সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ১৩)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

শনি মঙ্গলবার ছুটিদের কোয়ার্টারের সামনে হাট বসে। মঙ্গলবার চা বাগানের তলববার। সারা সপ্তাহের শ্রমিকদের কাজের হিসেবে “তলব” মানে মজুরি মঙ্গলবার বিকেলে দেওয়া হয়।
ছুটিদের কোয়ার্টারের পেছনের ঢালু খাদ পেরিয়ে বড় কারখানা ঘিরে সরু পায়ে চলা পথ গোটা কারখানার গা ঘেঁষে ঘেঁষে উইলসন ইশকুলের দিকে ও হাসপাতাল পাড়ার দিকে চলে গেছে।

৷ তলববার বিকেলে সারা সপ্তাহের কাজের হিসেব অনুযায়ী “তলব” (মজুরি) দেওয়া হয়। বেশ চেঁচিয়ে নাম ধরে ধরে ডেকে ডেকে মজুরি দেওয়া হয়। ছুটিদের কোয়ার্টার থেকে পরিষ্কার শোনা যায়।
ধরে নেওয়া যাক ফুলবাসিয়া বা পার্বতী নামে চারজন কামিন রয়েছে। তাদের ডাকা হয় এইভাবে ফুলবাসিয়া এক, ফুলবাসিয়া দুই ফুলবাসিয়া তিন। কিম্বা পার্বতী এক পার্বতী দুই পার্বতী তিন….
মঙ্গলবার তলব পাওয়ার পর পার্বতী ফুলবাসিয়ারা কিছু বাজার করে। হাতে থাকে দড়ি দিয়ে ঝোলানো দুটো কাঁচের শিশি। একটি বড় একটি ছোট। বড়টিতে যাবে মিঠা তেল ( সরষের তেল), ছোটটিতে কেরোসিন। চলার সাথে সাথে একটা রিনঠিন আওয়াজ ওঠে , অনেকের হাতেই এই শিশি দুটো একই ছন্দে বিরাজ করে, তাই হাটের ভেতর থেকে এই রিনঠিনে আওয়াজ উঠতেই থাকে।
৷ ছুটি তাদের কোয়ার্টারের টিলায় ওঠার সিঁড়ির পাশে চওড়া চাতালে বসে হাটের দোকান লোকজন দেখে। ফুলুরিওলা ফুলুরি ভাজছে। একটা কালো টিনের উনুন, বেশ বড়ো আকারের তেলকালি মেশানো কালো কড়াইয়ে গরম তেলে বেসন কিম্বা ডাল মাখা থেকে ছোট ছোট বল বানিয়ে অনবরত ছাড়ছে , আগুনে লাকড়ি ঠেলছে, আবার ছোট করে কেটে রাখা খবরের কাগজে তিনটে চারটে ফুলুরি ঢুকিয়ে বিক্রি করছে। ক্রেতা বেশিরভাগ শ্রমিকদের ছেলেমেয়ে। এক পয়সা, দু’পয়সার গরম গরম ফুলুরি। ওদিকে সুজন মাজন চা এর দোকান দিয়ে চা বিক্রি করছে। সঙ্গে মোটা ও চ্যাপ্টামত টোস্ট ও কুকিজ বিস্কুট। সব সরঞ্জাম এনে সে যখন ধীরে ধীরে গোছানো শুরু করে তখন থেকেই ছুটি এর নিয়মিত দ্রষ্টা। প্রথমেই সে কাঁধের বেঞ্চিটা রাখবে। তারপর ছোট টেবিল নামাবে, ব্যাগ থেকে বের করবে বয়াম, সারি সারি বয়াম সাজাবে। কোনওটাতে লজেন্স, কোনওটাতে হাতিঘোড়া বিস্কুট, টোস্ট কুকিজ, সিগারেট, বিড়ি, চানাচুর।
শুনশান চা বাগানে হাটবার মানে বেশ জমজমাট ব্যাপার। এত লোক একসাথে আর কোথায় দেখা যায়! এমন হাঁক ডাক! রাত আটটা সাড়ে আটটায় হাট ভাঙার পর সুজন মাজন ছুটিদের লম্বা উঠোনের একপাশে বেঞ্চটা রেখে যায়। ওই বেঞ্চটা ছুটির খুব প্রিয়। ওটাতে শুয়ে সে আকাশ দেখে, আকাশ চেনে। সুধাময় চিনিয়ে দেন কোনটা কালপুরুষ কোনটা সপ্তর্ষিমন্ডল কোনটা ধ্রুবতারা কোনটা সন্ধ্যাতারা। এত বিশাল বিপুল অন্তহীন শূন্যতার বুকে অগণিত গ্রহতারা ধূসর ছায়াপথ দেখে সবকিছু কেমন গোলমেলে মনে হয় ছুটির, একা একা ভাবে আমি ঠিক কে? এই সুজন মাজনই বা কে? কে ওই গন্ধরাজ পুলিশ? তবে এটা ঠিক সুজন মাজন যদি এই বেঞ্চটা না রেখে যেত তাহলে এভাবে এমন করে আকাশটাকে পড়া যেত না। মাঝে মাঝে ওই গ্রহ নক্ষত্রের ফাঁক ফোঁকর দিয়ে একটি তারা তীব্রগতিতে ছুটে যায়। হ্যাঁ বাবা বলেছেন ওটা তারা নয়, রকেট। হঠাৎ একটি উজ্জ্বল তারা খসে পড়ে বিলীন হয়ে যায়। এইসব ক্রিয়াকান্ডের অর্থটা ঠিক কী! ওসব কিছুর কি আদৌ কোনও মানে নেই?

৷ বুধবার হাটখিরা বাগানের বাজার এলাকায় বড় বাজার বসে। অচিনপুর শহর থেকে ভালো মাছ আসে। বরবক্র নদীর রুই মাছের স্বাদ তো একেবারে অপূর্ব। দারুণ সব ইলিশও আসে। সবাই বলে ওগুলো পদ্মা নদীর ইলিশ। তাছাড়া কচি পাঁঠা কিনে এনে তিন চারজন স্টাফবাবু মিলে ভাগ করে নেওয়া হয়। সে এক হুলুস্থুল কান্ড। বুধবার ওই বাজারের জন্যে সবাই অপেক্ষায় থাকে।
হাটখিরা চা বাগানে ঢোকার মুখে একটি ছোট নদী। নদীটির বরবক্র নদীর শাখানদী। শ্রমিকরা বলে গাঙ। গাঙের পুল পেরিয়ে শ্মশান। শ্মশান পেরিয়ে আরও খানিকটা উঁচু টিলাতে মদের পাট্টা। বুধবার ওটা হাট করে খোলা থাকে। মঙ্গলবার বিকেলে পুরো সপ্তাহের খাটুনির পর মজুরির পয়সার একটা ভারী অংশ মদের পাট্টায় দিয়ে টলটলায়মান পায়ে বেরিয়ে আসে গোটা হপ্তা যারা হাড়ভাঙা খাটুনি করে চা পাতা উৎপাদন করছে তাদের একটা ভারী অংশ।
৷ সেদিন বাজার করে ফেরার পথে ঝুপ করে একটা লোক সুধাময়ের পায়ের কাছে এসে পড়ল। সুধাময় পড়লেন ফাঁপড়ে। হাতে বাজারের ব্যাগ। লোকটা বারবার প্রণাম করছে আর বলছে -মাস্টরবাবু, গড় লাগি। ডানদিকে বাঁদিকে যেদিকেই যেতে চাইছেন সে পথ আটকে দিচ্ছে আর বলছে – মাস্টরবাবু গড় লাগি।
কেন সে বারবার ‘গড় লাগি’ করছে কে জানে! গুছিয়ে কথা বলার ক্ষমতা লোকটার নেই। খুব কষ্টের ব্যাপার হল এই, এদের আগামীকাল থেকেই ঠিকমতো খাওয়া জুটবে না। সব কিছু জেনেশুনেই এই একেবারে খোলামেলা মদের পাট্টা রমরমিয়ে চলার পেছনের কারণটা কি অতি সূক্ষ্ম কৌশলগত ব্যাপার? নেশায় বুঁদ হয়ে থাকলে প্রাপ্যের হিসেবটা গোলমেলে অবস্থানে থাকবে বরাবরের জন্যেই, তাই তো! নাহলে এই মদের পাট্টা চালানোর ওপর বিলকুল নিষেধাজ্ঞা নেই কেন?

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।