সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৩৩)

সালিশির রায়

কিস্তি – ৩৩ 

সারাদিন মন খারাপেই কেটে যায় অঞ্জলির। কোন রকমে নাওয়া – খাওয়া করে সে ভাবতে বসে তার পরবর্তী পদক্ষেপের কথা। মাকে ফেলে তো সে স্কুলে যেতে পারবে না। অরুণস্যারকে বলে ওদিকটা সামাল দিতে হবে। বাড়িতে পড়েই পড়াশোনার ঘাটতি পূরণ করার চেষ্টা করবে সে। চাকরি হোক বা না’ই হোক যত দিন পারে সে পড়াশোনাটা চালিয়ে যাবে। তারপর যেদিন যা হওয়ার হবে। বিকালের দিকে হৃদয়দা আসে। মনটা কিছুটা শান্ত হয়। হৃদয়দাকে সে সব খুলে বলে। জিজ্ঞেস করে , আমরা যখন বর্ধমান চলে যাব তখন কি হবে ?
— কি আর হবে ? আর একজন কাউকে খুঁজে নেব। আমি অত দূরে গিয়ে তোমার সঙ্গে প্রেম করতে তো পারব না।
হৃদয়দার কথা শুনে তার চোখ ঠল-ঠল করে ওঠে। কথা বলার ক্ষমতা হারিয়ে যায়। হৃদয়দা তার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। বেশ কিছুক্ষণ পর সে বলে — তুমি বলতে পারলে এ কথা ?
— না, বলার কি আছে ? যেটা সত্যি সেটাই তো বলেছি।
এবারে ফুঁপিয়ে কেঁদে ফেলে অঞ্জলি। আর শশব্যস্ত হয়ে তার চোখের জল মুছিয়ে দিতে এগিয়ে আসে হৃদয়দা। সে দ্রুত পিছিয়ে গিয়ে বলে — যাও যাও , তোমাকে আর সোহাগ দেখাতে হবে না। আর একজন কাউকে খুঁজে নিয়ে সোহাগ দেখাও গে যাও।মুখে কথাটা বলল বটে , অঞ্জলি মনে মনে চাইছিল হৃদয়দা তার চোখের জল মুছিয়ে দিয়ে একটু আদর -সোহাগ করুক। কিন্তু কে কোথাই থেকে দেখে ফেলবে তার ঠিক নেই। তাই সে নিজেকে সংযত রাখে।
তার মুখের ভাব দেখে হৃদয়দা দ্রুত বলে ওঠে — আচ্ছা তুমি কি কিছুই বোঝাই না। আমি তো তোমাকে রাগাচ্ছিলাম। হয়তো অন্য কাউকে খুঁজে পাব , কিন্তু আমার অঞ্জুর মতো ভালোবাসা কি আর পাব ?
—- যাও, আর তোয়াজ করতে হবে না আমাকে।
— না গো , তোয়াজ নয়। সত্যি কথাই বলছি।
হৃদয়দার কথা শুনে অদ্ভুত এক ভালো লাগায় ভরে যায় তার মন। আর ও কিছুক্ষণ গল্প-গুজব করে হৃদয়দা সন্ধ্যের মুখে চলে যায়। ঠিক হয় বাবা না আসা পর্যন্ত এখন থেকে দিনে একবার করে এসে খবর নিয়ে যাবে। কিন্ত দিন যায় , মাস যায় , বাবার আর খবর আসে না। দুঃশ্চিন্তায় নাওয়া- খাওয়া বন্ধ হয়ে যায় তাদের। অর্থাভাবে এমনিতেই বন্ধ হয়ে যেত এতদিন। নেহাত হৃদয়দা চাল-ডালটা নিয়ে আসে বলে কোন রকমে হাড়ি চড়ে। মা আরও চুপচাপ হয়ে যায়। অঞ্জলি বুঝতে পারে বাবার জন্য মায়ের মনেও দুশ্চিন্তার ঝড় বইছে। কিন্তু সে আরও দুঃশ্চিন্তায় পড়ে যাবে বলে কিছু প্রকাশ করে না। সে আর চুপচাপ বসে থাকতে পারে না। দাদাকে জানিয়ে কোন লাভ নেই। সে হৃদয়দাকে দিয়ে দিদির কাছে খবর পাঠায়। হৃদয়দার সঙ্গেই চলে আসে দিদি। এসেই তাকে ওই ভাবে বাবাকে যেতে দেওয়ার জন্য একপ্রস্থ বকাবকি করে।
হৃদয়দাই তখন মাঝে পড়ে পরিস্থিতির সামাল দিতে এগিয়ে আসে। দিদিকে বলে , যা হওয়ার তা তো হয়েই গিয়েছে। এখন কি করা যায় সেটাই ভাবতে হবে।
দিদি বলে — কি করা যায় সেটাই তো ভেবে পাচ্ছি না। বর্ধমান তো ছোট একটা জায়গা নয় , যে খুঁজে বের করে আনব বাবাকে।
— সেটা অবশ্য ঠিক। তবে একটা কাজ করা যেতে পারে।
—- কি কাজ ?
—- বর্ধমান থানায় একটা নিখোঁজ ডায়েরি করা যেতে পারে। তাতে খুব একটা লাভ হবে বলে মনে হয় না। তবু ওটাই নিয়ম।
ঠিক হয় , পরদিন ভোরের ট্রেনে সে আর হৃদয়দা যাবে বর্ধমান। মা’কে আগলে দিদি থাকবে বাড়িতে। সেই মতো বাবার একটা ছবি নিয়ে তারা বর্ধমানের উদ্দেশ্যে রওনা দেয়। থানা – পুলিশ সম্পর্কে অঞ্জলির সম্যক কোন ধারণা ছিল না। তবে লোক মুখে শুনেছিল সাধারণ মানুষকে পুলিশ নাকি মানুষই মনে করে না। সেই পুলিশ যে কতটা অমানবিক হতে পারে তা বাবার নিখোঁজ ডায়েরি লেখাতে গিয়ে হাড়ে হাড়ে টের পেল সে। সেদিন তারা খুব সকালেই পৌঁচ্ছে যায় বর্ধমান থানায়।গেটের সামনে তখন পায়চারি করছিল দুজন বন্দুক ধারী পুলিশ। তাদের মধ্যে একজন বলল , কি চাই ? তারা প্রয়োজনের কথা বলতেই সেই পুলিশ কর্মী বলল — ও সাতসকালে আর কাজ পেলে না মিসিং ডায়েরী লেখাতে চলে এলে ?
তারা কিছু না বুঝেই একসঙ্গে বলে ফেলে — এখানে বুঝি সকালে মিসিং ডায়রি নেওয়া হয় না ?
— নেওয়া আবার হবে না কেন ? সকালবেলায় একটু ভালো বউনি-বাটা না হলে সারাদিনটাই তো মাঠে মারা যাবে।
— বউনি–বাটা মানে ?
— বউনি — বাটা মানে , বউনি বাটা। যাক তোমাদের আর অত বুঝে কাজ নেই। সাত সকালে এসেই যখন পড়েছো তখন যাও ওই সামনের দোকান থেকে চারটে স্পেশাল চা আর এক প্যাকেট সিগারেট নিয়ে এসো দেখি। সকালে থেকে কারও পেটে এক ঢোক চা’ও পড়ে নি।
হৃদয়দা হাত বাড়িয়ে বলে, কই টাকা দিন এনে দিচ্ছি।
হৃদয়দার কথা শুনে অবাক হয়ে যায় পুলিশকর্মী। সে সংগীর দিকে তাকিয়ে বলে — আরে এ বলে কি রে ? সকাল বেলায় মহা আহমকের পাল্লায় পড়লাম তো। এ তো ঘুরিয়ে আমাদেরই টাকা চাইছে রে ?
তারা কিছু বুঝতে পারে না। হৃদয় অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে পুলিশ কর্মীদের দিকে।
তারপর বলে, আপনি চা – সিগারেট আনতে বললেন যে —–।
— সে তো বলছিই। থানায় বসে পুলিশ তোমার কাজ করবে আবার নিজের টাকায় চা-সিগারেট খাবে তা হয় কখনও?
— ডায়রি লেখাতে গেলে বুঝি সবাইকে চা–সিগারেট খাওয়াতে হয় ?
— সে রকম বাঁধাধরা কোন নিয়ম নেই বটে। তবে সেটাই দস্তুর। চা–সিগারেট খাওয়ালে এখনই তোমাদের ডিউটি অফিসারের কাছে যেতে দেব। নাহলে যতক্ষণ না কেউ এসে চা-সিগারেট খাইয়ে বউনি করছে ততক্ষণ যেতে পারবে না। তাতে যদি সবাই একের পর এক বউনি না করাতে শুরু করে , তাহলে যেতে আজ পাবে না কাল পাবে তার ঠিক নেই।
শুনে ‘থ’ হয়ে যায় তারা। আর কথা বাড়ায় না। হৃদয় সামনের দোকান থেকে চা–আর সিগারেট নিয়ে আসে। থালা থেকে নিজের দু গ্লাস চা আর চারটে সিগারেট বের করে নিয়ে গুঁফো পুলিশ কর্মীটি বলে , এবার ওই চা আর সিগারেটের প্যাকেটটা নিয়ে চলে যাও বাঁদিকে ডিউটি অফিসারের ঘরে।
সেই ঘরে ঢুকেই তারা দেখে পাশাপাশি চেয়ারে ইয়া ভুড়ি মোটা একজন আর অম্বলের রোগী মার্কা একজন পুলিশ বসে বয়েছেন। অন্য কোথাও এদের দেখলে নির্ঘাত হেসে ফেলত অঞ্জলি। এখানে খুব কষ্টে হাসি চাপতে হল তাকে। প্রথমে তাদের ঢুকতে দেখে দু’জনেরই ভ্রুকুচকে যায়। তারপর হাতের থালায় চায়ের গ্লাস আর সিগারেটের প্যাকেট দেখে মুখে একটু প্রসন্নভাব ফুটে ওঠে।প্রায় ছোঁ মেরে চা সিগারেট নিয়ে ভুঁড়িওয়ালা জিজ্ঞেস করে — কি কেস ? সব শোনার পর অম্বলমার্কাকে দেখিয়ে বললেন , ওর হাতে ১০০ টাকা দাও। ও সব লিখে রেডি করে রাখছে। তারপর বড়বাবু উঠলে ডায়েরি লিখে নেব। হৃদয়দা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ডায়েরি লেখাতেও টাকা লাগবে ?
— এমনিতে লাগবে না। কিন্তু তোমরা ঠিকঠাক দরখাস্ত লিখতে পারবে তো ? ভুল হলে কিন্তু আর ডায়রি হবে না।
অগত্যা অম্বলমার্কার হাতে ১০০ টাকা তুলে দিতে হয়। পাশের ঘরে গিয়ে তিনি নাম ধাম জেনে নিয়ে সাদা একটা দরখাস্ত লিখে তাদের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বেড়িয়ে যায়।বড়বাবুর অফিসে ঢুকতে ঢুকতে দুপুর গড়িয়ে যায়। তার ভুঁড়ি মোটা পুলিশের কাছে যেতেই তিনি বলেন — বড়বাবু বললেন এটা আমাদের কাছে ডায়রি হবে না। যেহেতু ট্রেনে এসেছে তাই ওটা রেলপুলিশের আওতায় পড়ে। তোমরা বরং তাদের কাছেই চলে যাও।
কথাটা শুনেই রাগে গা গড় গড় করে ওঠে অঞ্জলির। এই কথাটা জানার জন্যই তাদের সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত খালি পেটে পড়ে থাকতে হল। ডিউটি অফিসার হয়েও ভুঁড়ি মোটা পুলিশটা এটাও জানত না। তাই রেগে রেগেই সে বলে , বেশ আমাদের টাকাটা দিন।
— টাকা ? কোন টাকা ? ও ওই দরখাস্ত লেখার টাকা ? ওই অফিসার তো বাড়ি চলে গিয়েছে। তোমরা বরং আর একদিন এসে নিয়ে যেও। তাছাড়া দরখাস্ত লেখার জন্য টাকাটা দিয়েছিলে। সে কাজটা তো হয়েই গিয়েছে। ওই দরখাস্তটাই বরং রেলপুলিশকে দিয়ে দেবে।
—- তামাশা নাকি ? এই নিন আপনাদের দরখাস্ত , আর আমাদের টাকাটা ফেরত দিন – রেগেমেগেই কথাটা বলে হৃদয়দা।
—- এই ছোকরা মুখ সামলে। লক আপে ঢুকিয়ে পেঁদিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেব।
তারপর হাতের রুলার দিয়ে তার মুখটা তুলে ধরে বলে — এই ছুঁড়িটা কে হয় রে তোর ?
বলেই বিশ্রি মুখ ভঙ্গী করে চূড়ান্ত অশ্লীল একটা খিস্তি করে। কান লাল হয়ে যায় অঞ্জলির। হৃদয়দাকে নিয়ে সে থানার বাইরে আসে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।