সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৭)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

পেছনের ঢেউগুলো নিরন্তর আছড়ে পড়ে বিস্তীর্ণ সৈকতে, পেছন ফিরে সামনের দিকে চলতে শুরু করলেও ঠান্ডা ভিজে জলের ঝাপট টের পাই। উৎস আছে বলেই তো নদী তরতর করে সামনের দিকে বয়ে যায়। বাবা তাই বলতেন একটা গোটা মানুষ তার অতীত ও বর্তমান জড়ানো।

ব্রিটিশরা চাবাগান চালু করার পর এদেশীয় কর্মচারীর সন্তানদের পড়াশোনার অসুবিধের কথা ভেবে প্রাথমিক বিদ্যালয় খোলে প্রতিটি চা বাগানে। রূপমতী চা বাগান ও তার অধীনস্থ চা বাগানগুলির মধ্যে একমাত্র রূপমতী চা বাগানেই মধ্যবঙ্গ ইশকুল স্থাপন করে। তবে প্রতিটি ইশকুলেই মাতৃভাষা বাংলাই ছিল শিক্ষার মাধ্যম। ইচ্ছে করলে ইংরেজি মাধ্যম করা যেত, কারণ তারা ছিল তখন এদেশের রাজা। কিন্তু করেনি।
৷ প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মূলত পাঁচটি শ্রেণী। প্রথম ভাগ, দ্বিতীয় ভাগ, প্রথম মান, দ্বিতীয় মান, তৃতীয় মান। এখানেই প্রাথমিক শিক্ষার ইতি। তারপর মধ্যবঙ্গ ইশকুলে ক্লাস ফোর ফাইভ ও সিক্স অর্থাৎ চতুর্থ পঞ্চম ও ষষ্ঠ শ্রেণী। ক্লাস ফোর থেকে ইংরেজি আবশ্যিক একটি বিষয়, তবে শিক্ষার মাধ্যম বাংলা। রূপমতী চা বাগানে বিশাল ইশকুল কম্পাউন্ডে একপাশে উইলসন ইন্সটিটিউট (মিডল ইংলিশ স্কুল), অন্যপাশে রূপমতী প্রাথমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ে আলাদা শ্রেণীকক্ষ বলে কিছু নেই। দৈর্ঘ্যে প্রস্থে সমান এক বিশাল হলঘরে এদিক ওদিক করে আলাদা আলাদা শ্রেণীর ছাত্ররা বসে। তার মধ্যে প্রথম ভাগ বসে মেঝেতে। দ্বিতীয় ভাগ থেকে ডেস্ক বেঞ্চের ব্যবহার। শিক্ষক মাত্র একজন। ছাত্রদের সামাল দেবার জন্যে ছাত্রদের মধ্য থেকে তিন/ চারজন মন্ত্রী মনোনীত করেন মাস্টারমশাই। যেমন সাফাই মন্ত্রী, স্বাস্থ্যমন্ত্রী ইত্যাদি ইত্যাদি। মূলত এরাই ছাত্রদের হৈ হট্টগোল নিয়ন্ত্রণ করে হাতে একটা বেত নিয়ে।

৷ ছুটির মন্থর আনন্দের দিনগুলো যখন কাটছে তরতর করে, যখন মা দিদিরা স্লেটের ওপর পেন্সিল আঙুলে ধরিয়ে হাতের ওপর হাত রেখে অ আ ই ঈ লেখানো শুরু করে দিলেন, রপ্ত করিয়ে দিলেন ব্যঞ্জনবর্ণের জটিল ধারকোণগুলোকেও, সমাধা হল যুক্ত ব্যঞ্জনের মহা জটিলতর পর্ব এবং এভাবেই কখন যেন পৌঁছে যাওয়া গেল শব্দ ও বাক্যগঠনের ঘরে, তখন বাড়িতে স্থির হল ছুটি এখন ইশকুল যাক।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক শৈবাল চক্রবর্তী। সুধাময় শৈবাল মাস্টারমশাইয়ের সাথে এ নিয়ে কথা বললেন। শৈবাল মাস্টারমশাই ও সুধাময় প্রায়শই ইশকুল ছুটির পর একসাথে বাড়ি ফেরেন। ছুটির ইশকুল পাঠানোর ব্যাপারে শৈবাল বললেন – এতদিন ধরে ঘরে পড়ছে? প্রথম ভাগ পড়েনি?
সুধাময় বললেন – বাড়িতে কিছু কিছু শিখে নিয়েছে। মনে হয় না আর প্রথম ভাগের দরকার আছে। দ্বিতীয় ভাগের অনেকটা এগিয়ে গেছে।
শৈবাল বললেন – বেশ পাঠিয়ে দিন। বাজিয়ে দেখে নেব।
৷ ছুটির মন ভালো নেই। ছুটিদের কোয়ার্টারের লাগোয়া কমলাপুর ব্লকের থানা। কিছু পুরনো পুলিশ বদলি হয়েছে। নতুন দু’চারজন এসেছে। সদর গেটের সামনেই চমৎকার ফুলবাগান করে এরা। দুপুরবেলা ছুটি বেরিয়ে এসে এসব দেখে। মুরগি রেখেছে এরা দেদার। দুপুরে ওগুলো থেকে একটাকে কেটে রান্না করে খায়। ভুরভুর মাংসের গন্ধ ছাড়ে। তাছাড়া, রাসমণি ঝাড়ুয়ালির কাজ দেখা, “হাটাও” ও উঠোনে ঝাড়ুর বাড়ি দেখার জন্যে উদগ্রীব অপেক্ষা এসবের আনন্দ হারিয়ে যেতে বসেছে। এই ঘন দুপুরবেলায় নিঝুম পথঘাট গা এলিয়ে শুয়ে থাকে, হঠাৎ কোনও লেবারলাইনে দ্রিমিদ্রিমি মাদল বাজে, উঠোনের সবজিক্ষেতে এককোণে বাঁকানো গুলঞ্চ গাছটার নিচে গুলঞ্চ ফুল ঝরে পড়তে থাকে…সাদা, ফিকে হলুদ, গাঢ় হলুদ রঙ মেশানো ফুল। সব্জিক্ষেতের এককোণে রাখা জলের ড্রামে কলঘরের কল থেকে কালো মোটা পাইপ টেনে জল ভরে রাখা হয়, বিকেলে ভাইবোনেরা মিলে ঝারি দিয়ে সব্জিক্ষেতে জল দেওয়া হয়, কাঠবেড়ালিগুলোর পেছনে তো ছুটিকেই ছুটতে হয়, বুড়িমেনিটা বাচ্চা দিয়েছে, এখনও চোখ ফোটেনি। এরকম উজ্জ্বল দুপুর ছেড়ে ছুটিকে যেতে হবে ইশকুল? একদিনের জন্যে নয়, রোজ রোজ!
৷ ইশকুলে যাবার দিন সকালবেলাতেই বুধিয়া রান্না করার চ্যালাকাঠ চেরাই করতে এল। সুধাময় ভেতর থেকে কুড়ুল বের করে দিলেন। ঈস, বুধিয়ার কাঠ চেরাই দেখা হবে না আজ। ভারি মন খারাপ নিয়ে একখানা স্লেট, বর্ণবোধ দ্বিতীয় ভাগ একখানা, একটা ছোট প্লাস্টিকের বাক্সে দু’তিনখানা পেন্সিল নিয়ে সে বাবার হাত ধরে ইশকুল চলল। সে শুনেছে শৈবাল মাস্টারমশাই নাকি ছাত্রদের মারধর করেন। হাতের কাছে দু’তিন রকমের বিচ্ছিরি সব বেত থাকে। অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা আর কি। ছুটি কি এব্যাপারে বাবার সাথে কিছু কথা বলবে? তারপর ভাবে – থাক।
৷ দু’পাশে সবুজ চা গাছের ঘন সারি, মাঝে মাঝে মাথা উঁচু শিরীষ গাছ। তার শাখাপত্রের হালকা ছায়া চা গাছের সারির ওপর সুদৃশ্য আলপনার মত পড়ে আছে।
৷ থেকে থেকে ছুটির চোখে শুধু জল আসে।

ক্রমশ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।