সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে অর্ঘ্য ঘোষ (পর্ব – ৫৭)

সালিশির রায়
কিস্তি – ৬২
ফোঁটা দেওয়ার পর সাবিত্রীদি পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করতেই নিজেদের আর ধরে রাখতেপারেন না দুই দাদা। কান্না ভেজা গলায় দুই দাদাই বলে ওঠেন , আজ কত বছর পর আমাদের কপালে ফোঁটা পড়ল। আমাদের পাপের শাস্তি আমরা আজও ভোগ করে চলেছি। সাবিত্রী তুই বল আমাদের একবার প্রায়শ্চিত্তের সুযোগ দিবি ? ততক্ষণে সাবিত্রীদির চোখও জলে ভিজে উঠেছে। কিন্তু দাদাদের কথার কোন ব্যাখ্যা সে খুঁজে পাচ্ছিল না। হঠাৎদাদাদের হলোটা কি ? যে দাদারা এতদিন কোন খোঁজখবর নেয় নি, সেই দাদারাই কাউকেকিছু না জানিয়েই কি করে যে হোমে ভাইফোঁটা নিতে হাজির হোল তার কারণই সে অনুমানকরে উঠতে পারে নি এখনও।তার উপরে সেই দাদাদেরই কাঁদতে কাঁদতে প্রায়চিত্ত করার
সুযোগ চাওয়ার বিষয়টা কিছুতেই বোধগম্য হচ্ছে না তার।অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই তো? ছোট থেকে দাদাদের তো সে না চেনা নয়। কেউ পিছন থেকে কোন কলকাঠি নাড়ছে না তো ? সাবিত্রীদি কেমন যেন সন্দেহের চোখে তাকায় অঞ্জলিরদিকে। পরিস্থিতির সামাল দিতে তড়িঘড়ি সে বলে ওঠে — ঠিক আছে দাদারা , এখানে তো সবাই আছি। প্রায়শ্চিত্তের কথা কি বলছিলেন যেন সবার সামনেই বলুন, আমরাও শুনি। তার কথা শুনে বড়দা বলে ওঠেন , আমাদের ভুলেই একমাত্র বোনকে এতদিন হোমে পড়ে থাকতে হয়েছে। সেই লজ্জায় আমরা আর মুখ দেখাতে আসতে পারি নি। আজ আমরা সাবিত্রীকে বাড়ি ফিরিয়ে নিয়ে গিয়ে সেই ভুলের প্রায়শ্চিত্ত করতে চায়। দাদার কথা শেষ হতেই কেউ কিছ বলার আগে ডি,এম, সাহেব বলে ওঠে ন, এতো খুব ভালো কথা এতদিন পর হোমের কেউ নিজের বাড়ি ফিরছেন সচরাচর এমন ভাবাই যায় না। অন্যরাও সবাই সায় দিয়ে বলে ওঠেন সত্যিইহোমের ইতিহাসে এটি যুগান্তকারী ঘটনা হয়ে থাকবে।
সেই সময় সবাইকে অবাক করে দিয়ে সাবিত্রীদি বলেন , কিন্তু এতদিন পর আমি আর বাড়ি ফিরতে চায় না।সাবিত্রীদির কথা শুনে সবাই বিস্মিত হয়ে পড়েন। সবার আগে কথা বলেন ডি,এম সাহেব। তিনি বলেন , সেকি কেন ? প্রশাসন হোমের মেয়েদের নানা ভাবে সমাজের মুলস্রোতেফেরানোর চেষ্টা করছে। সেখানে খোদ বাড়ির লোক যেখানে আপনাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতেচায়, সেখানে আপনার যেতে আপত্তি কোথাই ? তবে যদি সত্যিই দেখা যায় কোন সমস্যা রয়েছে , তাহলে অবশ্য আলাদা কথা। সে ক্ষেত্রে বিকল্প পুনবার্সনের কথা ভাবা হবে।সাবিত্রীদি বলেন, আমি আর কারও গলগ্রহ হয়ে থাকতে চাই না।
জবাবে দুই দাদারা বলেন, না রে না। তোকে কারও গলগ্রহ হয়ে থাকতে হবে না। বাবাজমি সম্পত্তি তিনভাই বোনকে সমানভাবে ভাগের কাগজপত্র করে দিয়ে গিয়েছেন।তাছাড়া তোর বিয়ের জন্য বাবা যে টাকা রেখে গিয়েছিলেন , সেটাও আমরা খরচ করি নি। করিনি বললে ভুল হবে, আসলে করতে পারি নি। ব্যাংক তোর সই ছাড়া টাকা দেয় নি। সেই টাকাও আজ সুদেমুলে অনেক হবে। তুই তোর অধিকারেই তো সে সব পাবি। তাতেও যদি আমাদের ক্ষমা করে একসঙ্গে থাকতে না পারিস , আমরা তোকে আলাদা ঘর করে দেব। লক্ষ্মী বোনআমার , তুই অন্তত গ্রামে ফিরে চল।
সেই সময় অঞ্জলি বলে , তাছাড়া সাবিত্রীদি তো এখন কাঁথাস্টিচ, ঝাঁটা আর তালাইবোনার কাজ ভালোই করেন। গ্রামের মেয়েদের নিয়ে দিব্যি স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়েনিজের পেটের ভাত নিজেই জুটিয়ে নিতে পারবেন। আমরা দেখে এসেছি গ্রামে সেই রকমউৎসাহী মেয়ে অনেক আছে। সেক্ষত্রে সাবিত্রীদিকে কারও গলগ্রহ হয়েও থাকতে হবে না।
অঞ্জলির কথা শেষ হতেই তার দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকান সাবিত্রীদি। তিনি কিবলেন তা শোনার জন্য সবাই অধীর হয়ে ওঠেন। অঞ্জলির দিকে তাকিয়ে সাবিত্রীদি বলেন , আন্দাজ আমি করেই ছিলাম এসবের পিছনে তোরই হাত রয়েছে। কিন্তু এতদিন এখানেরয়েছি, হোমটাই আমার বাড়ির মতো হয়ে গিয়েছে , হোমের মেয়েরাই হয়ে উঠেছে আপনজন।এসব ছেড়ে যেতে মন চাইছে না, তোদের ছেড়ে থাকতে সত্যিই খুব কষ্ট হবে।
— কে বলেছে তোমায় আমাদের ছেড়ে থাকতে হবে ? আমরা ঠিক করেছি এবার থেকে যারাই হোম থেকে ফিরে যাবে, আত্মীয়–পরিজনদের মতো আমরা পালাক্রমে তাদের সঙ্গে দেখাকরতে যাব। তারাও মাঝে মধ্যে হোমে দেখা করতে আসবেন। তাছাড়া তোমার গ্রামে স্বনির্ভর গোষ্ঠী গড়ার জন্য আমাদের তো ঘন ঘন যেতেই হবে।
ডি,এম সাহেব বলেন , এর মতো ভালো প্রস্তাব আর হয় না। এ রকম গঠনমূলক একটা ভাবনার জন্য অঞ্জলিকে প্রশাসনের পক্ষ থেকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি। গর্বও অনুভব করছি। আমার এই ধরণের প্রস্তাবে আমার পূর্ণ সমর্থন রইল। এখন আপনি বলুন আপনার কি মত ?
— আপনারা সকলেই যখন আমাকে হোম থেকে তাড়াতে চাইছেন তখন আমি না করি কি করে বলুন ?
সবাই বোঝে বরফ গলতে শুরু করেছে। তাড়াতে চাওয়ার কথাটা আসলে সাবিত্রীদি মজা করেই বলেছেন।
তাই ডি,এম সাহেব বলেন , ছি — ছি এরকম বলবেন না। আমরা আপনাকে হোম ছেড়ে যাওয়ার জন্য কোন চাপ সৃষ্টি করছি না। আসলে আমরা সবাই নিজের নিজের বাড়িতে রয়েছি। তাই বাড়ির টান কি আমরা ভালোই বুঝি। কিন্তু এখানে যারা কোন না কোন ভাগ্য বিপর্যয়ে শিকার হয়ে আছেন তাদের তো বাড়ি হারিয়ে গিয়েছে। তাই কেউ যদি বাড়ি ফিরে পান তার মতো ভালো আর কিই বা হতে পারে ? তবে আমরা চাইছি বলেই আপনাকে হোম ছেড়ে যেতে হবে না। আপনার মন না চাইলে আপনি যতদিন ইচ্ছে হোমেই থাকুন।
—- না স্যার , আমার মনও ফিরতে চাইছে। নিজের চেনা পরিবেশে কার না ফিরে যেতে ইচ্ছে করে বলুন? তাছাড়া দাদারাই যখন আমাকে ফিরিয়ে নিয়ে যেতে এসেছে তখন তাদেরই বা ফিরিয়ে দিই কি করে? আমার শুধু হোমের মেয়েদের ছেড়ে যেতে খারাপ লাগছে।এবারে মুখ খোলে অঞ্জলি। সে বলে, তোমাকে ছেড়ে দিতে আমাদেরও খারাপ লাগছে। কিন্তু হোম ছেড়ে গেলেও তোমাকে তো আমরা জ্বালাতে ছাড়ব না। মাঝ মধ্যেই ঠিক দল বেঁধে হাজির হবো দেখো।
সাবিত্রীদির দাদারা বলেন, আমরাও ওকে নিয়ে আসব মাঝে মধ্যে।
আর কোন আপত্তি তোলেন না সাবিত্রীদি। শুরু হয়ে যায় গোছগাছ। অঞ্জলি সাবিত্রীদির জিনিসপত্র গুছিয়ে দেয়। শ্রাবণী সুন্দর করে সাজিয়ে দেয়। তারপর সাবিত্রীর হাতধরে তারা আস্তে আস্তে গেটের বাইরে নিয়ে আসে। সেখানে তখন — পুলিশ প্রশাসনের লোক, সংবাদ মাধ্যমের ভীড় উপছে পড়েছে। ঘন ঘন ঝলসে উঠছে ক্যামেরা। সাংবাদিকরা সাবিত্রীদিকে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে প্রশ্ন করছেন — এতদিন পর বাড়ি ফিরছেন , কেমন লাগছে আপনার ?
ওই প্রশ্নেই কেঁদে ফেলেন সাবিত্রীদি। নিজেকে সামলে নিতে বেশ কিছুক্ষণ লেগে যায় তার। তারপর বলেন , মনে হচ্ছে একবাড়ি ছেড়ে আর একবাড়ি যাচ্ছি। শরীরটা সেখানে গেলেও মনটা আমার এখানেই পড়ে থাকবে। এতগুলো বছর হোমের এই চার দেওয়ালে, এই মানুষগুলোর সঙ্গে কাটিয়েছি।
কি করে এসব ভুলে আমি ওখানে থাকব তা ভেবে পাচ্ছি না।কথা বলতে বলতেই আবার ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠেন সাবিত্রীদি। তাকে জড়িয়ে ধরে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে কেঁদে ফেলে অঞ্জলিরাও। সবার চোখের জলে পরিবেশটাই যেন অশ্রুসিক্ত হয়ে ওঠে। দীর্ঘক্ষণ পর ডি,এম সাহেবের কথায় তা হালকা হয়। ডি,এম সাহেব বলেন , হোমেরই একটি মেয়ের প্রচেষ্টায় একজন দীর্ঘদিন পরে নিজের বাড়িতে ফিরতে পারছেন বলে আমি আজ গর্বিত। আমার গাড়ি ওদের পৌঁচ্ছে দিয়ে আসবে। একই সঙ্গে আমি ওই এলাকার বি,ডি,ও’কে নির্দেশ দিচ্ছি নিয়মিত ওনার খবর নিয়ে রিপোর্ট পাঠাতে।তারপরই সবাই মিলে সাবিত্রীদিকে গাড়িতে তুলে দেয় তারা। তাদের হাত জড়িয়ে ধরে সাবিত্রীদি কান্নায় ভেঙে পড়েন। এক সময় সাবিত্রীদিদের নিয়ে ডি , এম সাহেবেরগাড়িটা হোম ছেড়ে চলে যায়। তারপর প্রশাসনের লোক, সাংবাদিকরা ফিরে যান। ভাই-দিদি আর শ্রাবণীদেরও ফিরে যাওয়ার তোড়জোড় শুরু হয়ে যায়। যাওয়ার আগে তাকে নিয়ে পড়ে শ্রাবণী ।তাকে একটু একা পেয়ে বলে , পরিকল্পনা কি তোমার না ওনার?
—- পরিকল্পনা ? কিসের পরিকল্পনা ? আর ওনার বলতে কাকে বোঝাচ্ছিস ?
— দেখ আর যাই করো , সব বুঝেও না বোঝার অভিনয় কোর না। অভিনয়ে তোমায় একদম মানায় না। সব ধরা পড়ে যায়।
—- মানে , কি বলতে চাইছিস তুই আমি সত্যিই কিন্তু বুঝতে পারছি না।
—- মানেটা হচ্ছে — ওই যে কালাশৌচের কথা বলে আলাপনবাবু ভাইফোঁটা নিলেন না , কেউ না বুঝুক আমার কিন্তু বুঝতে বাকি নেই ওটা কিন্তু একটা অজুহাত মাত্র। আসলে তোমার হাত থেকে ফোঁটা নেওয়া এড়াতেই উনি ওই অজুহাতটা খাড়া করলেন। তাই বলছি , বুদ্ধিটা কি ওনার নিজের না, তুমি দিয়েছো। ওনাকে যতদুর জানি এধরণের বুদ্ধি তার মাথা থেকে বেরোবে বলে মনে হয় না।
—- বয়ে গ্যাছে আমার ওইসব বুদ্ধি দিতে।তাছাড়া অজুহাতই বা হবে কেন ? কেউ তো মারা যেতেই পারেন। শ্রাবণীকে থামাতে কথাগুলো বলল বটে, কিন্তু বিষয়টি নিয়ে তারও সন্দেহ রয়েছে। পরে এনিয়ে আলাপনবাবুকে ধরবে সে। আলাপনবাবুর কথা মনে পড়তেই অন্যমনস্ক হয়ে পড়ে অঞ্জলি। সেই সুযোগে শ্রাবণী তার কানে কানে আলাপনবাবুকেজড়িয়ে চূড়ান্ত অশ্লীল একটা কথা বলে দূরে ছুটে পালায়। লজ্জায় তার চোখমুখ লাল হয়ে ওঠে। কিন্তু কিছুটা দুরেই দিদিরা থাকায় সে কিছু বলতেই পারে না। সে দূর থেকেই শ্রাবণীর দিকে আলতো হাতের কিল দেখায়। শ্রাবণীও তাকে ভেংচি কেটে প্রত্যুত্তর দেয়। তারপরইফিরে যায় শ্রাবণীরা।
তাদের যাওয়ার পর ভাই আর দিদিও ফেরার জন্য তৈরি হয়।যাওয়ার আগে ভাই তাকে জড়িয়ে ধরে বলে , দিদি সেই যে তুই আর হৃদয়দা আমাকে হোস্টেলে দিয়ে এলি আর আনতে গেলি না। তোর জন্য আমার খুব মন খারাপ করে।তুইও আমাদের সঙ্গে আজ চল না। কতদিন আমরা একসঙ্গে থাকি নি।ভাইয়ের আবদারে অঞ্জলি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে। দিদি তাকে অস্বস্তির হাত থেকে উদ্ধার করতে বলে , ও এখন আমাদের সঙ্গে যাবে কি করে ? ওর তো সামনেই পরীক্ষা, তার উপরে ট্রেনিং চলছে। সেটা শেষ না হলে যাবে কি করে ? তবে এবারের ছুটিতে তোকে হোস্টেল থেকে আনতে যাবে , কি রে তাই না ?
ভাই বলে, ঠিক যাবি তো ?
সে বলে, হ্যারে যাব। আমারও তোদের জন্য খুব মন কেমন করে। ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই অঞ্জলির গলা বাষ্পরুদ্ধ হয়ে আসে।
ক্রমশ…