সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ৪) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।
মহানগরীর বর্তমান প্রোটেস্টান্ট চার্চগুলির মধ্যে সর্বাপেক্ষা পুরাতন গির্জাটি হল Old Mission Church। অষ্টাদশ শতকে কলকাতায় আগত প্রথম প্রোটেস্ট্যান্ট মিশনারী ছিলেন John Zachariah Kiarnandar. জাতিতে তিনি ছিলেন সুইডিশ এবং মতাদর্শগত ভাবে ক্যালভিনপন্থী। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দে দক্ষিণ ভারতের কাড্ডালোরে তিনি প্রথম পদার্পন করেন। যে মিশনের সাথে তিনি যুক্ত ছিলেন তার উদ্দেশ্য ছিল দক্ষিণ ভারতে খ্রিষ্টধর্মের বিস্তার। এখানেই তাঁর বন্ধুত্ব হয় রবার্ট ক্লাইভের সাথে। ১৭৫৭ খ্রিষ্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধে জয়লাভের পর কলকাতা যখন কোম্পানির শক্তিকেন্দ্রে পরিণত হয় তখন ক্লাইভ তাঁকে কলকাতায় আমন্ত্রণ করেন। Kiarnandar এর কলকাতায় আসার মুখ্য উদ্দেশ্য ছিল ইউরোপীয় শিক্ষার বিস্তার এবং কলকাতায় বসবাসকারী রোমান ক্যাথলিকদের প্রোটেস্টেন্ট মতে দীক্ষিতকরণ। মহানগরী তে সেকালে খ্রীষ্টধর্মের প্রধান দুই শাখার মধ্যে দ্বন্দ্বের অস্তিত্ব এর থেকে সহজেই অনুমেয়।
জাকারিয়া প্রথমে কলকাতায় তাঁর বাসস্থানেই একটি অবৈতনিক বিদ্যালয় চালু করেন। তারপর কোম্পানি কর্তৃপক্ষর কাছে তিনি চার্চ নির্মাণের জন্য জমির দরখাস্ত করেন। তদানীন্তন গভর্নর ভ্যান্সিটার্ট পুরাতন কালেক্টর অফিসটি জাকারিয়ার ফ্রি স্কুলের জন্য এবং তার সংলগ্ন জমিটি চার্চ নির্মাণের জন্য ধার্য করেন। কিন্তু চার বছর পর তাঁকে তাঁর বাসগৃহ শূণ্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়। জাকারিয়া তখন নিজ প্রচেষ্টাতেই গির্জা গড়ে তুলতে সচেষ্ট হন। ১৭৬১ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর প্রথম স্ত্রীর মৃত্যুর পর স্ত্রীর সম্পত্তি বিক্রয় করে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে চার্চের জন্য একটি বৃহৎ জমি তিনি ক্রয় করেছিলেন। চার্চটির নির্মাণে ব্যয় হয় ৬৫,০০০ টাকা। কোন শিখর ছাড়াই চার্চটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৭৭০ খ্রিষ্টাব্দের ২৩শে ডিসেম্বর ছিল চার্চের প্রতিষ্ঠা দিবস। এক ডেনিশ স্থপতি Boutant De Mevell গীর্জার নকশাটি করেছিলেন। প্রথমে গীর্জার একটি ডেনিশ নাম দেওয়া হয় Beth Tephillah। চার্চের দেওয়ালে বহুদিন ধরে কোন প্লাস্টার ছিল না বলে ইঁটের লাল রঙের জন্য চার্চটি লাল দেখাত বলে লোকমুখে তার নামকরণ হয় লাল গীর্জা। পরবর্তীকালে ডেনিস নামের বদলে চার্চের ইংরাজি নামকরণ হয় ‘Mission Church’s. প্রাচীনত্বের কারণেই চার্চটি ‘Old Mission Church’s বলে অভিহিত হয় কারণ মহানগরীতে দ্বিতীয় কোন মিশন চার্চ অর্থাৎ যে পন্থায় জাকারিয়া বিশ্বাসী ছিলেন সেই পন্থার কোন চার্চ নেই। ১৭৭৩ খ্রিস্টাব্দে জাকারিয়ার দ্বিতীয় স্ত্রীর মৃত্যুর পর তাঁর সম্পত্তি বিক্রয় করে লাভ হয় ৬,০০০ টাকা, যা দিয়ে তৈরি হয় চার্চ সংলগ্ন বিদ্যালয়ের বিল্ডিং। চার্চের নিকটেই জাকারিয়া একটি গেস্ট হাউস ও স্থাপন করেন।চার্চের অনুকরণেরই যে রাস্তায় চার্চটি অবস্থিত তার নাম হয়েছিল Mission Row। বর্তমানে এই রাস্তাটির নাম বাঙালি কিংবিদন্তী ব্যবসায়ী মার্টিন রেল খ্যাত স্যার রাজেন্দ্রলাল মুখার্জির নামকরণে রাখা হয়েছে কারণ এই রাস্তার মুখেই তাঁর স্টিল প্ল্যান্ট IISCO-র হেডকোয়ার্টার অবস্থিত ছিল।
পরবর্তীকালে ১৭৭৮ খ্রিস্টাব্দে জাকারিয়া দৃষ্টিশক্তি হারান এবং পুত্র রবার্টের বিশৃঙ্খল জীবনযাপনের জন্য অর্থকষ্টে পড়েন ফলে কলকাতার শেরিফ চার্চটি অধিগ্রহণ করেন। ১৭৮১ খ্রিস্টাব্দে জাকারিয়া দৃষ্টিশক্তি ফিরে পেলে তৎকালীন ওলন্দাজ উপনিবেশ চুঁচুড়াতে ৫০ টাকা মাসিক বেতন যাজকের চাকরি নিতে বাধ্য হন। চার্চসহ তাঁর সমস্ত সম্পত্তি নিলামে ওঠে। এসময় চার্লস গ্র্যান্ট (ইতিহাসে ইনি জনকল্যাণমূলক কাজের জন্যই বিখ্যাত) নামক মালদায় কর্মরত এক সহৃদয় কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মচারী ১০,০০০ টাকা ব্যয়ে চার্চটি নিলাম হবার থেকে বাঁচান এবং জনসাধারণের প্রার্থনার জন্য দান করেন। ১৭৯৯ খ্রিষ্টাব্দে ৮৮ বছর বয়সে জাকারিয়ার মৃত্যু হয় এবং নর্থ পার্ক স্ট্রীট সেমেটারি যেখানে বর্তমানে Assembly of God Church School অবস্থিত সেখানে তিনি সমাধিস্থ হন।
বর্তমানে চার্চটিতে কিছু মূল্যবান মার্বেলের স্মৃতিফলক সংরক্ষিত আছে যার মধ্যে অন্যতম ছিল গীর্জার ত্রাণকর্তা চার্লস গ্রান্টের স্মৃতিফলক যিনি অবসরের পর ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির চেয়ারম্যান ও নিযুক্ত হয়েছিলেন। এই মিশন চার্চের ওপর এক ঐতিহাসিক গুরুত্ব হল ১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে এখানেই খ্রিষ্টধর্মে দীক্ষিত হন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। এছাড়াও ডিরোজিওর শিষ্য এবং Young Bengal Movement এর আরেক মুখ মহেশচন্দ্র ঘোষ ও ১৮৩২ খ্রিস্টাব্দে এই গির্জায় ধর্মান্তরিত হন। যিনি ছিলেন ওপর এক ডিরোজিয়ান রেভারেন্ড কৃষ্ণমোহন ব্যানার্জির ঘনিষ্ঠ বন্ধু। এভাবেই মহানগরীর বুকে ইতিহাসের জীবন্ত দলিল হয়ে গির্জাটি দাঁড়িয়ে আছে।

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!