সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ১৯)

সালিশির রায়

কিস্তি – ১৯

সেই সময় নড়ে ওঠে বাইরের দরজার কড়া। মুখ তুলে চাইতেই অঞ্জলি দেখে দরজা ঠেলে এগিয়ে আসছে হৃদয়দা।খুশিতে নেচে ওঠে তার মন। একক্ষণ তো হৃদয়দার কথাই ভাবছিল সে। পরিপূর্ণ দৃষ্টিতে হৃদয়দার দিকে চেয়ে থাকে অঞ্জলি। হৃদয়দাও হাসি হাসি মুখে চেয়ে থাকে। কতক্ষণ ওইভাবে তারা অপলক চেয়েছিল ঠিক নেই। একসময় হৃদয়দা একটা ঝোলা এগিয়ে দিয়ে বলে — নাও ধরো।
অঞ্জলি দেখে ঝোলাতে চাল-ডালের পাশাপাশি রয়েছে তরিতরকারি। ঝোলাটা নিতে তার খুব সংকোচ হয়। সেদিন ওইভাবে টাকা দেওয়ার পর বাজারও করে এনে দিয়েছিল হৃদয়দা। আজ আবার এনেছে। তাই বলে , রোজ রোজ আবার এসব কেন ? আর কত ঋণ বাড়াবে ?
—- আমার কাছে না হয় রইলেই একটু ঋণী। তারপর বলেছি তো একদিন সুদে আসলে শোধ করে দেবে। কি, দেবে তো সেদিন ?
ইঙ্গিতটা বুঝতে পেরে লজ্জায় লাল হয়ে যায় অঞ্জলি। কোন রকমে বলতে পারে — জানি না যাও। ওইসব জিনিসপত্র আনার জন্য কপট রাগ দেখায় বটে কিন্তু মনে মনে সে কিছুটা খুশীই হয়। এখন বাবার রোজগারে তাদের তো দিন আনি দিন খাই অবস্থা। দিদি–জামাইবাবু এখন এলে আর কোন অসুবিধা হতো না, হৃদয়দার আনা ওইসব জিনিসপত্র খুব কাজে লাগতো। তাছাড়া হৃদয়দা তো তার মনের মানুষ। মনের মানুষের কাছে ঋণী থাকতে অসুবিধা কোথাই ? হৃদয়দা একটা চ্যাটাই পেতে এসে তার কাছটিতেই বসে। এখন আর হৃদয়দাকে এসো বসো বলতে হয় না। নিজেই বাড়ির ছেলের মতো জায়গা খুঁজে নিয়ে বসে পড়ে। সেদিন জরিমানা মিটিয়ে দেওয়ার পর থেকে বাবা-মায়ের সামনে হৃদয়দার সংগে কথা বলতে তারও আর সেই সংকোচ হয় না। আর ভাইটা তো নেহাতই ছোট। সে’ও কেমন দিন দিন হৃদয়দার ন্যাওটা হয়ে উঠেছে। হৃদয়দা যখন আসে তখনই ওর জন্য কিছু না কিছু নিয়ে আসে। আর ছোটরা তো ভালোবাসার বশ। শুধু ছোটরাই কেন ? পৃথিবীর কে ভালোবাসার বশ নয় ? সে নিজে ?
তার চিন্তা শুধু দিদিকে নিয়ে। দিদি হৃদয়দাকে কেমন ভাবে নেবে সেটা নিয়েই তার দুশ্চিন্তা হয়। সেটা হৃদয়দা দিদির বাড়ি খবর দিতে গেলেই পরিস্কার হয়ে যাবে।হৃদয়দার অবশ্য সে সব নিয়ে কোন হেলদোলই নেই। বরং কথাটা বলতেই একপায়ে খাড়া। বলে , অত ভাবছ কেন। আমার উপরে ভরষা করেই দেখ না। ঠিক তোমার দিদিকে পটিয়ে নিয়ে চলে আসব। কিছু বললে গায়ে মাখবই না।
— অ , দিদিকেও পটাতে চাও বুঝি। মেয়ে পটাতে খুব যে এক্সপার্ট মনে হচ্ছে। মজা করেই হৃদয়দাকে খোঁচাটা দেয় অঞ্জলি। মজা করতে ছাড়ে না হৃদয়দা ও। সে বলে , মেয়েরাই বা পটার জন্য অত মুখিয়ে থাকে কেন ? আমি অবশ্য অনেক মেয়ের কথা জানি না। একটা মেয়েকেই পটাতে পারলেই চলবে আমার। বলতো সেই মেয়েটা কে ?
— কে ?
—- সেই মেয়েটা হলো আমার অঞ্জু। বলে আলতো করে তার হাতটা নিজের হাতে তুলে নেয় হৃদয়দা। তার সারা শরীর শির, শির করে ওঠে। যেন বিদ্যুৎ খেলে যায়। অনাস্বাদিত এক সুখানুভূতিতে ভরে যায় তার মন প্রান। মনে হয় এইভাবেই হৃদয়দার সংগে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকে।
তাদের কথাবার্তার মাঝে কখন মা এসে দাঁড়িয়েছে তা টের পায় না তারা। অঞ্জলি দ্রুত হৃদয়দার হাত থেকে তার হাতটা সরিয়ে নেয়। চরম অস্বস্তিতে পড়ে যায় হৃদয়দাও। কিন্তু মায়ের তেমন কোন ভাবান্তরই লক্ষ্য করা যায় না। যেমন এসেছিল তেমনই চলে যায়।হৃদয়দা যেন মায়ের আচরণে কিছুটা ভয় পেয়ে যায়। শঙ্কিত গলায় জিজ্ঞাসা করে আমাকে তোমার সঙ্গে দেখে উনি কি রাগ করলেন ?
অঞ্জলিও কিছুটা ভয় ধরানো গলায় বলে , রাগ করতেই পারেন। বাইরের কোন ছেলেকে মেয়ের হাত ধরে বসে থাকতে দেখলে মায়ের রাগ হওয়াটাই তো স্বাভাবিক।
—– তাহলে ?
—- তাহলে আর কি ? ভুলেও আর এ মুখো হয়ো না।
—- তুমি বলতে পারলে এ কথা ?
অঞ্জলি দেখে হৃদয়দার মুখে দুশ্চিন্তার ছায়া। বেচারিকে আর কষ্ট দিতে মায়া হয় তার। মায়ের বিষয়ে হৃদয়দার সঙ্গে আলোচনা করবে বলেই ঠিক করে রেখেছিল অঞ্জলি। তাই সে বলে , আমাদের বিষয়টি মায়ের মনে কোন রেখাপাতই করে নি।
—– সে কি, কেন ?
—- সেদিন ডাইনি নামানোর নাম করে ওই অমানসিক নির্যাতনের পর থেকেই মা কেমন হয়নগিয়েছে। এই স্বাভাবিক তো পরক্ষণে নিজের মধ্যে নেই।
—- জানগুরু আর পাড়ার লোকগুলো পুলিশে দেওয়া উচিত ছিল।
—- তাতে আর কি লাভ হত , মাঝখান থেকে আমাদের পাড়ার বাসটাই উঠে যেত।
—- তাও বটে, তাহলে কি করবে ?
—– ভাবছি মাকে ভালো কোন ডাক্তার দেখাব। দিদি আসুক তারপর সব ঠিক করব।
—- সেটাই ঠিক হবে। চাও তো আমিও তোমার সঙ্গে থাকতে পারি।
— তোমাকে তো থাকতে হবেই। তুমি ছাড়া এ দুঃসময়ে আমার পাশে আর কে আছে বলো ?
—- আমাকে এত ভরসা করো তুমি ?
—- করিই তো।
এবার সে’ই হৃদয়দার হাতটা তুলে নেয় নিজের হাতে।কিছুক্ষণ খুনসুটির পর বাড়ি যাওয়ার জন্য পা বাড়ায় হৃদয়দা। ঠিক হয় বিকালের দিকে সে এক বন্ধুর মোটরবাইক নিয়ে দিদির বাড়ি যাবে। হৃদয়দা যে মোটরবাইক চালাতে যানে তা জানা ছিল না তার। জানার পরই তার মানসপটে একটা ছবি ভেসে ওঠে। হৃদয়দার বাইকের পিছনে তার কোমর জড়িয়ে ধরে বসেছে সে। খুব জোরে বাইক চালাচ্ছে হৃদয়দা। সে উৎসাহ দিচ্ছে —আরো, আরো, আরো জোরে চালাও। হাওয়ায় উড়ছে তার শ্যাম্পু করা চুল।সালোয়ারের ওড়না। হৃদয়দার শরীরের গন্ধ তাকে যেন আচ্ছন্ন করে ফেলে। হৃদয়দা তার শরীরের ছোঁওয়া পেতে মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে রাস্তার – খানাখন্দের উপর দিয়েই চালিয়ে দিচ্ছে মোটর বাইক।আর সে টাল সামলাতে না পেরে হুমড়ি খেয়ে পড়ছে হৃদয়দার পিঠের উপর। আলতো হাতে হৃদয়দার পিঠে কিল মারছে আর বলছে — খুব না——- আচ্ছা দুষ্টু হয়েছে কিন্তু তুমি। আর অমনি হৃদয়দা যেন আরও দুষ্টুমি করার জন্য তার ঠোঁটের কাছে নিজের ঠোঁট দুটো এগিয়ে আনে। আর সে শশব্যস্ত হয়ে ওঠে — আরে করো কি, সামনের দিকে তাকাও। অ্যাক্সিডেণ্ট হয়ে যাবে যে। ঘোরো ,ঘোরো।
—- ঘুরছি রে বাবা অত তাড়া দিচ্ছো কেন ? হাতটা তো আগে ছাড়ো। হৃদয়দার কথায় বাস্তবে ফেরে অঞ্জলি। দেখে হৃদয়দার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে দরজার মুখে। খুব লজ্জা পেয়ে যায় সে। তাড়াতাড়ি হৃদয়দার হাত ছাড়িয়ে দু’পা পিছিয়ে যায়। হৃদয়দা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে , কি হয়েছিল তোমার এতক্ষণ ?
—- কিছু না। সাবধানে যাবে। একদম জোরে বাইক চালাবে না।
—- ঠিক আছে , আমি আসি তাহলে এখন।
—- হ্যা এসো।
সাইকেলের প্যাডেলে পা রাখে হৃদয়দা। রাস্তার বাঁকে মিলিয়ে যাওয়ার আগে পর্যন্ত সেদিকেই চেয়ে থাকে অঞ্জলি। তার খুব ভালো লাগে আজ হৃদয়দা আসি বলেছে। সেদিন যাই বলেছিল। সে শুধরে দিয়েছিল। তার সেই কথাটা মনে রেখেছে হৃদয়দা।এইসব ছোটখাটো বিষয়গুলিই বলে দেয় মনের মানুষটি তার কথা কতখানি মনে রাখে।এতক্ষণ সে যেন কোন স্বপ্নের জগতে হারিয়ে গিয়েছিল হৃদয়দার সঙ্গে। তার রেশটা এখনও মায়াঅঞ্জন হয়ে লেগে রয়েছে অঞ্জলির চোখে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।