সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ৫) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।

আগের পর্বগুলিতে চার্চ অব ইংলণ্ডের অধীনের চার্চগুলির কথা এবং বর্তমান শহরের প্রাচীনতম প্রোটেস্টেন্ট চার্চের কথা আলোচিত হয়েছে। ইংরেজ ইষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির আমলে নির্মিত মহানগরীর প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চ গুলির মধ্যে আংলিক্যান চার্চ এবং মিশন চার্চের পরেই আসে স্কটিশ চার্চ গুলির নাম। কলকাতার বুকে প্রথম স্কটিশ চার্চটি ছিল ডোরিক স্থাপত্যে তৈরি একক শিখর বিশিষ্ট St. Andrews Church। কোম্পানীর আমলের ট্যাঙ্ক স্কোয়ার যা সিপাহী বিদ্রোহ পরবর্তী পার্লামেন্টারি শাসনকালে ডালহৌসি স্কোয়ার এবং স্বাধীনতা উত্তরকালে বিনয়-বাদল-দীনেশ বাগ নামে পরিচিত হয় তার উত্তর-পূর্বে স্কটিশ প্রেসবিটেরিয়ান শাখার এই গির্জাটি অবস্থিত। স্কটল্যান্ডে চার্চকে ‘Kirk’ বলা হয়। তাই অতীতে চার্চটিকে এই নামেই ডাকা হত। বাংলায় এর নাম ছিল ‘লাট সাহেবের গীর্জা’।
রেভারেন্ড Dr. James Bryce ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চটি প্রতিষ্ঠা করেন। তার পূর্বে মহানগরীর স্কটিশ প্রেসবিটেরিয়ান মতাদর্শীয় বাসিন্দাদের প্রার্থনা অনুষ্ঠিত হত এশিয়াটিক সোসাইটির সভাকক্ষে। সরকার থেকে এই স্কটিশ চার্চ প্রতিষ্ঠার জন্য একলক্ষ টাকা অনুদান করা হয় এবং উপযুক্ত জমির ব্যবস্থা করা হয়। এছাড়া বিভিন্ন উৎস থেকে ৩৬,০০০ টাকার ফান্ড গঠন করা হয় চার্চটি নির্মাণের জন্য। ৩০শে নভেম্বর ১৮১৫ খ্রিষ্টাব্দে সেন্ট এন্ড্রুজের জন্মদিনে চার্চটির শিল্যান্যাস করা হয়। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সস্ত্রীক গভর্নর জেনারেল লর্ড ময়রা, কোম্পানির আর্মি অফিসার, ম্যাসন এবং অন্যান্য উচ্চপদস্থ কর্মচারীবৃন্দ। ম্যাডাম ময়রা নিজেও একজন স্কটিশ মহিলা হওয়ায় এই চার্চ প্রতিষ্ঠায় তাঁর ও বিশেষ আগ্রহ ছিল।
চার্চের সুউচ্চ শিখরটির প্রতিষ্ঠা নিয়ে অবশ্য চার্চ অব ইংলণ্ডের সাথে স্কটিশ চার্চের এক গোলযোগের সূত্রপাত হয়। কলকাতার প্রথম বিশপ রেভারেন্ড মিডলটন মনে করতেন ব্রিটিশ উপনিবেশগুলিতে উচ্চতম শিখর বিশিষ্ট গীর্জা প্রতিষ্ঠার অধিকার একমাত্র চার্চ অব ইংলণ্ডেরই থাকা উচিৎ। স্বাভাবিক ভাবেই এর ফলে ব্রিটিশ বিশপ মিডলটনের সাথে স্কটিশ রেভারেন্ড ব্রাইসের এক প্রতিদ্বন্দ্বীতার সূত্রপাত হয় যা শতাব্দিপ্রাচীন ব্রিটিশ-স্কটিশ দ্বন্দ্বের কথাই মনে করিয়ে দেয়। মিডলটন ও ব্রাইস একই জাহাজে কলকাতায় এসেছিলেন কিন্তু যেভাবে মিডলটন এন্ড্রুজ চার্চের শিখর নির্মাণকার্যে বাধা সৃষ্টি করতে থাকেন তাতে তিতিবিরক্ত হয়ে ব্রাইস মন্তব্য করেছিলেন কলকাতায় তাঁর মাত্র দুজন শত্রু আছে। জ্বালাময় গ্রীষ্মকাল এবং মিডলটন। বারবার কাজে বাধাপ্রাপ্ত হয়ে ব্রাইস জেদের বশে ঠিক করেন যে তিনি শুধু সেন্ট এন্ড্রুজের শিখরকে তদানীন্তন চার্চ অব ইংলণ্ডের অধীনের কলকাতার ক্যাথিড্রাল সেন্ট জনের শিখর অপেক্ষা উচুঁই করবেন না তার উপর এক ধাতব মোরগ মূর্তিও বসবেন মিডলটনের উপর তাঁর জয়কে সূচিত করতে। এবং তিনি তাঁর কাজ সম্পূর্ণ করেছিলেন। বিশপের এই নৈতিক পরাজয়ে অপ্রস্তুত কোম্পানীর কর্তৃপক্ষ নির্দেশ জারি করে চার্চের বিল্ডিং-এর রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব কোম্পানী নিলেও ওই মোরগটির কোন দায়িত্ব নেবেনা। যদিও দুই শতাব্দী পার করেও আজো ব্রাইসের স্কটিশ গৌরবের প্রতীক হিসেবে ধাতব পক্ষীটি অক্ষত আছে।এই ঘটনা প্রমাণ করে শুধু প্রোটেস্টেন্ট আর ক্যাথলিকদের মধ্যে না মহানগরীর প্রোটেস্টেন্ট খ্রিষ্টানদের বিভিন্ন শাখার মধ্যেও প্রতিযোগিতার পরিবেশ ছিল।
রেভারেন্ড ব্রাইস এবং তাঁর চার্চের সাথে আরো একটি অদ্ভুত কাহিনী জড়িয়ে আছে। ১৮৩৮ খ্রিষ্টাব্দে তৎকালীন বিখ্যাত চিত্রশিল্পী Sir Warren Gordon এর আঁকা ব্রাইসের একটি পূর্ণাঙ্গ চিত্র protector নামক এক জাহাজে করে কলকাতা পাঠানো হয়। গঙ্গাবক্ষে জাহাজটির সলিল সমাধি ঘটলেও আশ্চর্যজনকভাবে এই চিত্রটি রক্ষা পেয়েছিল এবং বর্তমানে তা চার্চে সংরক্ষিত আছে। ব্রাইস চার্চের প্রতিষ্ঠা দিবস থেকে ১৮৩৬ এর নভেম্বর পর্যন্ত এর সাথে যুক্ত ছিলেন। ১৮৩৫ খ্রিস্টাব্দে কোম্পানি সরকারের থেকে ২২০০ টাকা অনুদান এবং জনগণের দানের অর্থ থেকে চার্চের Tower Clock টি কেনা হয়। চার্চের দেওয়ালে মহানগরীর বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ স্কটিশ বাসিন্দা যথা কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী, যাজক এবং সেনাবাহিনীর আধিকারিকদের মার্বেল স্মৃতিফলক লক্ষিত হয়। এই চার্চটি মহানগরীর সর্বাপেক্ষা সযতনে রক্ষিত চার্চ।

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!