T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় অভিজিৎ রায়

“ভ্যানিশ” হয়ে যাওয়া মূল্যবোধ ও অন্যান্য প্রসঙ্গে দু-চারটি কথা

মনে আছে তো সোনার কেল্লা ছবিতে মুকুল কীভাবে জেনেছিল ভ্যানিশ কথাটা? কীভাবে আসল ডাক্তার হাজরাকে ভ্যানিশ করে দিয়ে মুহূর্তে হাজির হয়ে গিয়েছিল নকল ডাক্তার হাজরা? কেন যেন মনে হয় আমরাও আজকাল সেই সোনার পাথরবাটির দেশে বসে আছি। সোনা-মুঠির স্বপ্ন বাস্তবে পাথর প্রসব করে বসে আছে। হাতে পড়ে রয়েছে শুধু শূন্য ভাঁড়ারের হিসাবের খাতা আর সরকারি ক্যান্টিনে পাঁচটাকার ভাতের জন্য একপেট খিদে। আশেপাশে হাজার হাজার ডক্টর হাজরার মতো গজিয়ে উঠছে নকল প্রতিশ্রুতির জঞ্জাল। আর তার মধ্যে কবেই ভ্যানিশ হয়ে গেছে আমাদের বর্তমানের শেষ সম্বল আর ভবিষ্যতের আশা ভরসা। একটু বিশদে বলি।
ফেসবুকের প্রতিটি লাইক এবং কমেন্টের পিছনে যে রসায়ন থাকে, তাকে নিয়ে একটা নতুন বই লেখাই যায়। বিষয়টি ক্রমশ প্রত্যেক ব্যবহারকারীর কাছে সুস্পষ্ট হয়ে উঠছে এবং সকলেই এই রসায়ন বিষয়ে বিজ্ঞ হয়ে ওঠায় এই রসায়নের ব্যবহার ক্রমশ বেড়েছে। ফেসবুক বাঙালিকে জনপ্রিয় করে তুলেছে এবং সৃষ্টিশীলতাকেও। ফেসবুক না থাকলে করোনা কালীন লকডাউনে বাঙালি যে কী পরিমাণে আত্মহত্যা করত তা বলা মুস্কিল। তবে এখন তার অবসর কমলেও লাইক আর কমেন্টের নেশা কমেনি। আর, কমেনি বলেই ক্রমশ আমাদের রাজ্যের জিডিপির হাল খারাপ। কাজের ফাঁকে ফেসবুক করা বাঙালি এখন ফেসবুকের রসায়ন চর্চার ফাঁকে একটু আধটু কাজকর্ম করে বৈকি। যদিও লক্ষ্মীর ভাণ্ডার, রূপশ্রী, যুবশ্রী, কন্যাশ্রী’র পর বাঙালির কাজের প্রয়োজন আছে কিনা সে নিয়ে গরমেন্ট সন্দেহ প্রকাশ করে কর্মীদের ৩১% ডি.এ.টাই ভ্যানিস করে দিতে ব্যস্ত। অথচ একের পর এক চেয়ার থেকে শাসকদলের নেতারা চোর অপবাদে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। জিএসটি বাড়ার সুবাদে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের ৫০০ টাকা দুধ,মুড়ির ট্যাক্স জোগাতেই ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে। বড় থেকে ছোট সব ব্যবসার অবস্থাই খারাপ। বড়দের জন্য কর্পোরেট ঋণ মকুব আছে, কিন্তু ছোট ব্যবসায়ীদের অবস্থা ক্রমশ খারাপ। তার উপর সুদের হার বৃদ্ধি। সরকারি চাকরিজীবী মধ্যবিত্ত এখনও লড়াই করে গাড়ি, বাড়ির ঋণ দিতে পারলেও, ব্যবসায়ী জীবিকার মানুষজনের পক্ষে তা ইতিমধ্যেই অসম্ভব হয়ে উঠেছে। ফেসবুকের লাইক, কমেন্ট দিয়ে পেট ভরানোর একটা ব্যবস্থা করার কথা ভাবা গেলে ভাল হতো।
যা কিছু করলে ভাল হতো, তেমন আর করা হচ্ছে কই? নেতা, মন্ত্রী, আমলারা নিজেদের ভাল করতে ব্যস্ত আর জনগণ দুবেলা, দু-মুঠো খাবার জোগাড়ের। এরই মধ্যে সাধারণের জীবন থেকে ভ্যানিশ হয়ে যাচ্ছে অবসর। এই অবসর মানেটা কী? অবসর মানেই তো সম্পদ। জীবনের সম্পদ মানেই অবসর। প্রতিটি মানুষ যে অবসর তার নিজের মতো করে কাটাবে। গান গেয়ে, ছবি এঁকে, কবিতা-গল্প-উপন্যাস লিখে বা পড়ে। এই অবসর সাধারণের কাছ থেকে কেড়ে নিচ্ছে রাষ্ট্র। ভারতের মতো গণতান্ত্রিক দেশও এই অবসর সংগ্রহের সুযোগ দিচ্ছে না জনগণকে। কিন্তু কেন? জনগণের দ্বারা, জনগণের, জনগণের জন্য নির্বাচিত সরকার এই পথে অগ্রসর হচ্ছে কেন? কারণ হল পুঁজিবাদ। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা আর পুঁজিবাদের মিলিত শক্তি ও চক্রান্ত আমাদের প্রতিনিয়ত ফেটিশিজমের আরাধনা করতে বাধ্য করছে। এক চূড়ান্ত মায়াজাল আমাদের প্রত্যেকের জীবনকে ঘিরে তৈরি করা যাচ্ছে। “প্রতিদিন চুরি যায় মূল্যবোধের সোনা, আমাদের স্বপ্ন, আমাদের চেতনা”। আর, এ কথা খুব পরিস্কার যে, কোনও মানুষের স্বপ্ন আর চেতনা যদি চুরি যায় তবে সে আর মানুষ থাকে না। তার নিজস্ব বোধ থাকে না, তার মধ্যে থাকে না শিক্ষার আলোও। এককথায় সে তখন পুঁজিবাদের রাষ্ট্র যন্ত্রের মগজধোলাই যন্ত্র থেকে বেরিয়ে পড়া রোবট। তার যান্ত্রিকতায় সে তখন শুধু নিজের বেঁচে থাকাটাকেই একমাত্র উদ্দেশ্য মনে করে আর কাজ বলতে বোঝে শাসকের স্তুতি করা। তার শিক্ষা, শিল্পচেতনা তখন শাসক অসৎ উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে। কথাটা ভুল বললাম। আসলে সে কিছুই করে না। পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্র তার জন্য যে জাল বিছিয়ে রেখেছে তারই কারণে সে আজকে অসৎ। ‘ইয়ে দিল মাঙ্গে মোর’ – প্রতিটি জীবনই আর একটু বেশি চায় প্রতিমুহূর্তে। এই চাহিদার আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ার কাজটা প্রতিনিয়ত করতে থাকে পুঁজিবাদ। অন্যায় করা এবং অন্যায় সহ্য করাটাকেই মানুষ স্বাভাবিক মনে করতে থাকে। এই চক্রান্তের শিকার আমরা সকলেই। ইচ্ছা হলেই এই চক্রব্যূহ থেকে আমরা বের হতে পারব না। অবশ্য বের হওয়া বা হতে চাওয়া অনেক পরের ব্যাপার। আমাদের অধিকাংশ জনগণ বুঝতেই পারবেন না যে তারা কোনও চক্রান্তের মধ্যে পড়েছেন।
এরপর আমাদের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থাকে পঙ্গু করে দিয়ে স্বাস্থ্য ক্ষেত্রের মতো শিক্ষাক্ষেত্রেকে বেসরকারিকরণ করা হবে। পুঁজিপতিদের একটা অংশ ইতিমধ্যেই এই ক্ষেত্রে বিনিয়োগ শুরু করে দিয়েছেন। সরকারও স্কুল, কলেজে নিয়োগ কমিয়ে শিক্ষাব্যবস্থাকে হত্যা করছেন প্রতিদিন। উপরন্তু, আমরা যতই স্বাধীনতার অমৃতোৎসব পালন করি না কেন আমাদের বুঝতে হবে সরকারি চাকরিতে নিয়োগ কমিয়ে সরকার মানুষকে একটা ভাবনা ভাবতে বাধ্য করছে। আর, সেটা হল পড়াশোনা করে হবেটা কী? তাহলে মোদ্দা কথা কী দাঁড়াল? জ্ঞানের জন্য আমাদের মধ্যে বেশিরভাগ যেহেতু শিক্ষাগ্রহণ করি না, সেহেতু বেশি দামের বেসরকারি শিক্ষা গ্রহণ না করে জনগণ অন্যদিকে ঝুঁকবে। এরফলে একদিকে যেমন আদানি, আম্বানিদের জন্য স্বল্পমজুরিতে খাটার অনেক অল্পশিক্ষিত বেকার যুবক-যুবতী তৈরি হবে তেমনই উন্নয়ন আর বিকাশের ভোট সন্ত্রাসের জন্য বাহুবলের জোগানেও এইসব অল্পশিক্ষিত বেকাররাই প্রাধান্য পাবে। কর্মক্ষেত্রে চাহিদা জোগানের খেলায় জোগানের পাল্লা এতটাই ভারি হতে চলেছে অদূর ভবিষ্যতে যে পরিবার চালানোর ন্যূনতম আয়টুকুও অর্জন করা সাধারণের পক্ষে সম্ভব হবে না। এদিকে কালোবাজারি এবং সরকারি ভ্রান্ত নীতির দৌলতে দ্রব্য মূল্য বৃদ্ধি নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। করোনাকালীন অব্যবস্থা সামলাতে একদিকে সরকার যেমন নিজের ঘাড়ে ঋণের বোঝা বাড়িয়ে চলেছে, তেমনই সাধারণ মানুষকে উদ্বুদ্ধ করেছে ঋণগ্রহণ করতে। এখন করোনা দূরে চলে গেলেও বেশি সুদের হারে সেই ঋণ শোধ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে। ব্যাঙ্কের এন.পি.এ. নতুন করে বাড়বে। ব্যাঙ্কগুলোর আর্থিক অবস্থা এমনিতেই কর্পোরেট ঋণ মুকুবের খেলায় দুর্বল। এরপর আরও দুর্বল হলে ব্যাঙ্ক বেসরকারিকরণের ধুয়ো তুলতে কেন্দ্রীয় সরকারের সুবিধা হবে। জনগণের টাকা এমনিতেই সরকারি ব্যাঙ্ক থেকে কর্পোরেট ঋণমকুবের চক্রান্তে ভ্যানিস হয়ে যাচ্ছে প্রতিদিন। এরপর পুঁজিপতিদের মুখোশ পরা প্রতারকরাই ব্যাঙ্কের মালিক হলে কী হবে তা ‘জাস্ট’ ভাবা যাচ্ছে না।
তাহলে কী দাঁড়াল? রোজগারের ক্ষেত্র ক্রমশ সংকুচিত আর যে সমস্ত সাধারণের হাতে অল্পবিস্তর টাকা সঞ্চিত আছে তা ভ্যানিশ করে দেবার মাস্টার প্ল্যানও মজুত মুষ্টিমেয় কিছু নেতা ও প্রতারক ব্যবসায়ীর হাতে। এই অবস্থায় জনগণের হাতে না আছে ক্ষমতা, না আছে অধিকার। অত্যাচারী রাজার অত্যাচারের চরম সীমা অতিক্রম করে গেছে গণতন্ত্রের এই প্রহসন। দলবদলের আইনকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলছে কিছু রাজনৈতিক ব্যক্তির শোষণ। এর সঙ্গে যোগ দিয়ে মিডিয়া মানুষকে বোকা বানাচ্ছে। প্রায় সমস্ত মিডিয়া এখন শাসকদলের তাঁবেদারি করতে ব্যস্ত। এবং সুপরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন আর বিকাশের মিথ্যে প্রচারে গোয়েবেলসের নীতি প্রয়োগে তারা একদিকে যেমন দেশের সম্পদ বিক্রি করে মুনাফা নিজেদের পকেটে ভরছে, অন্যদিকে মানুষকে বাধ্য করছে বেঁচে থাকার জন্য ভিক্ষাবৃত্তির পথ বেছে নিতে। ডোল আর অনুদান রাজনীতি ক্রমশ মানুষকে অবসাদগ্রস্ত করে তুলছে আর রাজনৈতিক নেতানেত্রীদের মিথ্যাচার জনগণকে ভুলিয়ে জনগণের বাঁচার রসদ এখনও চুরি করে যাচ্ছে। চুরি ধরা পড়লেও সততাত প্রতীক এখনও প্রমাণ চাইছেন। আয় বহির্ভূত সম্পত্তির যদি ঠিকমতো তদন্ত করা হয় তাহলে বোধহয় ৯৯% নেতানেত্রীই চোর সাব্যস্ত হবে। কাটমানির মাধ্যমে চুরি না করেও সরকারি কোষাগার থেকে টাকা সুচারু পদ্ধতিতে বের করে নেওয়া যায় এ কথা আমি, আপনি বুঝলেও মানুষকে বোঝানো মুস্কিল। নেতানেত্রীদের বই লেখার টাকা লাইব্রেরি গ্রান্টের মাধ্যমে মেরে ঘরে তোলার ক্ষমতা যাদের আছে তারা সে সুযোগ তো নেবেই। আর, লেখক, প্রকাশক, বুদ্ধিজীবীরা সেই সমস্ত নেতানেত্রীদের সঙ্গে মঞ্চে উঠে হাততালি দিয়ে নিজেদের মাসোহারার পাকাপোক্ত বন্দোবস্তো করতে ব্যস্ত হয়ে নিজেকে মহান করবেন এবং সেই মতো যুক্তি খাড়া করে প্রচারে ব্যস্ত থাকবেন ভোটপর্বে। সাধারণ জনগণের মূল্যবোধের কথা আপাতত বাদ রাখছি কিন্তু শিক্ষিত বুদ্ধিজীবী শ্রেণির মূল্যবোধকেও এই দেউলিয়া রাজনীতি ইদানিং ভ্যানিশ করে দিয়েছে।
ভ্যানিশ করে দেবার এই খেলাতেই আমরা মত্ত। মূল্যবোধ থেকে মূলধন, সম্পর্ক থেকে সম্পদ– সবটাই ভ্যানিশ করে আমরা কোন উন্নয়নের বিকাশপর্বে নিজেদের উদ্ধার করব তা দেখার জন্য এই সমস্ত শব্দ, অক্ষর মুখিয়ে আছে। যারা এখনও নির্বোধ তারা ভাবছেন স্পষ্ট বক্তব্যের মধ্যে দিয়েই তারা ভ্যানিশ করার যাবতীয় চক্রান্ত রুখে দিতে পারবেন। নিজেদের স্বপ্ন আর চেতনা চুরি না-যেতে-দেওয়ার লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকতে থাকতে তাদেরও কাউকে কাউকে ভ্যানিস হতে হচ্ছে বা হবে একথা তারা ভাবতে পারছেন না। এই মুহূর্তে আমি সেইসব শব্দ ও অক্ষরের ব্যস্ততম সৈনিক হয়ে বাঁচতে চাই। তবে এই অসম লড়াইয়ে ভ্যানিশ হয়ে যাবার সম্ভাবনা একটা থেকেই যাচ্ছে। কারণ আমার মৌলিক অধিকার ভ্যানিশ হয়ে গেছে অনেক আগেই। মুকুলেরাও পল্লবিত হওয়ার অনেক আগেই জেনে ফেলছে ভ্যানিশ শব্দটার অর্থ। যাদের ভাতের থালা থেকে ডাল-ডিম-সয়াবিন-আলু একে-একে ভ্যানিশ হয়ে গিয়ে পড়ে থাকে শুধু ফ্যানাভাত আর নুন, তারা বোধহয় বসে আছে ভাতটুকুও ভ্যানিশ হওয়ার মাজিক দেখবে বলে। বেঁচে থাকুক আমাদের পঁচাত্তর বছরের স্বাধীনতা !

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!