সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিজয়া দেব (পর্ব – ৩১)

গোপনে গড়েছে কত স্বপ্নিল সাঁকো

পাশের কোয়ার্টারের থানাটা থাকায় একটা অসুবিধে হয়। পাকা উঠোনের ঠিক মাঝখানে একটা শক্ত তেলতেলে বাঁশের মোটা খুঁটি। ঐ খুঁটিতে চোরকে বেঁধে মাঝেমধ্যে এরা বেধড়ক পেটায়। চোরের আর্তস্বর উল্টোদিকের কারখানার ঘর্ঘর আওয়াজ ভেদ করে কানে এসে বড্ড বাজে।
মা বলেন – আহা রে কী কষ্ট পাচ্ছে। ইসস।
সুধাময় বলেন – এখানে থানা কেন দিয়ে রেখেছে কে জানে! ছেলেমেয়েদের মনে একটা খারাপ প্রতিক্রিয়া হবে।

৷ চা বাগানে পূর্ণিমা রাতে মনকাড়া জ্যোৎস্নায় দিকবিদিক ভেসে যায়। তখন সামনের সিঁড়ি জুড়ে পুলিশ দারোগা সব বসে থাকে। একজন তো চমৎকার গান গায়। এরা সিগারেট টানে। রাশি রাশি সিগারেটের খালি প্যাকেটগুলো ফেন্সিং এর বাইরে ফেলে দেয়। উইলস, নাভানা, চারমিনার। উপরমুখো হয়ে রিং করে করে সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়ে।
এই পাগল করা জ্যোৎস্নায় সিঁড়িতে পা ঝুলিয়ে বসতে ইচ্ছে করে ছুটির। অদূরে আট নম্বর লাইনের ঢালুতে চন্দনগাছটার পাতা জ্যোৎস্নায় দোল খায়। মনে হয় দিকবিদিকে পরীরা নেমেছে। কিন্তু ওরা বসে থাকে সিঁড়ি জুড়ে।
যদিও তারা ছুটিকে ডাকে – এই যে ছুটিরানী, এখানে এসে বসো। আজ চৌধুরী গান শোনাবে। চৌধুরীর গানের গলা খুব ভালো। একেবারে মনকাড়া। থানার পেছনে তাদের রান্নাঘর। সেখানে রান্না করতে করতে চৌধুরী মিঠে সুরে গান গায়। -“না যেও না, রজনী এখনও বাকি…. ” ছুটি দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে শোনে।
ছুটিকে ওরা ডাকলেও ওদের পাশে গিয়ে বসে না। অদূরে দাঁড়িয়ে বলে – গান শুনব।
চৌধুরী হেসে বলে – গান শুনবে? বেশ।
সে গেয়ে ওঠে – আহা ঐ আঁকাবাঁকা যে পথ যায় সুদূরে / মনহরিণী করুণ তার তাল তুলেছে….”
জ্যোৎস্নায় বিস্তীর্ণ ধানক্ষেতে ছায়ামাখা আলোর ধূসরতা। ঐ দূরের ধেয়ানি বস্তিতে কে যেন আলো হাতে চলেছে। একবিন্দু সচল আলো ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। কী রহস্যময় এই পৃথিবী! কী অচেনা!
চৌধুরী গায় ” স্মৃতিরা যেন জোনাকির ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি….. ”
এই ছোট্ট জীবনে ছুটির তেমন কোনও স্মৃতি নেই। শুধু মনে পড়ে সে একটা জানালার পাশে বসেছিল। তার পাশে কেউ ছিল, মা দিদি কিম্বা দাদা, রাস্তাটা খুব সামনে, সেই রাস্তা দিয়ে চলেছে অনেক মানুষ…কোথা সেটা? স্মৃতিরা যেন জোনাকির ঝিকিমিকি ঝিকিমিকি.. এই যে কিছু একটা মনে হচ্ছে আবার হারিয়ে যাচ্ছে জোনাকির দিপদিপে কিম্বা ফুটফুট আলোর মত। আহা, কী চমৎকার। কী চমৎকার। আচ্ছা, এই গানগুলো কি কেউ লেখে না কি আপনা আপনি তৈরি হয়? আর এই মন আলো করা সুর?
চৌধুরীর গান শেষ হলে সবাই হাততালি দিল। একজন বলল – ইসস চৌধুরী ট্রান্সফার হলে আমরা বিশেষ কিছু হারাব।
আরেকজন শ্বাস ফেলে বলল – সত্যি কী অমানুষিক কাজ আমাদের!
চৌধুরী মাথা নেড়ে বলে – উঁহু এসব কথা নয়। ডিউটি ইজ ডিউটি। যার জন্যে যে কাজ তাকে সেটাই করতে হয়। মন খারাপ কেন করব? তারপর দু’চার কথা বলে হাই তুলে আড়মোড়া ভেঙে ওরা উঠে দাঁড়াতেই ছুটি ছুটে গেটের ভেতর ঢুকে চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে।
চৌধুরী ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল – গান কেমন লাগল ছুটি…আরে চলে গেছে.. কিছু না বলে চলে গেল!
– লজ্জা পায়। তবে খুব মন দিয়ে গান শুনল কিন্তু….

৷ আস্তে আস্তে কি কারণে কে জানে থানা চা বাগান থেকে সরিয়ে দেওয়া হল। কোয়ার্টারের ভোল কিছুটা পালটে দেওয়া হল। নতুন স্টাফ এলো অচিনপুর শহর থেকে। ভদ্রলোকের নাম প্রতাপ সিং। তাঁর বৃদ্ধা মা, বউ আর চারটি ছেলেমেয়ে। এরা হিন্দিভাষী। তবে ভালো বাংলা বলে।
আসার পর মা বললেন -ছুটি যা তো, ওদের গিয়ে বল যদি কোনও অসুবিধে হয় আমাদের বলতে।
ছুটির এই ব্যাপারটা সামলাতে খুব অসুবিধে হয়। কিন্তু মা কিছু বলেছেন তাকে করতেই হবে। যখন থানা ছিল তখন এক দারোগা তার স্ত্রী শ্যালিকা ও একটি ছোট্ট বাচ্ছা নিয়ে এসেছিল। দারোগার ঘর ও পুলিশের ঘরের মাঝখানে বাঁশের ফেন্সিং দিয়ে একটা আড়াল তৈরি করা হয়েছিল। তখনও মা তাকে পাঠিয়েছিলেন। সে মাকে বলতেই পারে না যে নতুন মানুষের সামনে তার মুখে কথা ফোটে না। সেদিনও তেমনই কাঁপা কাঁপা পায়ে গিয়ে বলেছিল – মা বলেছেন… তারপর মুখে কথা ফোটে না। দারোগার বউ দেখতে কী সুন্দর। উফফ। ছোট্ট একটি বাচ্ছা বিছানায় হাত পা নাড়ছে। কী ছোট্ট! সে কী বলতে এসেছে ভুলেই গেল। বউটি মিষ্টি হেসে বলল – বোসো বোসো। তুমি পাশের কোয়ার্টারের? কি নাম তোমার?
তখন ছুটি নিজের নাম বলে বলল – মা বলেছেন কোনও অসুবিধে হলে বলবেন।
– হ্যাঁ। নিশ্চয়ই বলব। বিকেলে আমি তোমাদের বাড়ি যাবো। তোমার মা- কে বলো।
ছুটি উঠে দাঁড়িয়েছে, বউটি জোর করে তার বিস্কুট দিল। খুব মেলামেশা হয়েছিল এদের সাথে। তবে এরা খুব বেশিদিন থাকে নি। ট্রান্সফার হয়ে চলে গেল। খুব কষ্ট হয়েছিল ছুটির। এবারের সমস্যা আরেকটু গুরুতর। এরা অনেক লোক। মা বললেন – যা ছুটি!
ছুটির পা চলে না। আগ্রহ ও সংকোচ। কি মুশকিল!
ওদের কোয়ার্টারে পা দিতে না দিতেই একটি মেয়ে ছুটে এল। কথায় অবাঙালি টান। খুব মিষ্টি দেখতে। এসে ছুটির হাত ধরে ও- ই জিজ্ঞেস করল – কি নাম তোমার? মেয়েটির নাম নেহা। একটি ছুটির বয়েসি ছেলে এসে ছুটির দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে কুটিকুটি। ওর হাসি দেখে ছুটিও হাসছে, নেহাও হাসছে। ওদের ঠাকুমা বেরিয়ে এসে হাসছেন। ছুটি কি বলতে এসেছিল ভুলে গিয়ে ওদের সাথে খেলায় মেতে উঠল। ঠাকুমার হাত ধরে তারই বয়েসি একটি মোটামতন ছেলে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে তাদের দেখছে। ছেলেটিকে একটু অন্যরকম লাগছে। যেন কোথাও একটুখানি গরমিল।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।