সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে বিজয়া দেব (পর্ব – ৯)

অতিমারী

মরমী শোনে মরমী দেখে মরমী জানে কষ্টরা নানা বেশে নানা রূপে মানুষের জীবনে ঢেউয়ের মত আছড়ে পড়ছে। এর থেকে মুক্তি কবে কীভাবে মিলবে কেউ জানে না।
করোনা প্রতিষেধক অর্থাৎ ভ্যাকসিন নিয়ে শুরু হবে গবেষণা। শুরু নাকি হয়েই গেছে। ভ্যাকসিন তৈরি করাটা নাকি সময়সাপেক্ষ। ততদিনে কী করবে মানুষ? এভাবে ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যাবে? ঘরবন্দি থাকবে? নাকমুখ ঢেকে রাখবে লোকজন থেকে দূরে সরে থাকবে? কত কত প্রশ্ন উত্তর নেই।
কথাকলি ফেরার পথে কত কঠিন পরীক্ষা সব পেরিয়ে এল। কোবিড টেস্ট রিপোর্ট দেখানো, যেহেতু মিডল সিট পড়েছিল তাই পিপিই কিট লাগানো, তারপর যে ভয়ানক কান্ডটি হল বেল্ট থেকে লাগেজ ওঠানোর সময় স্রেফ তিনটে হাঁচি সাথে খুকখুক করে চার/পাঁচটে কাসি – সে সন্দেহ তালিকাভুক্ত হয়ে গেল, কোথা থেকে পিপিই কিট লাগানো কিছু অবয়ব এসে তাকে নিয়ে চলল অ্যাম্বুলেন্সে উঠিয়ে। তারপর কোথায় এক হাসপাতালে দীর্ঘ লাইনে দাঁড় করিয়ে আবার কোবিড টেস্ট করে দুদিন এক আইসোলেশনে রেখে কোবিড টেস্ট রিপোর্ট নেগেটিভ আসায় তাকে ছাড়া হল। ততদিনে বাড়ির সব লোক ও নিজে আতঙ্কে আধমরা। বেঁচে থাকাটা এত কষ্টের কখনও মানুষ এমন করে বুঝেছিল? এইসব অভিজ্ঞতা যেন এই কদিনেই বুড়িয়ে দিল কথাকলিকে। সে বুঝতে পারল আগের সেই কথাকলি আর বেঁচে নেই। নতুন এক কথাকলিকে জন্ম দিয়েছে এই অজানা ভাইরাস। পৃথিবী বদলে গেছে। বদলে গেছে মানুষ, মানুষের পেশা বদল হয়েছে। কেউ কেউ মাস্ক তৈরি ও স্যানিটাইজার উৎপাদনের ব্যবসায় লেগেছে, তৈরি হয়ে যাচ্ছে নতুন পেশা। আবার মোটামুটিভাবে যে কোনরকমে খেয়ে বেঁচে ছিল সে পথে বসে গেছে।
আকাশদের ইস্কুল চালু করেছিল মরমীরা, পুলিশ এসে বন্ধ করে দিয়েছে। কথাকলি লক্ষ করছে দিল্লি থেকে ফেরার পর স্বপ্নিল তাকে বেশ এড়িয়ে চলছে। সুন্দরবনে যাওয়ার একটা পরিকল্পনা ছিল ঝড়বিধ্বস্ত মানুষদের সাহায্য করার জন্যে, স্বপ্নিলের কাছ থেকে প্রায় কোনও সাড়া পাওয়া গেল না। পলাশ এখন স্বপ্নিলের গাড়ি চালায়। এন জি ও –র কাজে ওকে ডাকলেই বলে- স্যারকে বলুন। ভারি অদ্ভুত লাগছে কথাকলির। হঠাৎ স্বপ্নিলের এই পরিবর্তনের কারণ বুঝে ওঠা যাচ্ছে না। বরং সাহায্যে এগিয়ে এসেছে ডাক্তার অগ্নি রায়। মরমীর বাড়িতে অশান্তি বেড়েছে, তবু সে কাজ করে যাচ্ছে যতদূর সম্ভব।
স্বপ্নিলের মা কথাকলিকে কখনও খুব একটা পছন্দ করেন না। তার কারণ আছে হয়ত। মহিলার ভয় কীজানি স্বপ্নিল যদি কথাকলির সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এমন বারমুখো মেয়ে ঘরের বৌ হিসেবে মোটেই কাম্য নয়। হয়তো স্বপ্নিলের দিল্লি না যাওয়ার পরামর্শে কান না দেওয়ার জন্যে স্বপ্নিলকে উনি সতর্ক করেছেন। এটা হতেও পারে। কে জানে! পরপর কত ফোন করল কথাকলি। সবসময় একটা ব্যস্ততার দোহাই দিয়েছে সে, নয়ত ফোন রিসিভ করেনি।
একটা হতাশা কেন কথাকলিকে গ্রাস করছে? এমন তো সে ছিল না! চারদিকে নৈরাশ্যের ছবি। চেনাজানা কিছু মানুষ কোবিড আক্রান্ত হয়ে মারা গেল। বাড়িতে এখন টিভি চালানো বন্ধ করে দিয়েছে বাবা। নিরন্তর মৃত্যুর খবর। সেদিন ঠাম্মা টিভি দেখে কেঁদে ফেলল। বছর চল্লিশের এক অধ্যাপক কোবিড আক্রান্ত হয়ে কোনও হাসপাতালে ভর্তি হবার সিট না পেয়ে তীব্র শ্বাসকষ্টে রাস্তাতেই মারা গেল। এক প্রাইমারি ইস্কুলের শিক্ষিকা মারা গেল। মেয়েটি চিকিৎসা করানোর সুযোগ পায় নি। বাবা এখন কড়া হুকুম দিয়েছে টিভি যেন খোলা না হয়। এখন খবরের কাগজ রাখা বন্ধ। কাগজের সঙ্গে ভাইরাস লেগে থাকতে পারে সেই ভয়ে কেউ-ই খবরের কাগজ রাখছে না। বাবা অনলাইন কাগজ পড়ছে, আশ্চর্য, এখন আর কোনও খবরই নেই, নতুন করে আক্রান্ত নতুন করে সেরে ওঠা ও করোনার সাথে লড়াই করা আক্রান্তের হেরে যাওয়ার খবর ছাড়া।
গভীর রাতে ছাদে পায়চারি করে কথাকলি। নির্ঘুম রাতগুলো নিশাচর অ্যাম্বুলেন্সগুলোর তীব্র হুটারের আওয়াজ নৈঃশব্দকে খানখান করে দেয়। কথাকলির মনে হয় কেউ যেন আর বেঁচে নেই। চারপাশে মহাশ্মশান। সে একা বেঁচে আছে। ভাবতেই শিউরে ওঠে। মনে হয় জ্বর আসবে, মনে হয় গলা খুশখুশ করছে। কখনও মনে হয় আত্মহত্যা করবে। প্রবল হতাশার ভেতর সে যেন ডুবে যাচ্ছে। এত ভয়, এত নির্জনতা, এত অ্যাম্বুলেন্স, এত মৃত্যু… বেঁচে থেকে কী লাভ! তবে মরমী ফোন করলে মনে অনেকটা জোর পায় সে। সেদিন মরমী বলছিল – তুই কি স্বপ্নিলকে ভালবেসে ফেলেছিস?
কথাকলি কী উত্তর দেবে! নিজেকে সে তো এই প্রশ্নটিই করছে।
(অতিমারির দ্বিতীয় ঢেউ)
১১
অতিমারির দাপট ঝিমিয়ে পড়ল সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে। মরমী ডাঃ অগ্নি কথাকলি স্বপ্নিল এগিয়ে চলেছে এন জি ও – র কাজে, কোবিড বিধি মেনে ক্লাস চলছে আকাশ তারা ধূমকেতূদের… তখন শোনা গেল কোবিডের দ্বিতীয় ঢেউ নাকি আছড়ে পড়েছে বিভিন্ন দেশগুলোতে। এবং সত্যিকথা বলতে কী এ নিয়ে জল্পনা শুরু হতে না হতেই করোনা ঢেউ আছড়ে পড়ল এদেশে। হ্যাঁ, তখন সবে ভ্যাকসিন দেওয়া শুরু হয়েছে। মরমীর গলা ব্যথা, হালকা জ্বর, শুকনো কাসি, কথাকলিরও তাই। অনলাইনে ডাক্তার দেখানো। পরীক্ষা করে ওষুধ দিয়েছে, ওষুধ আর কী – কিছু অ্যান্টি ভাইরাল মেডিসিন কিছু ভিটামিন। এদিকে বৃন্দার অত্যাচার একেবারে মাত্রাছাড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে। সে কেন বাইরে গেল কেন সামাজিক দূরত্ব মেনে চলল না এখন বাড়িতে সবাই আক্রান্ত হলে কী হবে, প্রাণ সংশয় হলে মরমীই খুনি সাব্যস্ত হবে, সে ক্ষেত্রে মরমীর তো শাস্তি হবে না ইত্যাদি বলেই চলেছে অথচ সে যে আক্রান্ত হলো তার প্রতি কোনও মানবিক অনুভূতির প্রকাশ দেখল না মরমী। এমনকি একটিবারের জন্যে জিজ্ঞেসও করল না তোমার শরীর কেমন তুমি কী খাবে ডাক্তার দেখিয়েছ? না, কিছুই জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন বোধ করল না বৃন্দা। এন জি ও – র সহযাত্রীদের সহমর্মিতায় সে সামলে উঠল। একটা ভ্যাকসিন নেওয়া হয়েছিল জ্বর আসার দিন পনেরো আগে। কিন্তু ভ্যাকসিন নেওয়া সত্ত্বেও কেউ কেউ মারা গেল। আসলে দ্বিতীয় ঢেউ মানুষকে সময় দিল না মোটেই।
দ্বিতীয় ঢেউয়ের জন্যে আগাম প্রস্ত্ততি সেভাবে না থাকায় দেখা দিল চরম বিশৃঙ্খলা। যে ভয়টা করছিল মরমী, মা-র জ্বর এল। সঙ্গে তীব্র গলাব্যথা কাসি। একই ওষুধ চলছে যা মরমী অনলাইনে ডাক্তার দেখিয়ে নিয়েছিল।
এই অবস্থায়ই একরাতে শুরু হল সুনয়নার নিদারুণ শ্বাসকষ্ট। বৃন্দা ও নিরাময়কে বলতেই যুগপৎ আক্রমণের মুখোমুখি হতে হল এমন পরিস্থিতিতেও। শেষ রাতেই মরমীকে বেরোতে হল মাকে নিয়ে। একা একাই। নিরাময় তখন অতল ঘুমে। ডাকবার ইচ্ছে ও সাহস কোনওটাই হল না মরমীর।
অ্যাম্বুলেন্স পাওয়া যাচ্ছিল না, স্বপ্নিল অনেক কষ্টে ব্যবস্থা করল। অগ্নিকে আর ফোন করেনি সে, সবকিছুতে অগ্নির সাহায্য নেওয়ার ইচ্ছেও তার হল না।
তবে এক অদ্ভুত পরিস্থিতিতে পড়তে হল মরমীকে। হাসপাতালের বাইরে অনেক রোগী, মুমূর্ষু রোগীও রয়েছে। অক্সিজেনের অভাব, বেডের অভাব, দ্রুতগতিতে সংক্রমণ বাড়ছে, আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ, আগাম প্রস্ত্ততি তো ছিল না! সুতরাং তুমুল বিশৃঙ্খলা। মরমীর চোখের সামনেই এক বছর চল্লিশের কলেজ অধ্যাপক মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ল। জীবনমৃত্যৃ নিয়ে চরম খেলার এমন বীভৎস রূপ আগে কেউ কখনও দেখেছে? দেখলেও তা ইতিহাসে। মরমীর এই পয়তাল্লিশ বছরের জীবনে কেউ দেখে নি। বাধ্য হয়েই অগ্নিকে ফোন করতেই হল।
অগ্নির হাসপাতালেও তথৈবচ। সুতরাং ছুটোছুটি করার আপাতত কোনও মানে নেই। সকালের দিকে সিটের একটা ব্যবস্থা হল অগ্নির হাসপাতালে। ততক্ষণে মা-র শ্বাসকষ্ট চরম। ভোররাতে মা নিঃশব্দে চলে গেল। মরমীকে ভেতরে যেতে দেওয়া হয় নি। সে বাইরে বসেছিল। অনিদ্রা দুশ্চিন্তায় সকালের দিকে একটু ঢুলুনি এসেছিল, সেইসময়ে খুব মৃদু পুরুষকণ্ঠ কানে গেল – মরমী!
চোখ মেলে দেখল – অগ্নি।
দাঁড়িয়ে উঠে মরমী বলে – কেমন আছে মা? অক্সিজেন লাগানো হয়েছে? কী যে মারণরোগ, কাছেও যেতে নেই। একা একা মা…
অগ্নির মুখচোখ দেখে ঘাবড়ে গিয়ে মরমী চুপ করে অগ্নিকেই নিরীক্ষণ করছে।
অগ্নিকে নিশ্চুপ দেখে মরমী অস্থির হয়ে বলছে – অগ্নি?
অগ্নি বলছে – মা নেই।
মরমী জ্ঞান হারাল।
১২
কথাকলির প্রতিবেশী বিয়াল্লিশ বছরের তরতাজা সোহিনীকে কেড়ে নিল কোবিড। ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ নিয়েছিল মাত্র দিন কুড়ি আগে। ভ্যাকসিন নিতে গিয়েও অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সে, তারপর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট এর আক্রমণ তারপর মৃত্যু। এমনও হচ্ছে গ্রীষ্মের তীব্র গরম, দীর্ঘ লাইন… ভ্যাকসিনের প্রতিক্রিয়ায় অনেকের জ্বর আসে, তারপর কাসি তারপর রিপোর্ট করোনা পজিটিভ..
কথাকলিদের বৃদ্ধাশ্রমেও একজন এভাবে পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেল।
এখন এমন একটি অবস্থা.. মনে হচ্ছে বেঁচে আছি এই ব্যাপারটা প্রতি মুহুর্তে অনুভব করার মত ব্যাপার। মানুষ বাঁচার ক্ষেত্রে আনমনা হয়েই বাঁচে। কিন্তু এখন জীবন বলছে এখনও তোমার জন্যে আমি আছি আর যে কোনও মুহূর্তে অলবিদা বলতে পারি, তৈরি থেকো। এরকম হয়ে যায় যখন বেঁচে থাকা তখন তাৎক্ষণিকতার তাৎপর্য বেশ ভালোই উপলব্ধিতে আসে।
অপ্রতুল অক্সিজেনের যোগান হল অবশেষে। রোগীরা হিমশিম খাওয়ার পর, কিছু মানুষ জীবনের মায়া ছেড়ে দেবার পর।
দিল্লিতে অতীশ ডাইরি লেখে – “গ্রীষ্ম গড়িয়ে বর্ষা.. শরৎ হেমন্তের পর দ্বিতীয় ঢেউয়ের ভয়ংকর ডেল্টা ভ্যারিয়েন্ট কিছুটা ঝিমিয়ে পড়ল। অতিমারির অনিশ্চয়তা এতখানি যে বিজ্ঞান বলতে পারল না কতদিন এই করোনা ভাইরাসের স্থায়িত্ব। অবশ্য কখনই বিজ্ঞান জ্যোতিষবিদ্যা নয়, পরীক্ষিত সত্যের ওপরেই তা নির্ভরশীল।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!