সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ২৮)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো
ইশকুল থেকে ফিরতে ফিরতে বিকেল চারটা। কলতলার চারপাশ এক বিঘত উঁচু ঘের দেওয়া। জল বেরোবার আউটলেটটা একটা পুরনো কাপড় দিয়ে সে আচ্ছা করে বন্ধ করে দিল। তারপর দিল কল খুলে। জল বেরোবার পথ নেই, কলতলাটা যেন ছোটখাট পুকুর। সে অনেকক্ষণ জলের ভেতর হাত পা ছুঁড়লো, তারপর সটান শুয়ে পড়ল জলের ভেতর। মাথাটা সেই উঁচু ঘেরের ওপর। কী চমৎকার এই বন্যা বন্যা খেলা। যদি মণি আর রাই থাকত, কী মজাটাই না হত! কী মজা এই হাত পা ছুঁড়ে জলখেলা।
এইবার মা-র ডাকে তার টনক নড়ল।
৷৷ কিন্তু এই সুখকর অভিজ্ঞতার গল্পটা পরদিন আর রাই ও মণির সাথে সাতকাহন করে বলা হল না। সন্ধে থেকেই জ্বর এলো কাঁপুনি দিয়ে। লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদল অনেক। এই লুকিয়ে কাঁদার অভ্যেসটা তার আছে। সব কষ্ট বুকের ভেতর পুষে রাখা। এভাবেই কত স্বপ্ন যে ভে0ঙে যায় ছুটি তো তা জানে না। তাই বড় কষ্ট।
প্রায় পাঁচ /ছয় দিন ভুগে যেদিন ইশকুল গেল সেদিন আর সেই গল্প করতে লজ্জা পেল সে। তবে বন্ধুরা ওকে দেখে এত খুশি হল যে কলঘরের অভিজ্ঞতার কথা গল্প করতে না পারার কষ্টটা তাড়াতাড়িই ভুলে গেল।
জগমোহন স্যারের “বন্যা ও অচিনপুর” লেখা হয়নি। সে ভয় পাচ্ছে। মণি বলল – কেউ ঠিকমতো পারেনি লিখতে। ভয় পাস না।
স্যার ক্লাসে এসে একসময় ছুটিকে জিজ্ঞেস করলেন- কি খবর? স্যার বললেন তোর জ্বর ছিল? সেরেছে? কাহিল করেছে খুব দেখছি। “বরবক্র নদীর বন্যা ও অচিনপুর ” লিখেছিস?
– না স্যার। খুব জ্বর ছিল।
-লিখে আনিস তো। দেখি তুই কি লিখিস।
এইসময়ে রতন নামের একটি ছেলে দাঁড়িয়ে বলল – স্যার আমার লেখা হয়ে গেছে।
-নিয়ে আয়।
রতন স্টাফবাবুর ছেলে। একটা গম্ভীরভাব আছে সবসময়। স্যার মনোযোগ দিয়ে পড়লেন। বললেন-বাহ খুব ভালো লিখেছিস তো।
বলে জগমোহন স্যার ছুটির দিকে তাকিয়ে বললেন -তুই পারবি কি ওর মতো লিখতে। উঁহু, মনে হয় না।
ছুটি রতনের মুখের দিকে তাকিয়ে দেখল ওর মুখ আরও গম্ভীর হয়েছে। ছুটির আঁতে লাগল।
স্যার বলছেন -কেন বললাম, তুই তো নিজের খেয়ালে চলিস। যারা আপন খেয়ালে চলে তাদের হয় না।
-কি হয় না স্যার?
– কিছু না, বললাম মনোসংযোগ বাড়াতে হবে। নাহলে খুব মুশকিল।
মনোসংযোগ মানে কি? মন লাগিয়ে পড়াশোনা করা। ছুটি আড়চোখে রতনকে দেখল।
হুম, ফুটুনি!
কি হবে না তার? পড়াশোনা?
সে দাঁড়িয়ে আবার জিজ্ঞেস করল – কি হয় না স্যার? পড়াশোনা?
স্যার উঠে এলেন সামনে।বললেন-খাতা কোথায়? রচনার খাতা কোথায়?
ছুটি খাতা বের করল। স্যার বললেন – এখন লেখো। ঘড়ি দেখলেন। আরও কুড়ি মিনিট আছে। লিখে আমাকে দেখাবি।
বাকি সবাইকে ব্যাকরণ কিছু লিখতে দিয়ে স্যার অপেক্ষায়।
ছুটি কি লিখবে? ভাবতে লাগল। তারপর লিখল – “বরবক্র নদী দেখতে খুবই সুন্দর। পাহাড় থেকে নেমেছে উপত্যকায়। আমরা উপত্যকায় থাকি। তিনদিকে পাহাড় আছে। একদিকে সমতল, ওই রাস্তা পাকিস্তানে চলে গেছে। পূর্ব পাকিস্তান। ওদিকে যাওয়া যায় না। কাঁটাতারের বেড়া আছে। পাহাড়ে বৃষ্টি হলে জল সব নীচে নেমে আসে। জলের ধর্ম হচ্ছে নীচের দিকে যাওয়া। তাই বৃষ্টি হলে সে নীচের দিকে নেমে আসে। বেশি বৃষ্টি হলে তখন নদীর অন্য রূপ। বড় বড় ঢেউ, ঘোলা ঘোলা জল…..(এবার কি লিখবে সে? বন্যা কীভাবে আসে? হ্যাঁ বাবা সেদিন বলেছিলেন বাঁধ ভেঙে গেলে, আচ্ছা বাবা সেদিন যেন কি বলেছিলেন নদী দেখে? শক্ত শক্ত শব্দ, বলেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র হলে তাই লিখতেন, আজ বঙ্কিমচন্দ্রের জন্মদিন। হ্যাঁ কিছু কিছু মনে আছে। সে আবার লিখল -)…. যেন করালবদনী। (তারপর কি প্রবাহিণী ছিল? উঁহু, মনে পড়ছে না।লিখল..) নদীর আরেক নাম প্রবাহিণী। তার স্রোত বইতেই থাকে, বয়ে যেতেই থাকে, বেশি জল হলে তার কি দোষ? সে দেবে বাঁধ ভেঙে, দেবে পাশের জায়গা ভাসিয়ে…
জগমোহন স্যার ঘড়ি দেখে বললেন – এই নিয়ে আয় তো। বাকিটা বাড়িতে শেষ করে আনবি। সবাই যে যার খাতা নিয়ে আসো।
জগমোহন স্যার মন দিয়ে পড়লেন। জিজ্ঞেস করলেন – এসব তো নিজে থেকেই লিখেছিস। এখন একটু বইএর সাহায্য নিতে হবে, নাহলে দাদা দিদি স্যার কাউকে জিজ্ঞেস করে জেনে বুঝে লিখিস।নদী উৎস কোথায়, মানে কোন পাহাড় থেকে নেমেছে, বাঁধ কি জিনিস, কেন বাঁধ ভেঙে যায়, অচিনপুর শহর, বন্যার ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া এসব নিয়ে লিখতে হবে।
টিফিনের ঘন্টা পড়ার পর রতন এসে বলল – দেখি কি লিখেছিস? ছুটি খাতা খুলে দেখাল। রতন বলল- এই “করালবদনী” কোথায় পেলি?
ছুটি গড়গড় করে সব বলে গেল। অচিনপুর গিয়ে ভরা নদী দেখার কথা। বাবার বলা কথাগুলো।
রতন বিজ্ঞের মত মুখ করে বলল – হুম, স্যার বলেছিলেন তাই তো। আমিও ত বলি….
-কি বলিস?
– তুই এই কঠিন শব্দ সাততাড়াতাড়ি শিখে গেলি? বলত এর অর্থ কি?
ছুটির খুব রাগ হল। সে কি জানতে পারে না? বলল – শোন, তুই আমার মাস্টারমশাই নোস। তোকে কেন বলব?
রতন বাঁকা হেসে বলল – আসলে তো জানিস না।
-বেশ জানি না। এবারে তোর খাতা দেখা। দেখি কি লিখেছিস?
-উহু, ওটা এখন দেখানো যাবে না।
-কেন?
– ওটা নকল হওয়ার চান্স আছে।
-মানে আমি চুরি করব? হেই, কি বলছিস এসব?
– হ্যাঁ হতেই পারে, স্যারের শব্দ চুরি করেছিস ফট করে।
মণি এসে বলল – রতন, ছুটি তো তোর খাতা দেখার জন্যে আগে থেকে যায় নি। আর বাবার কাছ থেকে শিখবে না কেন? আমরা তো স্যারের কাছ থেকেই শিখি। তুইও তাই। আর কখনও আমাদের খাতা তোকে দেখাব না।
রতন বলে – আমি তো তোকে কিছু বলিনি মণি। তুই মাঝখান থেকে এলি কেন? ছুটিকে দেখাব। আগে ও নিজেরটা শেষ করুক।
আমি ভাবছি, তখন তো মান অপমান বোধ ছিল না। যা ছিল ঝগড়াঝাটি। তার সাথে কী টান ছিল পরস্পরের প্রতি। সেই তো অমল শৈশব।
ক্রমশ