সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব -১৭)

সালিশির রায়

কিস্তি -১৭

অঞ্জলি মনে মনে ভাবে শুধু ভালোবাসায় নয় , আজ থেকে হৃদয়দার কাছে সে কৃতজ্ঞতা পাশেও বাঁধা পড়ে গেল।হৃদয়দাকে ঘিরে এক মিষ্টি সুখ স্বপ্নে রাত কাটে তার।সকাল হতেই মুনিশ খাটতে বেড়িয়ে যায় বাবা। না হলে যে তাদের দিন চলবে না। মাকে অবশ্য আজ আর যেতে দেয় নি অঞ্জলি। একে মায়ের শরীর খারাপ , তার উপরে ঝাড়খণ্ড থেকে ডাইন ছাড়াতে জানগুরুর আসার কথা আছে আজ। জরিমানা দিয়ে বাড়ির ফেরার পর জগমাঝি এসে বলে যায় মা যেন কোথাও না যায়, জানগুরু আসবে ডাইন নামাতে জানগুরু আসবে। সেও এক অমানবিক ব্যাপার। তাই সে বলে, জরিমানা আদায় তো হয়েই গিয়েছে। আবার ওসবের কি দরকার ? জগমাঝি বলে, কি দরকার তা তো বলতে পারব না। মোড়ল বলল দুপুরের মধ্যে মা’কে নিয়ে মারাংবুরুর থানে চলে যেতে। এরপর তোরা যা ভালোবুঝিস করিস।
আর কথা বাড়ায় না অঞ্জলি। যাই হোক না কেন , ঘাড় থেকে ডাইন নামানোর নামে জানগুরুর বুজরুকি তাদের মেনে নিতেই হবে। নাহলে আবার কারও কিছু হলে কোপটা সেই মায়ের উপরেই পড়বে। তাই সেখানে যাওয়ার জন্য দ্রুত বাড়ির কাজ সামালাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে সে। রান্নাটাও সে’ই করে নেবে। মায়ের উপর যা ধকল গিয়েছে কাল , আজও জানগুরুর একপ্রস্ত নির্যাতন সহ্য করতে হবে তাকে। সব সামলে উঠতে মায়ের কয়েকদিন পুরোপুরি বিশ্রাম দরকার। একবার ডাক্তারের কাছেও নিয়ে যেতে হবে। টাকা-পয়সা যোগাড় হলে একবার লাভপুরের বিশু ডাক্তারের কাছে মা’কে দেখিয়ে আনতে হবে। সেদিন দুপুরের মধ্যে কাজ সেরে ফিরে আসে বাবা। সে তখন রান্না বান্না করে সবাইকে খাবার দিতে ব্যস্ত। সেই সময় হঠাৎ হন্তদন্ত হয়ে বাড়িতে ঢোকে দাদা।দাদাকে দেখে সে খুব অবাক হয়ে যায়। বলে , কি রে কাল সেই যে গয়না আনতে গেলি, তারপর আর এমুখো হলি না। এতক্ষণে বাড়ির কথা মনে পড়ল ? কি অবস্থায় আছি আমরা , বেঁচে আছি না মরে গেলাম তা জানার প্রয়োজন মনে হোল না তোর ?
—- আরে আমরাই তো মরে যেতাম।
— কেন, তোদের আবার কি হল ?
খানিকটা ঢোক গিলে দাদা বলতে শুরু করে —- কাল দুপুরের দিকে তো তোর বৌদি আর আমি গয়না নিয়েই ফিরে আসছিলাম। কিন্তু লা’ঘাটা রেলব্রীজটার কাছে তিনজন ছেলে কোথা থেকে মোটর সাইকেলে করে এসে তোর বৌদিকে ছুড়ি মেরে গয়না দুটো ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেল। তারপর তো তোর বৌদিকে বিপ্রটিকুরীতে ডাক্তার দেখিয়ে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছোতেই সন্ধ্যা হয়ে গেল।দাদার কথাগুলো খুব একটা বিশ্বাসযোগ্য মনে হয় না অঞ্জলির। তাই দাদার দিকে বেশ কিছুক্ষণ সনিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকে সে। চোরেরা বৌদিকে ছুড়ি মেরেছে বলছে , অথচ দাদার শরীরে কোথাও কোন আঘাতের কোন চিহ্ন নেই। কিন্তু তার শরীরেও তো আঘাতের চিহ্ন থাকার কথা। বৌদিকে বাঁচাতে গিয়ে আক্রান্ত হওয়ার কথা তো তারও। কেমন যেন সাজানো গল্পের মতো মনে হয় দাদার কথাগুলো। গয়না দেওয়া এড়াতে দাদা–বৌদি পরিকল্পনা করে চুরির গল্প সাজায় নি তো ?
সময়ই বলে দেবে আসল সত্যটা কি। মনের ভাব গোপন করে তাই সে বলে , বেশ কি আর করা যাবে, এ যাত্রা তো বিপদ উদ্ধার হয়েছে। রান্না হয়ে গিয়েছে। হাত মুখ ধুয়ে আয়, ভাত বাড়ছি।তার ওইভাবে সনিগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থাকা দেখে কেমন যেন ধরা পড়া ধরা পড়া ভাব ফুটে ওঠে দাদা চোখে মুখে। সেটা চাপা দিতেই দাদা তাড়াতাড়ি বলে ওঠে — সে তো পাড়ার লোকেদের মুখেই শুনলাম। শ্বশুরবাড়ির বাসস্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে ছটফট করছিলাম, মায়ের দুঃশ্চিন্তায় রাতে ঘুমোতে পারি নি। জানগুরুকে আনতে যাওয়ার পথে বাসের জানলা থেকে ওরাই তো বলল , হৃদয় নাকি জরিমানার টাকাটা মিটিয়ে দিয়েছে। যাওয়ার সময় মায়ের জরিমানার বিষয়টা আমিই হৃদয়কে বলে গিয়েছিলাম। ও বলেছিল দেখছি কি করা যায়। কিন্তু হৃদয় যে সত্যি সত্যিই টাকাটা মিটিয়ে দেবে ভাবতে পারে নি।
এতক্ষণে বিষয়টা পরিস্কার হয় অঞ্জলির কাছে। কাল ওই পরিস্থিতির মধ্যে একবারও তার মনে হয়নি মায়ের জরিমানার কথাটা তো হৃদয়দার জানার কথা নয়, তাহলে জানল কি করে। তার মনে হয় বৌদির গয়না আসলে এখানেই ছিল। চাপে পড়ে বের করে দিতে হয়, কিম্বা পাড়ার লোকেরা লুট করে নেয় সেই আশংকায় গয়না নিয়ে বাপের বাড়ি চলে যাওয়ার জন্য মিথ্যা বলেছিল। আর যাওয়ার আগে দাদা কায়দা করে মায়ের দায়টা হৃদয়দার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়ে যায়। তারপর বিপদ মিটে গিয়েছে শুনে দরদ দেখাতে এসেছে। দাদাকে খুব ছোট মনে হয় তার। মায়ের জীবনের চেয়ে বৌদির গয়নাই তার কাছে বড়ো হল ? যে মা হাড়ভাঙা খাটনির মাঝে তাকে গর্ভে নিরাপদে লালন করেছে , ধান পুঁততে পুঁততেও গামছা বুকে ঝুলিয়ে দুধ খাইয়ে বড়ো করেছে , সামান্য দুটি গয়নার দাম সেই মায়ের থেকেও বড়ো হয়ে গেল ? দাদা একবারও ভাবল না জরিমানার টাকা না পেলে ওরা মায়ের কি হাল করত ?
সুসময় এলে গয়না হয়তো ফেরত হত , কিন্তু মাকে ওরা পিটিয়ে মেরে ফেললে মা’কে কি ফেরত পাওয়া যেত ? দাদার সঙ্গে কথা বলতেই আর ইচ্ছা হয় না তার। কিন্তু নেহাত দুপুর বেলায় এসেছে তাই সে বলে, বেশ তুই খেতে আয়।
—– না রে , আজ আর খাওয়া হবে না। এখুনি আমাকে বেরিয়ে যেতে হবে।
—- মানে, এই তো এলি , না খেয়ে আবার কোথাই যাবি ?
—- আসলে তোর বৌদি সালিশিসভা, জরিমানা এইসব নিয়ে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছে। তাই এখন থেকে বাপের বাড়িতেই থাকবে ঠিক করেছে। আমাকেও সেখানে গিয়েই থাকতে হবে। সেইজন্য তোর বৌদির বাক্সটা নিতে এসেছিলাম।
দাদার কথা শুনে অঞ্জলি মনে মনে ভাবে, তলায় তলায় তাহলে এই ব্যাপার। বৌদি তাদের সঙ্গে এক সংসারে বেশিদিন থাকবে না সেই আন্দাজ সে আগেই পেয়েছিল , কিন্তু সালিশিসভা- জরিমানার অজুহাত দেখিয়ে এত তাড়াতাড়ি যে সরে যাবে তা ভাবতে পারে নি। নাহলে সালিশিসভা – জরিমানা তো সব আদিবাসী গ্রামেই চালু আছে। বৌদির বাপের বাড়িতেও কি নেই ? তাই কারণটাকে তার আলাদা থাকার একটা অজুহাত বলেই মনে হয়।
কিন্তু দাদাও কি করে এত তাড়াতাড়ি ভুলে গেল তাদের ? মায়ের এই অবস্থা , বাবার শরীরও অশক্ত, ভাইটা নেহাতই ছোট, এই অবস্থায় কোন স্বর্গসুখের মোহে দাদা তাদের ছেড়ে চলে যাচ্ছে তা ভেবে পায় না সে। কিন্তু কেউ চলে যেতে চাইলে তাকে তো আটকে রাখা যায় না। বাবা-মা অবাক হয়ে চেয়ে থাকে দাদার দিকে। আর দাদা অস্বস্তিতে এড়াতে তাড়াতাড়ি বাক্সটা নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়। অঞ্জলি ভাবে , শ্বশুরবাড়ি যাওয়ার আগে মেয়েদের মায়ের দুধ আর বাবার অন্নের ঋণ মিটিয়ে দিয়ে যেতে হয়। ছেলেদের কি বাবা–মায়ের কাছে কোন ঋণ থাকে না ? শ্বশুরবাড়ি চলে যাওয়ার সময় তাদের কি বাবা-মায়ের ঋণ এভাবেই শোধ করতে হয় ? দাদা চলে যাওয়ার পর খুব মন খারাপ হয়ে যায় অঞ্জলির।কিন্তু মন খারাপ করারও ফুরসুত মেলে না তার। মারাংবুরুর থান থেকে সোরগোল ভেসে আসে।
অঞ্জলি বুঝতে পারে জানগুরু এসে পৌঁচেচ্ছে। সে আর দেরি করতে চায় না। ডাইন নামানোর নাটকটা যত তাড়াতাড়ি সম্ভব চুকিয়ে দেওয়ার জন্য সে মাকে নিয়ে সেখানে পৌঁছোয়। মারাংবুরুর থানে তখন বসে রয়েছে জটাজুটধারী জানগুরু। তেল চুপচুপে পাকানো গোফ। পাশে নামানো রয়েছে বিভিন্ন রকম শিশি বোতল, এক বাটি পাকা লংকা। প্রথমেই লোকটা বোতল থেকে জলের মতো কি সব ছিটিয়ে দেয় মায়ের চোখে মুখে। কিছুক্ষণ পরে মায়ের মুখের কাছে দেওয়া হয় লংকা পোড়ার তীব্র ঝাঁঝ। দূর থেকে তারাই হাঁচি আর কাশি সামলাতে পারে না, তাই মায়ের কি অবস্থা হচ্ছে তা ভালোই অনুভব করে অঞ্জলি। তীব্র জ্বালাকর সেই ঝাঁঝ সহ্য করতে না পেরে মা মারাংবুরুর থানে কাটা পাঁঠার মতো ছটফট করতে থাকে। অঞ্জলির ইচ্ছে হয় গিয়ে লংকা পোড়ার বাটিটা চেপে ধরে লোকটার মুখে। কিন্তু তাদের সেখানে যাওয়ার নিয়ম নেই।
এরপর লোকটা সমানে মায়ের শরীরে মুড়ো ঝাঁটার বাড়ি মারতে শুরু করে। আর বলতে থাকে , বল তুই ডাইন , তুক করে তুইই তারণকে খেয়েছিস। মায়ের তখন কথা বলার মতো অবস্থা নেই। কিন্তু অমানসিক ওই নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে কোন রকমে বলে , হ্যা আমিই ডাইন। আর যায় কোথাই ? ফের সপাসপ পড়তে থাকে ঝাঁটার বাড়ি। সেই দৃশ্য আর দেখতে পারে না অঞ্জলি। হাত চাপা দিয়ে দুচোখ বন্ধ করে ফেলে। ভাইটা ভয়ে তাকে জাপটে ধরে কাঁদতে শুরু করে। পাড়ার লোকেদের উল্লাসে চাপা পড়ে যায় মায়ের যন্ত্রনাকাতর আর্তনাদ। তারই মাঝে অঞ্জলি শুনতে পাই ঝাঁটার বাড়ি মারতে মারতেই লোকটা বলে বদমাইশ — বল তুই ওর ঘাড় থেকে নেমে যাবি।চোখ খুলে অঞ্জলি আশ্চর্য হয়ে যায়। দেখে মা ঘাড় নেড়ে লোকটার কথাকেই সমর্থন করছে। অঞ্জলি বোঝে যন্ত্রনায় মা বোধ বুদ্ধি হারিয়ে ফেলেছে।
লোকটা সমানে সেই সুযোগ কাজে লাগিয়ে যাচ্ছে। একসময় সে তার জুতোটা মায়ের সামনে এগিয়ে দিয়ে বলে , যা এইটা মুখে নিয়ে তুই মারাংবুরুর থানটা একপাক ঘুরে এসে ওর ঘাড় থেকে নেমে যা। অঞ্জলি দেখে মা কেমন ওর জুতোটা মুখে নিয়ে মারাংবুরুর থানটা একপাক ঘুরে এসেই উলটে পড়ে যায়। আর লোকটা মায়ের শরীরে জল ছিটিয়ে দিয়ে বলে, এবার একে নিয়ে যেতে পার। খুব শক্ত ডাইন ভর করেছিল ওর ঘাড়ে। তাকে নামাতে আমাকে খুব কসরত করতে হল। মায়ের তখন সারা শরীর থেকে চুঁইয়ে চুঁইয়ে রক্ত ঝরছে। জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়েছে। সে আর ভাই ধরাধরি করে মাকে তুলে নিয়ে আসে। আসতে আসতেই শুনতে পাই পাড়ার মেয়েরা বলাবলি করেছে , দেখছো আমাদের কাছে শিকার করছিল না। জানগুরুর কাছে দিব্যি কেমন সব সুরসুর করে স্বীকার করে নিল। আর হবে না’ই বা কেন ? পাঁচ পুরুষের জানগুরু বলে কথা। স্বীকার না করে যাবে কোথা ? ঝেঁটিয়ে বিষ ঝেড়ে দেবে না তাহলে ? অঞ্জলি মনে মনে ভাবে, এই জন্যেই বোধ হয় বলে “ঝড়ে বক মরে , আর ওঝার কেরামতি বাড়ে”।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।