সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৪০)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৪০ 

আমরা এক্ষুনি আসছি। জ্যেঠু তাদের আবার একটা করে কেক–চা দেয়। প্রথমে তারা কিছুতেই ওসব নিতে চায় না। কারণ জ্যেঠু কিছুতেই তাদের কাছে থেকে দাম নিতে চায় না। বেশি জোরাজুরি করলে বলে , ও আমি বুঝি শুধুই দোকানদার ? কারও জ্যেঠু , কারও দাদা হতে পারি না ? আর কথা চলে না। অগত্যা নিতে হয় কেক–চা। চা খেতে খেতেই নিজেদের দুর্ভাগ্যের কথা ভাবে অঞ্জলি। একের পর এক ঝড় আছড়ে পড়ছে তাদেরই উপরে। কি করে তারা বেঁচে থাকবে তা ভেবে কোন কুল কিনারা পায় না। হঠাৎ নিজের গলা শুনে চমকে যায় সে। সামনে তাকিয়ে দেখে দেওয়ালের কোনে রাখা টিভিতে খবর শুরু হয়ে গিয়েছে। তাকে আর মাকে দেখা যাচ্ছে। তবে মুখটা বোঝা যায় না। অরুণস্যারের বাড়িতে এর আগেও সে এই ধরণের খবরে অন্য মেয়েদের মুখটা আবছা দেখেছে। স্যার বলেছিলেন , মেয়েটাকে যাতে সবাই চিনতে না পারে , মেয়েটি যাতে সবার আলোচনার খোরাক হয়ে না যায় তার জন্যই নাকি ওই ব্যবস্থা। এমন কি নাম ঠিকানা পর্যন্ত গোপন রাখা হয়। তার ক্ষেত্রেও অন্যথা হয়নি। তাদের মতো সব হারানো মেয়েদের সম্মানের কথা এভাবে ভাবার জন্য সংবাদমাধ্যমের ভূমিকাকে মনে মনে প্রশংসা করে সে।
অঞ্জলি দেখে টিভিতে তখন থানার সামনে সেই সাংবাদিককে দেখা যাচ্ছে। তিনি সমানে বলে চলেছেন — গাঁয়ের মোড়লের নির্দেশে রাতভর এক আদিবাসী তরুণীকে গণধর্ষণ করে উসুল করে নেওয়া হল সালিশি সভার ধার্য জরিমানা। ধর্ষকদের নজর এড়িয়ে রাতের অন্ধকারে ৫ কিমি হেঁটে থানায় এসেও মিলল না বিচার। থানা তার অভিযোগই নিল না। এদিকে তার অভিযোগ জানাতে আসার খবর জানাজানি হওয়ার পর গ্রামে ফিরতেও ভয় পাচ্ছে ধর্ষিতা তরুণী আর তার মা। অসহায়ের মতো পড়ে রয়েছেন থানা চত্বরে। মোতিপুর থানা থেকে ক্যামেরায় অয়নের সঙ্গে আমি সুস্মিত। খাসবার্তা, বীরভুম।
খবর শেষ হতেই জ্যেঠু বলে ওঠেন — দেখ এবার খেলা।সে জ্যেঠুর দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই জ্যেঠু ফের বলেন — একে বলে যেমন কুকুর তেমনি মুগুর। এতক্ষণে খবরটা নিয়ে সারা পৃথিবীতে ঢি–ঢি পড়ে গিয়েছে। দেখই না কি হয় ? পুলিশ এবার ডেকে তোমার অভিযোগ নেবে।জ্যেঠুর কথা শেষ হতে না হতেই থানার সামনে একের পর এক লাইন পড়ে যায় মোটরবাইক আর গাড়ির। মাথায় ছাতা লাগানো কয়েকটি গাড়িও পৌঁছোয়। সেই সাংবাদিক দুজনও পৌঁছোন। তারাই অন্যান্য সাংবাদিকদের সঙ্গে তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। একসঙ্গে চালু হয়ে যায় অনেক ক্যামেরা। সেদিনের ঘটনার কথা ফের বলতে হয় তাকে। দোকানের টিভিতে তখন দেখা যায় শুধুই সেই খবর।
কিছুক্ষণের মধ্যে থানা থেকে বেরিয়ে আসেন সেই ডিউটি আফিসার। তাদের কাছে এসে তিনি বলেন , মাকে নিয়ে তুমি থানার ভিতরে এসো। তোমাদের অভিযোগ নেওয়া হবে।আশ্চর্য হয়ে যায় অঞ্জলি। এই অফিসারই কিছুক্ষণ আগে তাকে অশ্লীল ইঙ্গিত করে থানা থেকে কার্যত গলা ধাক্কা দিয়ে বের করে দিয়েছিলেন। তিনিই এখন সংবাদ প্রচারিত হওয়ার পর থানায় ডেকে অভিযোগ নিতে চাইছেন। কিন্তু সে যদি সংবাদ মাধ্যমের নাগাল না পেত তাহলে কি হত ? সব ঘটনা তো সংবাদমাধ্যম জানতে পারে না। তাদের অভিযোগ তো ধামাচাপা পড়ে যায়। তাদের বোবা কান্না তো কেউ শুনতে পায় না। কিন্তু সে এখন কি করবে ? তাকে কিছু করতে হয় না। এগিয়ে আসেন সেই দুজন সাংবাদিক। তারাই অফিসারকে বলেন, শুধু ওরাই যাবেন না। আমরাও সঙ্গে যাব।
— কেন , আপনারা কি করতে যাবেন ?
— যাব , কারণ আপনাদের উপরে আমাদের বিশ্বাস নেই। আপনারা তো অভিযোগটা তো ধামাচাপা দিতে চেয়েছিলেন। এখনও যে আসল অপরাধীদের আড়াল করতে নিজেদের ইচ্ছে মতো অভিযোগ লিখিয়ে নেবেন না তার কি নিশ্চয়তা আছে ?
— না , আপনাদের আমরা আলাউ করব না।
— তাহলে ওদেরও আমরা আপনাদের সঙ্গে যাওয়া আলাউ করব না। ওদের নিয়ে সোজা জেলা সদরে হাজির হব।তখন পোড়া মুখটা কিন্তু আবার পুড়বে। সেটার জ্বালা সইতে পারবেন তো ? তাছাড়া সেটা কি আপনাদের সার্ভিস রেকর্ডের ক্ষেত্রে খুব ভালো হবে ?
অন্যান্য সাংবাদিকরাও সায় দেন দুজনের কথায়।অফিসার কিছুক্ষণ সাংবাদিকদের দিকে আগুন দৃষ্টিতে চেয়ে থাকেন। তারপর ফোনে কারও সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা চালানোর পর বলেন, ঠিক আছে , আপনাদের মধ্যে দুজন ওদের সঙ্গে আসুন।সেই মতো দুজন সাংবাদিকের সঙ্গে তারা আবার ডিউটি অফিসারের ঘরে যায়।সাংবাদিকদের সাহার্য্যে অভিযোগ লিখে ডিউটি অফিসারের হাতে জমা দেয় সে। অফিসারের কাছে সাংবাদিকরা অভিযোগের রিসিভ কপি চায়। ডিউটি অফিসার প্রথমে কিছুতেই রিসিভ কপি দিতে রাজী হন না। সাংবাদিকরা তখন বলে ,তাহলে আমরা বরং সেই মর্মে আর একবার খবরটা করে পাঠায়।সেই কথা শুনে যেন তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠেন অফিসার। একরাশ বিরক্তি ঝরিয়ে বলেন , আপনাদের নিয়ে আচ্ছা মুশকিলে পড়া গেল দেখছি। আপনারা কি আমাদের কাজটুকু করতে দেবেন না ?
— করুন না আপনারা কাজ , কিন্তু আমাদেরও কাজ করতে দিন।অভিযোগের কপি না হলে যে আমাদের কাজ হবে না।
অগত্যা ব্যাজার মুখে অভিযোগের প্রতিলিপি দিতে হয় ডিউটি অফিসারকে।
তারপরই পুলিশ সাংবাদিকদের গাড়ি ছোটে শ্রীপল্লী অভিমুখে। যাওয়ার সময় গাড়ি থেকেই সে জ্যেঠুকে হাত নেড়ে বিদায় জানায়। জ্যেঠুও হাত নাড়তে থাকেন। অঞ্জলি ভাবে , জ্যেঠু না থাকলে তো সব ধামাচাপা পড়ে যেত।জ্যেঠুর মতো লোক যদি সব জায়গায় একটা করে থাকত তাহলে তাদের মতো অসহায়রা বুকে একটু বল পেত। সেই কথা ভাবতে ভাবতেই ধুলো উড়িয়ে একের পর এক গাড়িগুলো পাড়ায় ঢোকে। আর তখন অঞ্জলি দেখতে পায় ইতিমধ্যেই গ্রামে দাঁড়িয়ে আছে আরও কিছু গাড়ি। তার মধ্যে মাথায় ছাতা লাগানো টি, ভি’ চ্যানেলের গাড়িও আছে বেশ কয়েকটা। পাড়াটা যেন অচমকাই বড়ো বেশি সরগরম হয়ে ওঠে। অঞ্জলি দেখে অচেনা বহু লোক পাড়াময় ছোটাছুটি করছে।
গাড়ি থেকে নেমেই পুলিশ তাকেও সনাতনের বাড়ির কাছে ছুটিয়ে নিয়ে যায়। কোথাই কি হয়েছিল তা দেখিয়ে দিতে বলে। সেই বাঁশঝোঁপের কাছে যেতেই তার শরীর কেমন যেন অবশ হয়ে আসে। সেটা বুঝতে পেরেই মা তাকে ধরে ফেলে। কিছুটা সামলে নেওয়ার পর সে সবকিছু দেখিয়ে দেয়। সনাতনের বাড়িতে তখন শয়তানগুলো নির্ভয়ে আনন্দ ফুর্তি করছিল। বাইরের গাঁয়ের মোড়ল পাঁচজনও ছিল
। তারা ভাবতেও পারে নি গাঁয়ে এভাবে পুলিশ হানা দেবে। হানা দিলেও নেতারা থাকতে পুলিশ তাদের টিকিটিও ছুঁতে পারবে না বলেই তাদের স্থির বিশ্বাস ছিল। কিন্তু ততক্ষণে উপর থেকে এক জাঁদরেল অফিসার এসে পৌঁচেচ্ছেন। তারই নির্দেশে পুলিশ একে একে ১৩ জনকেই ধরে গাড়িতে তোলে। অঞ্জলির মনের জ্বালাটা একটু প্রশমিত হয়।

ক্রমশ

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!