সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায় (পর্ব – ১০)

গ্যাস চেম্বার

পর্ব – ১০

৯ই সেপ্টেম্বর
রণজয়দার কাছেই থেকে গেলাম । আবিরাকে একটা ফোন করে জানাতে ও প্রথমে অবিশ্বাসের সঙ্গে আমার কথাটা শুনল । পরে একদিন এসে রণজয়দার ফ্ল্যাটটা নিজের চোখে দেখে, কফি খেয়ে গেল আমার সঙ্গে। কথায় কথায় বুঝতে পারলাম আবিরা চাইছে রাজুর সঙ্গে নতুন করে সংসার করতে । রাজু। নিজের বউকে ডিভাের্স দিলেই ও ব্যাপারটা নিয়ে এগােতে চায়। আমি জিজ্ঞেস করলাম যে রাজুর মেয়েটার কী হবে? আবিরা এড়িয়ে গিয়ে বলল, সুলগ্না। তােকে নতুন করে শুরু করতে হবে। মুশকিলের ব্যাপার হল আমি শুরু, শেষ এসব কিছু ভাবতেই পারি না আর । আমার ঘুমােবার আগে মাথার ওপর একটা ছাদ দরকার । সেটা শৌনকের বাড়িতে ফিরে গিয়ে পাওয়া সম্ভব নয়। নিজের বাড়িতেও নয় বাবার আর প্রতিমার এখনকার রিলেশনের জন্য । লেডিজ হােস্টেলে থাকতে গেলে যে টাকাটা খরচ হবে প্রতিমাসে, এখনকার রােজগার থেকে সেটা শেয়ার করা মুশকিল। আবিরার কাছে থাকতে গেলে প্রায় প্রতি রাত্রে রাজু আর আবিরার ভালােবাসাবাসির মধ্যে একটা বাধা হয়েই থাকতে হবে । তাহলে আমার অপশন কী রইল? রণজয়দা ছাড়া?
আমি সত্যযুগের মতাে কিছু আশা করছিলাম না কিন্তু আমাকে অবাক করেই রণজয়দা আমাকে সামান্য ডিস্টার্বও করল না। একদিনও রাত্রে আমার ঘরে ঢুকে এল না । আমি আমার মতাে থাকতাম, কোনাে কমিটমেন্ট না করে । রণজয়দা অনেকটা স্পেস দিত আমায়। একদিন একসঙ্গে বেরিয়েছি। রণজয়দা বলল জানাে রংগুলাে পাল্টে যায় জীবনে । যখন অল্প বয়স ছিল, ভালাে লাগত গােলাপি । গােলাপিটা একসম খয়েরি হল, খয়েরি থেকে লাল, তারপর এখন আবার নীলের দিকে ঝোঁক । জীবনের রংগুলােও পাল্টে যায় দেখবে । রং পাল্টানাের ব্যাপারটা বুঝলাম কয়েকটা দিন যেতে । ভেবেছিলাম আবার ঢি ঢি পড়ে যাবে হােয়াটসঅ্যাপে, ফেসবুকে, মােবাইলের মেসেজে । ছিছিক্কার নিন্দেমন্দ শুরু করে দেবে সবাই মিলে । কিন্তু আশ্চর্যের বিষয়, রণজয়দার সঙ্গে আমি থাকি, বিষয়টা চাউর হয়ে যেতে কেমন যেন চুপ করে গেল সবাই। অ্যাকাডেমিতে নাটক দেখতে গিয়ে, শপিংমলে বাজার করতে গিয়ে দেখা হয়ে যেতে থাকল চেনাজানা লােকের সঙ্গে। কোথাও বিরাট কোনাে প্রতিক্রিয়ার মুখােমুখি হতে হল না । কী করে এমনটা হচ্ছে, রণজয়দাকে জিজ্ঞেস করলাম । রণজয়দা বলল, বুঝতে পারছ না? লােকে ভয় পায় ক্ষমতাকে । আমার ছবি খবরের কাগজের পেজ থ্রি’তে ছাপা হয়, টিভির পর্দায় দেখা যায় আমাকে। তুমি আমার সঙ্গে আছ, লােকে মুখােমুখি তােমাকে আর কিছু বলতে পারবে না । ফেসবুকে তােমার নামে কিছু পােস্ট করার আগেও পাঁচবার ভাববে কারণ আমি তাে ইন্টেলেকচুয়াল সার্কিটে কিছু ক্ষমতা ধরি । ওই লােকটা আমার থেকে হতাে কোনাে সুবিধে নিযেছিল কথনাে, বা নেবে।
রণজয়দার প্রভাব-প্রতিপত্তি বা অন্য যে-কোনাে কারণে, এই যে মুখােমুখি আমাকে আর কেউ মার্ডারার, পাগল, পেশেন্ট, বলতে পারবে না বা হুট করে ফেসবুকে পােস্ট করবে না আমার বিষয়ে এটা আমার কাছে অনেক শান্তি নিয়ে এল । আমি রণজয়দাকে ‘আপনি’র বদলে ‘তুমি’ করে বললাম, ভুলে গেছো, তুমি আমায় একটা জানলা দেবে বলেছিলে? -একটুও ভুলিনি, মনে আছে । – কোথায় সেই জানলাটা? রণজয়দা হাসল, অপেক্ষা করাে। সেদিন ডিনারের পর একটা সিগারেট ধরিয়ে রণজয়দা আমাকে ওর ঘরে ডেকে অনেক গল্প করল । গল্প করতে করতে ‘তুমি’ থেকে ‘তুই’ তে চলে গেল কথার তােড়ে, জানিস আমার ছােটবেলার অনেকটা সময় আসামে কেটেছে। নগাঁও বলে একটা প্রত্যন্ত শহরে। সেখানে বিশেষ কিছু দেখার নেই, শুধু বৃষ্টির পর ঘাসগুলাে অসম্ভব সবুজ হয়ে ওঠে । দেশভাগের পর আমাদের ফ্যামিলি আসামেই শিফট করেছিল, বলা ভালাে আসতে বাধ্য হয়েছিল । সেই নগাঁওতেই আমার প্রাইমারি, সেকেন্ডারি সব । ওখানে আমার এক দূরসম্পর্কের কাকার মেয়ে ছিল রুম্পি। ওরাও নগাঁওতেই থাকত । রুম্পির সঙ্গে আমার ছােটবেলায় সামান্য ভাব-ভালােবাসা হয়েছিল, বুঝলি ? মানে ওই একটু জড়িয়ে ধরা, একটা চুমু খেয়ে সরে আসা ওইরকম । রুম্পিই আমার জীবনে প্রথম মেযের স্পর্শ, বলতে পারিস। বিরাট কিছু নয়, ঘন কিছু নয়, কিন্তু ওই প্রথম কোনাে মেয়েকে ছোঁয়া। তার অনেক পরে, তখন আমার বিয়েও হয়ে গেছে, আমি একবার আসাম গেছি, প্রোগ্রাম করতে, নগাঁওতে গিয়ে রুম্পির খোঁজ করলাম। শুনলাম, রুম্পি ওখানকারই একটা কারখানার কেয়ারটেকারকে বিয়ে করেছে । ছেলেমেযেও হযেছে । আমি রুম্পির সঙ্গে দেখা করব বলে নগাঁও চষে ফেললাম প্রায়। তখনই খবর পেলাম আমি ওর খোঁজ করছি শুনে রুম্পি নাকি ঘরে
তালা দিয়ে কোথাও চলে গেছে।আমি বিখ্যাত হয়েছি, আসামে আসছি প্রােগ্রাম করতে, এখন ওর খোঁজ করছি মানে হয়তাে ওকে ছােট করব, অপমান করব । কিন্তু আমি ওকে অপমান করার জন্য খুঁজিনি রে । ওকে মনে রেখেছি, আজও একটু আধটু মিস করি এটা জানানাের জন্য খুঁজছিলাম । – তুমি আমাকে এই গল্পটা কেন বললে রণজয়দা? – জাস্ট এটা বােঝাতে যে পারসেপশনের ডিফারেন্স হয়ে যায় । তাের বাবার সঙ্গে তাের একটা পারসেপশনের ডিফারেন্স হয়ে গেছে । তুই যা বলছিলি সেটা মেনে নিয়েই বলছি, মানুষটার হয়তাে প্রতিমার সঙ্গে কোনাে ঘনিষ্ঠতা হয়ে থাকতে পারে, তাই বলে তুই একেবারে তার জীবন থেকে সরে যাবি, কোনাে যােগাযােগ রাখবি না, এটা কোনাে কাজের কথা হল? চল একদিন । আমি যাচ্ছি তাের সঙ্গে ।। রণজয়দাকে আমি দুঃখ করেই বাবার গল্প করেছিলাম একদিন । সেই মুহুর্তে কিছু বলেনি কিন্তু কথায় কথায় রণজয়দাই আমাকে সেই জোরটা দিল যেটা ছাড়া আমি আর আমাদের ছােট্ট শহরটায় যেতে পারতাম না । গিয়ে দেখলাম চারপাশ অনেক বদলে গেছে। বাড়িগুলাে ভেঙে আখাম্বা সব ফ্ল্যাট উঠেছে । যেন কলকাতারই একটা বিচ্ছিরি এক্সটেনশন ।
বাবা আমাকে দেখে অবাক হল, প্রতিমা আরাে । কিন্তু রণজয়দা গাযেই মাথল না কিছু । ঘরে ঢুকেই রণজয়দা, প্রতিমাকে, ‘এই আপনি চায়ের সঙ্গে একটু মুড়ি মেখে দেবেন তাে বলার মধ্যে দিয়ে পরিবেশটা এমন করে দিল যে কিছুক্ষণ পর প্রতিমা না চাইলেও কাজে জুতে গেল । রণজয়দা বাবার স্টাডিতে গিয়ে বাবার আঁকা পুরনাে সব ছবিগুলাে দেখতে থাকল । দেখতে দেখতে বলে উঠল, আপনার ছবিগুলাে নিয়ে তাে একটা এক্সিবিশন করতে হবে। – এক্সিবিশনের স্ট্যান্ডার্ডে হয়েছে? বাবা আনন্দ আর উৎকণ্ঠা মেশানাে গলায় জিজ্ঞাসা করল । – সে বিচার তাে মানুষ করবে । রণজয়দা হাসল ।
বাবা আমার কাছে জানতে চাইল না রণজযদার সাথে আমার রিলেশন । নিজের জীবনে প্রতিমার উপস্থিতির কারণেই কি এরকম চুপ করে গেল বাবা? কে উত্তর দেবে?
প্রতিমা অবশ্য নীচের ঘরেই শুয়েছিল । আমি বাবার ঘরে ঢুকেও এমন কোনাে ডেফিনিট প্রমাণ পেলাম না যাতে দাবি করা যায় অন্য দিনগুলাে প্রতিমা এখানেই শােয়। অবশ্য আমি ফেলুদা বা ব্যোমকেশ নই। আর তার চেয়েও বড় কথা, শুলেই বা কী? রাতে খাওয়াদাওয়ার পর রণজয়দাকে জিজ্ঞেস করলাম, বাবাকে যে তুমি বড় বড় কথা বললে বাবার ছবিগুলাে কি সত্যিই দারুণ কিছু? – দুর্দান্ত কিছু নয়। কিন্তু ভালাে তাে । একটা ছােটখাটো এক্সিবিশন করতে পারলে ক্ষতি কী?
রণজয়দার উদ্যোগেই বাবার ছবির এক্সিবিশন হল । সেদিন বাবার চোখ মুখ যেন আলাে আলাে। জীবনে যে এতটা সম্মান, এতটা স্বীকৃতি আসতে পারে, প্রায় অচেনা কারাে হাত ধরে, বাবা আশা করতে পারেনি। গ্যালারির এ মাথা থেকে ও মাথা বাবা পায়চারি করে বেড়াচ্ছিল সিংহের মতাে। একটা ছবিও বিক্রি হল কি না সন্দেহ, কিংবা একটা রণজয়দারই কোনাে এক বন্ধু কিনল কিন্তু বাবার সেই গর্ব, সেই আনন্দ, আমি কোনােদিন ভুলতে পারব না। যেন একটা ভাঙা নৌকো আবার ভেসে উঠল । নৌকো ভাসল অন্য দিক থেকেও । হঠাৎ এমন একজনের ফোন পেলাম যার ফোন আশা করিনি। তিনি শৌনকের মা । ভেবেছিলাম আমাকে বােধহয় তুমুল গালাগালি করবেন। কিন্তু উনি খুব শান্ত গলায় বললেন, শুনছি তুমি একজনের সঙ্গে সেটল করেছ তাহলে এবার আমার ছেলেকে মিউচুয়ালি ডিভাের্সটা দিয়ে দাও। আমরা ক্ষতিপূরণের কথা তুলব না । ভাবতে থাকলাম কোনাে গালাগাল নেই, দোষারােপ নেই, এত ভালাে! রণজয়দাকে বললাম কথাটা । ও মুচকি হাসল । পরে জানতে পারলাম এর পিছনে অ্যান্টিবায়ােটিক কাজ করেছে। রণজ্যদাই একদিন শৌনকের সঙ্গে দেখা করে জিজ্ঞেস করেছিল যে ও কী করতে চাইছে। শৌনক চুপ করে থাকায় রণজয়দা বলেছিল, যাকে নিয়ে এত খারাপ স্মৃতি, ছেড়ে দে তাকে।
শৌনক জিজ্ঞেস করেছিল, তােমার সুবিধে হয় তাতে? রণজ্যদা উত্তরে বলেছিল, ধরে নে আমার সুবিধে হয । তাের কী তাতে? তুই যা ফেলে দিচ্ছিস অন্য কেউ তা কুড়িয়েও নিতে পারবে না? শুনতে শুনতে রনজয়দার শার্টের কলার চেপে আমি বললাম, তােমাকে এত ভাল হতে কে বলেছে? বলতে বলতে কেঁদে ফেললাম।
শৌনকের সঙ্গে আমার ডিভাের্সটা শান্তিতেই হয়ে গেল। জীবনের যে চাকাটা নেমে গিয়েছিল আবার উঠে এল সেটা। আর অশান্তি নেই, কুৎসা নেই। আমি আগের স্কুলটা ছেড়ে একটা বড় স্কুলে জযেন করলাম । মাঝে মাঝে রণজয়দাকে জিজ্ঞেস করতাম, আমি যে এই তােমার বাড়িতে থাকছি, খাচ্ছি কিন্তু এক পয়সা দিচ্ছি না, তােমার অসুবিধে হচ্ছে না? | রণজয়দা জবাব দিত না আর দিলে বলত, মােষের পিঠে বসে একটা মাছিও একবার এরকম একটা প্রশ্ন করেছিল। আমি হেসে ফেলতাম। বুঝতে পারতাম, রণজয়দার একটা স্টেডি সাের্স অফ ইনকাম আছে। তাই অসুবিধে হয় না। ধীরে ধীরে আমার ভিতরে কোথাও একটা ইচ্ছে জাগ্রত হতে শুরু করল । সেই ইচ্ছেটা কি নেহাতই শরীরী নাকি থাকতে থাকতে আমি রণজয়দাকে ভালােবাসতে শুরু করেছিলাম? জানি না। রণজয়দা এত ক্যাজুয়াল, আর কুল ছিল যে আলাদা করে কিছু বলতই না । কিন্তু বুঝতে পারতাম আবার আমার পছন্দের রং পাল্টে যাচ্ছে । একদিন রাত্রে আমি ওর কাছে গিয়ে বসলাম । রণজয়দা কথা বলতে বলতে বলল, ঘুমােবি না? আমি রণজয়দাকে জড়িয়ে ধরে বললাম, আজ তােমার সঙ্গেই ঘুমবাে। রণজয়দা হেসে উঠল, ঘুমাে তাহলে। – যদি না ঘুমােই? – আমার কোনাে অসুবিধে নেই । কিন্তু তাের অসুবিধে আছে কি না বল । ঘরের ভিতর তাে তাের অসুবিধে হয় ।
রণজয়দা যে কেন আমাকে মনে করিয়ে দিল ঘর বাঁধার ক্ষেত্রে আমার সেই ভয়টার কথা। আমি বললাম, জানলাটা ? – দেব তাে । বৃষ্টিটা নামুক। – বৃষ্টির সঙ্গে জানলার কী সম্পর্ক? – দেখতেই পাবি।
বৃষ্টি একটু আগেই এল, আর বৃষ্টি শুরু হতেই রণজ্যদা আমার সামনে দুটো টিকিট মেলে ধরল ।
আমি মজা করে বললাম, কোথায় যাচ্ছি আমরা, হানিমুনে? – আমরা হানিমুন করতে যাচ্ছি না। বম্বে যাচ্ছি। আর বম্বে থেকে একটা ট্রেনে করে যাব আবার ফিরে আসব । – বম্বে থেকে ট্রেনে কোথায়? – পুরাে পশ্চিমঘাট ধরে একটা জার্নি । – কেরালায়? আমি জিজ্ঞেস করলাম । – না, কেরালা পর্যন্ত নয় । কেরালার মুখটা অবধি গিয়ে আবার ফিরে আসব ।
বম্বে গিযে রণজয়দা ইচ্ছে করে এমন একটা ঘর ভাড়া নিল যেটা হাফ ধর্মশালা । বুঝতে পারছিলাম, ও আমার সঙ্গে না থেকে, আমাকে আরাে অনেকের সঙ্গে রেখে আমার ভয়টা কাটাতে চাইছে। কিন্তু সেটা যে এতটা আনন্দ, এতটা শান্তিতে বদলে যেতে পারে তা ওই কোন রেলে না চাপলে বিশ্বাস করতে পারতাম না। সে এক অদ্ভুত জার্নি । ট্রেনের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে মনে হয় ঘাসগুলাে হিরের মতাে জ্বলজ্বল করছে । মাঝে মাঝে বৃষ্টি হলে একটা নতুন সমুদ্র যেন তৈরি হয় ঘাসের ভেতর । পাহাড়ের গায়ে নানান শেডের সবুজ, আমি জানলা দিয়ে তাকিয়েই রইলাম বাইরে । তার মধ্যে একবার সূর্য উঠল। মনে হল, যদি ট্রেনটা বম্বে থেকে পশ্চিমাঞ্চল ধরে কেরালার মুখ অবধি না গিয়ে পিছােতে থাকত, তাহলে সূর্যটা উঠতেই থাকত । আর সূর্যের ওঠাটা আমরা দেখতেই থাকতাম। কিন্তু ট্রেনটা এগােতেই থাকল । কত রকম টানেলের ভেতর ঢুকল, টানেলের ওপরে উঠল । দেখছিলাম পাহাড়ের ওপর থেকে নেমে কত কত ছােট নদী নিজেদের মধ্যে কাটাকুটি খেলতে খেলতে এগিয়ে চলেছে, আবার কোনাে কোনাে জায়গায় ঝর্ণা হয়ে ফেটে পড়ছে। কখনাে বা একটা রুদ্ধ জলাশয় হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আমি যেদিকে তাকাচ্ছি, দেখছি, ঘন নারকেল গাছের সারি, সাদায় সবুজে, নীলে একটা অদ্ভুত রং এর খেলা। বুঝতে পারছিলাম জীবনে কোনাে দিন আর একটাই মাত্র ভালবাসার রং’কে আলাদা করতে পারব না। ওই যে আরেকটু দূর, ওখানেই যােগ ফলস; আরব সাগর শুরু হবে। আর এই তাে আমি গােয়ার কাছে । একসঙ্গে এতাে সুন্দর কোনােদিন দেখিনি। ওই জানলাটা আমার জীবনের সমস্ত কষ্টের ইতিহাস একটা ন্যাতা দিয়ে মুছে দিয়ে গেল। স্পঞ্জ যেরকম জলের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে থাকে, আমি সেরকম ওই দৃশ্যের জন্য তৃষ্ণার্ত হয়ে চেয়ে রইলাম । আর ওই দৃশ্য আমার ভেতরে ঢুকতে লাগল যতক্ষণ না স্পঞ্জটা একদম টইটম্বুর হযে উঠল ।
এখন আমি পূর্ণ । আর যা পূর্ণ তা এত কম হবে কেন? ওই জানলাটা, পাহাড়, নদী, ঘাসজমির সঙ্গে এমন এক আত্মীয়তার বন্ধনে বেঁধে দিয়েছে আমায় যে পৃথিবীর কোনাে ঘরকে আমি আর কক্ষনাে ভয় পাবাে না । ফিরতি পথে ট্রেনের মধ্যেই আমি রণজয়দাকে জড়িয়ে ধরলাম। ঠোঁটে ঠোঁট রেখে চুমু খেয়ে বললাম, আমাকে এবার একটা ঘরে নিয়ে চলাে ।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।