সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৪)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

অতিক্রান্ত সময় বহমান সময়ের কানের কাছে ফিসফাস করে, বলে আমরা যাই নি মরে আজও… তাই তো পুরনো স্মৃতি নতুন মোড়কে ফিরে ফিরে আসে। ফিরে আসে পুরোনো অসহায় অনুভব। ফিরে আসে অসহায় কিছু মুহূর্ত। বিপন্নতার সুর তো মূলত এক, তার ওপর দিয়ে যতই সময় বয়ে যাক না কেন।

ছুটিদের রূপমতী চা বাগান। নিরিবিলি, সকাল ন’টায় যখন ভোঁ বাজল তখন শ্রমিকদের ও স্টাফবাবুদের কাজে যাওয়ার ব্যস্ততা। তারপর ছাত্র ছাত্রী শিক্ষককের ইশকুল যাওয়া। এরপর নিশ্চুপ পড়ে থাকে পথঘাট।
৷ টিলাভূমি এলাকা। পিচঢালাই গাড়ির রাস্তা থেকে নিচের দিকে নেমে গেছে শ্রমিকদের থাকার লাইন। প্রতিটি লাইনের নম্বর দেওয়া আছে। ছুটিদের কোয়ার্টারের সদরের গেট থেকে মুখোমুখি আটনম্বর লাইনে যাবার আঁকাবাঁকা পাথুরে পায়েচলা পথ।যাওয়ার পথে একটি শাখাবিস্তারি চন্দনগাছ সরু পায়ে চলা পথটাকে ছায়াময় করে রেখেছে। চন্দনগাছের পেছনে ম্যানেজারের বাংলো। চন্দন গাছের ছোট ছোট লাল মসৃণ বিচি কুড়িয়ে এনে কৌটোয় জমিয়ে রাখে ছুটি। তারপর বিছানায় ছড়িয়ে ফেলে ওগুলো মন দিয়ে দেখে। এত সুন্দর রঙ, এত মসৃণ বিচিগুলো। ছুটির তো ইশকুল যাওয়ার তাড়া নেই। সে আছে মা-র পিছু পিছু, মা-র আঁচলের গন্ধে গন্ধে।

৷ চাবাগানে গাড়ি চলাচল করে খুব কম। সাধারণত বুধবার, যেদিন চাবাগানে সাপ্তাহিক ছুটির দিন সেদিন কিছু ঝকঝকে বাহারি গাড়ি শহরে যায। সেগুলো সবই চাবাগানের ম্যানেজারদের গাড়ি। শহরের ক্লাবে যায় তারা। কিছু জিপ চলে, সেগুলো মূলত হাসপাতালের। আর চলে ট্র্যাকটর, সেগুলো ছোট চাবাগান থেকে চা পাতা নিয়ে আসে। রূপমতী বড় চাবাগান, তার তত্ত্বাবধানে রয়েছে আরও কিছু ছোট চাবাগান, ছোট চাবাগানগুলোতে কারখানা নেই, চাপাতা নিয়ে ট্রাকটর এসে ঢোকে রূপমতী চা বাগানের ফ্যাক্টরিতে। আর আছে ট্রাক, একটি নীলরঙা ট্রাক চলে, ওগুলো মাটি পাথর চাগাছের সার ইত্যাদি নিয়ে যায়, আশপাশের চা বাগানে প্রয়োজনে কুলিকামিনও নিয়ে যায়। একটু ঝরঝরে শব্দ হয়, ছুটি জানে এই নীলরঙা ট্রাকের নাম ফোর্ড, আর রয়েছে বাদামিরঙা ট্রাক, ছুটি জানে ওটার নাম বেডফোর্ড। ছুটিদের কোয়ার্টারের পাশে চালগুদাম। ওখান থেকে চাল আটা চা পাতা ইত্যাদি রেশন হিসেবে দেওয়া হয়। পুজোর আগে সুজি চিনিও দেওয়া হয়। এই রেশন নিয়ে বড় ঝকঝকে ট্রাক আসে শহর থেকে। ছুটি জানে এই সুন্দর উঁচু ট্রাকের নাম টাটা। ছুটির এই ছোট্ট জীবনের বৃত্তে এসবই অনেক মানে রাখে। এই ছোট্ট ছোট্ট জানার ব্যাপারগুলি (ভুল হোক কিম্বা নাই হোক) বড্ড কৌতূহল নিয়ে আসে। তো টাটা ট্রাক সাধারণত বিকেলবেলা ঢোকে। যখন রেশন নিয়ে চা বাগানে ঢোকে তখন তার চাকার শব্দ শুনলেই ছুটি টের পায়। ভারী মোটা শব্দ। সঙ্গে সঙ্গেই সে কোয়ার্টারের লম্বা উঠোন পেরিয়ে উর্দ্ধশ্বাসে ছুটতে ছুটতে বাইরে আসে। উঁচু ট্রাকের পেছনে সারি সারি বস্তা।তার উপর বসে চার / পাঁচজন বস্তা আনলোড করার মানুষ। বস্তার ধুলোর হাত থেকে বাঁচতে তাদের মাথায় গামছা জড়ানো। ট্রাক এসে থামে রেশনগুদামের সামনে। লম্বা রেশনগুদামটি তাদের লাগোয়া কোয়ার্টার ছুঁয়েছে। দরজায় রূপোরঙা বিশাল তালা। ছুটি জানে এখন আসবে দরোয়ান ত্রিবেণী সিং। ইয়া মোটা গোঁফ, ইয়া লম্বা, ইয়া মোটা হাত, পকেট থেকে বেরোবে চাবির গোছা, বিশাল তালা খুলবে ত্রিবেণী সিং ভোজপুরী গান গাইতে গাইতে।
৷ ছুটি উঁকি মেরে দেখছে আধো অন্ধকার লম্বা রেশনগুদামের ভেতর সারি সারি স্তুপ করা বস্তা। পুরো গাড়ি আনলোড করতে করতে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসে। গাড়ি স্টার্ট দিতেই পেছনে কিছু লিঙপিঙে ছোটো ছেলে অদ্ভুত কায়দায় ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়ে। ত্রিবেণী সিং হুংকার দেয়, “এ্যাই, উতরো, এক্সিডেন্ট হো যায়গা”… তারপর সে তার নিজস্ব ছন্দে গান গাইতে গাইতে চলে যায়। কিছুদূর যাওয়ার পর গাড়ি গতি বাড়ানোর মুহূর্তেই ছেলেগুলো সেই অদ্ভুত কায়দায় নেমে যায়। ছুটি অবাক হয়ে দেখে। এরা শ্রমিকদের ছেলে। এদের এই কুশলতা দেখে তো ছুটি মুগ্ধ। কী আফসোস সে নিজে এমনটা করতে পারে না। আহা যদি এমনটা পারা যেত! পড়ন্ত বিকেলে যদি এমনি লাফিয়ে উঁচু টাটা ট্রাকের পেছনে ঝুলে পড়া যেত আবার গাড়ির গতি বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে লাফ দিয়ে নেমে পড়া… কায়দাটা রপ্ত করতে পারলে মজা হতো দারুণ, কিন্তু সেটাতো মোটেই সম্ভব নয়। কারণ, সে বাবুদের বাড়ির, আরেকটি কারণও আছে এবং সেটি হল সে মেয়ে। ছোট হলে কী হবে, সে তো জানে মেয়েদের চারপাশে গন্ডী কাটা আছে, চোখে দেখা যায় না কিন্তু সেটা আছে।কিন্তু তখন কি ছুটি জানতো ভয়ঙ্কর এক ঘটনা ঘটাবার জন্যে তখন তৈরি হচ্ছে সময়? না জানতো না।
৷ সুধাময়ের কিছু ছাত্র মাঝেমধ্যে কোয়ার্টারে সকালের দিকে পড়া বুঝতে আসে। ছুটি ওদের কাছাকাছি ঘুরঘুর করে। পূরণ বলে একটি ধেয়ানি ছেলে, খুব চঞ্চল, খুব ছটফটে। ওর মা হরিমতি মাঝেমধ্যে তার সবজিক্ষেতের এটা ওটা নিয়ে আসে।শীতের মরসুমে পৌষ সংক্রান্তির আগে নিয়ে আসে বিন্নি চাল। খুব পান, দোক্তাতামাক খায়। দাঁত মিশকালো। সারাক্ষণ মুখে হাসি লেগে আছে। ছুটির মা চা করে দেন, এটা ওটা জিজ্ঞেস করেন। হরিমতি খুব খুশি। যাবার সময় সুধাময় বাড়ি থাকলে একবার জিজ্ঞেস করে যায়, পূরণ পড়ছে তো? তার ছেলের পড়াশোনা হবে তো? পূরণের বাবা নেই, ক্ষেতে কাজ করতে করতে সাপে কেটেছিল, সারাদেহে বিষ ছড়িয়ে গেছিল, সারাদেহ নাকি নীলবর্ণ হয়ে গেছিল। হাসপাতালে সুঁই দিয়েছিল। কিন্তু কোন কাজ হল না। ঐ একটাই ছেলে হরিমতীর। একটু পড়াশোনা হলে সে ধারদেনা করে নাহয় ছোট একটা দোকান দিল, ঐ ক্ষেতের কাজে বড় কষ্ট, নিজেদের তো জমি নেই। হরচাঁদের জমিতে চাষ করা। নিজের জমি হলে যাহোক একটা কথা ছিল।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।