সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৪৫)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৪৫

কিন্তু ততক্ষণে বাইকের চাকা গড়াতে শুরু করেছে। অফিসার হতভম্ভ হয়ে বাইকের পিছনে পিছনে কিছুদুর ছুটে আসেন। সাংবাদিকরা তার উদ্দেশ্যে হাত নাড়তে নাড়তে সুর করে গাইতে থাকেন — গুরু ‘তোমার হলো সারা। আমার হলো শুরু।’ গান শেষ হতেই অফিসারের মুখের উপর একরাশ ধোঁওয়া উগড়ে দিয়ে বাইক দুটো থানা চত্বর থেকে বেরিয়ে আসে।ঘন্টা খানেকের মধ্যেই তারা জেলা সদরে পৌঁচ্ছে যায়। জেলাশাসকের দপ্তরে তখন সংবাদমাধ্যমের উপছে পড়া ভীড়। টিভির খবরে সে জেলাশাসকের দপ্তরে আসছে জেনেই ভীড় জমিয়েছেন সাংবাদিকরা। ফের তারা একপ্রস্থ ছবি তুলে বক্তব্য নেয়।তারপর কয়েকজন তাকে নিয়ে যান জেলাশাসকের দফতরে। সব শোনার পর জেলাশাসক নিরাপত্তার কারণে তাদের হোমে থাকার ব্যবস্থা করেন। শুনেই চিন্তায় পড়ে অঞ্জলি। সে তো সঙ্গে কিছুই আনে নি। হোমে থাকতে গেলে তো পোশাক সহ নিত্য প্রয়োজনীয় কিছু জিনিস পত্র লাগবেই। তার মুখ দেখেই বোধহয় সাংবাদিকরা বিষয়টি উপলব্ধি করেন।
নিজেদের মধ্যে চাঁদা তুলে তারা মা এবং তার জন্য কিছু পোশাক আর টুকিটাকি জিনিসপত্র কিনে নিয়ে আসেন।
তা নিয়ে সে খুব অস্বস্তিতে পড়ে যায় অঞ্জলি। সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে সে বলে — আপনাদের কাছে আমার ঋণ শুধু বেড়েই যাচ্ছে। আপনারা পাশে না দাঁড়ালে তো সব ধামাচাপা পড়ে যেত। এখন আবার এসব কিনে দিলেন। জানিনা এ ঋণ আমি কেমন ভাবে শোধ করব।
— অত ভাববেন না তো। এতে অস্বস্তিরও কিছু নেই। আপনি আমাদের বোনের মতো। দাদার কাছে বোনের ঋণ বলে কিছু হয় না।
— তবু —
— তবু যদি একান্তই আপনার নিজেকে ঋণী মনে হয় তাহলে যেদিন অভিযুক্তরা সাজা পাবে সেদিন আপনার বাড়ি যাব। সবাইকে ভরপেট খাইয়ে দেবেন তাহলেই আপনার ঋণ শোধ হয়ে যাবে।
—- আর্শিবাদ করুন , সেই দিনটা যেন আসে।
—- আর্শিবাদ নয়, আমাদের শুভকামনা সবসময় আপনার সঙ্গে থাকবে।
কথাটা শুনেই মনটা জুড়িয়ে যায় অঞ্জলির। সে যেন আরো বেশি করে কৃতজ্ঞতা পাশে বাঁধা পড়ে যায়। সে বলে , বোনকে বুঝি দাদারা এমনি ভাবে আপনি আজ্ঞে করে কথা বলে ?
— সত্যি বলতে আমরাও তোমাকে আপনি আজ্ঞে করে কথা বলতে বলতে হাঁফিয়ে উঠেছিলাম। কিন্তু পেশাগত সৌজন্যে এবং সম্মান প্রদর্শনের জন্য সবাইকে আপনি–আজ্ঞে করেই কথা বলতে হয়।
—- দাদাদের মুখে আর কিন্তু আমি ওই সম্ভাষণ শুনতে চাই না।
—- আমরাও আর বোনের মুখে আপনি আজ্ঞে শুনতে চাই না , এক সঙ্গে সাংবাদিকরাও বলে ওঠে।
দু’পক্ষের আবেগ ঘন আলাচারিতায় পরিবেশটাই পাল্টে যায়। নিজের দাদা তো কবেই যাবতীয় দায় ঝেড়ে ফেলে দিয়ে শ্বশুরবাড়িতে গিয়ে বসে আছে। আর তিনদিন আগেও যাদের সে চিনত না তারাই তার দায় ঘাড়ে তুলে নিল। এইসব দাদাদের কথা সে জীবনেও ভুলতে পারবে না। সবাই একসঙ্গে হোমের পথে পা বাড়ায়। প্রথমে ঠিক ছিল মা’ও তার সঙ্গে হোমেই থাকবে। কিন্তু হোমে যাওয়ার মুহুর্তে সেই সিদ্ধান্তটা পাল্টে যায়। টিভিতে খবর দেখে ছুটতে ছুটতে এসে পৌঁছোয় দিদি আর জামাইবাবু। সে ছুটে গিয়ে সবার সামনেই দিদিকে জড়িয়ে ধরে আকুল কান্নায় ভেঙে পড়ে। তাকে সান্তনা দিতে গিয়ে দিদিও কেঁদে ফেলে।
কান্না সামলাতে পারে না মা’ও। বেশ কিছুক্ষণ পর দিদিই কথা শুরু করে। কথায় কথায় জানা যায় — টিভিতে নাম — জায়গার কোন উল্লেখ ছিল না। এমন কি মা আর তার মুখও বোঝা যাচ্ছিল না বলে দিদিরা প্রথম দিকে ঠিক বুঝতে পারে নি। পরে বাড়ির ছবি আর গলার স্বর আন্দাজ করার পরই গ্রামের একটি ছেলের মোটর বাইক নিয়ে বেড়িয়ে পড়ে তারা। কিন্তু বাড়িতে গিয়ে দেখে তালা ঝুলছে। তারপর খুঁজে খুঁজে এখানে এসে পৌঁচেছে।
একটানা কথা গুলো বলে দিদি অনুযোগের সুরে বলে , আমাকে একবারও জানানোর প্রয়োজন মনে করলি না ? আমি কি এতই পর হয়ে গেলাম ? টিভির খবর শুনে বোনের হেনস্থার কথা জানতে হলো ?
— রাগ করিস না।তোকে খবর দেওয়ার কথা আমি কতবার ভেবেছি জানিস ? কিন্তু ওই পরিস্থিতিতে কি ভাবে তোকে খবর দিতাম বল ? ভেবেছিলাম পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলেই মাকে নিয়ে তোদের বাড়ি যাব। তাছাড়া তোর বাড়ির রাস্তাঘাটও তো আমি চিনি না। এতদিন তো – – – অনিচ্ছা স্বত্ত্বেও আবার সেই তার কথাই মুখে চলে আসে তার। আসলে তাদের জীবনযাত্রার সঙ্গে নামটা এত আঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল যে পুরোপুরি মুছে ফেলতে সময় তো একটু লাগবেই। তার অস্বস্তি টের পেয়ে দিদি বলে , তোর আর দোষ কি ? প্রথমদিকে আমার সন্দেহ হলেও পরে ছেলেটার ব্যবহার দেখে আমিই তো ধোঁকা খেয়ে গেলাম। ভেবেছিলাম ছেলেটা বোধহয় অন্যদের থেকে আলাদা। তাই তো আর তোদের মেলামেশাতে আপত্তি করি নি। সে যাকগে মন থেকে মুছে ফেল সব কিছু।
অঞ্জলি কোন কথা বলতে পারে না । তার চোখ দিয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ধারা। দিদি তার গলা জড়িয়ে ধরে পরম মমতায় মুছিয়ে দেয় তার চোখের জল। দিদি – জামাইবাবু কিছুতেই তাকে হোমে থাকতে দিতে রাজী হয় না। তারা মা আর তাকে নিয়ে তাদের বাড়ি নিয়ে যেতে চায়। কিন্তু অঞ্জলি বলে, তোরা মাকে নিয়ে যা বরং। এই অবস্থায় আমাকে তোদের সঙ্গে যাওয়ার জন্য জোর করিস না। গিয়ে তো আমাকে সেই মুখ লুকিয়েই ঘরে ঢুকে থাকতে হবে।সাংবাদিকরাও তার কথা সমর্থন করেন। তারা বলেন , তাছাড়া মামলার জন্য এখন ঘন ঘন আদালতে যেতে হবে ওকে।
গ্রামে থাকলে নিজের দায়িত্ব যেতে হবে। সেক্ষেত্রে যাওয়া আসার খরচ, নিরাপত্তার দায়িত্বও নিজের উপরেই বর্তাবে। কিন্তু হোমে থাকলে সেই দায়িত্ব প্রশাসনের। তাছাড়া জেলার সদর শহরে থাকলে সবার নজরেও থাকবে অঞ্জলি।তাছাড়া হোমে থাকলে সরকার পুনবার্সনের একটা ব্যবস্থা করতে পারে। সে ক্ষেত্রে গ্রামে থাকা বিপদজনক মনে হলে অন্য গ্রামেও পুনবার্সনের ব্যবস্থা হতে পারে। মামলার রায় বেরোনোর পর সেখানে গিয়ে উঠলেই হবে। কিন্তু বাড়ি বা অন্য কোথাও চলে গেলে প্রশাসনের উপর চাপ কমে যাবে। তখন দায়িত্ব ঝেড়ে ফেলে প্রশাসন হাত ধুয়ে নেবে। কথাটা যুক্তিযুক্ত মনে হয় দিদির। তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য আর জোরাজুরি করে না।
ঠিক হয় মা আপাতত দিদির বাড়িতে গিয়ে থাকবে। তারপর পরিস্থিতি একটু স্বাভাবিক হলে সে হোম থেকে ফেরার পর মাকে নিয়ে আসবে। দিদি জামাইবাবু তাদের গ্রামের একজনের মোটরবাইকে এসেছে। সেটাতে আর মায়ের যাওয়া সম্ভব হবে না। তাই সাংবাদিকরা একজন নিজে থেকেই দিদি-জামাইবাবুদের সংগে গিয়ে মাকে পৌচ্ছে দিয়ে আসার দায়িত্ব নেয়। সে দিদিকে বলে, জামাইদাকে পাঠিয়ে ভাইকে যেন হোষ্টেল থেকে নিয়ে আসে। ভাইকে তার ব্যাপারটা বলতে হবে না। তার পড়াশোনার ক্ষতি হতে পারে। তার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে কিছু একটা বলে এড়িয়ে গেলেই হবে। জামাইবাবু বলে , সেটা নিয়ে তোমাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। আমি গিয়ে ওকে নিয়ে আসব। কথা বলতে বলতেই তারা হোমের গেটের সামনে পৌঁচ্ছে যায়। বিদায় নেওয়ার আগে সে মা আর দিদিকে জড়িয়ে ধরে। তিনজনেই কান্নায় ভেঙে পড়ে। কতক্ষণ যে ওইভাবে কেটে যায় কেউ টের পায় না। এক সময় োদ্বারোয়ানের তাগাদায় তাদের খেয়াল হয় সন্ধ্যে ঘনিয়ে এসেছে। দারোয়ানও বলে – সন্ধ্যে হয়ে এল। এবার গেট বন্ধ করতে হবে। ভিতরে যাওয়ার কে আছেন চলে আসুন।
কিছুতেই দিদি আর মাকে ছেড়ে যেতে মন চায় না অঞ্জলির। সেটা বুঝতে পেরে দিদি বলে , মন খারাপ করিস না , মা আর আমি মাঝে মধ্যে এসে তোর সঙ্গে দেখা করে যাব।
তারপর দিদি আর মা তাকে হোমের গেটের ভিতর পর্যন্ত পৌঁছে দেয়। তারপর বন্ধ হয়ে যায় হোমের বিরাট গেটটা। চোখের আড়াল হয়ে যায় প্রিয়জনেরা। শুরু হয় অঞ্জলির এক নতুন জীবন।

ক্রমশ …

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!