সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে অয়ন ঘোষ (পর্ব – ৯)

বেদ – কথা

পূর্বেই বলেছি যে ‘ঋষি’ বলতে আমরা বুঝব কবি বা দ্রষ্টা। খুব সাধারণ অর্থেই যদি ধরি তাহলেও এটা বিশ্বাস করি যে কবিরা সত্যিই দ্রষ্টা। এ বিষয়ে ইংরেজি সাহিত্যের কবি কোলরিজের imagination বা কল্পনার ওপর একটি তত্ত্ব রয়েছে। সেই তত্ত্ব অনুযায়ী secondary imagination থাকে কেবলমাত্র সৃষ্টিশীল মানুষদের আর এর সাহায্যেই তারা দ্রষ্টা হয়ে ওঠেন। বেদ নিয়ে আমাদের মধ্যে নানা ধরনের অলৌকিক ব্যাখ্যা আছে। অনেকেই মনে করেন বেদ নিত্য বা শাশ্বত। এটি কেউ রচনা করেননি বা কোনো মানুষের দ্বারা সৃষ্ট নয়। এই ব্যাখ্যা অনুযায়ী বেদের ঋক বা মন্ত্রগুলি আপনিই তপবলের প্রভাবে ঋষিদের সামনে আবির্ভূত হয়েছিল। কিন্তু ভিন্ন মতও রয়েছে। শব্দ যে শ্রুত হয় একথা পরীক্ষিত। কিন্তু শব্দ যে দৃশ্যগোচর হয় এমন কোনো প্রমাণ নেই। সেই অনুযায়ী বেদমন্ত্রগুলি ঋষি দ্বারা প্রণীত হয়েছিল। যারা এই মত বিশ্বাস করেন তারা এই যুক্তি দেন যে বেদের বিভিন্ন ক্ষেত্রে এমন অনেক সূক্ত রয়েছে যেখানে ঋষিরা নিজেরাই বলেছেন তারাই মন্ত্র তৈরি করেছেন বা সৃষ্টি করেছেন।

“ঋষির্বিশ্বামিত্রপুত্রো মধুচ্ছন্দা। অগ্নির্দ্দেবতা।।
গায়ত্রীচ্ছন্দঃ ব্রহ্মযজ্ঞান্তে বিনিয়োগঃ অগ্নিষ্টোমে চ।।”

এই ঋকটি উদাহরণ দিয়ে আমরা দেখিয়েছিলাম এই সূক্তের ঋষি বিশ্বামিত্রের পুত্র মধুচ্ছন্দা, এই সূক্তের দেবতা অগ্নি, এই সূক্তের ছন্দ গায়ত্রী ও এই সূক্তের বিনিয়োগ ব্রহ্মযজ্ঞান্তে এবং অগ্নিষ্টোম যজ্ঞে। ঋষি শব্দের আলোচনা আমরা করেছি। এবার আসা যাক ‘দেবতা’ শব্দে। যেমন ঋষি বলতে নিরুক্ত অর্থে আমরা বুঝলাম কবি বা দ্রষ্টা তেমনই ‘দেবতা’ শব্দটিও লৌকিক অর্থ ব্যতিরেকে বোঝার চেষ্টা করব। “যস্য বাকং স ঋষি যা তেনোচ্যতে সা দেবতা” অর্থাৎ সূক্তে যার সমন্ধে কথা বলা হয়েছে তিনিই দেবতা। সেই হিসেবে দেবতা হচ্ছেন সূক্তের বিষয় বা subject, এই বিষয়ে ভিন্ন মত রয়েছে। এই ভিন্ন মত অনুযায়ী বর্তমানে আমরা দেবতা বলতে যা বুঝি, বেদমন্ত্রেও দেবতা বলতে সেটাই বোঝানো হয়েছে। কিন্তু যারা এর ভিন্ন মত পোষণ করেন তারা “দানস্তুতি সূক্তের” উল্লেখ করেন। এই “দানস্তুতি সূক্তে” কোন দেবতার কথা বা প্রশংসা করা হয়নি। এগুলিতে দানের প্রশংসা করা হয়েছে। সেই অনুযায়ী ওই সকল সূক্তের দেবতা হলো ‘দান’।

এবার জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে যে সূক্তের সাবজেক্ট বা বিষয় যদি দেবতা হয় তাহলে বর্তমানে যে অর্থে আমরা দেবতা বুঝি, দেবতা শব্দের সেই অর্থের শুরু কি ভাবে? যাস্ক বলছেন “যো দেবঃ সা দেবতা” অর্থাৎ যাকে ‘দেব’ বলে তাকেই ‘দেবতা’ বলা যায়। ‘দিব্’ ধাতু হতে ‘দেব’ শব্দের উৎপত্তি। ‘দিব্’ যা দীপ্যমান বা দ্যুতিময়। যা উজ্জ্বল তাই হলো ‘দেব’।

চলবে…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।