক পুরনো বন্ধুর সাথে। দুজনে ঘরভাড়া নিয়েছে। বন্ধুটিও সাথে এসেছে। শীর্ণ হাত, চোখের কোলে আঁধার জমাট বেঁধে আছে। এখন ফেলে আসা সেই ঘরবাড়ি মাঠঘাট নিয়ে স্বপ্নের কাঁথায় ফুল তুলছে মেয়েটি। অনেক্ক্ষণ সে বলেই চলল। তারপর বলল – গলাটা বড্ড শুকিয়ে গেছে দিদি। আরেকগ্লাস জল দেবেন?
বললাম – চা খাবেন?
দুজনে প্রায় সমস্বরে বলে উঠল, তাহলে তো খুব ভালো।
একে অপরের চোখে তাকায় স্মিতচোখে।
দু’কাপ চা আর দুটো করে বিস্কুট। ওরা চা খায় পরম তৃপ্তিতে। আমি ক্লান্ত দেহ সোফায় এলিয়ে দৃশ্যটি দেখি। এর পরের দৃশ্যও মনে মনে কল্পনা করে নিই। এরা এখন ব্যাগ খুলবে, বের করবে রকমারি শাড়ি। পছন্দ অপছন্দের ব্যাপারে যদি না যেতে পারি, মানে কোনোটাই যদি পছন্দ না হয় সেইক্ষেত্রেও একটি শাড়ি কিনতে হবে। ওরা হয়তো দুটি কিম্বা তিনটি শাড়ি কেনার জন্যেও জোরাজোরি করতে পারে। চা খেয়ে বেশ আরাম বোধ করছে এরা। যেমন ভেবেছি ঠিক সেইরকমই কালো মোটা ঢাউস ব্যাগটা খুলল। প্রথমে ক’টা ধনেখালি, তারপর ফুলিয়ার তাতের শাড়ি। তারপর একটি সিল্ক। সুতোর অনবদ্য কাজ, বাদশাহী শিল্পকলা। চমৎকৃত হলাম। জিজ্ঞেস করলাম – কোথা থেকে এই শাড়ি সংগ্রহ করেছেন? মহিলাটি হেসে বলে – আমি নিজেই করেছি দিদিভাই।
-আপনি করেছেন?
-হ্যাঁ, বিশ্বাস হচ্ছে না? একদিন আমাদের ভাড়াবাসাতে আসুন দিদি। আমাদের কাজ দেখে যাবেন। শাড়িটা দেখছি, এমন অপূর্ব কারুকৃতি! সত্যিই মুগ্ধ। অনাবিল মুগ্ধতা।
– নেবেন দিদি?
-এটা নয়, অন্য শাড়ি নেব।
-কেন দিদি, এটা পরলে আপনাকে দারুণ দেখাবে।
– কিন্তু এই শাড়ি তো পরার নয়, দেখানোর জিনিস। এমন চমৎকার কারুকাজ…
– দিদি, অতশত বুঝি না, বিক্রির জন্যেই ত রাত এত খাটুনি।
– আচ্ছা মুঘল শিল্পকলা কোথা থেকে জোগাড় করলেন?
ওরা একজন আরেকজনের মুখের দিকে তাকাল।তারপর বলল – এগুলোর জন্যে আমাদের ক্যাটালগ আছে।
-এই শাড়িটা তৈরি করতে কতদিন লেগেছে?
– তৈরি করতে? এই ধরুন একমাস। আপনি এটা নিচ্ছেন তো?
আমি দেখছি এর ডিটেইলস এর কাজ। একবারে শিল্পীর কাজ।
এরা দাম বলছে অনেকটা। শাড়ি কেনা হল দুটো, কিন্তু এই শাড়িটা ওদের ব্যাগেই ঢুকলো ওদের।
ওরা চলে গেছে। সন্ধ্যা নেমেছে শহরে। রাতের আলো জ্বলে উঠছে ক্রমশ। লাগোয়া আবাসনে ডিজেতে হুল্লোড়ে গান, নাচ গান হৈ হৈ। তারমাঝেও অক্ষরমালা মাথার ভেতর নকশীকাঁথা বোনে।
শেষ বিকেলে দুটি নারী পথে নামে।
কাঁধে সেই পুরোনো গাঁটরি,
যে গাঁটরি তাদের পিতার কাঁধে
ছিল সীমান্ত পেরোবার সময়।
কাঁধ থেকে কাঁধে জায়গা বদলের
গল্প করে করে ক্লান্ত হাত তার
ট্রেনের হ্যান্ডেলে, শাড়ির মজুতি কাজে
শিল্পীর আঙুলের মতই খেলা করে।
সে সুলতানি আমলের শাড়ি দেখাল
আমায়।
শেষ ট্রেন চলে গেছে,
প্ল্যাটফর্ম শুনশান,
কেউ গাঁঁটরি কাঁধে দাঁড়িয়ে
সেই আমগাছের নীচে।
মা, শাড়ি দেখুন, ধনেখালি,
ফুলিয়ার শাড়ি।
ছুটি ছুটে গেছে মায়ের
কাছে রুদ্ধশ্বাসে।
লোকটি মেঝেতে বসেছে
শাড়ির পসরা মেলে।
বলে – একগ্লাস জল দ্যান মা।
সেই থেকে হেঁটে হেঁটে ভারি কষ্ট।
কিন্তু এমন কি ছিলাম মা?
আমাদের দেশ ছিল বাড়ি ছিল
ছিল মাছভরা দীঘি, ক্ষেতভরা ফসল…
চারপাশ সারাক্ষণ বলে
পেছনে তাকিও না। এটা তো
জানো যা যায় তা দীর্ঘ যায়!
তবু সুলতানি আমলের শাড়ি
নকশিকাঁথার বুননে রেশমি শাড়িতে
ছুঁচের অমোঘ ফোঁড়ে ছবি তুলে আনে।
তবু ফেলে আসা দেশঘরবাড়ি
ভাসমান মেঘের ভেতর স্বপ্নবাড়ি
তৈরি করে অক্ষর বুননে।
সব ভুল জানি।
ভুল জানি
প্রত্ন শুধু অধিদপ্তরের।
ক্রমশ