হৃদয় হেটে যাচ্ছিল। গ্রামের মাঝ দিয়ে যে বড় রাস্তা চলে গেছে সোজা পশ্চিম দিকে সে রাস্তা ধরে। দূর থেকে দেখে কালোমত কি একটা দেখা যাচ্ছে রাস্তার উপরে যে বটগাছটা আছে তার নীচে। কৌতুহলী হয়ে দ্রুত পা চালায়। কাছে যেতে যেতে দেখে জিনিষটা নড়াচড়া করছে। একটু এগিয়ে দেখে অনেকগুলো মানুষ খুব মনোযোগের সাথে কি যেন খুঁজছে। আরও কাছে গিয়ে দেখে গ্রামের প্রায় সব নারী সদস্যরা সেখানে আছে।। হৃদয় পাশের বাড়ির ছোট্ট কিশোরী মিনুর কাছে জানতে চাইলো তারা কি করছে? সে বেনী দুলিয়ে গাল ফুলিয়ে যেতে যেতে বললো খুঁজছি। বলেই সে আবার গিয়ে মনোযোগ দিয়ে খুঁজতে লাগলো। হৃদয় দেখে তার কলেজ পড়ুয়া দিদিও আছে সেখানে। তাকে ডেকে জানতে চাইলো কি খুঁজছে তারা। দিদি কপালের চুল সরাতে সরাতে বলল তুই তোর কাজে যা ভাই, বিরক্ত করিস না। বলেই চলে গেল। এবার হৃদয় ওবাড়ির বৌদিকে দেখে তার কাছে জানতে চাইলো। বৌদি মুচকি হেসে বললো ভাই তোমার কাজে তুমি যাও। তাকে পাত্তা না দিয়ে খোঁজায় মন দিল। এবার হৃদয়ের জেদ চেপে গেল। যত জরুরী কাজ থাকুক না কেন তাকে জানতেই হবে এরা সবাই কি খুঁজছে। হঠাৎ দেখে সর্দার বাড়ির চাচীও আছে সেখানে। মনে মনে ভাবলো চাচী আমাকে ঠিক বলবে। তাই চাচীর কাছে গিয়ে বেশ নরম সুরে জানতে চাইলো তারা কি খুঁজছে। চাচী মাথার ঘোমটা আর একটু টেনে বললো বাপ এখন কিছু বলতে পারবো না। হায় হায় কি হয়েছে এদের? এরা কি সব পাগল হয়ে গেল না কী? রানু পিসি কে দেখে ভাবল আর যে যাই করুক পিশি আমাকে বলবেই। পিশির গা ঘেঁষে বসে বললো ও পিশি কি খুঁজছো? বিধবা রানু পিশি ফিক করে পানের পিক ফেলতে ফেলতে বলে হৃদু এখন জ্বালাতন করিসনে, যা ভাগ। এবার দেখে সেখানে ওপাড়ার বাবুর জ্যাঠিমাও আছে। তার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে কুশল জানতে চাইলো। জ্যাঠিমা কেমন উদাস ভাবে বললেন তুই আজকাল আর আসিস না যে বড়ো। হৃদয় বুঝলো জ্যাঠিমা কিছু বলবেন না। তপুর মাকে দেখে তার কাছে গিয়ে বললো মাসীমা বলুন না কি খুঁজছেন? আমি তো খুঁজতে সাহায্যও করতে পারি। তপুর মা কেমন ফিরেও তাকালেন না। এবার শেষ চেষ্টা করতে হবে ভেবে এগিয়ে গেল অপুর ঠাকুরমার কাছে। এই ঠাকুরমাকে ওরা বন্ধুরা সবাই খুব ভালবাসে। বয়েসকালে উনি অপরূপ সুন্দরী ছিলেন বোঝা যায়। এখন মাথায় ছোট করে কাটা চুল সাদা হয়ে গেছে। গালের চামড়া ঝুলে পড়েছে। দাঁত নেই বলে হাসলে শিশুর মতো দেখায়। সেই ঠাকুরমার কাছে গিয়ে তার হাত দুটি ধরে মিনতি করে জানতে চায় তারা কি খুঁজছে। এবারে ঠাকুরমা হেসে বলে ওঠে “আমি কে”? মানে—- কিছুইতো বুঝলাম না বলে হৃদয় হতবাক চোখে চেয়ে থাকে। এবারে ঠাকুরমা সবাইকে বলেন ও মেয়েরা তোমরা কি কিছু পেয়েছো? সবাই বলে ওঠে পেয়েছি। মিনু বলে আমি বাবার আদরের ছোট্ট মেয়ে, দিদি বলে আমি ভাইয়ের দিদি, চাচী বলে আমি হৃদুর চাচী। বৌদি বলে আমি তার রতন দাদার বৌ। এমনি করে পিশি, জেঠি, মামি, মাসি সবাই বলে। তখন ঠাকুরমা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলে বলেন, ওরে এতক্ষন ধরে আমি কি তোদের এই খুঁজতে বলেছি। আমি বলেছি তোদের নিজের পরিচয় কিছু আছে কি-না সেটা খুঁজে দেখ। জন্মাবার পর একটা নামতো পেয়েছিলি,দেখ অন্তত সেটা খুঁজে পাস কি-না।