ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৮)

কিশোর উপন্যাস

ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

৮।।
তাদের পরনে গেরুয়া পোশাক। মাথায় লম্বা চুল। গলায় নানা রকমের মালা। তাদের কারও কাছে একতারা, কারও হাতে দোতারা, কারও হাতে ঢোল। সবার কাঁধেই গেরুয়া রঙের ঝোলা ব্যাগ। বৃষ্টিতে ভিজে তারা জুবুথুবু হয়ে যায়নি। কারণ প্রত্যেকের গেরুয়া বসনের ওপর আছে সাদা রেইনকোট। বাড়তি আছে ছাতা।
মাহাবুব ভাই বললেন: আকমল, তুই আমাকে একেবারেই চমকে দিলি বন্ধু। তুই যে বাউল শিল্পী নিয়ে আসবি তা ঘুণাক্ষরেও ভবিনি।
ঘরে প্রবেশ করতে করতে আকমল ভাই হাসিমুখে বললেন: একদিন আমার খুব দুর্দিন ছিল। হাতে টাকা-পয়সা থাকতো না। বন্ধুদের জন্য কোনো দিক দিয়েই কিছু করতে পারতাম না। বলা যায়, এখন আমার সুদিন এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে টাকা পাই। ছবির বিক্রিও বেড়েছে। আমার ছবির প্রদর্শনও হচ্ছে মাঝে মাঝে। এখন আমি বন্ধুদের জন্য কিছু করতে চাই। তুই এতগুলো ছেলে নিয়ে এই বৃষ্টির রাতে আমার এখানে আছিস। রাতটা যদি একটু স্মরণীয় না করতে পারি……।
বাউলরা ঘরে এসে বসলেন। আকমল ভাই আমাদের উদ্দেশ্যে বললেন: তোদের মনে আরও বিশেষ কোনো ইচ্ছা আছে না কি? থাকলে বল। পূরণ করে দেবো। যদি বলিস তো ঢাকা থেকে একটা ব্যান্ডদল ডেকে আনবো। বাউল এবং ব্যান্ড একসাথে চলবে। আমি বললাম: না, ব্যান্ডের দরকার নেই। আমরা বাউল গান শুনতে চাই।
: বাউল গান তো শুধু কান দিয়ে শুনলে হবে না, অন্তর দিয়েও শুনতে হবে।
: আমরা অন্তর দিয়েও শুনবে।
: ধন্যবাদ। তাহলে চা-নাস্তাটা ঝটপট সেরে নেয়া যাক, তারপর…..।
আমাদের তো চা-নাস্তা হয়ে গিয়েছিল। বাউলরা নাস্তা পর্ব শেষ করলেন। তাদের খাবার খুবই সামান্য। একটা টোস আর একটু চায়ের বেশি তারা কিছু খেতে চাইলেন না। তারপর গান-
লালন শাহের গান
হাসন রাজার গান
শাহ আব্দুল করিমের গান
আরও অনেকরে গান
গানের তালে আমরা মাথা দোলই। তারপর শরীর দোলাই। তারপর কেউ কেউ গায়কের সাথে দাঁড়িয়ে নাচতে শুরু করি। অভূতপূর্ব এক ভালো লাগার অনুভূতি। এমন নির্ভেজাল সুখ আর আনন্দ এর আগে আমরা খুব কমই পেয়েছি। সবচেয়ে বড় কথা বাংলা গানের বিশেষ এক মূল্যবান ধারা বাউল গান আমাদের অস্তিত্তে বিশেষ আবেদন সৃষ্টি করলো।
কখন যে রাত দশটা বেজে গেছে তা কেউ খেয়াল করিনি। খেয়াল হলো যখন রাতের খাবার এল।
আকমল ভাই সব বলে এসেছিলেন। আগের ছেলেটার সাথে আরেকটি ছেলে এসেছে। কারণ এবার খাবারের পরিমাণ বেশি।
সাদা ভাত। ইলিশ মাছ আলু আর পোটল দিয়ে ঝোল করে রান্না। আর ডাল। ছেলে দু’টি ভাত-তরকরির সাথে ফ্লাস্ক ভরে চা-ও নিয়ে এসেছে। আকমল ভাই বললেন: তোমরা যদি গান শোনো তো বসো।
সঙ্গে সঙ্গে ছেলে দু’টি বসে পড়ল। আরও ঘন্টা খানেক গান চলল। ছেলে দু’টিও খুবই মজা পেল। আচানক বড় ছেলেটি বলল: আমি একটা গান বানাইছি। একা থাকলে নিজে নিজে গাই। গানটা কি এইখানে গাওয়া যাবে? দোতারার সাথে কেমন হয় দেখার ইচ্ছা।
ছেলেটার কথা শুনে আমরা অবাক হলাম। বাউলরা খুব খুশি হলেন। একজন বাউল বললেন: গাও বাবা, গাও….।
ছেলেটা গাইল:
মানুষ হয়ে মানুষরে তুই
মানুষরে ক্যান চিনলিনা
এত কিছু খুঁজলি ভবে
মানুষরে তো খুঁজলি না।
সদাই জপিস আল্লা-খোদা
ভগবান ঈশ্বর
মানুষ ছাড়া সে কোথায় আছে
মনরে জিজ্ঞাস কর।
সে যে অসীম ক্ষমতাবান
তার ক্ষমতার শ্যাষ নাই
ক্ষমতা সে পাইলো কোথায়
মানুষ কি তা দেয় নাই?
তাই তো মানুষরে ভজ
মানুষের কর সেবা
বুঝবি তখন খাস দিলে
আল্লা-খোদা কেবা।
মানুষ হইয়া মানুষরে তুই…..।
ছেলেটার কন্ঠ খুবই সুন্দর! শুধু মাহাবুব ভাই আর আকমল ভাই না, বাউলরাও তার কন্ঠের অনেক প্রশংসা করলেন। তার গান আমাদের ভালো লাগলো। কিন্তু গানের অর্থের গভীরতা ঠিকমতো ধরতে পারলাম না।
আকমল ভাই বললেন: তোমাদের ফিরতে তো অনেক দেরি হয়ে গেল। কাল তোমাদের মালিককে আমি বলে দেবো…।
: জি না স্যার, কিছু বলতে হবে না। আমাদের ডিউটি টাইম শেষ হয়া গেছিল। আর আমাদের মালিক মানুষটা খুব ভালো। আমাদের যথেষ্ট স্বাধীনতা দেন। বলল শিল্পী ছেলেটা।
সকালে ঘুম ভাঙতে ভাঙতে বারোটা। আগের দিনের ভ্রমণের ক্লান্তি ছিল। রাতে গান-বাজনা শুনেছি। তার ওপর রাতের খাওয়াটা ছিল বেশ। রাতের খাওয়া যত ভালো হয়, ঘুম নাকি তত ভালো হয়। ক্ষুধা পেটে ঘুম আসে না।

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!