গারো পাহাড়ের গদ্যে আলমগীর কবীর হৃদয়

ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্যে ও সমাজ সংস্কারে এক উজ্জল নক্ষত্রের নাম

আজ থেকে ২০০ বছর আগে যে সাহিত্যে স্রষ্টা ও সমাজ সংস্কারক এর জন্ম হয়েছিল, ভারতবর্ষের পশ্চিম মেদেনীপুর জেলার বীরসিংহ গ্রামের মাটিকে ধন্য করে। সে নবজাগরণের অগ্রদূতও বটে। সে হলো ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। যদিও তার পিতামহ রাজময় তর্ক ভূষণ তাদের বংশানুযায়ী নাম রেখেছিলেন “ঈশ্বরচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়”। কিন্তু ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তার অসাধারণ প্রতিভার জন্য ১৮৩৯ সালের ২২ এপ্রিল হিন্দু ল কমিটির পরীক্ষা দিয়ে সেই পরিক্ষাতে কৃতিত্বের সাথে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য ১৬ মে ল কমিটির কাছ থেকে যে প্রশংসাপত্রটি লাভ করেন। জানা যায় সেখানেই প্রথম তার নামের সাথে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধি ব্যবহৃত হয়। সেই থেকে তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর হিসাবেই পরিচিত আমাদের মাঝে। ঈশ্চরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের জন্ম ১৮২০ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর, তার রতœগর্ভা মা ভগবর্তী দেবী ও গর্বিত জনক ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায়।
যে মানুষটির জন্ম না হলে আমি মনে করি অন্ধকার ও কুসংস্কারে আচ্ছন্ন হয়ে যাওয়া যুগ আলোর মুখ দেখতো না। কেননা, আজ আমরা বিংশ শতাব্দিতে দাড়িয়ে যে নারী শিক্ষার প্রচার প্রসারের জন্য ভাবছি নানাবিধ কৌশল ও পরিকল্পনা প্রণয়ন করছি। সেই নারী শিক্ষা বিস্তারের অগ্রপথিক ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। তিনিই প্রথম ভেবেছিলেন নারী জাতির উন্নতি না হলে বাংলার সমাজ ও সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নতি সম্ভব নয়। তাই তিনি ১৮৫৭ সালে বর্ধমান জেলায় মেয়েদের জন্য একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন ও তার ঠিক এক বছর পর ১৮৫৮ সালে মে মাসের মধ্যে নদীয়া, বর্ধমান, হুগলী ও মেদেনীপুর জেলাতে ব্যক্তিগত উদ্যোগ নিয়ে ৩৫টি বালিকা বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। জানা যায় সে সকল বিদ্যালয়ে তৎকালীন সময়ে প্রায় ১৩০০ জন ছাত্রী পড়াশোনা করতেন। এছাড়াও তিনি কলকাতায় ১৮৭২ সালে মেট্রোপলিটন ইনষ্টিটিউশন (যা বর্তমানে বিদ্যাসাগর কলেজ নামে পরিচিত) ও নিজের গর্ভধারিনী মায়ের স্মৃতি রক্ষার্থে নিজ গ্রামে ভগবতী বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। কিন্তু অতীব দুঃখের বিষয় আজ যখন নারী শিক্ষা নিয়ে সভা সেমিনার হয় তখন নারী শিক্ষা শুরু করার অগ্রপথিক ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের নামটি বে-মালুম আমরা ভুলে যাই, অথবা স্বীয় নেতাগিরি থাকে না এই ভাবনায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে মনে করিনা। এটা যেমন দুঃখজনক ঠিক তেমনি বাঙালি জাতির জন্য লজ্জাও বটে। সে ক্ষেত্রে আমি বলবো স্রষ্টাকে ভুললে সৃষ্টিকে আস্বিকার করা হয়। আর সৃষ্টিকে যদি অস্বিকার করেন তাহলে আপনি নিজেকেই অস্বিকার করছেন।
আগামীতে আপনিও থাকবেন না কোন স্বরণ পাতায়। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একজন শিক্ষা সংস্কারকও ছিলেন। তিনি হিন্দু শাস্ত্রবিদ হয়েও ধর্মকে শিক্ষাক্ষেত্র থেকে আলাদা করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেননি। উল্লেখ্য সংস্কৃত কলেজের দ্বার শূদ্রদের জন্য উন্মুক্ত করা, অষ্টমী ও প্রতিপদের পরিবর্তে রবিবার সাপ্তাহিক ছুটি প্রবর্তন করা, ও ভারতবর্ষে পাশ্চাত্য শিক্ষা প্রবর্তনের পক্ষে মত প্রদান করা, উদার ও ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষাদর্শনের সূচনাও সেই করেন। তিনি বরাবরই মাতৃভাষার মাধ্যমে শিক্ষাগ্রহণের পক্ষপাতী ছিলেন। বর্ণপরিচয় গ্রন্থে তার লিপিসংস্কারই বাংলা আদর্শলিপি আদর্শ হয়ে আছে আজো তাই। মূলত আজকের নবজাগরণের চিন্তা চেতনার ভিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর আজ থেকে দুশো বছর আগেই তার কর্ম ও ভাবনায় প্রকাশ করে গেছেন, যা হয়তো আজকের প্রজন্মের অনেকেই জানেন না।
আজকের সমাজে বাল্যবিবাহ বন্ধে যে আইন প্রণয়ন করে, বাল্য বিবাহ রোধ করা করছি, সেই বাল্যবিবাহ বন্ধ করার স্বপক্ষে প্রথম প্রতিবাদ ও প্রচার করেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরই, আবার আমরা এটাও জানি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর তিনি একজন সংস্কৃত শাস্ত্রের বড় মাপের পণ্ডিত হওয়া সর্তেও নারী মুক্তি ও নারীদের উপর অন্যায় অত্যাচারের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আন্দোলন করেছেন এবং সে আন্দোলনের সফলতা হিসাবে ১৮৫৬ সালে তৎকালীন সরকার বিধবা বিবাহ কে আইনসিদ্ধ বলে ঘোষণা করেন, যা নারী মুক্তির জন্য একটি অনন্য মাইল ফলক। সমাজে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কুসংস্কার ও ধর্মবর্হিভূত একটি আচার ছিল যে বিধবাকে বিবাহ করা যাবে না, সেটা সে প্রমাণ করেছেন সফলতার সাথে। তার এই সমাজ সংস্কার পৃথিবীর আলো বাতাস যতদিন বইবে ততদিন উজ্জ্বল থেকে আরো উজ্জ্বলতর হয়ে ধরা দেবে যুগযুগান্তরে। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মত সমাজ সংস্কারক শতশত বছরে একজনই হন। তিনি যে শুধু আন্দোলন বা সংস্কারকই ছিলেন তা নয়, আমরা জানতে পারি তার স্বীয় পুত্র ও এক ভাগ্যহীনা বিধবা নারীকে বিবাহ করেন। সে জন্য সেই সময়ের রক্ষণশীল সমাপতিদের কঠোর বিদ্রুপ ও অপমান সহ্য করতে হয় তাকে। এখানে আরো একটি কথা বলতে পারি জ্ঞানী হলেই মহৎপ্রাণ মানুষ হওয়া যায়না। সেজন্য মুক্তচিন্তার ও মুক্তবুদ্ধির স্বার্থহীন মানুষ হতে হয়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর যখন নারী মুক্তির ও নারী শিক্ষার আন্দোলন করেন, তখন তার এই মহৎ উদ্যোগকে তখনকার সমাজের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা সেই আন্দোলনের জন্য নিন্দা করেন। সেই সাথে তখনকার কবি ঈশ্বরচন্দ্র গুপ্ত অত্যন্ত হীন বাক্যবানে নারী মুক্তি আন্দোলনের ব্যঙ্গ করতে দ্বিধা করেননি।
তবুও ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সেগুলোর তোয়াক্কা না করে তার আন্দোলন চালিয়ে যান এবং তার জীবদ্দশাতেই সে আন্দোলনের ব্যাপক জনপ্রিয়তা তিনি দেখতে পান।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে নিয়ে আলোচনা করতে গেলে বহু সময়ের প্রয়োজন তাকে বুঝবার জন্য, তার সাহিত্য কর্মকে জানবার জন্য সাধনা ও একাগ্রতা দরকার। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে বাংলা সাহিত্যে মনে করা হয়, বাংলার প্রথম সার্থক গদ্যকার। যদিও তথ্যগতভাবে বাংলা গদ্যের জনক তিনি নন। কারণ ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্যে প্রবেশের আগেই গদ্য রচনার সূত্রপাত ঘটেছিল। কিন্তু সে সকল গদ্য রচনা ছিল শিল্পগুণ বিবর্জিত। তাই ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের লেখা সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বলেছিলেন “বিদ্যাসাগর বাংলা গদ্য ভাষার উচ্ছৃঙ্খল জনতাকে সুবিভক্ত, সুবিন্যাস্ত, সুপরিচ্ছন্ন ও সুসংহত করিয়া তাহাকে সহজ গতি ও কর্মকুশলতা দান করিয়াছিলেন” এই মূল্যায়ন থেকেই বোঝা যায় যে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর একজন সার্থক সাহিত্যে স্রষ্টা ছিলেন।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর সাহিত্যে স্রষ্ঠা হিসাবে- শিক্ষামূলক গ্রন্থ রচনা করেছেন, বর্ণ পরিচয়, ঋজুপাঠ, সংস্কৃত ব্যাকরণের উপক্রমনিকা ও ব্যাকরণ কৌমুদী। এছাড়াও তার অনুবাদ গ্রন্থ- হিন্দি, সংস্কৃত ও ইংরেজি ভাষা থেকে ১২টি গ্রন্থ প্রকাশ হয়। তার মৌলিক গ্রন্থ ১৪টি প্রকাশিত, সম্পাদিত গ্রন্থ ১৪টি বলে জানা যায়।
আমি বলবো একজন সফল মানুষ বলতে যা বোঝায় ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ছিলেন তাই। তার মাঝে মানব প্রেম যেমন উজ্জ্বল ছিল তেমনি ছিলেন তিনি দৃঢ়চেতা প্রতিবাদী অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখর একজন সমাজ সংস্কারক, তেমনি তিনি ছিলেন মা ভক্ত প্রাণ, মায়ের আদেশ সে কখনোই অমান্য করেননি সেটা হোক যত বড় কঠিন। তেমনি ছিলেন একজন সাহিত্যে স্রষ্টা যা আমাদের শিক্ষাগ্রহণের হাতে খড়ি হয় তারই রচিত বই বর্ণপরিচয় দিয়ে। একজন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে পাঠ করলে ও তার কর্মগুলো জীবনে যদি আমরা বাস্তবায়ন করতে পারি তাহলে বলতেই পারি। বর্তমান এই অস্থির ও অনিয়মে ভরা দেশ ও সমাজটাকে আমরা আবারো সুন্দরে সাজিয়ে তুলতে পারি।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!