ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ৪)

কিশোর উপন্যাস

ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

৪।।
বাস ছিল যথেষ্টই। বাসচালক, কনডাক্টর, হেল্পারদের মধ্যে যাত্রী পাওয়ার প্রতিযোগিতাও ছিল। তবে যাত্রী কম। বাসের চাকা অর্ধেক পানিতো ডোবা।
একটা বাস এসে থামলো। বড়ো বাস। মাহাবুব ভাই বললেন: গাবতলী?
: ওঠেন! বাসের গায়ে সজোরে থাপ্পর দিল কন্ডাক্টর। হাত ভেজা বলে থাপ্পর সেভাবে না লেগে পিছলে গেল।
মাহাবুব ভাই বললেন: আমরা তেরোজন। সিট হবে?
: তেত্রিশ জনেরও হবে। ওঠেন!
আমাদের চেয়ে সিনিয়র-কলেজপড়ুয়া কিছু ছাত্র-ছাত্রী বাসের সামনে ভিড় করেছিল। মেয়েগুলোর কিছুটা অস্থিরতা দেখা যাচ্ছিল। নিশ্চয় বাপ-মা উদ্বিগ্ন আছে। তাড়াতাড়ি বাসায় ফেরা দরকার। তাদের আগে ওঠা দরকার। সিট না পেলে ভেজা কাপড়ে বাসে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েদের জন্য সমস্যা।
মাহাবুব ভাই কালচার্ড লোক। আগে ওঠার জন্য মেয়েদের রাস্তা করে দিলেন। মেয়েরা নিজেদের মধ্যে নিজেরাই ধাক্কাধাক্কি শুরু করে দিল। একটা মেয়ে পেছন থেকে তীরবেগে ছুটে এসে বাসে উঠতে গিয়ে পিচ্ছিল হাত দিয়ে দরজার হাতল ধরে রাখতে পারলো না। আমি চুপচাপ দরজার নিচে একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলাম। সে আমাকে টেন ধরে রক্ষা পেতে চাইলো। আমাকে ধরতে পারলো না, কিন্ত ভীষণ এক ধাক্কা দিল। আমি পড়ে গেলাম। একটা ম্যানহোল। সেখানে পানির ঘূর্ণীপাক চলছে। আমি সেই ম্যানহোলে ঢুকে গেলাম। প্রথম কেউ ব্যাপারটা খেয়াল করেনি। আমার বুক পর্যন্ত ডুবে গেছে এবং ক্রমশ তালয়ে যাচ্ছি দেখে আমার সঙ্গিদের টনক নড়ল। মাহাবুব ভাই আর ফেকু আমার দুই হাত টেনে ধরল। আমাকে টেনে তুলল। নোংরা পানিতে আমার যা অবস্থা! আমার গা গুলিয়ে বমি আসতে লাগলো।
মাহাবুব ভাই বললেন: আর একটু হলেই তো ভয়ানক কেলেঙ্কারি হয়ে যেত। তুই সোজা বুড়িগঙ্গায় গিয়ে নামতি। আর আমি হতাম মর্ডার কেসের আসামি। বিয়ে করার মিথ্যে নাটক সাজিয়ে আমার ছেলেকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করেছে-এইভাবে তোর বাপ কেস সাজাতো।
আমার বাবা কিভাবে কেস সাজাতেন, সেটা আমার চিন্তার বিষয় ছিল না। আমার খুব রাগ হচ্ছিল সেই মেয়েটার ওপর। আমি তার দিকে গরম চোখে তাকাচ্ছিলাম। মেয়েটা শুধু বলছে: সরি ভাইয়া, রং হয়ে গেছে। সরি, এক্সট্রিমলি সরি।
আমি বললাম: তুমি এখানে একটা ডুব দিয়ে আসো, তাহলেই আমি তোমাকে ক্ষমা করবো। না হলে হাশরের মাঠে দাঁড়িয়ে আমি প্রথমেই তোমার নামে বিচার দিব যে, এই মেয়ে আমাকে গু-এর সাগরে ফেলে দিয়েছিল।
: হাশরের মাঠ কই পাবা? ঐগুলা কল্পনা। পরকাল বইলা কিছু নাই। মরণেই সব শেষ। স্টিফেন হকিং বলেছেন, মানুষ মৃত্যুকে, অন্ধকারকে ভয় পায় বলে ঐসব কল্পনায় বিশ্বাস করে। আমি হকিং-এর সাথে একমত। তুমি যদি আমাকে ক্ষমা করতে না পারো, যদি আমার শাস্তি চাও তাহলে পুলিশের কাছে বা আদালতে আমার নামে বিচার দাও। মরণের পর সেরকম কোনো চাঞ্চ পাবা না।
এই মেয়ে স্বয়ং বিস্ময় হয়ে দেখা দিল উপস্থিত সবার কাছে। সবাই বিরাট চোখে তাকিয়ে তার দিকে। এক দল মানুষ সে বিস্ময় নিয়ে মেয়েটার দিকে তাকিয়ে আছে তা দেখে আমি মেয়েটাকে ক্ষমা করে দিলাম।
কন্ডাক্টর বাসের গায়ে থাপ্পর মেরে হাক দিল। আরে তাড়াতাড়ি ওঠেন! পেছনের বাস আগে চইলা যাইতেছে। শেষে আমাগো ওস্তাদ খালি ওভারটেক করার তালে থাকবে। এই সাগরের মধ্যে ওভারটেক করা কঠিন।
বাসে উঠে সবাই যথারীতি আসন পেল। সেই মেয়েগুলো জানালার পাশের আসনগুলো দখলে নিলো। আমার জন্য খালি থাকল মাঝ বয়সী এক খালাম্মার পাশের আসন। আমি সেখানে বসতে যেতেই খালাম্মা চিৎকার করে উঠল: এই পোলা-এই পোলা, তুমি এইখানে বসো ক্যান?
: সিট তো খালি আছে।
: সিট খালি আসে বইলাই তুমি বসবা? যাও, অন্যদিকে যাও।
: আর কোনো সিট তো খালি নাই।
: তায়লে খাড়ায়া থাকো।
: হাত ভেজা। রড ধরে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। কারও ওপর পড়ে যেতে পারি।
: যার উপ্রেই পড়ো, আমার উপ্রে পইড়ো না। উহঃ….!
খালাম্মা নাকে কাপড় চেপে ধরল। তার পেছনেই বসেছে সেই মেয়ে, যে আমাকে ধাক্কা দিয়ে ম্যানহোলে ফেলে দিয়েছিল। পাশে তার এক বান্ধবী। মেয়েটা সব দেখল, সব শুনল। সে তো তার বান্ধবীকে বলত পরতো, তুই গিয়ে ঐ খালাম্মার পাশে বস, আর সে আমার পাশে বসুক। গু-এর সাগরে তো আমিই তাকে ফেলে দিয়েছিলাম।
না, তা সে বললো না।
ব্যাগ থেকে সেলফোন বের করে সে পটাপট বৃষ্টির ছবি তুলতে লাগল। এই ছবি ফেসবুকে পোস্ট করবে, কত আবেগী ক্যাপশন লিখবে। এই বৃষ্টিতে ভিজে সে ধন্য হয়ে গেছে। এক অবর্ণনীয় অনুভূতি অর্জন করেছে। হাজার হাজার লাইক আর কেেমন্টের বন্যায় ভেসে যাবে তার পোস্ট। বাস্তবিক বৃষ্টিটা যে তার জন্য কতটা বিরক্তি নিয়ে এসেছে তা জানি আমি। তার ভাগ্য ভালো যে, তার ফ্রেন্ড লিস্টে আমি নেই। থাকলে ঠিক ঠিক সত্যটা প্রকাশ করে দিতাম কমেন্ট লিখে।
আমি মেয়েটার থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নিলাম। তাকালাম সেই খালাম্মার দিকে। দেখি খালাম্মা ফোনের স্ক্রীনে লিখছেন-‘আজ এই বৃষ্টির কান্না শুনে, মনে পড়ল তোমার অশ্রু ভেজা দু’চি চোখ।’

ক্রমশ…

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!