সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ১২)
সালিশির রায়
কিস্তি – ১২
চোখ মেলে চাইতেই দেখে তাদের বাড়ির উঠোন যেন ভরে উঠেছে হাজার তারার আলোয়। কখন যে হৃদয়দা উঠোনে এসে দাঁড়িয়েছে টের পায়নি সে। ঘাড় ঘোরাতেই দেখে হৃদয়দা তারই দিকে তাকিয়ে মিটি মিটি হাসছে। তার সারা শরীরে শিহরণ খেলে যায়। মনে মনে সে হৃদয়দাকেই দেখতে চাইছিল ছিল এতক্ষণ। মারাংবুরু কি সেইজন্য হৃদয়দাকে পাঠিয়ে দিলেন ? আলাপ পরিচয় হলেও দিদি আর বোনেরা থাকায় হৃদয়দার সঙ্গে তো সে ভাবে কথাই বলতে পারে নি সে। আজ আর সেই সমস্যা নেই। তাই এইসময় হৃদয়দাকে পেয়ে তার খুব ভালো লাগে। কিন্তু হৃদয়দাকে সেটা বুঝতে দিতে চায় না সে। বরং হৃদয়দা তাকে কতটা চায় , কেমন ভাবে চায় সেটাই আজ জানার চেষ্টা করতে হবে তাকে।
আদিবাসী মেয়েদের নিয়ে দিন কয়েক ফুর্তি করেই বেশিরভাগ ছেলে কেটে পড়ে। আর মেয়েটা সেই আঘাত খাওয়ার কথা কাউকে খুলে বলতেও পারে না। নিজে শুধু গুমরে গুমরে মরে। হৃদয়দা সেই দলে পড়ে কিনা তা আজই ভালো করে বাজিয়ে দেখে নিতে হবে। এমন সুযোগ হয়তো আর পাবে না সে। বাবা – মা থাকলেও তারা বিশেষ আন্দাজ করতে পারবে না। সে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে চাইতেই হৃদয়দা বলে , তোমার দাদার বিয়ের কয়েকটা ছবি তুলেছিলাম।বাপের বাড়ি যাওয়ার আগে বউদি ছবিগুলো চেয়েছিল। তাই প্রিন্ট করিয়ে দিতে আসছিলাম। পথেই ওদের সঙ্গে দেখা হয়ে গেল। তারপর ভাবলাম এতদুর এসেছিই যখন তখন কাকা–কাকামীর সঙ্গেএকবার দেখা করে যায়। তাই চলে এলাম।
—- ও , শুধু বাবা-মায়ের সঙ্গেই দেখা করতে এসেছো ? তা বেশ যাও না, তোমার কাকা–কাকিমা ভিতরের দিকে আছে। সেখানেই যাও।
— এই দেখ , এ গ্রামে কাকা–কাকিমা ছাড়া আর কে আছে যে তাদের সঙ্গে দেখা করতে আসব?
— সে তো ঠিকই , আমি তো আর কেউ নয়।
—- ও হো বড্ড ভুল হয়ে গিয়েছে। ভুলেই গিয়েছিলাম তুমিও আছো।
কথাটা শোনার পরই অভিমানে তার ঠোট তির তির করে কাঁপতে থাকে। চোখ ফেটে জল আসে। যন্ত্রনায় বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে ওঠে। যাকে এক পলক দেখেই তার সর্বাঙ্গ শিহরিত হয় সেই কিনা তার কথা ভুলে যায়। মনে হয় দিদি তাহলে ঠিকই বলেছিল। কিন্তু তার যে খুউব কষ্ট হচ্ছে। কোন কথা বলতে পারে না। তার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আর তা দেখেই হৃদয়দা এগিয়ে এসে তার হাত দুটো ধরে। পরম মমতায় মুছিয়ে দেয় তার চোখের জল। আর অঞ্জলির সারা শরীরে বিদ্যুৎ খেলে যায়। প্রতিটি লোমকুপ কাঁটা দিয়ে ওঠে। জীবনে প্রথম পুরুষ স্পর্শে বিহ্বল হয়ে পড়ে সে। লজ্জায় মুখ তুলে চাইতে পারে না। হৃদয়দাই তার মুখটা তুলে ধরে। চোখে চোখ রেখে পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। সেই দৃষ্টিতে যেন হারিয়ে যায় সে।
একসময় হৃদয়দা বলে , কই আমার দিকে ভালো করে চাও। সে কিছুতেই তাকাতে পারে না। একি হোল তার ? এতদিন যাকে দুর থেকে আড়চোখে দেখেছে , কাছে থেকে দেখার জন্য কাতর হয়েছে, সেই স্বপ্নের মানুষ তার দিকে ব্যাকুল নয়নে চেয়ে আছে অথচ সে মুখ তুলে চাইতেই পারছে না। যাকে বলব বলে অনেক কথা জমিয়ে রেখেছিল সে তার হাত ধরে উন্মুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অথচ সে কিছু বলতে পারছে না। জমানো কথা যেন মাঝপথে কোথাই হারিয়ে গিয়েছে। তার ওই অবস্থা দেখে একসময় হৃদয়দাই বলে, আচ্ছা তুমি কি সেদিন রাতে আমার চোখের ভাষা পড়তে পারো নি , মনের কথা বুঝতে পার নি ? উত্তর না পেয়ে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে চেয়ে থাকে হৃদয়দা। কোন রকমে সে বলতে পারে , বুঝেছিলাম তো। কিন্তু তুমি অন্যকথা বললে তাই খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
—- কেন, ভয় কিসের ?
—- যদি আমার বোঝাটা ভুল হয়ে যায় ?
—- না গো ভুল নয় , হৃদয়ের হৃদয়টা যে তোমার কাছেই সেদিন থেকে বাঁধা পড়ে গিয়েছে।
কথাটা শুনে চমকে যায় অঞ্জলি। সেদিন দিদির প্রশ্নের মুখে এই কথাটাই তো তার মনে হয়েছিল। সে সাহস করে বলতে পারে নি এই যা।হৃদয়দার কথায় ভরসা পেয়ে সে বলে — তুমি সত্যি বলছো ? — হ্যা গো, সত্যি সত্যি সত্যি। একেবারে তিন সত্যি। নাহলে তোমার দাদার অন্য বন্ধুদের মতো তো ভোজ খেয়ে বাড়ি চলে গেলেই পারতাম। বৌভাতের তদারকি, ফটো দিতে আসা তো একটা অজুহাত মাত্র। আসল উদ্দ্যেশ্য তোমাকে দেখা। বাড়িতেও এখন আমার মন টেকে না জানো।
সে আন্দাজ কিছুটা অঞ্জলিও করেছিল। কিন্তু মেয়েদের বুক ফাটলেও তো মুখ ফোটে না। তার উপরে ছিল সামাজিক অনুশাসনের ভয় , প্রত্যাখ্যাত হওয়ার আশংকা।কিন্তু এখন হৃদয়দাই সে সব দুর করে দিল। তাই সে বলে – তাই বুঝি ?
—- হ্যা, আমি শুধু তোমার জন্যই এখানে ছুটে আসি, শুধু তোমার জন্য।
—- সত্যি তুমি আমাকে এত ভালোবাসো ?
—- কেন, বিশ্বাস হয় না ?
—– বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্ন নয়। জানোই তো আমাদের আদিবাসী সমাজের অনুশাসন কত কঠিন। তোমার সঙ্গে আমার ভালোবাসা কেউ ভালো চোখে দেখবে না। তোমাদের সমাজও আমাকে মেনে নেবে না। তাই প্রকৃত ভালোবাসা না থাকলে সমাজের ওইসব বাধা কিছুতেই আমরা পার হতে পারব না।
—- বিশ্বাস করো আমি তোমাকে প্রানের থেকেও বেশী ভালোবেসে ফেলেছি। যত বাধাই আসুক আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাব না।দরকার হলে একসঙ্গে মরব তাও ভালো। তুমি আমাকে ছেড়ে যাবে না তো?
—- আমি তো সেদিন রাত থেকেই তোমায় ভালোবেসে ফেলেছি। কতক্ষণ দুজন হাত ধরে যে দাঁড়িয়েছিল তা কারও খেয়াল ছিল না। যেন কোথাই হারিয়ে গিয়েছিল দুজনে। একসময় মায়ের ডাকে চমকে ওঠে অঞ্জলি। দ্রুত হৃদয়দার হাত ছাড়িয়ে সরে যায়। ভেসে আসে মায়ের গলা —- কইরে অঞ্জু, মনসা থানে ধুপ সন্ধ্যা দিবি না নাকি আজ ?
—- এই যায় , বলে ভিতরের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় সে। আর হৃদয়দা বাইরের দিকে।
মনে মনে খুব হাসি পায় তার। এই হৃদয়দাই নাকি বাবা–মায়ের সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল। অথচ শুধু তার সঙ্গে দেখা করেই ফিরে যাচ্ছে। বাবা–মা অবশ্য হৃদয়দার আসাটা টের পায় নি। হৃদয়দা চলে যাবার পর বাড়িটাকে আবার বড়ো বেশি ফাকা লাগনতার। এতক্ষণ হৃদয়দার উপস্থিতিই যেন বাড়িটাকে ভরিয়ে রেখেছিল।হৃদয়দার স্পর্শ যেন তাকে আচ্ছন্ন করে রাখে। একের পর এক নানা কাজে ভুল করে চলে। মনসা থানে ধুপবাতি গুঁজে জ্বালিয়ে দিতে ভুলে যায়। মাকে বুকে ব্যাথার সকালের ওষুধটা রাতে খাওয়াতে যায়। ভাগ্যিস মা লক্ষ্য করেছিল, নাহলে কি হত কে জানে। তার অন্যমনস্কতা চোখ এড়ায় না মায়ের। তার দিকে অবাক চোখে চেয়ে থাকে মা। কি যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে লক্ষ্য করে। খুব ভয় পেয়ে যায় সে। এই রে মায়ের চোখ, সব পড়ে ফেলবে নাকি ?
সে বলে — কি হলো ?
মা বলে — সেই কথাটাই তোকে জিজ্ঞেস করছি। সন্ধ্যা থেকে দেখছি একের পর এক কাজ ভুল করছিস। মনটাও কেমন উড়ু উড়ু। এমন তো দেখি নি আগে। তাই বলছি হলো কি তোর ?
—- কি আর হবে, এতদিন হয় নি বলে কি ভুল হতে পারে না? উড়ু উড়ু ভাব না আরও কিছু। সব তোমার চোখের ভুল।
কথা ক’টা বলে মা’কে এড়িয়ে অন্যদিকে চলে যায় অঞ্জলি। সত্যিই তার মন তখনও আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। সে মনে মনে শুধু হৃদয়দার কথাই ভেবে চলেছে। আজ হৃদয়দা তার সব সংশয় দুর করে দিয়েছে। তাই এক রঙীন স্বপ্নের জগতে হারিয়ে যায় অঞ্জলি।
ক্রমশ…