সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ২৩)

সালিশির রায়

কিস্তি – ২৩

হৃদয়দা টিভির নায়ক নায়িকাদের মতো এঁটো হাতেই আঙুলে রিঙ করে বলে , অসম, একদম ফাস্টো কেলাস। হৃদয়দার বলার ভঙ্গীটা খুব ভালো লাগে অঞ্জলির। ইচ্ছে করে , এঁটো হাতেই নেড়ে ঘেটে হৃদয়দার চুলগুলো এলোমেলে করে দেয়। তাদের ওইভাবে বসে থাকতে থেকে ঘরের ভিতর থেকে দিদি গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, কি রে অঞ্জু—– হৃদয় তো খালি থালার সামনে অনেকক্ষণ ধরে এঁটো হাতে বসে আছে। ভাত-টাত নেয় তো দে।
কিছু না ভেবেই সে বলে, জিজ্ঞেস করেছি তো। আর কিছু লাগবে না বলেছে।
— সেও তো শুনেছি অনেকক্ষণ। তাই তো ভাবছি শেষপাতে খাওয়ার মতো আর কিছু আছে নাকি ?

ইঙ্গিতটা দুজনেই বোঝে। তাই হৃদয়দা তাড়াতাড়ি উঠে পড়ে। আর সে নিজে লজ্জায় কথা হারিয়ে ফেলে। লজ্জা ঢাকতে হৃদয়দা তাড়াতাড়ি হাত ধুয়ে মোটরবাইকের দিকে এগিয়ে যায়। আর সে অন্য দিকে মুখ ঘুরিয়ে থাকে। তা দেখে দিদি বলে, যাও আর লজ্জা দেখাতে হবে না। একটু এগিয়ে দিয়ে এসো। নাহলে তো আবার তোমার কোন কাজেই মন লাগবে না। তবে লজ্জা সরম একটু আধটু থাকা ভালো। হাজার হোক আমি দিদি, গুরুজন।
— যাঃ দিদি তুই না। ভারি তো আমার গুরুজন। মোটে তো দু’বছরের বড়ো। বলে সে হৃদয়দার আনা দুটো থলে ফেরত দেওয়ার অজুহাতে বাইরে যায়। দিদি যতই বলুক, শুধু শুধু তো আর সে সবার সামনে হৃদয়দাকে এগিয়ে দিতে যেতে পারে না। লজ্জা বলেও তো একটা কথা আছে। হৃদয়দা চলে যাওয়ার পর তারা একসঙ্গে খেতে বসে। খেতে খেতেই নানা কথা হয়। দিদি জানায় , ডাক্তারবাবু বলেছেন মানসিক চাপেই নাকি মায়ের ওই অবস্থা। ওষুধ দিয়েছেন , কিন্তু বলেছেন পরিপূর্ণ শারীরিক এবং মানসিক বিশ্রাম প্রয়োজন।

কথা প্রসঙ্গে দিদি হৃদয়দার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে ওঠে। বলে, মায়ের চিকিৎসার জন্য একটা পয়সাও আজ আমাকে খরচ করতে দেয় নি। কার করার কথা, আর কে করছে।দিদির মুখে হৃদয়দার প্রশংসা শুনে খুব ভালো লাগে অঞ্জলির। ভালোবাসার মানুষের প্রশংসা শুনতে কার না ভালো লাগে। কথায় কথায় দিদি বলে , বেচারিকে তেতেপুড়ে এসেই আবার খেয়ে দেয়ে চলে যেতে হলো বলে প্রথমে খুব খারাপ লাগছিল। কিন্তু পরে ভেবে দেখলাম ও চলে গিয়েছে, একদিকে ভালোই হয়েছে।
—- ভালোই হয়েছ ?
—- অঃ কথাটা বুঝি তোমার খুউব খারাপ লাগল ? কিন্তু ভেবে দেখছো কি, বিকালে মোড়ল নির্বাচনের মিটিং আছে। আমরা সবাই যাব। হৃদয় থাকলে তাকেও নিয়ে যেতে হত। ওকে দেখলেই গুজগুজ – ফিসফাস শুরু হয়ে যেত। বাবার মোড়ল নির্বাচনের আগে সেটা কি খুব ভালো হত ? পরে এটা নিয়েই কোন অশান্তি হবে কিনা কে জানে।

অঞ্জলি ভাবে সত্যিই তো এদিকটা তো সে ভাবে নি। দিদি কেমন গুছিয়ে ভেবেছে। আবেগে সে এঁটো হাতেই জড়িয়ে ধরে গালে কপালে চুমু খেয়ে অস্থির করে তোলে। দিদি শশব্যস্ত হয়ে তাকে বলে, ছাড় ছাড়। হলোটা কি তোর। সারা গায়ে এঁটো মাখিয়ে দিলি যে।
সে আরো জোরে দিদিকে জাপটে ধরে বলে, দিদি – দিদি- দিদি। তোর কি বুদ্ধি রে। পড়লে তুই নির্ঘাত মাষ্টারিনী হয়ে যেতিস।
—- হয়েছে, হয়েছে। আমার আর মাস্টারিনী হয়ে লাভ নেই। এবারে সব গোটা তো দেখি। বেলা পড়ে এলো। যেতে হবে তো এবার নাকি?
—- হ্যা হ্যা, এই গুটিয়ে নিলাম বলে।
তারপরই দ্রুতহাতে সে এঁটো থালা বাসন গুটিয়ে হাত ধুয়ে নেয়।

ঠিক হয় ভাই আর মা বাড়িতেই থাকবে। কি হয় সেটা বলা তো যায় না। মায়ের তো ওই অবস্থা , ডাক্তার চাপ নিতে বারণ করেছে। শেষে ভালো মন্দ একটা যদি কিছু হয়ে যায় তাহলে সারাজীবন আফশোষের শেষ থাকবে না। তাই বাবাকে নিয়ে যাবে শুধু তারা দুই বোন।সেই মতো বাবাকে নিয়ে ওরা পৌঁছোয় অঙ্গনওয়াড়িকেন্দ্রে। পাড়ার লোকেরাও একে একে হাজির হচ্ছে। এসে পৌঁচেছে দুরোই কাকা, মলিন্দকাকা, ভক্ত জ্যাঠা, হোপনকাকা,লক্ষণ জ্যাঠারা। কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিক্রান্ত হয়ে যাওয়ার পরও এসে পৌঁছোয় নি মোড়ল কালীরাম। আসে নি তার পারিষদরাও। সবাই বলাবলি করতে থাকে , ওরা তো জানেই আজ থেকে আর ওদের পদ থাকবে না। তাই হয়তো আসবে না। তবু মলিন্দকাকাকে ডাকতে পাঠানো হয় ওদের। কিছুক্ষণের মধ্যে ফিরে এসে মলিন্দকাকা বলে, ওরা বলল তোমদের যা খুশী করে গে, আমরা যাব না। অগত্যা শুরু হয়ে যায় মোড়ল পরিষদ গঠনের প্রক্রিয়া। মলিন্দকাকাই প্রস্তাবটা রাখে। উঠে সে বলতে শুরু করে, বন্ধুরা আমরা জানতে পেরেছি কালীরাম আমাদের নাম করে বিভিন্ন সরকারি সাহার্য্য এনে নিজে একাই ভোগ করেছে। এমন কি জরিমানার টাকাও সে’ই বেশি নিজের স্বার্থে লাগিয়েছে, পাড়ার উন্নতির কথা ভাবে নি।তাই আমরা আর আজ থেকে তাকে মোড়ল হিসাব মানব না।নতুন মোড়ল হিসাবে আমি সুখলালের নাম করছি। এবার তোমরা তোমাদের মত জানাও। মলিন্দকাকার কথা শেষ হতেই সবাই হই হই করে ওঠে — তাই হোক, তাই হোক।

অঞ্জলিরা অবাক হয়ে যায়। এই লোকগুলোই কিছুদিন আগে তার বাবা মা’কে গাছে বেঁধে জরিমানা আদায় করেছে। আর আজ তারাই বাবার নামে জয়ধ্বনি দিচ্ছে। বুঝতে অসুবিধা হয় না পিছন থেকে কলকাঠিটা নেড়েছে ওই রাম নস্করের দলের লোকেরা। কালীরাম আর তাদের কথায় চলে না বলেই ছক কষে তাকে সরিয়ে বাবাকে মোড়ল করা হল। যেদিন বাবার সঙ্গেও আর বনবে না সেদিন তাকেও সরাতে দুবার ভাববে না রামবাবুদের দল। রাজনীতির লোকেদের এটাই ধর্ম। যেমন করেই হোক নিজের বশে রাখতে হবে সবাইকে। তবে তা নিয়ে এখন থেকেই বেশি কিছু ভাবতে চায় না সে।যেদিনকার যা সেদিন তা হবে। আপাতত বাবার মোড়ল হওয়াটা তাদের রক্ষাকবচ হয়ে দাঁড়াবে। না হলে কে বলতে পারে তার আর হৃদয়দার বিষয়টি নিয়ে সালশি সভা ডেকে জরিমানা করা হত না। তাই বাবা যতদিন মোড়ল থাকবে ততদিন আর হৃদয়দার সঙ্গে মেলামেশা করা নিয়ে তাকে দুশ্চিন্তা করতে হবে না। মোড়ল নির্বাচনের পর একে একে পারানিক , জকমাঝি আর চৌকিদার নির্বাচনও হয়ে যায়। তারপর শুরু হয়ে যায় ধামসা–মাদলের সংগে নাচ। পাড়ার মেয়েরা তাদেরও টেনে নিয়ে যায়। পায়ে পায়ে পা মিলেয়ে তাদেরও ‘ সানতাল করেছে ভগোমান গো ‘ গানের সঙ্গে কোমর দুলিয়ে নাচতে হয়।

বাবা লক্ষণ জ্যাঠার হাতে রাম নস্করের দিয়ে যাওয়া টাকাটা তুলে দেয়। আর জ্যাঠা সবার উদ্দেশ্যে বলে , শোন সবাই আমাদের নতুন মোড়ল আনন্দ করার জন্য ৫০০ টাকা দিয়েছেন। সবাই তার নামে একবার জয় জয় বলো।অমনি পাড়ার লোক বাবার নামে জয়ধ্বনিতে ফেটে পড়ে। চলে আসে ঢালাও মদ আর মাংস। তারা বাবাকে নিয়েই বাড়ি ফিরতে চাইছিল, কিন্তু ভক্তাজ্যাঠারা কিছুতেই বাবাকে ছাড়ল না। বলল, তোমরা যাও। তোমাদের বাবা এখন আমাদের মোড়ল। তার দায়িত্ব আমাদের। আনন্দ- ফুর্তির পর আমরাই দিয়ে আসব বাড়িতে। অগ্যতা তারা দু’বোন বাড়ি ফিরে আসে।তারা বাড়ি ফিরে আসা মাত্রই ভাই ছুটে এসে জিজ্ঞেস করে , ও দিদি বল না বাবা মোড়ল হয়েছে তো। অঞ্জলি বলে, হ্যারে হয়েছে হয়েছে, তোর যে তর সইছে না দেখছি। কি
ব্যাপার বল তো ?
—– দাঁড়া , আমি আসছি। বলে ভাই তাদের কিছু বোঝার আগেই একটা দড়ি নিয়ে ছুটে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণ পরেই দেখে ভাই কালীরামের বাড়ি থেকে জরিমানার সময় নিয়ে চলে যাওয়া তাদের সেই শুয়োর গুলো টানতে টানতে নিয়ে আসছে। বাড়ি ঢোকার আগেই ভাইকে আটকায় সে। সেখান থেকেই দেখে কালীরাম তার ছেলেটাকে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওই ছেলেটাই একদিন তাদের বাড়ি থেকে ভাইয়ের কাছে থেকে শুয়োর গুলো নিয়ে চলে গিয়েছিল। মুহুর্তে দৃশ্যটা মনে পড়ে যায়। সেদিন ঠোঁট ফুলিয়ে অনেকক্ষণ কেঁদেছিল ভাই। তারা আবার শুয়োর কিনে দেব বলে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভাইয়ের কান্না থামিয়েছিল।

আজও সেই শুয়োর কিনে দিতে পারে নি। তাই ভাই শুয়োর হারানোর দুঃখ ভোলেনি। ভাইয়ের বয়সী কালীরামের ছেলেটাও হয়তো এতদিনে শুয়োর গুলোকে ভালোবেসে ফেলেছে। তাই শুয়োরগুলো নিয়ে নিলে ভাইয়ে মতো তারও দুঃখ হতে পারে ভেবেই সে ভাইকে বলে, শুয়োর গুলো আবার ওদের বাড়ি থেকে আনতে গেলি কেন ?
—- শুয়োর গুলো তো আমাদের। ওরা যখন মোড়ল ছিল তখন জোর করে নিয়ে চলে গিয়েছিল। আজ আমার বাবা মোড়ল, তাই শুয়োর গুলো নিয়ে চলে এলাম।
অঞ্জলি দেখে ক্ষমতার পরিবর্তনের স্বাদ ছোট ভাইটা ও কেমন বুঝে ফেলেছে। সত্যি বলতে কি , কালীরামেরও দূর থেকে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া আজ আর করার কিছু নেই। বরং তারা চাইলে কালীরামের কাছ থেকে নিজের শুয়োরগুলোও নিয়ে নিতে পারে। কিন্তু সে হবে চোরের উপর বাটপাড়ির সামিল। তাছাড়া ক্ষমতার অপব্যবহারও সে পচ্ছন্দ করে না। তাই ভাইয়ের মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে সে বলে, ছিঃ ভাই ওই শুয়োর তো আর আমাদের নেই। ওদের হয়ে গিয়েছে। বাবা তো এখন পাড়ার মোড়ল। ওদের শুয়োর নিয়ে নিলে বাবার নিন্দে হবে, সেটা কি তুই চাস ? তার কথা শুনে ভাইটা কি বুঝল কে জানে , শুয়োর গুলোকে ছেড়ে দিল। আর কালীরামের ছেলেটা এসে সেগুলো ডাকিয়ে তাদের বাড়ির দিকে নিয়ে চলে যায়। সে ভাইকে নিয়ে বাড়ি ঢোকে। সেদিন অনেক রাতে বাড়ি ফিরেছিল বাবা। তারপরও অনেক রাতপর্যন্ত বেজেছিল ধামসা মাদল। সেই বাজনা শুনতে শুনতে অঞ্জলির মনে পড়ে যাচ্ছিল কয়েকমাস আগের সেই রাতটার কথা। সে রাতেও এমনি করেই বেজেছিল ধামসা মাদল।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।