সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২৫)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

চা বাগানের সুপারইন্টেন্ডেন্টের কাছে আবেদনপত্র নিয়ে দেখা করা হল। সুপারের একই কথা, ইশকুলের এত খরচ খরচা বহন করা তাদের চা বাগান কর্তৃপক্ষের পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না। চা বাগানে প্রাথমিক ইশকুল তো আছেই। প্রাথমিক শিক্ষার পর যাদের ইচ্ছে আরও পড়বে তারা রতনপুর হাই ইশকুলে চলে যাক পড়তে, তাহলে আর কোনও অসুবিধে রইল না। পঞ্চায়েত প্রেসিডেন্ট বলল- আমাদের ছেলেমেয়েরা চা বাগানের কাজ করে তবে পড়তে যায়, রোজ ইশকুল যেতেও পারে না। ওদের পক্ষে এতদূর গিয়ে পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়।
দীর্ঘ আলোচনার পর স্থির হলো সরকারি অনুদান যাতে আনা যায় তার জন্যে চেষ্টা করতে হবে। একা চা বাগানের মালিকানা থেকে এভাবে ইশকুল চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হবে না। যাই হোক আপাতত ইশকুল উঠিয়ে দেওয়ার যে তোড়জোড় শুরু হয়েছিল তা বন্ধ হল।
এখন লড়াইটা চালিয়ে যেতে হবে সরকারি অনুদানের জন্যে। এবং সেটা নিজেরাই করতে হবে। ভাবনাটা তো রয়েই গেল।
এরপর প্রশ্ন উঠল কোয়ার্টারের ব্যাপার নিয়ে। সেটা নিয়ে অনেকক্ষণ আলোচনার পর কর্তৃপক্ষ থেকে জানানো হল, কোয়ার্টার যেমন আছে তেমনই থাকবে, তবে বিদ্যুৎ পরিষেবা দেওয়া যাবে না। বাকি সবকিছু যেমন আছে তেমনই চলবে। আর যত দ্রুত সম্ভব সরকারি অনুদান আনার চেষ্টা চালানো হোক।
৷ দীর্ঘ সভা শেষ করে বেরিয়ে আসার পথে হেডমাস্টারমশাই আক্ষেপ করে বললেন – যাঁরা শিক্ষার আলো ছড়াবে তাঁদের কোয়ার্টার এ আলো দেওয়া যাবে না। চমৎকার সিদ্ধান্ত।
৷ শুরু হলো অন্য লড়াই। বারবার বাবা অচিনপুরে যাচ্ছেন ডি আই অফিসে, যে করেই হোক সরকারি অনুদান আনতে হবে। অনেক সময় বড়দাদাও বাবার সঙ্গে গেছে।
শেষ পর্যন্ত সরকারি অনুদান পাওয়ার সরকারি অর্ডারটি এল। উইলসন ইশকুল সরকারের deficit grant এর স্কুলগুলোর সাথে সংযুক্ত হলো।
তবুও শিক্ষকদের কোয়ার্টারে বিদ্যুৎ পরিষেবা দিতে প্রস্তুত হল না চা বাগান কর্তৃপক্ষ।
চোখের সামনেই সব কোয়ার্টার এ বিদ্যুৎ এর আলো জ্বলল। শুধু তিনজন শিক্ষকের কোয়ার্টার সেই পুরোনো কেরোসিনের আলোতেই পড়ে রইল। তবে চা বাগানের সুপার নিজের থেকেই বলল – যদি বাড়িতে কোনও উৎসব থাকে তাহলে সাময়িক বিদ্যুৎ কানেকশন দেওয়া যাবে।
ছুটির মনটা খুব খারাপ হয়ে যায়। সবার কোয়ার্টার সন্ধ্যার পর আলোতে ভরে যায়। তাদের কোয়ার্টার সেই পুরোনো কেরোসিনের টেবিল ল্যাম্প, হ্যারিকেনের আলোছায়ার ভেতর প্রচ্ছন্ন সঙ্কেতের মত দাঁড়িয়ে থাকে।
হয়তো সেই সময়টা ছুটির ছোট্ট জীবনের প্রথম ক্রান্তিলগ্ন। এই প্রথম সে অনুভব করে পৃথিবীর অনেক রূপ , চারপাশের গাঢ় অন্ধকার, সেই অন্ধকারের ভেতর যে হাত পা নিয়ত ক্রিয়াশীল তা বাইরে থেকে দেখা যায় না। ছুটির সেই খোলা মনে যে দিলখোলা আনন্দের হাওয়া বইতো সেখানে কিছু অন্ধকার জমতে শুরু করল। মনে হল এই আলো হাওয়া গাছপালা নীলাভ পাহাড় এরা বড্ড উদাসীন। মানুষের পথ চলায় এদের প্রত্যক্ষ কোনও ভূমিকা নেই।

প্রাণের বন্ধু মণি রয়ে গেল উইলসন ইশকুলে। নতুন আর একটি মেয়ে এসেছে। অচিনপুর সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের ছাত্রী ছিল। মেয়েটির বাবা নেই। জ্যেঠু চা বাগানের চাকরি নিয়ে এসেছেন। সে পাশের চা বাগানে থাকে, খুব সুন্দর নিত্যনতুন ছাঁটের ফ্রক পরে আসে। উইলসন ইশকুলে ইউনিফর্ম নেই। ইচ্ছে করেই দেওয়া হয়নি। তাতে শ্রমিকদের ওপর যে আর্থিক চাপ পড়বে তাতে হয়ত তারা ইশকুল এ আর আসতেই চাইবে না।
৷ নতুন মেয়েটির প্রতি আকৃষ্ট হল ছুটি ও মণি। বেশ শহুরে ভাব। জিজ্ঞেস করল – কি নাম তোমার?
-রাই।
উফফ নামটাও দারুণ। মেয়েটির সঙ্গে জমে গেল দিব্যি। রাই কথায় কথায় অচিনপুরের গল্প বলে। সরকারি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ের কত কী গল্প।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।