ধারাবাহিক উপন্যাসে আবুল কালাম আজাদ (পর্ব – ১৮)

কিশোর উপন্যাস

ঢাকা টু মানিকগঞ্জ

১৮।।
যে ঘরটায় আমাদের নিয়ে বসালো সেটা ছোট এবং অপরিচ্ছন্ন। এমন ঘরেই বসতে হবে মনে মনে আমরা ভেবেছিলাম। থানার হাজতখানা সম্পর্কে অনেক শুনেছি।
আমরা দেয়ালে ঠেস দিয়ে পাশাপাশি বসলাম। মাহাবুব ভাই বসলেন আকমল ভাইয়ের দিকে পেছন ফিরে। আকমল ভাইয়ের ওপর তার রাগ ও বিরক্তির শেষ নেই। সে মনে করে, যা কিছু ঘটছে সব আকমল ভাইয়ের কারণেই।
মাঝি দু’জন আমাদের সামনের দেয়ালে ঠেস দিয়ে বসলো। তারা হয়তো নিজেদেরকে আমাদের সমান্তরাল ভাবতে পারছে না, তাই আমাদের সারিতে বসলো না। তাদের মুখ পাংশুল। ভীষণ ভয় খাওয়া চেহারা। ঘরটা অপরিচ্ছন্ন হলেও মাথার ওপর একটা সিলিং ফ্যান আছে। কয়েকদিন ধরে টানা বৃষ্টির কারণে পরিবেশ বেশ ঠান্ডা। সিলিং ফ্যান্টাও ঘুরছিল। তারপরও মাঝি দু’জন খুব ঘামছিল।
সবার মুখে এক পলক করে তাকিয়ে আমার চোখ চলে গেল দরজার পাশে একটা গর্তে। সেখানে চিকন ও লম্বা কী যেন নড়াচড়া করছে। সাপ না কি! বর্ষায় গ্রামাঞ্চলে সাপের উৎপাত বাড়ে। ভালো করে খেয়াল করে দেখলাম, সাপ না, সেটা একটা ইঁদুরের লেজ। একটু পর ইঁদুরটাকেও দেখলাম। ইঁদুরটা একবার গর্তে ঢুকছে, আবার বের হচ্ছে। বেশ বড় সাইজের ইঁদুর। যাকে বলে ধারী ইঁদুর। এই সমস্যায় চিন্তামুক্ত থাকার জন্য ইঁদুরটার গর্তে ঢোকা আর বের হওয়া দেখা একট ভালো কাজ।
কতক্ষণ ইঁদুরের দিকে তাকিয়ে ছিলাম ঠিক জানি না। লোহার গেট খোলার শব্দ শুনে গেটের দিকে দৃষ্টি ফেরালাম। আর ইঁদুরটা গর্তের ভেতর পালিয়ে গেল।
একজন গাট্টাগোট্টা বেঁটে ধরনের লোক ঘরে এল। লোকটার গায়ের রঙ কালো, থ্যাবড়ানো নাক, মুখে বসন্তের দাগ। লোকটার পরনের সাদা লুঙ্গি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, পায়ে চটি জুতা, মাথায় মোটা কাপড়ের গোল টুপি। টুপির ভেতর জরির কাজ।
লোকটা বাম হাতে লুঙ্গি কিছুটা তুলে ধরে ঘরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত পর্যন্ত কয়েকবার পায়চারী করল। সবার মুখে একবার করে তাকাল। তারপর গিয়ে থামলো আকমল ভাই আর মাহাবুব ভাইয়ের সামনে। বলল: অপরাধ যাই হোক না কেন, আমাকে এক লাখ টাকা দিলে ছাড়িয়ে দিবো। আমার এলাকায় এসে কেউ সমস্যায় পড়লে আমি তাকে উদ্ধার করি। এই থানার ওসি যদিও খুব সৎ, তবু আমি পারি। আমার হাত আরও ওপরে যায়।
মাহাবুব ভাই বিস্ফোরিত চোখে তাকালেন লোকটা দিকে। চোয়াল ও হাতের মুষ্টি খুব শক্ত হয়ে গেল। মনে হল, এখনই লোকটা ওপর ঝাপিয়ে পড়বেন। কিন্তু না। হাত, পা, চোয়াল শক্ত করে তিনি চুপচাপ বসে রইলেন। কিছু বললেন না।
আকমল ভাই বললেন: আমরা কোনো অপরাধ করিনি।
লোকটা বলল: পুলিশের হাতে যখন ধরা পড়েছেন তখন অপরাধ না করলেও করেছেন। পুলিশ চাইলে শিশুর মতো নিস্পাপ মানুষকেও মার্ডার কেসে ফাঁসিয়ে দিতে পারে।
: দুঃখিত, আমরা আপনাকে কোনো টাকা দেবো না। আমরা আপনার কাছ থেকে কোনো সাহায্য চাই না।
: সেটা আপনাদের ব্যাপার। এটা আমার এলাকা। আমার এলাকায় কেউ বিপদে পড়লে তাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসা আমার নৈতিক দায়িত্ব। কেউ যদি আমার সাহায্য না নেয় তো আমার কিছু করার থাকে না। আবারও বলছি, ভালো করে ভেবে দেখুন। থানা-পুলিশ কিন্তু কারেন্ট জালের মতো। আটকা পড়লে বের হওয়া যায় না।
: ভালো করে ভেবে দেখেছি, আমরা আপনার কোনো সাহায্য চাই না।
: আমি তিনবার হজ্বব্রত পালন করেছি। একবার আমার নিজের, একবার বাবার হজ্ব, একবার মায়ের হজ্ব।
: খুব ভালো করেছেন। আপনার এলাকার সব মানুষের হজ্ব আপনি পালন করেন গিয়ে। হজ্বে সেঞ্চুরি করেন গিয়ে। গিনেজ বুকে আপনার নাম উঠে যাবে।
: গিনেজ বুক কী?

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।