T3 মকর সংক্রান্তি স্পেশাল – এ অমৃতা ভট্টাচার্য্য

পৌষের গান
চারিদিকে এখন কেবল বিরান মাঠ। মাঝে মাঝে জলটুঙ্গির মতো একফালি সবুজ বীজতলা। পৌষ ফুরানো সকালে এমন করে একেকটা রাঢ় বঙ্গের ভোর জেগে ওঠে। জেগে উঠছে আসলে কত কত বছর ধরে। একেকবার এমন একেকটা সংক্রান্তির ভোরের দিকে চেয়ে চেয়ে আমার হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করে। ভূগোলের খাতাখানা জমা দিয়ে ওই খড়ের গোছা মাড়িয়ে আতপ চাল আর পাটালি গুড়ের গন্ধের ভিতর ডুবে যেতে ইচ্ছে করে বেমালুম। এমন ইচ্ছের আসলেই কোনো মানে নেই জেনেও পিঠের গন্ধের মধ্যে তলিয়ে যেতে সাধ হয়। সারা সারা রাত ধরে পৌষের হিম মেখে ওই যে স্থির হয়ে আছে রসবড়ার পাতিলখানা! ওর ভিতরে আমার শৈশব ঘুমিয়ে আছে। নদী পাহাড় আর সর্ষেক্ষেত মাড়িয়ে সে ফিরে যেতে চায় সংক্রান্তির ভোরে। ধান ঝরানো শেষ, গেরস্ত ঘরে এখন কত রকমের যে পিঠে! আশ্চর্য মানচিত্রে মুড়ে মানুষের ইতিহাসে তারা জাগরূক থাকতে চেয়েছে কতকাল ধরে। তবু, চাইলেই বা দিচ্ছে কে! নরম নরম কলার মধ্যে নারকেল আর বিন্নি চাল মেখে নিচ্ছে মায়াবী হাত। আর কিছুক্ষণে কলার পাতে মুড়ে, জলের বাষ্পে জমে তৈরি হবে আতিক্কা পিঠা। চট্টগ্রামের মানুষ জানেন সে পিঠার স্বাদ। তারা জানেন কেমন করে বিন্নি চালের গুঁড়ো ছড়িয়ে দিয়ে ভিন্নস্বাদের পাটিসাপটা বানাতে হয়। মানুষে অমন নরম পাকের পিঠারে কয়, আপন পিঠে। খুব ভোরে, রুকসানার নানি পাতিলের মধ্যে হাত ডুবিয়ে জালা মাখে। ভোর ভোর তৈরি হবে জালা পিঠা। সন্দ্বীপের চরে জালাপিঠার খ্যাতি কত! বীজধান ভিজে দিনে দিনে তা অঙ্কুরিত হয়। সেই অঙ্কুরিত ধান বেটে তার নির্যাসটুকু নিয়ে চালের খামিরে মেখে নেন নানি আর দাদিদের হাত। সারা সারা রাত ধরে ধানের দুধ সাদা নির্যাসে গেঁজে ওঠে চালের খামির। শিশিরের স্নিগ্ধতার চেয়ে সে কি কম কিছু হলো! ভোর ভোর নারকেল কোরা আর চিনি দিয়ে জালা মেখে নিচ্ছে নানি। ডেকে বলছে, কি রে রুকসানা? পিঠা খাবি না? কত কত নানির কত না কণ্ঠস্বর ওই জালা পিঠার মধ্যে থিতু হয়ে আছে। এমন পৌষের ভোরে সেসব স্বর ওই মাঠের ওপারে কুয়াশার মতো জমে থাকে বেবাক। চৌকো কড়াইয়ে আঁচ ঠেলে ঠেলে মেহনতি মানুষেরা তখন গুড় জ্বাল দেন। সে গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে পাকা চালতের ডাল পেরিয়ে গাঁ-ঘরের ওপারে। ফজরের নামাজ মিটতে না মিটতেই সাইকেলে ঘণ্টি বাজিয়ে যে ছোকরা ধুকি পিঠা বেচতে আসে! আজ তার দেখা নেই। আজ কি আর লোকে ধুকি খাবে? মানুষে আজ সাজের পিঠা খাবে, চিঁড়ের পুলি খাবে, চুষির পায়েস খাবে তবে না! নরম তুলতুলে সাজের পিঠে, আমরা কই চিতই পিঠে। অমন পিঠে গোরুর দুধ আর পাটালির মিশ্রণে রাতভোর ডুবে থাকতে চায়। ভোরের হাওয়ায় আলোয়ান মুড়ি দিয়ে দুধ-চিতই খেতে যা সুখ, সে তো বোঝাবার নয়!
সংক্রান্তি কি আসলেই মানুষকে মনে করিয়ে দিতে চায়, এই মাটি, এই ধান, এই খেজুরের রস এই সমস্তের মধ্যে পৃথিবীর গন্ধ থিতু হয়ে আছে। তুমি তাকে চেনো, তাকে জানো। ধর্মের ভূগোলে তুমি রান্নার মানচিত্র আঁকতে চাও আঁকো, পৃথিবী তো দীনা নয়! সংক্রান্তির দিনে আমাদের টানা বারান্দার এক ধারে বসে বসে তোলা উনোনে আমার ঠাকুমা গুড়ের পায়েস রাঁধছেন, গোকুল পিঠে ভেজে রসে ফেলছেন … এসব আমি দেখতে পাই। ওর শাড়ির পাড়, চুলের প্রান্ত, হাতের ঘূর্ণন দেখতে দেখতে আমি ভুলে ভুলে যাই পৃথিবী কমলালেবুর মতো গোল। আমি কেবল টের পাই, বাংলাদেশের কত কত নানি দাদি ঠাম্মা দিম্মার হাতে আতিক্কা থেকে মধুভাত, মুগের চাপটি থেকে সরু চাকলি প্রাণ পাচ্ছে ঘরে ঘরে। এও তো শিক্ষানবিশি! নয় কী? আলপনা দেওয়া হাত গোলা ছিটিয়ে ছিটিয়ে ছিটারুটি ভাজছেন দ্যাখো কেমন! এ তো দেখবারই জিনিস মশাই! আমাদের পাড়াগাঁয়ের কল্পনা পিসি ছিল যশোর থেকে আসা ছিন্নমূল মানুষ। ওদের দরমার বেড়ার ওপারে এক চিলতে হেঁশেল। সেখানে পিড়ি পেতে বসে বসে কল্পনা পিসি পিঠে ভাজছে এক মনে। সাদা সাদা পিঠে। সাদা চিনি আর নারকেলের পুরে পাটিসাপটাই বেশি। পাড়ার বাচ্চারা খাচ্ছে, বুড়োরা খাচ্ছে। খাবেই তো! উদবাস্তু মানুষ বলে কি তারা পিঠে খাবে না! তাও কি হয়! কিন্তু সে তো খুব পুরনো নয়! তার কি ফুরিয়ে যাবার এতই তাড়া ছিল! হবেও বা। ফুরিয়ে আসা পৌষের মতো সেও যেন এক জালা পিঠার ভোর। বনগাঁ থেকে যশোর, রানাঘাট থেকে রাজশাহি ছুঁয়ে কত রকমের যে পিঠে, তার তো কোনো হিসেব নেই! হিসেব রাখবেই বা কে বলুন! এই অগণিত চারুশিল্পের সম্ভারে কেবল কি আর খেঁজুর কাঁটায় কেটে কেটে নক্সী পিঠা খায় মানুষ? কেবল কি আর সেদ্ধ পুলি খায়? নোনতা পিঠা, ফুলঝুরি পিঠা, মাংসের পিঠাও খায় বৈকী। এই ধরুন না, টাঙাইলের রোট পিঠা, ময়মনসিংহের মাংসের পিঠার সঙ্গে কাঁঠালপাতায় সেদ্ধ পুলির ফারাক কি কম! এই ভিন্নতাই বোধহয় ওর প্রাণ, ওর জিয়নকাঠি। নরম নরম রসুন পাতা দিয়ে, মরিচ কুচিয়ে রূপার নানি চিতই পিঠে বানায়। ওর তুলতুলে চিতই মরিচের ভর্তা দিয়ে খেতে চমৎকার! ওর নানি কখনও রোট পিঠা খায়নি, ঝুরা মাংসের পিঠাও না। পিঠেপুলির মানচিত্র কেমন বিচিত্র বলুন তবে! মানুষের গল্পে দেশ কাল ধর্মের বেড়া নাই বা দিলুম এমন পৌষের ভোরে। বিরান মাঠের ওপারে সংক্রান্তির সূয্য উঠছেন কুয়াশার পর্দা ঠেলে, আলো ফুটবে আরেকটু পর। এমন দিনে নাকি অজয়ে এসে গঙ্গা মেশে, পদ্ম ফোটে নরম আলোয়। লোক বিশ্বাসের কি আর পাথুরে প্রমাণ থাকে কিছু? আস্ত একখানা পিঠেপুলির ভোরে জেগে উঠে তাই দেখতে চাইছি, বাচ্চারা দোলাই গায়ে হাঁটু মুড়ে বসেছে ওই রোদ্দুরে। নরম নরম চিতই পিঠে খাবে ওরা , গরম গরম জালা পিঠে খাবে। খাক, পেট ভরে খাক। ওরা পেট ভরে পিঠে খেলে পদ্ম ফোটে চরাচরে। সংক্রান্তির ভোর আর কি চাইতে পারে? এইটুকুই তো! আতপ চালের গন্ধে, পাটালির গন্ধে, তিলের গন্ধে ভূগোল আর ইতিহাসের খিলান পেরিয়ে মানচিত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছে কে ও? ও কি বঙ্গলক্ষ্মী?