সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ১১)

সালিশির রায়

কিস্তি – ১১

সেই কথা ভেবে এক অনাবিল আনন্দে ভরে যায় তার মন। কিন্তু তার সেই আনন্দ বেশীক্ষণ স্থায়ী হয় না। কিছুক্ষণের মধ্যেই আত্মীয়ের বাড়ি থেকে ফিরে আসে জামাইবাবু।তারপরেই শুরু হয়ে যায় দিদির শ্বশুরবাড়ি ফেরার তোড়জোড়। দিদিকে ছেড়ে দিতে হবে ভেবে খুব মন খারাপ হয়ে যায় তার। মনকে ভোলাতে দিদিকে সাজাতে বসে অঞ্জলি। মনের মতো সাজানোর পর দিদির মুখের সামনে আয়নাটা ধরে বলে — দেখ দেখ, কেমন সুন্দর দেখাচ্ছে তোকে। জামাইদা তো আর মুখ ফেরাতে পারবে না।দিদি মনে মনে খুশীই হয় , কিন্তু কপট রাগ দেখিয়ে বলে, তুই কিন্তু খুব পেকে যাচ্ছিস এবার। আর জামাইবাবু থেকে একেবারে জামাইদা।
— জামাইদাটাই শুনতে ভালো লাগে , কেন তোর আপত্তি আছে ?
— না, না আপত্তির কি আছে ? সে তুই বল না তোর যা খুশী।
—– তোর আপত্তি শুনছেই বা কে ? দাঁড়া আমি আসল লোককে ধরে আনি।
বলেই সে ছুটে গিয়ে বাইরে থেকে জামাইবাবুকে ধরে আনে ঘরে। তারপর দিদির সামনে বসিয়ে দিয়ে বলে , দেখো দেখো তোমার বউকে কেমন সাজিয়ে দিয়েছি দেখো।
তার কথা শুনে জামাইবাবু যেই দিদির মুখের দিকে চেয়েছে অমনি সে বলে ওঠে — তুমি তো আচ্ছা হ্যাংলা , যেই বললাম অমনি বউয়ের মুখ দেখার জন্য আর তর সইল না।
জামাইবাবু লজ্জায় কিছু বলতে পারে না কিন্তু দিদি চোখ পাকিয়ে বলে — অঞ্জু তুই সত্যি কিন্তু খুব বাড়াবাড়ি করছিস।
—– তুই থাম তো , তোর সঙ্গে তো কথা হচ্ছে না। কথা হচ্ছে ওনার সঙ্গে।
তারপর জামাইবাবুর দিকে ঘুরে বলে, এই যে মশাই শোন তোমার বৌকে বললাম তোমাকে আমি জামাইবাবু – টাবু বলতে পারব না। আমি জামাইদা বলব। তা উনি স্পষ্ট করে কিছু বলেন নি। তা তোমার আপত্তি নেই তো ?
— না, না ভালোই তো লাগছে শুনতে। তুমি জামাইদাই বলো।
—- সে অবশ্য আমি ঠিকই করে রেখেছিলাম, তুমি আপত্তি করলেও আমি তোমায় জামাইদা বলেই ডাকব।
তিনজনে ওইভাবে খুনসুটি করতে করতে এক সময় দিদির যাওয়ার সময় এগিয়ে আসে। জামাইদার সাইকেলেই যাবে ওরা। যাওয়ার আগে দিদি-জামাইদা বাবা-মাকে প্রনাম করতেই দিদির মাথায় হাত রেখে মা কেঁদে ফেলে। দিদিও মাকে জড়িয়ে কেঁদেই চলে। সে দিদিকে নিয়ে আস্তে আস্তে দরজার বাইরে পা রাখে। দিদিকে সে গ্রামের শেষপ্রান্ত পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। বিদায় নেওয়ার সময় দিদি তাকে জড়িয়ে ধরে আবার কাঁদতে শুরু করে। সেও নিজেকে ধরে রাখতে পারে না। বেশ কিছুক্ষণ কাদার পর দিদি তার মুখটা তুলে ধরে বলে — লক্ষী বোন আমার , কাল রাতে যে কথা গুলো বলেছি সেগুলো একটু মনে রাখার চেষ্টা করিস। সাইকেলে ওঠার আগে জামাইদাও তার হাত দুটো ধরে বলে — বাদনা পরবে কিন্তু আমাদের বাড়ি যেতেই হবে। আমি এসে নিয়ে যাব।
সে কোন জবাব দেয় না। আসলে দিদির কথা শুনেই মাথা গরম হয়ে যায় তার। বেশি বেশি গার্জেনি করছে দিদি। সে যেন একেবারে কচি খুকী। ভারি তো আমার দু’বছরের বড়ো। আর ভাব দেখাচ্ছে যেন দিদি নয় , দিদিমা। তাকে চুপ করে থাকতে দেখে দিদি বলে , জানি এখন আমার কথা তোর খুব খারাপ লাগবে। কিন্তু শুনলে তোর ভালোই হবে।তারপরই জামাইদার সাইকেলের পিছনে চেপে বসে দিদি। সাইকেলের সঙ্গেই দুই বোনের দুরত্ব বাড়তে থাকে। একসময় চোখের আড়ালে চলে যায় দিদি। আর তার দু’চোখ জলে ভরে ওঠে। সে বাড়ির পথে পা বাড়ায়। দিদির সঙ্গে ওই রকম আচরণের জন্য তার খুব কষ্ট হয়। ছোট থেকে এক সঙ্গে মানুষ হয়েছে। কত সুখ – দুঃখ, আনন্দ – বেদনার দিন রাত্রি কাটিয়েছে , সেই দিদির চেয়ে দুদিনের পরিচিত একটা ছেলে তার কাছে আপন হয়ে গেল ?
মনটা খারাপ হয়ে যায় তার। কিন্তু এটাও সত্যি হৃদয়দাকে আর তার দুদিনের চেনা মনে হয় না , মনে হয় যে কতদিনের পরিচয়, কত আপনারজন। হৃদয়দার কথা ভাবতে ভাবতেই সে বাড়িতে পৌঁছে যায়। বাড়ি ফিরতেই দেখে দাদা-বৌদিরাও বেরোনোর তোড়জোড় শুরু করছে। সে দিদির মতোই বৌদিকেও সাজিয়ে দেয়। তারপর গ্রামের মাথা পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসে। তারপর একসময় গ্রামের বাঁকে তাদের সাইকেলও মিলিয়ে যায়। বাড়ি ফিরতে ফিরতে তার মনে হয় একদিন সেও তো দিদির মতো সেজেগুজে হৃদয়দার বাড়ি যাবে। কে সাজিয়ে দেবে সেদিন তাকে, দিদি না বৌদি ? বৌদির কথা এখন থেকে নিশ্চত করে কিছু ভাবা যায় না। কিন্তু দিদি কি দেবে সাজিয়ে? দিদি তো হৃদয়দাকে দেখতেই পারে না। তার সঙ্গে মেলামেশা করতে বারণ করে। আবার পরক্ষণেই ভাবে , দিদি হয়তো ভুল ভাবছে। আসলে তাদের বিয়ে হওয়াটা খুব সহজ নয় , ভেবেই দিদি তাকে ওই রকম বলছে।
বিয়েটা হয়ে গেলে নিশ্চয় দিদি আর দুরে থাকতে পারবে না। হৃদয়দা সব বাধা সরিয়ে তাকে নিজের করে নিতে পারবে না ? সে কি সত্যিই তাকে ততটা ভালো বাসে ? তাকে নিজের করে পেতে চায় হৃদয়দার চোখের ভাষা সে যতটুকু বুঝেছে তাতে মনে হয়েছে হৃদয়দাও তাকে চায়। হৃদয়দার কথা ভাবতে ভাবতেই বাড়ি ফেরে অঞ্জলি। বাড়িতে বড়ো একা লাগে তার। ভাইটাও খেলতে বেড়িয়েছে। বাবা- মা একটু জিরিয়ে নিচ্ছে। কাল থেকেই তো কাজে বেরোতে হবে। ভাগের ধান যা পেয়েছিল তা তো দুটো বিয়ে পার করতেই শেষ। পেট তো কমেনি। দিদি গিয়েছে বৌদি এসেছে। আদিবাসী পরিবারের মেয়েরা আবশ্যক নিজের রোজগারেই খায়। কিন্তু বৌদির নাকি সে অভ্যাস নেই। তার বাবার কিছু জমিজমা আছে। পরিবারের মেয়েদের পরের বাড়িতে খাটতে যেতে হয় না।
তাই তাদের পরিবারে খাওয়ার লোক একই থাকলেও খেটে খাওয়ার লোক একজন কমে গেল। স্কুল ছাড়ার পর থেকে দিদিও মজুর খেটেছে। সেই মজুরীতে শুধু দিদির একার পেটের ভাতের সংস্থানই নয়, সংসারের অনেক সুসারও হয়েছে। বাবাকে তো প্রায়ই বলতে শুনেছে, সনমনি আমার সংসারের লক্ষ্মী।যেদিকে জল পড়ে সেদিকেই ছাতা ধরে। কিন্তু বৌদি যমসে ভূমিকা নিতে পারবে না তা বুঝতে পেরেছিল বাবা। তাই ওইরকম অবস্থাপন্ন পরিবারে দাদার বিয়ে দেওয়ার খুব একটা ইচ্ছে ছিল না বাবার। কিন্তু বিয়ের কথাবার্তা কচলাকালীন দাদা নাকি গোপনে বার কয়েক বৌদির সঙ্গে দেখা করে মন দেওয়া নেওয়া করে ফেলেছিল। তার উপরে বড়োলোক শ্বশুরবাড়ির জামাই আদরের মোহে বৌদিকে ছাড়া অন্য কোথাও বিয়ে করব না বলে গোঁ ধরে বসেছিল। অগত্যা বাবাকে তাই মত দিতে হয়। সেইসব কথা ভাবতে ভাবতে কখন সন্ধ্যার আধার ঘনিয়েছে টের পায়নি সে। চোখ মেলে চাইতেই দেখে তাদের বাড়ির উঠোন যেন ভরে উঠেছে হাজার তারার আলোয়।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।