সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিজয়া দেব (পর্ব – ৫)

অতিমারী

মানুষ কি এত স্বার্থপর হয়ে গেল যে এই রাতে নার্স মেয়েদুটো কোথায় গেল খোঁজও নিতে চাইল না? খুব ভয়ানক ও ভয় পাবার মতই ব্যাপার এটা।
কথাকলিরা ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে অনেক সময় কাটায়। ঘরবন্দি থাকতে থাকতে হাঁফিয়ে উঠছে সবাই। লকডাউন! এ তো কার্ফুর চাইতে ভয়ানক। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে কার্ফু শিথিল হয়। ধীরে ধীরে পরিস্থিতি পুরো স্বাভাবিক হলে কার্ফু তুলে দেওয়া হয়।
অতীশের গেস্টরুমের লাগোয়া ব্যালকনিতে রাত হলে তিনজন বসে থাকে। অতীশ বিপাশা ও কথাকলি। এককোণে বিপাশা একটা দীর্ঘ দড়ি বেঁধে রেখেছে, এখন এটি একপাশে গোটানো, অনেকসময় সবজিওলা পেপারওলাদের সাথে সরাসরি যোগাযোগের দড়ি এটি। রাত বাড়ছে। কারোর আর রাতে ঠিকমত ঘুম হয় না। সারাদিন বাড়িতে। ছাদে গেলেও হাত পা ধোয়া স্যানিটাইজ করা কাপড়চোপড় পাল্টানো ইত্যাদি হাজারও ঝক্কিতে সারাদিন প্রায় ঘরের ভেতরেই কেটে যায়। এতরাতে রাজপথে একটি ভিখিরি ইতস্তত হাঁটছে। খাবার জোটেনি হয়ত আজ। দোকানপাট সব বন্ধ।
অতীশ বলে – বিপাশা, ফ্রিজে কিছু আছে? অতঃপর পাউরুটি কিছু রান্না করা তরকারি প্যাকেট করে দড়িতে বেঁধে ভিখিরির সামনে নামানো হল। লোকটা উপরে দেখছে। অতীশ ইশারায় তাকে খাবার নিতে বলল। লোকটি মনে হল বুঝতে পেরেছে। দড়ি থেকে প্যাকেটটি খুলে নিয়ে দুহাতে তুলে নমস্কার জানাল।
ভিক্ষুকটি খাচ্ছে।
অতীশ বলে – ব্যস। এবার ঘুমোবে চল। বিছানায় শুয়ে বিপাশা একমাত্র মেয়ে প্রত্যাশার কথা ভাবছে। প্রত্যাশা আমেরিকায় চাকরি করছে। একা থাকে। খুব চিন্তা হচ্ছে। আমেরিকায় আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়ছে। ঘুম আসে না।
কথাকলি ভাবে ঐ লোকটা আগামীকাল কি খাবে? সব বন্ধ। কে খাওয়াবে ওকে? মরে যাবে এভাবে না খেয়ে খেয়ে?

আবহাওয়া দফতর থেকে ঘোষণা চলছিল তুমুল ঝড় আসছে “আমফান”।কথাকলিদের এন জি ও – র ড্রাইভার পলাশের বাড়ি সুন্দরবন। হঠাৎ করে কোবিড লকডাউন ইত্যাদির ঘটনায় দিশেহারা হয়ে পলাশের বাড়ি থেকে ফোন আসছিল – বাড়ি চলে আয়। সবাই একসঙ্গে মরব। মহামারী যখন তখন হয়ত কেউ বেঁচে থাকবে না।
পলাশের মা ফোনে কাঁদছিল – কেউ বাঁচবেনি। তুই চলে আয়। আবার এ-ও বলছিল-শহরে বেশি মরবে। এখানে ভাইরাস আসবেনি।
স্বপ্নিল বারবার পলাশকে বারণ করছিল – বাড়ি এখন যাস না। আমরা আছি তো তোর কিছু হলে আমরা দেখব না?
পলাশ ভয়ে হাউহাউ করে কাঁদছে দেখে বিরক্ত স্বপ্নিল আর জোর করেনি।
তবে বলেছিল – ওখানে কাজ আছে তো? লকডাউন হলে পরে ফিরতে পারবি না পলাশ। শোনেনি পলাশ। বাড়ি চলে এসেছিল। এবার ঝড় এল। কলকাতাতে জোর ঝড় এল। অনেক গাছ পড়ল। বহুতল ফ্ল্যাটবাড়িতে কাঁচের জানালা ভাঙ্গল। এতবড় ঝড় কলকাতা অনেকদিন দেখেনি।
তবে কলকাতা যত না ক্ষতিগ্রস্ত হল তারচাইতে অনেক বেশি লন্ডভন্ড হল সুন্দরবন যা বারবার ঝড়ে তুফানে হয়েই থাকে, তবে এবারেরটা ব্যাপক।
এদিকে লকডাউন, পথঘাট বন্ধ। ছারেখারে গেল ঘরদোর। প্রায় একটিও ঘরবাড়ি অবশিষ্ট নেই। সব ভূমিসাৎ হয়েছে। হারাধন জ্যেঠুর বউ মানদা জ্যেঠি ঘরের নিচে চাপা পড়েছে। পলাশ দেখে বিড়বিড় করতে করতে একা একাই হারাধন জ্যাঠা ভাঙ্গা ঘর সরাচ্ছে।
অনেকদিন থেকেই হারাধন জ্যাঠার মাথায় গন্ডগোল। তেমন কিছুই না যদিও, কাজকর্মও করে, শুধু একা একা কথা বলে। সে কথার কোনও মাথামুন্ডু নেই।
লোকজন এই মহা বিপর্যয়ে নিজেদের নিয়ে এতটাই জড়িয়ে গেছে যে হারাধন জ্যাঠার এই ঘোর বিপদে ছুটে আসতে ভুলে গেছে। মানদাজ্যেঠির জন্যে হারাধনজ্যাঠা ঠিকঠাক চলছিল। এখন কী হবে! মানদাজ্যেঠি নিশ্চয়ই মারা গেছে। ঘরচাপা পড়ে আছে এতসময়, সাড়াশব্দ নেই, ঈস কী সাংঘাতিক! পলাশের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। শীত শীত করে। আকণ্ঠ জলতেষ্টা ও আগ্রাসী ক্ষিদে নিয়ে হারাধনজ্যাঠার সাথে ভাঙ্গা ঘরের বাঁশের বেড়া, খুঁটি, ভেজা হোগলা, পলিথিনের ভেজা সিট এগুলো সরাতে থাকে।
মানদাজ্যেঠি খুব কাজের ছিল, গাছপালা লাগাত। বাঁধের পাশে পাশে অর্জুন, শাল, গরান ইত্যাদি লাগিয়ে বলত, বেশি করে গাছপালা লাগাবি, সবাই মিলে করবি। ঝড়তুফানে আমাদের কী কষ্ট, বারবার বাঁধ ধ্বসে যায়, নিজেরাই কাজ করে আমরা নিজেদের বাঁচাব..
হারাধন জ্যেঠাকে খুব যত্ন করত মানদাজ্যেঠি। ঘন্টাখানেক যুদ্ধের পর মানদাজ্যেঠিকে পাওয়া গেল। থ্যাতলানো দেহটি জলে কাদায় রক্তে বৃষ্টিতে ফুলে উঠেছে। হারাধন জ্যেঠা স্থির তাকিয়ে আছে। তার বিড়বিড় করে কথা বলাও বন্ধ এখন।
আচ্ছা, মৃত্যুটা এত সহজ? একটা দমকা হাওয়ার মত? হ্যাঁ দমকা হাওয়ার মতই। কেন পলাশের দাদু ঘর চাপা পড়ে মারা যায়নি? কী বীভৎস থ্যাতলানো চেহারা হয়েছিল! সে তো সেই শৈশবকালের কথা। তারপর তার বড় কাকু জঙ্গলে জ্বালানি কাঠ কুড়োতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যায়নি? সবাই বলে বাঘ নাকি কাকুর হাড় মাস চিবিয়ে খেয়েছে। কিচ্ছু বাকি রাখেনি।
দেখতে দেখতে ভিড় জমছে। সবাই দেখছে, আতঙ্কের শেষ নেই আর? হঠাৎ ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। মরদেহের অন্ত্যেষ্টি তো করতে হবে! এই জোর বৃষ্টি থামবে কখন! সবাই আজ উদ্বাস্তু। কারোর ঘর নেই। ইস্কুলবাড়ির বারান্দায় ঘরের ভেতর লোকজন গিসগিস করছে। পলাশের খিদে পেয়েছে জোর! এই জোরালো বৃষ্টিতে হারাধন আবার বিড়বিড় করে ভাঙ্গা ঘরের খুঁটি বেড়া চাল টেনে টেনে সরাতে শুরু করেছে।

পার্লার চালিয়ে কিছু টাকা জমিয়েছিল মরমী। কিন্তু তা আর কত! নিজের হাতখরচায় কিছু টাকা থাকত রোজকার ব্যবসার লাভের টাকা থেকে। পথশিশুদের ক্লাশ নিলে দৈনিক হিসেবে সামান্য কিছু দিত কথাকলি। ব্যাঙ্কের ঐ ক’টা টাকায় সে হাত দিত না। আর খাওয়াখরচের জন্যে ভাইয়ের হাতে কিছু তুলে দিত।
বৃদ্ধাশ্রমে খরচ কত সে আদৌ জানে না। এখন লকডাউনে সব বন্ধ হয়ে যাওয়ায় একটা ভয় এসে দানা বেঁধেছে। কতদিন চলবে এই অতিমারি? বাড়িতে বৃদ্ধা মা। তার মধ্যে বৃন্দা ও নিরাময় আছে। এদের মুখের ধার শরীরী ভাষা আছে। মা ও মেয়ে দুজনেই ব্রাত্য এ পরিবারে। ইস্কুল বন্ধ। পথশিশুদের জন্যে নিজের উপার্জনের টাকা থেকে সাহায্য করার ক্ষমতাও আপাতত নেই। শিশুগুলো তাদের মুখাপেক্ষী হয়ে গেছে ইস্কুল খোলার পর। যতদিন ইস্কুলে আসেনি ততদিন চায়ের দোকানে পরের বাড়িতে কাজ করে নিজেদের খাবার জুটিয়ে নিত। ইস্কুলে আসার পর এন জি ও থেকে নানাভাবে সাহায্য করা হয়, খাবার দাবার কাপড়চোপড়…. এখন এদের কী হবে! দোকানপাট বন্ধ, এরা খাবে কী!
স্বপ্নিলকে ফোন করেছিল মরমী… ও রেগে আছে কথাকলির ওপর। পথশিশুদের জন্যে খুব ভাবনা হয় – ওদের নাম রেখেছিল মরমী – আকাশ, তারা, ধূমকেতু, ছায়াপথ, উল্কা, সপ্তর্ষি, কালপুরুষ এইসব।
স্বপ্নিলকে ফোন করে সে আবার একরকম মরিয়া হয়ে।
বলে- স্বপ্নিল, একটা কিছু করো প্লিজ, আমরা কি একসঙ্গে বেরোতে পারি? আকাশদের সঙ্গে দেখা করতে হবে। বেঘোরে মারা যাবে বেচারিরা না খেয়ে।
স্বপ্নিল বলে – তুমি কী ভেবেছ, আমি ব্যাপারটা নিয়ে ভাবছি না? আমার চিন্তা নেই? গিয়েছিলাম সেদিন। ওরা ইস্কুলেই আছে। মা-কে বলে কিছু রুটি তরকারি নিয়ে গিয়েছিলাম। আর কিছু বিস্কুট। কথা-র কাছে তো ফান্ডের কাগজপত্র। কিছু দিয়ে তো গেল না। এটিএম কার্ড ওর কাছেই। তাছাড়া, এভাবে তো টাকা তোলা যাবে না। ও না ফিরলে কী করা যায় বলো? জানো, কোনও কোনও স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কম্যুনিটি কিচেন করে গৃহহীনদের খাওয়াচ্ছে। আমরা শুধু আমাদের ছেলেমেয়েদের খাওয়াব তা-ও সম্ভব হচ্ছে না। এখন বলো আমরা ঠিক কী করতে পারি!
ডোনেশনের ব্যবস্থা করা যাবে?
এখন সোস্যাল ডিসট্যান্স বজায় রেখে চলতে হয়। কী করে কী হবে বুঝতে পারছি না।
আকাশ ছেলেটি পথশিশুদের ক্যাপ্টেন। সবাই মিলেই করেছিল ওকে। ছেলেটি বুদ্ধিমান, শান্ত স্বভাবের। ধৈর্য্য ধরে কষ্ট করতে জানে।
একটা ফোন ওকে কিনে দিয়েছিল মরমী। একবার ফোন করল ওকে। কিন্তু যোগাযোগ হল না। স্যুইচ অফ। কী হল কে জানে! হ্যাঁ, নিশ্চয়ই রিচার্জ করানো হয় নি। তারাই তো রিচার্জ করে দিত। এখন তার নিজের অবস্থাও টলোমলো। ফোন কম্পানিগুলো এত ব্যবসামনস্ক যে এখন দশ /কুড়ি টাকা রিচার্জ করানোর সুবিধে বন্ধ করে দিয়েছে। কমপক্ষে ১০০ টাকার নিচে রিচার্জ করানো সম্ভব হচ্ছে না।
এই মুহূর্তে তার অগ্নির কথা মনে হল। দুবার তারা অগ্নির কাছ থেকে বেশ মোটা টাকা ডোনেশন নিয়েছে। কিন্তু এখন তো সেটা সম্ভব নয়। অগ্নির স্ত্রী ডা. সেবিকা করোনার বলি হয়েছে। শোকগ্রস্ত অগ্নির সাথে দেখা করা উচিত ছিল। সেটাও সম্ভব হয় নি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।