জানি না।
: যা জানেন না তা বলেন কীভাবে?
: দয়াকরে আমাদের চুপচাপ বসে থাকতে দিন। সারারাত আমরা কেউ ঘুমাতে পারি নাই।
লোকটা চলে গেল। মাহাবুব ভাই প্রবীন মাঝিকে জিজ্ঞেস করলেন: আপনি তো এই এলাকার লোক। তাকে কি চেনেন?
: জি চিনি। তার নাম ইলিয়াস মাতুব্বর। এইবার আবার চেয়ারম্যান হইছে। এখন নাম হইছে ইলিয়াস চেয়ারম্যান। লোকটা পিঁচাশ প্রকৃতির। টাকা ছাড়া দুনিয়ায় আর কিছু চেনে না।
: তার এত ক্ষমতা কিসের?
: রাজনীতি করে। যখন যে দল ক্ষমতায় সে তখন সেই দলের নেতা। তার ক্ষমতা কোনোদিন শেষ হবে না।
: আপনার ধারণা ভুল। সব কিছুরই শেষ আছে। কোনো না কোনোদিন তার ক্ষমতাও শেষ হবে। আজ সে মানুষকে হাজত থেকে বের করার জন্য টাকা চাইতে আসছে। তার জীবনে এমন দিন আসবে যখন সে অন্যের পা ধরবে নিজের মুক্তির আশায়। ওর আশার গুড়ে বালি হবে।
: তাই য্যান হয়। মরণের আগে এই পিচাশটার ক্ষমতার বিনাশ দেইখা যাইতে চাই।
কিছুক্ষণ পর একজন পুলিশ এল। বলল: আপনারা কি হাজী ইলিয়াস মাতুব্বরের সাথে টাকা-পয়সার কোনো চুক্তি করেছেন?
আকমল ভাই বললেন: প্রশ্নই আসে না। আমরা ভাঙবো কিন্তু মচকাবো না।
: গুড, ভেরি গুড। আমাদের ওসি স্যার অন্যরকম মানুষ। আপনারা যদি কোনো অপরাধ না করে থাকেন তো আপনাদর কোনো সমস্যা হবে না। তবে ভয় খেয়ে হাজী সাবের সাথে যদি কোনো চুক্তি করেন তো বিপদে পড়বেন। অপরাধ না করলেও একজন খারাপ মানুষের সাথে চুক্তি করার জন্য বিপদে পড়বেন। যাকগে, বাচ্চারা তোমরা আমার সাথে এসো।
ফস করে গুল্লু বলল: শুধু আমরা যাব?
: শুধু তোমরা আসবে।
: তারা?
: তোমরা ভিকটিম, আর তারা আসামী। তাই তাদের থেকে তোমাদের আলাদা করতে হবে। আসো, কাম উইথ মি।
: না, আমরা তাদের ছেড়ে কোথাও যাব না। উই লাভ দেম।
: ইউ লাভ দেম! তার মানে তোমাদের মগজ ধোলাই হয়ে গেছে। এখন তো সন্দেহ অন্যদিকে মোড় নিলো। শুধু শিশু পাচারকারী না, তাদেরকে জঙ্গি বলে সন্দেহ হচ্ছে। মগজ ধোলাইয়ের কাজ জঙ্গিরা করে। মনে হইতেছে ইংলিশ মিডিয়ামে পড়া আধুনিক জঙ্গি।
আকমল ভাই গুল্লুকে ধমক দিয়ে বললেন: পুলিশ কি তোর দুলাভাই লাগে যে, এত তর্ক করছিস? পুলিশের সাথে ব্যাদবি না করে যেতে বলছে যা।
আমাদেরকে যে ঘরে নিয়ে বসালো সেটা বেশ বড়। মেঝো টাইলস করা। বেশ পরিচ্ছন্নও। পুলিশ বলল: ওয়াশরুম আছে। আধুনিক ওয়াশরুম। হাগা-মুতার দরকার থাকলে হাগা-মুতা করো। তারপর হাত-মুখ ধুয়ে ফ্রেস হও। তোমাদের জন্য খাবার আসতেছে।
‘হাগা-মুতা’ শব্দযুগল আমাদের সবাইকে বিরক্ত করলো খুব। গুল্লু কড়া কন্ঠে বলল: পুলিশরা এত বাজেভাবে কথা বলে? ‘হাগা-মুতা’ কেমন শব্দ?
: পুলিশরা এর চেয়ে বাজেভাবে কথা বলতে পারে। চোর-ছ্যাচ্চরদের প্রচুর গালাগাল করে। কেউ কেউ বাপ-মা তুলে গালাগাল করে। তবে আমি সেটা করি না। কোনো বাবা-মা তার সন্তাকে চোর-ছ্যাচ্চর বানায় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে বাপ-মায়ের অবহেলা থাকে। তোমাদের বয়স কম। তাই অভিজ্ঞতা কম। চোর, ছ্যাচ্চর, গুন্ডা-পান্ডা, ঘুষখোর, দুর্নীতিবাজ, ধর্ষক, চাঁদাবাজ, জঙ্গি এইসব খারাপ ধরনের লোকজনের সাথে পুলিশের কাজ-কর্ম। তাই বেশিরভাগ সময় মাথা ঠিক থাকে না। যাও, হাগা-মুতা করে হাত-মুখ ধুয়ে আসো। তোমাদের জন্য খাবারের ব্যবস্থা আছে।
আমরা প্রয়োজন মতো নিজেদেরকে ফ্রেস করে নিলাম। ঘরের এক পাশে একটা টেবিল ছিল। তার ওপর ছিল টিস্যু পেপারের বক্স। আমরা টিস্যু পেপার দিয়ে হাত-মুখ মুছলাম। তারপর চুপচাপ বসে রইলাম।
বাইরে ফর্সা হয়ে গেছে। মানে রাত শেষ হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে কিছুটা শীতল বাতাস আসছিল। বৃষ্টি ভেজা বাতাস বলে শীতল। জানালার বাইরে একটা আমগাছ। আমগাছের ডালে একটা কাক জুবুথুবু হয়ে বসে আছে। বেচারা যে খুব কষ্টে আছে তা বোঝা যায়। কাকদের জন্য ভালো সময় হলো শীতকাল। এসবময় ওদের পালক মসৃন ও চকচকে হয়। তবে ওর চেয়ে কষ্টে আছি আমরা। গতকাল সন্ধ্যায়ও কি আমরা ঘুণাক্ষরে ভাবতে পেরেছিলাম যে, আমাদের রাত কাটবে পুলিশ হেফাজতে?
কাকটা থেকে থেকে ডেকে উঠছিল। কিন্তু আওয়াজটা তত বেশি না। মনে হয় গলাটা বসে গেছে। ডেকে ওঠার সময় ওর পুরো শরীর কেঁপে উঠছিল।
শিবলু বলল: এরা মাহাবুব ভাই, আর আকমল ভাইকে শিশু পাচারকারী মনে করলো। আমাদেরকে মনে করল কিডনাপ হয়ে যাওয়া শিশু। এইরকম অনুমান শক্তি নিয়ে এরা পুলিশের চাকরি করেছ। মাসে মাসে বেতন পাচ্ছে। আশ্চার্য!
নদু বলল: এই দেশে যারা বড় বড় চাকরি করছে, মোটা বেতন পাচ্ছে তাদের অনেকেই নিজেদের কাজে দক্ষ না। কিন্তু যারা ছোট কাজ করে তারা তাদের কাজে পুরোপুরি দক্ষ। আমাদের কৃষকরা তাদের কাজে দক্ষ। কামা-কুমার-জেলে-তাঁতি তাদের কাজে দক্ষ। আমাদের ঐ মাঝি দু’জনের কথা ভাব। তাদের দক্ষতায় এতটুকু ঘাটতি নেই।
আমি জানালায় তাকিয়েই রইলাম। এসব গুরুগম্ভীর মাস্টারি কথাবার্তায় আমার আগ্রহ নেই। আর কেউও কিছু বলল না। শিবলু আর নদু নিরাশ হয়ে চুপ করল।
একটু পর দু’জন লোক এল। তাদের পরনে পুলিশের ইউনিফর্ম নেই। একেবারে সাদা পোশাক। এরা হয়তো থানার কর্মচারী। তারা এসেছে ভাত-তরকারি নিয়ে। বড় একটা গামলা ভরে ভাত। আরেকটা গামলায় তরকারি। ঘরের পাশের টেবিলটায় ভাত-তরকারি নামিয়ে রেখে নিঃশব্দে চলে গেল। আমাদের কারও দিকে তাকালো না পর্যন্ত।
একটু পর ফিরে এল প্লেট, গ্লাস, আর জগ ভরে পানি নিয়ে। এবার তারা আমাদের দিকে তাকালো। একজন বলল: তোমরা একটা করে প্লেট নাও। ভাত-তরকারি দিতেছি। চুপচাপ খেয়ে বসে থাকবা। সারা রাইত ঘুমাও নাই। ঘুম পাইলে দেয়ালে ঠেস দিয়ে ঘুমাবা।
আমি বললাম: আমরা রাতে খেয়েছি। আবার রাত বারোটার পরে নাস্তা হয়েছে। আমরা এখন খেতে পারবো না।