|| শাম্ভবী সংখ্যা ২০২১ || T3 শারদ সংখ্যায় অগ্নিমিতা দাস

প্রায়শ্চিত্ত
_ তোমায় আমি হোটেলেই বলেছিলাম, শুধুমধু জিদ করলে বলে তো আসতে হলো। আমি জানি তো , ইন্দিরা গান্ধীকে ঢুকতে দেয় নি তো তুমি? শাহিল একটানা কথাগুলো যাকে বলল সেই তরুনীটা তখন অসহায় দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে। গোলাপী তাঁতের শাড়ি আর শান্তিনিকেতনী ব্যাগ কাঁধে মেয়েটির সৌন্দর্য আশেপাশের অনেকের নজর কাড়ছিল। সে ইতিহাসের ছাত্রী, তাই যে কোন স্থাপত্য শিল্প দেখতে সে খুব উৎসাহী। তারা উড়িষ্যার মন্দিরে ঢুকে ছিল, পুজো দেয় নি। কিন্তু দুচোখ ভরে দেখেছিল। চুমকি আর শাহিল দুজনেই কলেজের অধ্যাপনা করে। পুজোর ছুটিতে পুরী বেড়াতে এসেছে। সমুদ্র দেখবে, স্থাপত্য শিল্পের নিদর্শন দেখবে আর পুরীর জগন্নাথদেবের দর্শণ করবে। দুজনেই মুসলিম বাঙ্গালী পরিবারে জন্মগ্রহণ করলে ও জাতপাত ধর্ম নিয়ে তাদের কোন তাপ উত্তাপ নেই। দুজনেই আধুনিক ও উদার পরিবারে বড় হয়েছে। মনে প্রাণে তারা বাঙালী। চুমকির খুব উৎসাহ সে জগন্নাথদেবের দর্শন করবে, পুজো দেবে। শাহিল বারবার বারন করেছে ওখানে গেলে পূজো দিতে গেলে নাম, গোত্র সব বলতে হবে। সেখানেই ওরা ধরা পড়ে যাবে। মিথ্যার আশ্রয় তারা নিতে নারাজ। কিন্তু চুমকির এক গোঁ, সে মন্দিরে ঢুকবেই। এখন কি আর বস্তাপচা নিয়ম চলে নাকি। শাহিলের কথা না শুনে চুমকি এগিয়ে গেল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা পান্ডার দিকে। _ আচ্ছা, মানে আমরা বাঙালী, কিন্তু ইয়ে মানে মুসলমান তো আমরা মন্দিরে ঢুকতে পারবো তো?
পান্ডা রক্তচক্ষু হয়ে বলল_ ধাই কিড়ি কিড়ি! ম্লেছদের এই মন্দিরে ঢোকা বারন। শাহিদ তাড়াতাড়ি চুমকির পাশে এসে দাঁড়াল। চুমকির চোখ ছলছল করে উঠলো। ও খুব এমোশনল মেয়ে। কি অদ্ভুত নিয়ম না।!ঈশ্বরের কাছে আবার সন্তানদের মধ্যে বিভেদ। মানুষের কোন দাম নেই।
কারোর গায়ে কি ধর্ম লেখা থাকে।
“একম ব্রহ্মা দ্বৈত্য নাস্তি নহিনা নাস্তি কিঞ্চান” গমগমে গলায় একজন বলে উঠলো। ওরা ঘুরে দেখলো একজন সৌম্যদর্শন ধুতি পাঞ্জাবি পরা বৃদ্ধ পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে।পাশে দাঁড়ানো লাল পাড় শাড়ি পরা গোলগাল ফর্সা চশমা পরা পুজোর থালি হাতে এক বৃদ্ধা। বৃদ্ধ সস্নেহে চুমকির দিকে তাকিয়ে বলল_ ওরা মূর্খ। ওরা কি জানে সব ধর্মেই এক ইশ্বরকে বলা হয়েছে। পবিত্র কোরান আর বেদ বাইবেল সব এক। ঈশ্বর কি এক স্থানে বন্দী থাকতে পারেন। এই চার দেওয়ালের মধ্যে। তিনি তো আছেন_ রাখো রে ধ্যান, থাক্ রে ফুলের ডালি, ছিঁড়ুক বস্ত্র, লাগুক ধুলাবালি, কর্মযোগে তাঁর সাথে এক হয়ে ঘর্ম পড়ুক ঝরে। _ রোদ্দুর চড়চড় করে মাথায় উঠেছে। তুমি এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কাব্যি করবে। আমার পুজো দেওয়া শিকেয় উঠলো। শাহিলরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো বৃদ্ধের কথা শুনছিল।চুমকি বলে উঠলো মেসোমশাই আপনি মন্দিরে যান। দেরি হয়ে যাচ্ছে।
_ আমি যাবো না। রমলা তুমি পুজো দিয়ে আসো। এমনিতেই তোমার ইচ্ছায় এখানে আসা। কিন্তু যে মন্দিরে মানবতার অপমান হয় সেখানে আমার আজ যেতে ভালো লাগছে না। আমি বরং এখানে দাঁড়াচ্ছি।
_ যতোসব !অজাত কুজাতদের নিয়ে আদিখ্যাতা করতে খুব ভালো লাগে। এত কাছে এসে জগন্নাথ দর্শন করবে না। খুব পন্ডিত এসেছেন। তোমার পাপ হবে দেখো। এই বলে বৃদ্ধা পুজোর ডালি নিয়ে মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেল। শাহিল আর চুমকি অপ্রস্তুত হয়ে বৃদ্ধের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। এরপর আলাপ-পরিচয়ের পালা। কথায় কথায় ওরা জানতে পারল বৃদ্ধের নাম শচীদানন্দ ভট্টাচার্য। কলকাতায় থাকেন। মাস্টারি করতেন। একমাত্র ছেলে ডাক্তারি পড়ে জার্মানি চলে গেছে। তারা ও কোলকাতায় থাকে শুনে আলাপ বেশ জমে গেল। আলাদা আলাদা হোটেলে উঠলে ও ওরা উদয়গিরি, খণ্ডগিরি, কোণার্ক সব একসঙ্গে ঘুরলো। বৃদ্ধার বেশ আপত্তি ছিল মুসলিম ছেলেমেয়েগুলোর সাথে ঘোরাঘুরির। কিন্তু শাহিল আর চুমকির মিষ্টি ব্যাবহারে ওর সব আড় ভেঙে গেল। শাহিলদের গাড়িতে ওরা সব জায়গায় ঘুরলো। সন্ধ্যাবেলায় শচীদানন্দের ভরাট গলায় সমুদ্রের ধারে আবৃত্তি, চুমকির রবীন্দ্রসঙ্গীতে বেশ আসর বসতো। শাহিলদের এবার যাবার পালা। ঠিক হলো ওদের গাড়িতে ওরা ও যাবে। যাবার ঠিক আগের দিন রাতে শাহিলের মোবাইল বেজে উঠল বাবা! তুমি এক্ষুনি এসো। তোমার মেসোমশাই কেমন করছে। আমার ভয় করছে খুব। শাহিল বারমুন্ডা পরা অবস্থায় দৌড় লাগালো। হোটেলে গিয়ে দেখলো মেসোমশায়ের মুখটা একধারে বেঁকে গেছে। গোঙাতে গোঙাতে কিছু বলার চেষ্টা করছে। দেরি না করে তক্ষুনি নার্সিংহোমে ভর্তি করা হল। দুদিন যমে-মানুষে টানাটানি হলো। মাসিমা এই কদিন জল ছাড়া কিছু মুখে দেয় নি। চুমকি সবসময় ওর পাশে ছিল। দুদিন পর রাত দুটোর সময় নার্সিংহোম থেকে খবর এলো মেসোমশাই হার্ট ফেল করেছে।
মাসিমা কপাল চাপড়ে চাপড়ে কেঁদে উঠলো আমার কথা জগন্নাথ শুনলে, বলেছিলাম তোমার পাপ হবে। তাই তুমি তাকে আমার কাছ থেকে কেড়ে নিলে? চুমকি আর শাহিল দুজনেই কোনমতে সামলাছিল। মাসিমার ইচ্ছে মেসোমশাইকে কোলকাতায় দাহ করা হোক। তাছাড়া তার ছেলেকে খবর দেওয়া হয়েছে। ছেলে তো মুখাগ্নি করবে। এই কদিন শাহিল চোখের পাতা এক করতে পারে নি। অচেনা জায়গায় সব ব্যাবস্থা করে মেসোমশাই কে নিয়ে কোলকাতায় আসা হলো। শাহিলের মোবাইলে খবর এলো_ শাহিল! আমি মানস বলছি মানে ভাই আমি না ছুটি ম্যানেজ করতে পারছি না। বডি ফেলে রাখার কোন মানে নেই। আমি কাজের দিন ঠিক হাজির হবো। একটু ম্যানেজ করে নাও। টাকা পয়সা নিয়ে চিন্তা করো না। তোমার একাউন্টের নাম্বারটা একটু এসএমএস করে দাও। খুব ভালো করে ব্যবস্থা করো। মানি ইস নো ফেক্টর। শাহিল ফোনটা রেখে মনে মনে ভাবলো এই সময়ে ও মানুষ টাকা দেখায়। ও তো নিজে ও এই নিয়ে কোন চিন্তা করে নি। মাসিমার কাছে কি আছে না আছে এই নিয়ে ভাবে নি। সব খরচা নিজেই করছে। এই কদিনে মেসোমশাইকে কখন ভালোবেসে ফেলেছে সে নিজেই জানে না। তাই তার আত্মজ যখন বডি কথাটা বললো তখন বুকটা মুচড়ে উঠলো। শাহিল অনেকবার শ্মশান যাত্রী হয়েছে। তাছাড়া তার সব বন্ধুরা বেশিরভাগ ধর্মমতে হিন্দু। তাই সে সব নিয়ম কানুন নিখুঁত ভাবে জানে। অনেক আত্মীয়স্বজনে মাসিমাদের ঘর ভরে গেছে। কথায় কথায় শাহিলদের পরিচয় পেয়ে একটু কানাঘুষো চলছে। মুসলিম ছেলে যেচে পড়ে এত কিছু করছে। কি জানি বাবা কি মতলব! অলরেডি অনেক দেরি হয়ে গেছে। তাই দাহের তোড়জোড় করা হচ্ছে। চুমকি আর শাহিলরা এক জামায় রয়েছে সেদিন থেকে, দাহ হয়ে গেলে ওরা ফিরে যাবে। নিয়মতো মেসোমশাইয়ের বড় ভাইয়ের ছেলে মুখাগ্নি করবে। হঠাৎ মাসিমা বলে উঠলেন শাহিল মুখাগ্নি করবে। সবাই চমকে উঠলো। মাসিমার মতো ধর্মনিষ্ঠ ব্রাহ্ণণ বৌয়ের মুখে এক কথা শুনে সবাই অবাক।
মাসিমা কঠিন গলায় বলল __ আত্মার সাথে জড়িয়ে থাকে তারাই আত্মীয়। যে কাজ আমার মানসের করার কথা ছিল, সে তো শাহিল করেছে। বাবা শাহিল পারবে না তোমার মেসোমশায়ের জন্য নিয়ম কানুন কদিন মানতে। আমি আর কোন ধর্ম নিয়ে মাথা ঘামাই না। স্বয়ং জগন্নাথদেবের মন্দিরে ওদের দেখা পেয়েছি। উনি তাই চান। জগন্নাথদেব ও বোধহয় সেদিনের উনার দর্শন না পাওয়ার প্রায়শ্চিত্ত করছেন। মানুষের পাপ যে দেবতাকে বইতে হয়।
চিতার লকলকে আগুনের সামনে দাঁড়িয়ে শাহিলের কেমন যেন ঠান্ডা ঠান্ডা মনে হচ্ছিল। আসলে বুকের ভেতর তার অঝোরে বৃষ্টি ঝরছিল।