বড় বড় গ্রাসে চিড়েগুড় খাচ্ছে এখন মানুষটা। পৃথিবীর আর কোনও কিছুতে তার এতটুকু ভ্রুক্ষেপ নেই। চনমনে হয়ে উঠছে শরীর। মনটাও খানিক জুরোতে লেগেছে। হঠাৎ ঢং ঢং শব্দে আকাশ বাতাস আন্দোলিত হতে শুরু করলে মানুষটা চমকে ওঠে। খাওয়া বন্ধ হয়ে যায়। জিজ্ঞেস করল,
কিসের ঘন্টা বাজে দয়াল?
আজ্ঞে, মিশনবাড়ির গির্জায় সন্ধ্যার প্রার্থনার ঘন্টা বাজছে গোঁসাই।
তা তোমরা যাইবা না?
আজ্ঞে না, আমাদের মতো হাভাতে ঘরের লোকেদের প্রতিদিন প্রার্থনায় গেলে চলবে কেন। তারপর দয়াল পুলিনের উদ্দেশ্যে বলল, এবার জায়গাটা একটু গোবরলেপা করে দে বাবা।
না, ও গোবরঘাটার কাজ আমার দ্বারা হবে না দাদু। পুলিন কঠিন গলায় অসম্মতি জানাল।
হবে না কি রে, এতবড় অধর্মের কথাটা বলতে পারলি তুই! বিস্মিত হয়ে জিজ্ঞেস করল দয়াল। পরক্ষণেই গলাটা একটু খাদে নামিয়ে নরম সুরে বলল, দে বাবা, দে। এতে তোরই পুণ্য হবে। আরও একটা টাকা না হয় দিচ্ছি।
এক টাকা না, দুটাকা। এই রোদের মধ্যে এতটা পথ হেঁটে বাজার করে আনলাম। দুটাকা দেবে বলেছিলে কিন্তু দিলে এক টাকা। আর দুটাকা না দিলে ওই গোবরে হাত দেব না আমি।
দুটাকা না বাবা, দেড়টা টাকা দিচ্ছি, কাজটা একটু করে দে। গোঁসাইয়ের সেবায় লেগেছিস, তাঁর আশীর্বাদ পাবি। কত পুণ্যের কাজ বলতো! দয়াল বোঝাবার চেষ্টা করে।
না! আরও দৃঢ় গলায় বলে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে পুলিন।
টাকাটা তুমি ঐখানে পরিস্কার জায়গায় রাখ দয়াল। মানুষটা বলল।
মানুষটার এ কথার উদ্দেশ্য যে কী তা বুঝতে পারছে না দয়াল। সে একরকম বিমূঢ় হয়ে দুটো এক টাকার মুদ্রা ওই পরিস্কার জায়গাটায় রাখল।
মানুষটা চিড়েটুকু খাওয়া শেষ করে ঢক ঢক করে বেশ খানিকটা জল খেল। তারপর গোটাকতক তৃপ্তির ঢেঁকুর তুলল। উঠে দাঁড়াল। কিছু শুকনো ঘাস লতাপাতা ছিঁড়ে নিয়ে তা হাতের তালুতে ডলেমুচড়ে ন্যাকড়া মতো করে নিয়ে বাটির বাকি জলটুকু গোবরে ঢেলে নিয়ে জায়গাটা লিপতে লাগল।
দেখে হায় হায় করে উঠল দয়াল, দেখ পুলিন দেখ, কী পাপটাই না করলি তুই! গোঁসাইমানুষটা কিনা নিজের হাতে গোবরলেপার কাজ করছে!
তাতেও পুলিনের মধ্যে কোনওরকম ভাবান্তর নেই। ভাবে, কেন সে ওই সামান্য পয়সায় এত কাজ করতে যাবে? কে এই মানুষটা, কী এর পরিচয়,কেন সে এদের মধ্যে এসে জুটল, কিছুই জানে না পুলিন। সে জ্ঞান বয়স থেকে জেনেছে, শ্রম দিলে তার সঠিক মজুরি মালিককে চুকাতেই হবে। তার বাপ কাকারা পার্টির মিটিংমিছিলে যায়। পুলিনও তাদের সঙ্গে কতবার গেছে। বড় বড় নেতারা সেখানে বক্তৃতা করেছে। বলেছে, শ্রমের ন্যায্য মজুরির কথা। কম কিংবা বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম দেওয়া মানে বেগার খাটা। এই করে গরীব মানুষকে শোষণ করা হয়।
মুদ্রা দুটো যেখানে রাখা হয়েছিল সেখানেই পড়ে থাকল। দয়াল সেদিকে বারবার তাকায়। মানুষটা ভ্রুক্ষেপহীন। তবে ভাবটা এমন, ও দুটো ওখানে আছে থাক না, দেখই না মজাটা কী হয়, গোছের।
ভাত ফুটছে। চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ছে ভাতের গন্ধ। সূর্যটা পশ্চিম আকাশের কোলে আরও কিছুটা ঢলে পড়তে তাপে পোড়া পোড়া পৃথিবীতে সমুদ্রবায়ু রাজত্ব করতে শুরু করে। তাতে করে একটু স্বস্তি বোধ করছে মানুষটা। ক্লান্ত ধস্ত প্রকৃতি ঘুমের কোলে ঢলে পড়ছে। ভাত, আলুসিদ্ধ, মুগডালসিদ্ধ আজকের মতো রান্না করেছে মানুষটা।
চারিদিকে এখন নরম সোনারঙ আলো। পশ্চিম আকাশে কিছু ধূসর মেঘ জেগে উঠছে। খাদ তৈরি করে ওৎ পেতে আছে ক্লান্ত সূর্যটাকে বাগে পেয়ে নিজেদের মধ্যে লুকিয়ে নেওয়ার জন্য। পাখিরা ঘরে ফিরছে। তাদের ডানার ছায়া ছুটছে মাঠঘাট নদী আর বসতের বুক ছুঁয়ে ছুঁয়ে অনেক দূরে।
বসতির পুরুষ মানুষগুলো যখন ফিরল তখন পুরোপুরি সন্ধ্যা নেমেছে। জ্যোৎস্নাপক্ষের রাত বলে চারিদিক পরিস্কার। যত রাত বাড়ছে আরও পরিস্কার হচ্ছে। দয়াল মানুষটার সঙ্গে বসতির পুরুষমানুষগুলোকে পরিচয় করিয়ে দিল। এদের কেউ কেউ ওই দেশে থাকতে মানুষটাকে দেখেছে। বাকিরা এই প্রথম দেখছে। ওদের কয়েকজন মানুষটাকে ভক্তিশ্রদ্ধা দেখাল। কেউ কেউ মানুষটার প্রতি নির্বিকার, উদাসীন। যেন এই মানুষটা তাদের কাছে আর পাঁচটা মানুষের থেকে আলাদা কেউ নয়। তাছাড়া তারা ভিন্ন ধর্মের একজন গোঁসাইমানুষকে নিয়ে মাতামাতি করতে যাবেই বা কেন!
দয়ালের প্রস্তাব শুনে সবাই হৈচৈ বাঁধিয়ে প্রতিবাদ করে উঠল। বলল, কিছুতেই না, সারাদিন হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর এখন আবার ওই কঠিন কাজে হাত লাগাতে বলছ তুমি কোন আক্কেলে শুনি?
দয়াল আকুতিভরা গলায় বলল, মাথা ঠান্ডা করে শোন তোরা আমার কথাটা আগে। তোদের এক্ষুনি কে কাজ করতে বলছে? খাওয়াদাওয়া সেরে একটু বিশ্রাম করে নে সবাই। শরীরটা ঠান্ডা কর আগে। পূর্ণিমার রাত, কাজ করতে অসুবিধা হবে না তোদের। ঘরটার অবস্থা তো দেখেছিস, সারাই করে তুলতে তিন চার রোজের কাজ। পূর্ণিমা থাকতে থাকতে কাজটা তোদের শেষ করে দিতে হবে। আমার সে বয়স থাকলে একাই কাজে নেমে পড়তাম।
এই মানুষগুলো মাটি কাটে, নদী বাঁধ দেয়, পাঁচিল তোলে, চাষআবাদের কাজে মজুরি খাটে। এই করেই সংসার চালায়। একদিন কাজ না জুটলে একরকম পেটে গামছা বেঁধে পড়ে থাকার অবস্থা হয়।
দশমীবুড়ি এতক্ষণ ধরে ওদের কথা শুনছিল। সে বলল, বাবারা, মানুষটা আমাদের ভরসায় ওই দেশ ছেড়ে এদেশে এসেছে। দেশের মানুষ, আমরা তাকে না দেখলে মানুষটা যাবে কোন ঠাঁইয়ে, বল তোরা?
ওরা যার যার ঘরে এল। এই কটা দিন ওদের তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়লে চলবে না। একরকম বিস্মৃত আর অচেনা একজন মানুষকে এদেশের মাটিতে আশ্রয় দিতে ঘর সারাইয়ের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে তাদের। শ্মশানের সেই পঙ্গু সাধুর ওই কুঁড়েঘরটা হবে এই মানুষটার বসবাসের জায়গা। সে সাধু একদিন হঠাৎ কোত্থেকে এসে এই দ্বীপে হাজির হয়েছিল। জটাজুট চুলদাড়ি, রক্তবর্ণ পোশাক, হাতে ত্রিশূল আর কমন্ডুলু। শরীরের বাঁদিকটি পক্ষাঘাতগ্রস্ত। বাঁ বুক, হাত পা, শুকনো হাড়জাগা। তাকে কেউ কোনওদিন কারোর সঙ্গে কথা বলতে দেখেনি। মাধুকরী করতে বেরিয়ে হাতের কমন্ডুলুটা শুধু সামনে বাড়িয়ে ধরত।
পয়সা চাল তরিতরকারি পড়ত তাতে। মুক নির্বিবাদী মানুষটাকে দেখে গ্রামের সবার ধারনা হয়ছিল যে, এই সাধু নিশ্চিত দৈবি ক্ষমতার অধিকারী। কেননা যে বছর সাধু এই গ্রামে এল সেবছর চাষবাস ভাল হয়। অসুখবিসুখ তেমন একটা হয়নি। ঝড়বন্যাও হয়নি। এর সুখ স্বাচ্ছন্দ্য দেখলে তাদের জীবনে আশীর্বাদ নেমে আসবে। সবার মঙ্গল হবে। বাজারকমিটি সিদ্ধান্ত নিল, সাধুর থাকার জন্য ঘর তুলে দেওয়া হবে।
সে ঘরে সাধু থাকলও কয়েকবছর। তারপর হঠাৎ একদিন কোথায় হারিয়ে গেল। অনেক খোঁজ করেও তার কোনও হদিশ পাওয়া যায়নি। গ্রামের লোকেরা আতঙ্কগ্রস্ত হয়ে পড়ল, নিশ্চয়ই তাদের কোনও ভুলের জন্যই সাধু অসন্তুষ্ট হয়ে এই গ্রাম ছেড়ে চলে গেছে। গ্রামবাসিরা তাই অমঙ্গলের আশঙ্কা করছিল। তারপর বছরের পর বছর গড়িয়ে গেছে, সে আশঙ্কাও মানুষগুলোর মন থেকে মুছে গেছে।
বসতির মানুষগুলো একসময় দা,শাবল আর কোদাল নিয়ে বাইরে এসে জড়ো হল। মানুষটা রাতের খাওয়াদাওয়া সেরে নিমগাছটার নীচে গামছা পেতে শুয়ে আছে। শুয়ে শুয়ে সাতপাঁচ কত কথাই না ভাবছে, কোথা থেকে কোথায় এসে পড়ল সে। এতবছরের শোনা, তাদের দেশ, ইন্ডিয়ায় প্রথম রাতটা কাটাতে চলেছে মানুষটা। মাথার ওপর অনন্ত আকাশ এখন তার। কাছেই নোনা নদী জোয়ারের ঢেউ ভাঙ্গছে। ভূমিশয্যা মানুষটার জীবনে এই প্রথম। যতদিন না তার জন্য ঘর উঠছে ততদিন এই গাছতলাতেই তাকে দিন কাটাতে হবে। তবে গরমকাল বলেই বাঁচোয়া। দিনের বেলাটা কোনওরকমে কাটিয়ে দিতে পারলে রাতে খোলা বাতাসে আরামে ঘুম দিতে পারবে। কিন্তু পারু যে কীসব কথা বলল! ভরপেট খাওয়ায় শরীর মন তার এখন চনমনে হয়ে উঠছে। মস্তিষ্কও যেন ঠিকঠাক কাজ করতে শুরু করেছে। এই দেশে এসে সে যে একেবারে জলে পড়েনি সে ব্যাপারে এখন সে নিশ্চিত। থাকার জন্য ঘরের ব্যবস্থা হচ্ছে। ওই তো ওরা দা, কোদাল আর শাবল নিয়ে শ্মশানের দিকে হেঁটে চলেছে, কুঁড়েঘরটা সারাই হবে। তবে শুধু দয়ালদের উপর ভরসা করে থেকে যে তার এদেশে জীবন কাটবে না তা সে ভালই বুঝতে পারছে। যদিও প্রথম দিনেই তার দুটো টাকা রোজগার হয়েছে! এক ফাঁকে ওই একটাকার মুদ্রা দুটো তুলতে যেতেই কোত্থেকে ভেসে এল বীদ্রুপভরা খিলখিল হাসি, সেইসঙ্গে পারুর বাঁকা জিজ্ঞাসা, নিজের কাজ নিজে করলে আর তারও পয়সা নিলে তুমি! আর সে পয়সা জোগাতে হল কিনা আমাদের, আজব মানুষ বটে তুমি গোঁসাই! মানুষটা চুপ করে ছিল। সে বুঝতে পেরেছে, এখন তার সব ঘৃণা, অপমান, অবজ্ঞা সহ্য করে যাওয়ার সময়। যত বাধা আসুক, বিরুদ্ধ কথা উঠুক, ধৈর্য্য ধরে সব সহ্য করতে হবে তাকে। এভাবেই এদেশের মাটিতে একটু একটু করে থিতু হবে সে। কাল থেকেই সে মাধুকরিতে বেরিয়ে পড়বে। কিন্তু একার এই জীবন যে বড় কষ্টের! আর কত দিন! স্বপ্ন দেখে মানুষটা, এদেশের মাটিতে তার সব চাওয়া পূরণ হবে একদিন। ঘুম পায় তার, এ বড় শান্তির ঘুম। তার আগে মনে এক সাধ জাগে, এই মানুষগুলোকে কি কোনওভাবে স্বধর্মে ফিরিয়ে আনা যায় না! যায় কি! তাহলেই তো তার জীবন কত সহজ হয়ে যায়, এই মাটিতে!
তার দুচোখের ওপর অনন্ত আকাশে ধ্রুবতারাটি জ্বলছে, বুকের আশার আলো হয়ে!
দুচোখ মুদে এসেছে মানুষটার। এমন সময় দয়াল এসে তাকে ডাকল। বলল, কটা দিন এখানে একটু কষ্ট করে থাকুন গোঁসাই। কাল একটা মাদুর কিনে দেব আপনাকে।
হুম! আর কিছু বলতে পারছে না মানুষটা এখন। শুধু ডান হাতটা একটু উঁচিয়ে ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে মানা করল মানুষটা।