ছোটগল্পে আনোয়ার রশীদ সাগর

।। কবি ।।

ছ্যাঁচড়া ছুড়ি ছোট ছোট ছেনালিতে ছুঁই ছুঁই করে আকাশ ছুঁয়েছে।
পটলের মুখে এ কথা শুনে মল্লিকা ঘাড় কাইত করে একঝলক তাকিয়ে, নিতম্ব দোলাতে দোলাতে চলে যায়। অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে কবি অসিত।
যাকে সবাই আত্মভোলা কবি বলেই ডাকে।
অসিত অনুপ্রাসের ব্যবহার নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভাবুক হয়ে গেছে। সেই দুপুরে দুমুঠো ভাত খেয়ে বেরিয়েছে শব্দের খোঁজে।
এপাড়া-ওপাড়া ঘুরে ঘুরে, যশোর রেল স্টেশনের দক্ষিণ-পশ্চিম দিকে ইন্ডিয়ান বাজার বা ব্লাকের বাজারের পাশ দিয়ে হাঁটছিল। এ বাজারে ইন্ডিয়া থেকে নিয়ে আসা কাপড়সহ বিভিন্ন ধরনের জিনিসপত্র বিক্রি হয়। সব সময়ই মনে হয় এখানে মেলা হচ্ছে।
গরীব মহিলারা এখানে রঙবেরঙের পোষাক পরে বেচাকেনা করে।
কবি অসিত সুইপার পটলের কাছ থেকে অশ্লীল কথাগুলোর মধ্যে অনুপ্রাস খুঁজে পেয়ে খোশমেজাজে হাঁটে। ধীরে ধীরে পটলের সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। ততক্ষণও পটলের চোখ মল্লিকার পিঠের উপর আড়কাটানো লালব্লাউজের দিকেই আছাড় খাচ্ছিল।
কবি অসিতকে সামনে দেখে সে লজ্জা পেয়ে যায়,মাস্টারদা আপনি?
মাস্টারদা শব্দটা শুনে অসিত আরো পুলকিত হয়। মনে পড়ে,বিপ্লবী সূর্য সেনের কথা।
কেন সে বোকার মত ওই ভদ্রলোকদের মধ্যে সাহিত্যচর্চা করতে যায়,কেন কবিতা পাঠ আর আলোচনা করে সময় নষ্ট করে? ইশ ঘুরে বেড়ানোই ভালো!প্রকৃতিতেই কবিতার যত ছন্দ উড়ে -উড়ে, ঘুরে-ঘুরে,দূরে-দূরে আড়ালে আবডালে থাকে। খুশিতে ডগমগো হয় কবি অসিত।
এ ধরনের হাজার রকমের ভাবনা সে নিজের মনের কাছে খোঁজে। তারপর পটলের দিকে অপলক চেয়ে থাকে।
পটল এসএসসি পর্যন্ত লেখাপড়াও করেছে। সঙ্গীতক্লাবে প্রায়ই সন্ধ্যায় পৌঁছিয়ে যায়, ভালো ডুগি-তবলাও বাজায়।
কর্মহীন জীবনকে কর্মময় করতে গিয়ে,বাবার পেশায় বেছে নিয়েছে। ভদ্র সুইপার হিসাবে শহরে তার বেশ খ্যাতি আছে। স্কুল বা কলেজগুলোর ল্যাট্রিন পরিস্কার ও ঝাড়ু দেওয়াসহ তার কিছু নিয়মিত কাজও আছে।
আবার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে অনুষ্ঠান হলে, ডুগি-তবলা বাজানোর অফারটাও মাঝে মাঝে পায়।
কবি অসিতের চোখের দিকে তাকিয়ে,পটল বেশ ভয় পেয়ে যায়,মল্লিকাকে বাজে কথা বলার কারণে, মাস্টারদা কী এভাবে আড়চোখে চেয়ে আছে?
পরক্ষণেই কবি অসিত পটলকে বুকের মধ্যে টেনে নেয়। পটল তো সরে যেতে পারলে বাঁচে।
তবে বুকে বুক ঠেকলে মানুষ বুঝতে পারে ভালোবাসা কেমন হয়। পটলও অসিতের বুকের সাথে বুক রাখার সাথে সাথে বুঝতে পারে, মাস্টারদা তাকে আদরই করছে।
সে গর্বে গর্বিত হয়, অসিতকে দু’হাতে জড়িয়ে ধরে প্রায় কেঁদে ফেলে,চোখ ছলছল করে, আমি সুইপার দাদা!-আমাকে তো, কেউ বুকের মধ্যে নেয় না?
অসিত পিঠে ছোট ছোট আদরের ধাবা দেয়। আঙ্গুলগুলো পটলের পিঠে খেলা করে,মৃদু নেড়ে দিয়ে, ছেড়ে দিয়ে মুখের দিকে চেয়ে থাকে। তারপর হাসে শুধু হাসে,তুই আমার সাথে রোজ বিকেলে ঘুরবি।
পটল ঘাড় নেড়ে হা সূচক সম্মতি দিয়ে কয়েকবার বলে,জ্বী জ্বী।
কবি অসিত ভাবতে থাকে। ভাবতে ভাবতে ভাবুক হয়ে যায়,আচ্ছা তোর ওই মল্লিকা ওভাবে নেচে-নেচে, চেয়ে-চেয়ে, অভিমান করে চলে গেল ক্যান?
পটল কোনো জুতসই জবাব দিতে পারে না।
আমতা আমতা করে বলে,ও না বড় দেবী সেজেছে দাদা। পাড়ার সব পুরুষের মনের রাণী গো দাদা!- আমার সেই মনের মল্লিকাকে ওর মধ্যে আর খুঁজে পায় না।
-তুই ওকে ভালোবাসিস?
-বাসতাম দাদা। ওতো কথা শোনে না,নিজের ইচ্ছে মত চলে।
-ভালোবাসার মানুষ অপবিত্র হয় না।মনের মধ্যে মনে মনে মনজুড়ে থাকে।
কবি অসিতের কথা শুনে মুগ্ধ হয় পটল।
অসিত এক সময় প্রাইভেট পড়াতো।ছাত্রছাত্রী নিয়ে দিন কেটে যেতো। বেশ কিছু টাকাও আয় হতো। কয়েক বছর পড়ানোর পর নবম শ্রেণিতে বাংলা ব্যাকরণ শিখতে আসে চন্দ্রিমা। প্রথমে নাম শুনে মনে মনে মুগ্ধ হয়েছিল অসিত। চন্দ্রিমা ছিল ভূমি অফিসের কানুনগোর মেয়ে। অনেক আয় করতো চন্দ্রিমার বাবা। একেক দিন একেক রকমের পোষাক ও গহণা পরে সেজেগুজে আসতো।
তারপর অসিতের মনের দূর্বলতা প্রকাশ হতে থাকে কবিতার মাধ্যমে। তার সব কবিতায় চন্দ্রিমাকে নিয়ে লেখা।
চন্দ্রিমা হারমোনিয়াম বাজিয়ে ভালো নজরুল সঙ্গীত গাইতো।
অসিতও ভালোভাবে বাংলা ব্যাকরণ শেখাতে ব্যস্ত হয়ে থাকতো। চন্দ্রিমা চাঁদের মত হেসে হেসে অসিতের দিকে চেয়ে চেয়ে সব শিখে নিতো। গ্রাস করতো অসিতের হৃদয়মন।
এক সময় অসিতের খাতায় অনেকগুলো কবিতা জমে যায়।
চন্দ্রিমা তখন সবেমাত্র দশম শ্রেণিতে পড়তে শুরু করেছে। জেলা স্কুলের বাংলা ব্যাকরণের ভালো ছাত্রী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে যায় চন্দ্রিমাও। স্যাররা বেশ গুরুত্ব দিতে থাকে চন্দ্রিমাকে। স্কুলের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা বা কবিতা আবৃত্তিতেও চন্দ্রিমার তুলনা হয় না।
অসিতের কবিতার খাতাটা এক সময় চন্দ্রিমা জোর করেই নিয়ে নেয় এবং স্থানীয় প্রেস থেকে ছাপিয়ে দেয়। এ বইটিই অসিতের প্রথম কবিতার বই। প্রকাশক হিসেবে চন্দ্রিমার নাম থেকে যায় বইটিতে। যশোর শহরে এক নামে কবি অসিতের পরিচয় হয়ে যায়। যে কোনো অনুষ্ঠানে সে কবিতা পাঠ করে ও দাওয়াত পেতে থাকে।
এরই মধ্যে চন্দ্রিমার বাবা বদলী হয়ে চলে যায় নেত্রকোনায়। চন্দ্রিমা হেসে হেসে, আবার চোখ মুছতে মুছতে বিদায় নেয় অসিতের প্রাইভেটরুম থেকে।
অসিত হয়ে যায় বিরহ ও দ্রোহের কবি।
প্রাইভেট পড়ানোর সময় অসম্প্রদায়িক কর্মকাণ্ডের জন্য সে মাস্টারদা খেতাবটাও পেয়ে গিয়েছিল সনাতন বাবুদের কাছ থেকে।
চন্দ্রিমা বাবার সাথে নেত্রকোনায় চলে গেলে, অভিমানে মনের ক্ষোভে প্রাইভেট পড়ানোই ছেড়ে দেয় অসিত। ঘুরে বেড়ায়,লিখতে থাকে নতুন নতুন কবিতা,পাঠায় বিভিন্ন পত্রিকা অফিসে।
রাত দুপুর পর্যন্ত স্থানীয় একটি পত্রিকার অফিসে কাজও করে। কিন্তু মাঝে মাঝে ভুলে যায় তার দায়িত্বটা। তাই তাকে পত্রিকা অফিসের কলিগরা আত্মভোলা কবিও বলতে থাকে।
মল্লিকা যখন নিতম্ব দুলিয়ে হেলেদুলে যাচ্ছিল তখন কবি অসিত অনুপ্রাসের ব্যবহার নিয়ে ব্যস্ত ছিল। হঠাৎ ক্যাসেটে বেজে ওঠে ” যারে যাবি যদি যা…”।
দূর থেকে বেশ ক’জন কম বয়সী মেয়ে ক্যাসেট বাজানো লোকটির দোকানের পাশে গিয়ে দাঁড়ায়। ঠেলাঠেলি করে, এটি বসির আহাম্মেদ গাইছেরে?
আর একজন মেয়ে পান মুখে গুজে দিতে দিতে বলে, হ-হ।
কবি অসিতের মনে পড়ে জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার কথা।
মনে মনে রেগে যায়,আরে গানটি গাইছে বসির আহমেদ ঠিক আছে,গানটি লিখলো কে-রে মূর্খের দল? খান আতার কথা ভুলে গেলি! যে সৃষ্টি করলো তাকে কেউ মনে রাখলি না?
অভিমান আর হতাশা নিয়ে মুখ ভার করে, কবি অসিত পটলের হাত ধরে সামনে হাঁটতে থাকে। হাঁটতে হাঁটতে বলে,জানো পটল দুনিয়ায় সবাই কবি। কেউ লিখে প্রকাশ করে, কেউ বলে প্রকাশ করে, আর কেউ ভালোবেসে প্রকাশ করে। কিন্তু যে সৃষ্টি করে সে স্রোষ্টা। জাতির জনক বঙ্গবন্ধু এ দেশটা সৃষ্টি করেছে।
পটল শুধু ঘাড় নেড়ে জ্বী-জ্বী করতে থাকে।
অসিত বলতে থাকে,তুমি মল্লিকাকে ভালোবেসে তোমার অনুভূতি প্রকাশ করেছো। এই যে গালি দেওয়া কথাগুলো বললে,তার মধ্যে কত কবিতার শব্দ আছে জানো?- তোমার এই অভিযোগের মধ্যে আসল প্রেম লুকিয়ে আছে। তাই অন্য কারো সাথে মল্লিকা মিশুক সেটা তুমি চাও না। এটিই আসল কবিতার রসায়ন।
পটল মল্লিকার প্রতি ধীরে ধীরে দূর্বল হয়ে পড়ে, আবেগে আপ্লুত হয়ে বলে,জ্বী দাদা আমি ওকে খুব ভালোবাসি।
কবি অসিত মনে মনে মুগ্ধ হয়ে মল্লিকার মুহূর্তের মধ্যেই কবিতার ছন্দের মত, হেঁটে যাওয়া দেখতে থাকে।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!