মাহাবুব ভাই উত্তর দিলেন না। গুল্লুর থেকে মুখ ফিরিয়ে বসে রইলেন।
নৌকার প্রবীন মাঝি বললেন: ওগুলো ইলিশ মাছ ধরার নাও-এর হারিকেনের আলো। আপনারা যদি যাইতে চান তো তাদের কাছে নিয়া যাবো।
গুল্লু বলল: আমরা যাবো। জীবনে তাজা ইলিশ মাছ দেখি নাই। এদেশের সব মানুষেরই প্রিয় মাছ ইলিশ, কিন্তু বেশির ভাগ মানুষই তাজা ইলিশ দেখে না। আমরা দেখবো। মাহাবুব ভাই, আপনি কি তাজা ইলিশ দেখেছেন?
মাহাবুব ভাই আস্তে ঘাড় ঘুড়িয়ে গুল্লুর দিকে তাকালেন। গম্ভির কন্ঠে বললেন: তুই কি তাজা তিমি বা হাঙর দেখেছিস?
: তিমি বা হাঙর আমাদের নদ-নদীতে থাকে না। ওসব আমরা খাইও না। রূপালী ইলিশ আমাদের জাতীয় মাছ। সারা পৃথিবীতে এর সুনাম আছে। এই মাছটা তাজা দেখার মধ্যে দেশ প্রেমের অনুভূতি কাজ করে।
মাহাবুব ভাই গুল্লুর কাছে হালে পানি পেলেন না। গুল্লু আমাদের স্কুলের সেরা বিতার্কিক।
চল্লিশ/পয়তাল্লিশ মিনিট পর আকমল ভাই ফিরলেন। তার দুই হাতে ছোট-বড় কয়েকটা ব্যাগ। বললেন: ধর ধর, পড়ে গেল।
আমরা ছুটে গিয়ে একেকজন একে ব্যাগ হাতে নিলাম।
আকমল ভাই অনেক কিছু এনেছেন। পরোটা, সবজি তরকারি, ডিম ভাজি, আপেল, পেয়ারা, শশা, টমেটো। এছাড়া চানাচুর আর বিস্কুট।
আমি বললাম: এত খাবার কে খাবে?
আকমল ভাই বললেন: সারা রাত নৌকায় থাকবো। গল্পে গল্পে খেয়ে ফেলবো। মাঝি ভাইয়েরাও তো আছে।
মাহাবুব ভাই ফস করে বলে উঠলেন: আমি কিছু খাবো না।
আকমল ভাই ব্যাগগুলো একপাশ করে রাখতে রাখতে বললেন: তুই দেখি শিশুদের মতো অভিমান করিস। মনে হচ্ছে, তোর ঠিক হয়ে যাওয়া বিয়ে আমরা ভেঙে দিয়েছি। কতগুলো ছেলে নিয়ে এসেছিস। ওদের সাথে আনন্দ কর। তুই যে উদ্দেশ্যে এসেছিস তা সফল হবে।
আমরা খেতে বসলাম। আকমল ভাই মাঝি দু’জনকে ডাকলেন। প্রবীন মাঝি বললেন: আপনারা খান। আমরা সাঁঝবেলায় কিছু খাইছি।
: সাঁঝবেলায় খেয়েছেন বলে এখন খাওয়া যাবে না, এটা কোনো কথা নয়। সারারাত নৌকা চালাতে হতে পারে। এই ছেলেদের যেমন আগ্রহ দেখছি, হয়তো এরা রাতে ঘুমাবে না। আসেন, কিছু খেয়ে নেন।
মাঝিরা খেতে এল।
খাওয়া বেশ ভালোই হল। সবজিটা হয়েছিল বেশ। আলুর সাথে কয়েক রকমের সবজি মিক্সড করে রান্না। বেশ সুগন্ধও। সগীর বলল: মানিকগঞ্জের মানুষের রান্না মনে হচ্ছে ভালো। মাহাবুব ভাই এখানে বিয়ে করতে পারলে ভালো ভালো খেতে পারবেন। আমরাও মাঝে মাঝে খেতে পারবো। গাব্বু, তোর মামীদের হাতের রান্না কেমন?
: কাল খাওয়ার পর নিজেই বুঝবি।
রুটি খাবার পর আমরা টুকটাক ফল খেলাম। নদীর পানিতে ধুয়ে শশা কামড়ে খেলাম। বৃষ্টি কিছুটা কমেছে। ইলশেগুড়ি বুষ্টি আছে।
আকমল ভাই বললেন: মাঝি ভাইয়েরা, তাহলে নৌকা ছেড়ে দিন।
মাঝিরা নৌকা ছেড়ে দিলো। পেছনে প্রবীন মাঝি, আর সামনে নবীন মাঝি।
ক্যাবলা বলল: মাহাবুব ভাই, একটা গান শুরু করেন। এই পরিবেশে আপনার ভরাট কন্ঠের গান খুব মানাবে।
মাহাবুব ভাই গরম চোখে ক্যাবলার দিকে তাকালেন।
আকমল ভাই বললেন: মাঝি ভাইয়েরা কি গান জানেন?
প্রবীন মাঝি বললেন: এক সময় গান গাইতাম। না’এ উঠলেই বুকের ভেতর থিকা গান বাইর হয়া আসতো। এখন আর সেইরকম দম পাই না। তয় সুজন ভালো গাইতে পারে।
আমরা এতক্ষণে জানলাম, নবীন মাঝিটার নাম সুজন। সুজন মাঝি। আকমল ভাই বললেন: আপনাদের দুইজনের সম্পর্ক কী?
প্রবীন মাঝি বললেন: ও আমার ভাতিজা। নৌকা চালাইতাম আমি আর আমার বড় ভাই। ও লেখাপড়া করতেছিল। হঠাত আমার ভাইটা মারা গেল। এতবড় নৌকা আমি একা চালাইতে পারি না। নৌকা না চালাইলে পেটের ভাতও জোটে না। শেষে ইস্কুল ছাইড়া ও আমারে সাহায্য করতে আসলো। গরিম মানুষ চাইলেই ভাগ্য ফিরাইতে পারে না।
মাঝির কথায় আমাদের মন খারাপ হল। নবীন মাঝিটার এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার কথা ছিল।
কিন্তু আমরা আসছি আনন্দ করতে। কারও হতভাগ্যের কথা শুনে মন খারাপ করে বসে থাকলে তো চলে না। মাহাবুব ভাই বললেন: সুজন মাঝি, আপনি গান ধরেন।
মাহাবুব ভাই কথা বলে উঠলেন! আমরা একযোগে তাকালাম মাহাবুব ভাইয়ের মুখে। সুজন মাঝি গলা ছেড়ে গাইলো-
কল কল ছল ছল নদী করে টলমল
ঢউে ভাঙ্গে ঝর তু’ফানে তে ।
নাও বাইও না মাঝি বষিম দইরাতে ।।
গগণে গগণে হুংকারযি়া ছুটে মঘে
শন শন বায়ু বয় চৌদকিে ।
মাঝি নমিশিে গুটাইও পাল সামনে ধরযি় হাল
তারা তারি দযি় পারি বঠৈাতে ।
বদরে বদর বলি কনিারে কনিারে চলি
ভাটি গাঙ্গে ভাটযি়ালী গাইও ।
মাঝি থাকলিে জোয়ার বশেি লগী মাইর তারাতারি
বলো বলেি ঘাটে ফরিা আইশ ।।
সুজন মাঝির গান আমাদের ভালো লাগলো। কন্ঠের গভীরতা আছে। সুরও ঠিক আছে। চর্চার যা অভাব। চর্চা করতে পারলো বাংলা গানের জগত আরেকটা আব্দুল আলীম হতে পারতো।