“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় অর্ঘ্য রায় চৌধুরী

মৌলভী মুস্তাক মোরাদাবাদী

নিমকহারাম দেউড়ি পার করেই ছিলো নবাববাড়ি। বাইরে থেকে খন্ডহর মনে হলেও, ভেতরে ঢুকলে তাক লেগে যেত।
আসলে নবাব হুমায়ূন জা থেকে নিয়ে ওয়াসিফ অলি মির্জা পর্যন্ত নবাবী শান ও শওকতের যে নুমাইশ ছিলো, তার জিকর অনেকদিন ওবধি মুর্শিদাবাদের প্রতিটি নসল শুনে এসেছে। কিন্তু তারপরের কাহানী ছিলো বুঝতি হুই চিরাগ।
কিন্তু নবাবী খুন, তার তুঘলকি মিজাজ বহুদিন পর্যন্ত বরকরার রেখেছিলো। শাহজাদাদের কবুতরবাজী, কিমতি ইত্বর আর বেহশতি পানের কদর তো অনেকেই দেখেছে। নবাববাড়ির এইসব অনোখা আন্দাজ বাদ দিলেও নিমকহারাম দেউড়ি ছিলো রহস্যময় একটি অঞ্চল।
নবাব বাড়ির পেছনে, যেখানে একদিকে থাকতেন ওস্তাদ রহমৎ খাঁ, তার পরেই টানা খিলানওয়ালা বারান্দা। পেছনেই আমবাগান, ওখানে একটা দরজা ছিলো। সেখান দিয়ে নবাববাড়ির বিরাট আমবাগানে যাওয়ার একটা পথ ছিলো, ওই দরজাটার নাম ছিলো “ছোটি দরওয়াজা”। ওই দরজাটার ঠিক পাশেই তিনটি ঘর নিয়ে একাই থাকতেন মৌলভী মুস্তাক মোরাদাবাদী। কোনোদিন তাঁকে শাদা অথবা কালো পোশাক ছাড়া দেখা যেত না। টকটকে রং, শীর্ণ চেহারা, পাকা দাড়ি, গম্ভীর মুখ, ঠোঁটদুটো পানের রসে লাল, মাথায় টুপী, আর চোখদুটো হলুদ এবং অত্যন্ত তীব্র সেই চোখের দৃষ্টি।
মৌলভী সাহেব শাহজাদাদের আরবীর পাঠ দিতেন।আসল বাড়ি ছিলো মোরাদাবাদ।
মৌলভী মুস্তাক মোরাদাবাদীর একটি ছড়ি ছিলো। অজীব দিখনেওয়ালা সেই ছড়ি দিয়ে মাঝেমাঝে জমিন কে উপর তাঁকে নানারকম আঁক কষতে দেখা যেত। পুছতাছ করলে জবাব মিলতো “ইয়ে মামুলী দাগ নহী, তসভির হ্যায়।” “ক্যায়সি তসভির জনাব?” কোনো নাদান অচানক এই সওয়াল পেশ করলে মৌলভী সাহেব বলতেন “আসমান কী তসভির।” ওই “আসমান কি তসভির” আঁকার কিছুক্ষনের মধ্যেই তিনি যে কোনো বিষয়েই নির্ভূল ভবিষ্যৎবাণী করতেন, এবং সবাইকে তাজ্জুব বানিয়ে দিয়ে, তা মিলেও যেতো। মৌলভী মুস্তাক তারপর জলদ্ বাজীর সঙ্গে সেই স্হান ত্যাগ করতেন।
সেই কারামাতী ছড়ির রং ছিলো কুচকুচে কালো, লিকলিকে সরু, আর তার মাথায় ছিলো একটা ভয়ঙ্কর মুখের আদলওয়ালা হাতল। কানাঘুষো শোনা যেত ওটা জ্বীনের ছড়ি ছিলো। নবাববাড়ির খানসামারা ফিসফাস করতো, মৌলভী সাহেবকে নাকি ওই ছড়ির সঙ্গে কথা বলতেও দেখা গেছে।
নির্জন ওই পেছনের দরজার সামনে মৌলভী সাহেব ছাাড়া আর কেউ থাকতেন না।
একবার নবাব সাহেব অসুস্হ হলেন। তিনি বছরে ছমাসই লন্ডনে থাকতেন। মৌলভী সাহেবের সেই ছড়ির আসমানী তসভির বলে দিয়েছিলো নবাব সাহেব কবে সুস্হ হয়ে উঠবেন, এমনকী পুরো রমজান মাসটা যে মুর্শিদাবাদেই কাটাবেন, সে কথাও মৌলভী সাহেব ভবিষ্যৎবানী করেছিলেন। এবং শুধু তাই না, মির্জা আরিফের ফুফুজান জন্নত আরার হিরার আঙটি, কে হস্তগত করে কোথায় লুকিয়ে রেখেছে, তাও ওই আসমানী তসভির বলে দিয়েছিলো। জন্নত আরা থাকতেন হায়দ্রাবাদে।
মৌলভী সাহেবকে নবাব বাড়ির লোকরা বেশী ঘাঁটাতো না।
তবে এক রাতে নবাববাড়ির খানসামা আহমদ জান ওই ছোটি দরওয়াজার কাছে এক অদ্ভুত জিনিস দেখে দেশে গিয়ে আর কখনো ফিরে আসেনি। গভীর রাতে কোনো এক দরকারে সে ছোটি দরওয়াজার দিকে গেছিলো। মৌলভী সাহেবের ঘর থেকে চাপা গলায় আওয়াজ ভেসে আসায় সে প্রথমে কান পেতে শোনার চেষ্টা করে। কিন্তু সেই কথপোকথনের বিন্দুমাত্র বুঝতে না পেরে দরজার ফাটলে চোখ লাগিয়ে দেখেছিলো, একজন কালো রঙের পুরুষ, সাধারণ মানুষের থেকে অনেকখানি লম্বা। এতটাই যে তার মুখটা দেখার জন্য আহমদ জানকে নীচের চৌকাঠে ঝুঁকে পড়তে হয়েছিলো। সেই কালো রঙের লম্বা লোকটার গলার আওয়াজে চাপা ক্রোধ, সে ছটফট করছে আর মৌলভী সাহেবকে একটা মোহর দিতে চাইছে। মৌলভী মুস্তাক আঙুল তুলে তাকে তর্জন করছেন, আর সেই লোকটা নানারকম ভয়ঙ্কর প্রাণীর রূপ ধারণ করতে করতে এবং মৌলভী সাহেবকে ভয় দেখানোর চেষ্টা করতে করতে নাকাল হয়ে শেষে সেই ছড়িতে রূপান্তরিত হয়ে গেলো। আর তখনই ছড়ির সেই মুখটা আহমদ জানের চোখে স্পষ্টভাবে ভেসে উঠলো, সেই লোকটা আর ওই ছড়ির মুখটা অবিকল এক।
মৌলভী মুস্তাক মোরাদাবাদী খানসামা আহমদ জানকে দেখে ফেলেছিলো। তাকে সেই ছড়ি দিয়েই আঘাত করে বলেছিলো। “জিন্দা রহনা হ্যায় তো মহল ছোড়কে ভাগ যা খবিশ কী অওলাদ, নহী তো ইয়ে ছড়ি তুঝে জিন্দা খা জায়গা।” তারপরেই আহমদ জান ধূম জ্বর নিয়ে একাই বাড়ির পথে রওনা হয়ে যায়, তার কী হয়েছিলো আর জানা যায়নি।
মৌলভী সাহেবের মৃত্যুও হয়েছিলো অদ্ভুতভাবে। এক সকালে দরজা ভেঙে দেখা যায় ছড়িটা তার বুক এফোঁড় ওফোঁড় করে তাঁকে নিয়ে সিলিং থেকে ঝুলে আছে। আর ছড়িটার মাথাটা ভাঙা‌। সেটার খোঁজ আর কখনো পাওয়া যায়নি।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!