গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
নেহা ওরা অচিনপুরে থেকে থেকে প্রায় বাঙালিই হয়ে গেছে। রথযাত্রা, তাই ওরা খুব খুশি। বিকেল চারটে থেকে অনেকদূর থেকে খোলকরতালের আওয়াজ ভেসে আসছে। ছুটতে ছুটতে ইভান আর ছুটির পায়ে ব্যথা, সাথে খিলখিলিয়ে হাসি। চা বাগান এমনিতেই খুব নিরিবিলি। বিশেষ করে দুপুরবেলায় তো গা ছমছমে পরিবেশ। সবাই অফিসে, ইশকুলে গেল, শ্রমিক পুরুষ নারী চাপাতা তুলতে চলে গেল। তখন রোদ গা চিতিয়ে থাকে। গরমে তো হাওয়া নেই। গাছগুলোও নিথর হয়ে থাকে। বিকেলে চাপাতা যারা তুলেছে তাদের পাতা কতখানি তুলেছে তার একটা হিসেব হয়। সেটা ছুটিদের কোয়ার্টার থেকে শোনা যায়। এছাড়া চলতে থাকে কারখানার অনর্গল ঘড়ঘড় শব্দ। আজ বিকেলটা অন্যরকম। শ্রমিকদের ছোটো ছোটো ছেলেমেয়েরা দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে। আর ওদিকে নেহা, হীরা, দাদি ওদের উঠোনে গোল হয়ে বসে অপেক্ষা করছে কখন রথ আসবে। ওদের উঠোন নীচে বড়ো রাস্তার একেবারে কাছে। ছুটিদের লম্বা উঠোন পেরিয়ে গেলে তারপর কোয়ার্টার। ইভান তাদের উঠোনে বসতে রাজি নয়। তাই বারবার তারা লম্বা উঠোন পেরিয়ে যাচ্ছে আবার আসছে। এই যে অপেক্ষা রথ আসছে আসছে সেটাই বড় উত্তেজনার। এসে গেলেই তো চলে যাবে, ছুটি ভাবে। আসুক সে ধীরে ধীরে। কাঠের গোল গোল চারটে চাকা গড়গড় করে আসছে। কীর্তনের গানটাও জানে ছুটি। কারণ ঐ গানটা মা ঘরের কাজ করতে করতে করেন।
” গৌর চলছে ব্রজনগরে
জয় রাধা শ্রী রাধার নাম বলে।
ও তোরা বলে দে রে নগরবাসী
বৃন্দাবন কতদূরে…
জয় রাধা শ্রী রাধার নাম বলে…. “
এখানে ছুটির একটা ছোট্ট প্রশ্ন। শোভনার কাকা চিত্ররূপ খোল বাজিয়ে নেচে নেচে কীর্তন গাইতে গাইতে আসে। সঙ্গে সবাই দোহার দেয়। কিন্তু ছুটি প্রতিবারই শোনে চিত্ররূপ গাইতে থাকে – “ও তোরা বলে দে রে নগরবাসী / বৃন্দাবন কতয় দূরে ” – ” কতয়” কেন বলে? ওটা তো “কত ” হবে। একদিন মা-কে জিজ্ঞেস করেছিল সে- মা, শোভনার কাকা বৃন্দাবন “কতয়” দূরে কেন বলে? মা কাজে ব্যস্ত ছিলেন। বলেছিলেন – এখন যা তো, কাজ করছি।- পরে আর মা- কে জিজ্ঞেস করা হয়নি। এই “য়” টা কেন লাগায় এরা কে জানে! আজকেও যদি ঐ কীর্তনটাই করে তাহলে খুব মন দিয়ে “য় ” – র দিকে নজর রাখতে হবে। চিত্ররূপের ঘাড় পর্যন্ত বাবরি চুল। মাথা দুলিয়ে নেচে নেচে খোল বাজাতে বাজাতে যখন আসে, তখন যে কী দারুণ লাগে আহা। খোলকরতালের শব্দ ক্রমশ কাছে এগিয়ে আসছে, এইবার রথের চূড়া দেখা গেল। কোন কীর্তন হচ্ছে, ছুটির কান খাড়া। এদিকে ইভান নেহা এরা হাত ধরে টানছে, ওদের সাথে ছুটতে ছুটতেই ছুটি শুনতে পেল – গৌর চলছে ব্রজ নগরে/ জয় রাধা শ্রী রাধার নাম বলে/ ও তোরা বলে দে রে নগরবাসী / বৃন্দাবন কতয় দূরে…” এই তো “কতয়” বলল। কেন “য়” কেন? সবাই দোহার দিচ্ছে “কতয় দূরে…” লুঠের বাতাসা ছুটোছুটি করে কুড়োনো হলো। দড়ি ধরে টান হলো। গড়গড় করে রথ চলে গেল। আরেকটা রথ আসবে। হাটখিরা চা বাগানের আখড়া থেকে। সেদিন ইভান তাকে ছাড়ছেই না, পোস্ট অফিস পর্যন্ত ছুটে গেল তিন/ চারবার। আকাশে কালো মেঘ জমছে। দুপুরবেলায় একবার বৃষ্টি হয়ে গেছে। হাটখিরার রথ এসে গেল। পথঘাটে আজ বেশ লোকজন। সন্ধে হয়ে গেছে। দূরে অনেকদূরে খোল করতালের মৃদু আওয়াজ ভেসে আসছে। ইভান ছুটির হাত ধরে টেনে আবার পোস্ট অফিস পর্যন্ত ছুটে গেল। ছুটি কী ক্লান্ত। বলল – মা বকবেন ইভান। রাত হয়ে গেছে। শিগগির চল। আমার ভয় করছে। ইভান বলে – আমি ঘরে যাব না। মা-র ঘর বন্ধ আছে। মা-র পেটে বহোত জোর দরদ।
– তাহলে আমাদের বাড়ি চল। পরে ঘরে যাবি। বেশ দূর থেকেই ছুটি মা-র গলা শুনতে পেল – ছুটি ই ই ই। -তাদের বাড়িতে সন্ধের পর বাইরে থাকলে বাবা মা দুজনেই খুব রাগ করেন। হাত পা ধুয়ে কিছু টিফিন করে পড়তে বসতে হবে। এটাই কড়া নিয়ম। এর এদিক ওদিক হলেই মুশকিল। ধমক খেতে হবে। বাবা বকেন কম, কিন্তু হাবভাবে বুঝিয়ে দেন। কিম্বা দু’ চারটে কথা বলেন, ওটাই ঢের।
ইভানকে নিয়ে ছুটি ঘরে ঢুকল। ছুটির সাথে ইভানও টিফিন করল। ছুটি পড়ার টেবিলের পাশে একটা চেয়ার দিয়ে ইভানকে বসিয়ে রাখল। একটু পর নেহা এসে ইভানের বই খাতা রেখে গেল। বলল – পরে এসে তোকে নিয়ে যাবো। এখন পড়। ছুটি অঙ্ক নিয়ে বসেছে, ইভান বাড়িতে খুব চেঁচিয়ে পড়ে, এখান থেকে শোনা যায়। ইভানের বইটা খুলে দেখল হিন্দি বই। একটা কবিতা বের করে বলল – এটা ইশকুলে পড়ানো হয়ে গেছে?
-হাঁ।
– তো এইটা বই থেকে দেখে দেখে লেখ। ধীরে ধীরে লিখবি, তো দেখবি, হাতের লেখা খুব সুন্দর হবে।
ইভানের মন খারাপ। খুব সম্ভবত মা-কে নিয়ে ভাবছে। লিখতে লিখতে হঠাৎ বলে উঠল- ছুটি, তুমার বাবা মা সব মরি যাইত, (মরে যাক), আমার বাবা মা সব মরি যাইত ( মরে যাক), সির্ফ তুমি আর আমি ঘুমতাম ( ঘুরব)।
ছুটি ধমক দিয়ে উঠল – কি বলছিস এসব? এসব এমন করে বলতে হয় না। আর কোনও দিন এমন করে বললে কিন্তু খুব খারাপ হবে।
ঠিক এইসময় ছোট্ট শিশুর কান্না ভেসে এল ইভানদের কোয়ার্টার থেকে। ইভান পিঠ খাড়া করে বসে রইল। চোখে জল।
ছুটি বলে – এই কাঁদছিস কেন?
ইভান বলে – মা- র কি হয়েছে? বাচ্ছা কাঁদছে কেন?
একটু পর নেহা এল। রান্নাঘরের দিকে যেতে যেতে বলল – ও মাসিমা, আমাদের একটা ভাই এসেছে।
(ক্রমশ)