আন্তর্জাতিক || পাক্ষিক পত্রপুট || এ অনিন্দিতা সেন

মেরুদন্ড
পর্ব (১)
দিব্যি ছিল নরেন। রসে বশে। দশটা পাঁচটা অফিস, সন্ধ্যেয় বাড়ি ফিরে চা-মুড়ি খেয়ে হারুর চায়ের ঠেকে মুখে মারিতং জগত। রাত দশটা নাগাদ আবার বাড়ি মুখো, চাট্টি ভাত গিলে নিঃসাড়ে মশারির তলায়। শিশু কন্যা আর বুড়ো বাবার যাবতীয় ঠেকা যেন তার বউ বাসবীর। তবে হ্যাঁ, মেয়ে ঝিমলি কে কথা দিয়েছে একটা কথা বলা পুতুল সে এনে দেবে, তা সে যত দামই হোক্ না কেন? মেয়ের অনেক দিনের বায়না!
এইভাবেই কেটে যাচ্ছিল বেশ। মাসখানেক আগে, বাজার করে লালুর মাছের দোকান থেকে ফেরার সময় ঘাড়ের কাছে খট করে একটা শব্দ। ওহ্ বাবা, তারপর থেকেই ঘাড় পিঠ এক্কেবারে সোজা। দেখল, চারপাশটা বেশ অন্যরকম ঠেকছে। কেমন যেন, বীরের মত।
– বল বীর বল উন্নত মম শির…শির নেহারি আমারি…নত শির ওই… শিখর হিমাদ্রির…বল বীর…! ছোটবেলায় পড়া কবিতার অংশটুকু মনে মনে বেশ আউড়ে নিল খানিক…! আহঃ কি প্রশান্তি!
জোরে জোরে আওড়াতে আওড়াতে বাড়ির পথে…. লোকজন ঘুরে দেখছে…” পাগলে গেল না কি রে লোকটা?”
বাড়ি ফিরে খেয়ে দেয়ে স্টেশন, ৯.০৫ এর বনগাঁ লোকাল। গিয়ে দ্যাখে, শিয়ালদা লাইনে অবরোধ। অতএব ট্রেন নড়বেনা। যাচ্চলে, কি করে এখন? এদিকে ভীড়ে ঠাসা কামরা। নিত্যযাত্রীর কচকচানি। ভাদ্রের প্যাচপেচে গরম। তায় অসুস্থ শিশু কোলে মা। মেজাজটা কেমন তিরীক্ষে হয়ে গেল। প্ল্যাটফর্ম এর একটা নড়বড়ে রেলিং খুলে নিয়ে এলোপাতাড়ি ঘা কতক। বরাবরই নরেনের পেটানো স্বাস্থ্য, ছেলে বয়েস থেকে চিরকাল মুগুর ভেজেছে। সহজে কাবু করা যায়না তাকে। কাজেই মারধোর নেহাত মন্দ হল না। ঘটনার আকস্মিকতায় আন্দোলনকারী ছেলে ছোকরার দল রেল লাইন ছেড়ে পগার পাড়। বেশ কেমন একটা ফিলিং হচ্ছে, গ্রেট… গ্রেট…!
পর্ব(২)
ধীরেধীরে নরেন কিরকম পালটে যেতে লাগল। সব জায়গায় প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ এর নেশায় জীবনটা পলে পলে বদলে যাচ্ছে, বুঝতে অসুবিধে নেই। ট্রেনের কামরায় সিটে বসা ইয়াং ছেলে দেখলেই ব্যায়ামবীর নরেন কলার ধরে তুলে দেয়, বদলে খোঁড়া কানা অথবা বৃদ্ধ মানুষ ধরে ধরে বসিয়ে দেওয়া অথবা মহিলাদের পেছনে উশখুশানি ছেলে ছোকরার ঘাড়ে রদ্দা মেরে পরের স্টেশনে ঘাড় ধরে নামিয়ে দেয়া চলতেই থাকল। নাহ্ এইভাবে ঠিক যেন জমছে না ব্যাপারটা। মানুষের ভাল করার নেশা পেয়ে বসলে যা হয় আর কি! চোখে মুখে উৎকন্ঠার ছাপ। বউ রীতিমত কান্নাকাটি শুরু করে আর কি!
– এ কি হল মানুষটার, নাওয়া খাওয়া ভুলে যেখানে পারছে মারপিট করে বেড়াচ্ছে!
– এই তো সেদিন সন্ধ্যেবেলায়, ছেলেদের খেলার মাঠের ধারে পুরোনো শিবমন্দিরের পেছনে একটা হকিস্টিক নিয়ে গিয়ে হাত কাটা কালুর মদ গাঁজার ঠেকে কি ধুম মাচালো, বাপরে বাপ! একেবারে হাড়হিম অবস্থা।
– ওরা নাকি ইভটিজিং করে, চুল্লু খায়, সমাজের জঞ্জাল।
– তা করুক না বাপু, যা খুশি, তাতে কার বাপের কি গেল, এল? নাহ্, সে বললে আর শুনছে কে? তাই বলে হাত কাটা কালুর ল্যাজে পা! এত্ত সাহস?
– পাশের বাড়ির মিন্টির মা’র কাছে শুনেছে যে ওদের দলে নাকি লোকাল এম.এল.এর বিশ্ব বখাটে ছেলে বিশেও আছে।
তা বিশে-কালুর কেস গিয়ে উঠল থানায়। এম.এল.এর ছেলে বলে কথা, ইয়ার্কি? সেই থেকে নরেন ফেরার। বিশে কালুর মনে যে ভয় ঢোকেনি তা, নয়! আগের মত আর বুক ঠুকে ঘুরে বেড়াতে পারছে কই!
পর্ব(৩)
এলাকার সকলের টনক নড়ল যখন বিশে-কালুর আধপোড়া দেহ ভুস করে ভেসে উঠল মাসি পুকুরের পচা পাঁকে। ব্যাস আর যায় কোথায়? পুলিশ যখন তখন টহল দিয়ে যাচ্ছে নরেনের খোঁজে। হামলে পড়ছে মিডিয়ার লোক। সমাজের চোখে নরেন এখন হিরো। পাড়ার মেয়েরা শিবমন্দিরে মানসিক রাখছে নরেনের নামে! এদিকে নরেন ফেরার। মাস খানেক পরে টিভির নিউজে একটা খবর দেখে চমকে উঠল বাসবী।
– “ব্রেকিং নিউজ…..বনগাঁ গামী রাত আটটা পন্চাশের শেয়ালদা লোকালে এক অজ্ঞাত কুলশীল ব্যাক্তির গুলিবিদ্ধ মৃতদেহ। দেহটির হাতখানেক দূরে পাওয়া গেছে একটি টকিং ডল। এই কথা বলা পুতুলের সংগে মৃতদেহের কি সম্পর্ক, তা খতিয়ে দেখছে পুলিশ”।
শেষ