রম্য রচনায় অর্পিতা চট্টোপাধ্যায়

তখন শীতের ভোর মানেই ছিল সাইকেলে চড়ে গোয়ালপাড়ায় রস খেতে যাওয়া। রসের হাঁড়ির আশেপাশে কালো পিঁপড়ের মিছিল। মুগ্ধ হয়ে তাদের দেখতে দেখতে রসের ভাঁড়ে চুমুক দিলেই শরীরে শীতলতার শিরশিরানি উঠত। খুব সুখ হত। সেসময় পৌষমেলা বলতে ছিল রস খাওয়া সেরে সোজা মেলার মাঠে কালোর দোকানে ঢোকা। সেখানে কচুরি খেয়ে ভাটুদার দোকানে জিলিপি খেয়ে গিয়ে বসতাম পদ্মভবনের মাঠে ক্যামেরা নিয়ে। সঙ্গে থাকত এক ঠোঙা ভরা চীনেবাদাম বা ছোলাভাজা। আজকাল তো চীনেবাদামে আর মানুষের মন ওঠেনা। কিন্তু এক ঠোঙা চীনাবাদামে যে এক সমুদ্র ভালোবাসা বোনা যায় সে কথা আজ
আর কাকে বোঝাই?
সেই পৌষের মেলায় এক সব্বনাশী ডাক ছিল। ঘর ছাড়া করত কত মানুষকে। সেই মেলার কিছু টুকটাক স্মৃতিকথা ধরা আছে আজও আমার মনের লেন্সে।
সেই মেলাতেই এক বিকেলে দেখা হয়েছিল আমার ফাগুনের সঙ্গে। স্তরে স্তরে সাজানো মাটির হাঁড়ি কলসির মাঠের মাঝে বসে এক ছেলে বাঁশি বাজায়। মাথায় তার গামছা বাঁধা, মুখে তার ভাঙা চাঁদের হাসি।
হঠাৎ ফাগুন বাঁশি রেখে হাঁড়ি দেখিয়ে ওর ভাষায় কাকে যেন কিসব বলে ওঠে আর হা হা করে খুব হাসে। কে সে কার সঙ্গে ওর এত কথা, কার জন্য ওর মুখে এমন ভুবন ভোলানো হাসি। তাকে খুঁজি। হঠাৎ ফাগুন ডাকে – ” রায়মুনি এ রাইমুনি”। দূরের এক দীঘল নীলাম্বরি ভিড়ের মধ্যে ঘুরে তাকায় ফাগুনের দিকে। কি তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তার। হঠাৎ একটা হাঁড়ি হাতে তুলে নেয় ফাগুন দু চারবার বাজায় হাঁড়ি কানের কাছে নিয়ে। কি হতে কি হল সেই বাজনাতে দূরের নীলাম্বরি তিরতির ঝরনার মতো মাটির হাঁড়ি কলসির মাঝখান দিয়ে ফাগুনের কাছে এসে, গা ঘেঁষে দাঁড়াল। হঠাৎ রাইমুনির হাতটা একটু ঠেকল ফাগুনের হাতে। ফাগুন সে সুখে হাসল এক আকাশ হাসি। রাইমুনি তার লজ্জা আড়াল করতে ফাগুনের হাত থেকে হাঁড়িটা নিয়ে নিল নিজের হাতে তারপর সেও দুচারবার হাঁড়ি বাজিয়ে বুঝতে লাগল হাঁড়ির টিকে থাকার গভীর রহস্যের কথা। ফাগুন হাসিমাখা মুখে তার দিকে মুগ্ধ হয়ে তাকিয়ে থাকে। কি দেখে? তা ফাগুনের ভালোবাসা জানে।
এরকম দেখাদেখি, নাদেখাদেখি চলতেই থাকে কিছুক্ষন।
আমি মন দিয়ে খেয়াল করি ফাগুন একাজ করে সেকাজ করে রাইমুনির থেকে তার চোখ সরে না কিন্তু রাইমুনি বিশেষ দেখে না ফাগুনকে। হঠাৎ আরো একদল সাঁওতাল মেয়ে এসে জমা হয় মাটির হাঁড়ি কলসির মাঠে। ভুল ভাঙে আমার। রাইমুনির না দেখায় ঢাকা দেখার নিবিড় সুখকে খুঁজে পাই তার চোখের কড়া ইশারায়। একটা হাঁড়ি ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বাজাচ্ছিল ফাগুন রাইমুনি এসে হাঁড়ির কাছে কান পাতল। একদল সাঁওতাল মেয়ে তখন ছড়িয়ে ছিটিয়ে হাঁড়ির মাঠে। পশ্চিমের আকাশ তখন সুখের সূর্যাস্তে রাঙা।
ওরা সবাই হাঁড়ি কেনে আমি রাঙা আলোয় গোপিনীদের ভিড়ে রাধাকৃষ্ণ দর্শন করি।
ছবি তুলতে তুলতে দুচার কথা গড়িয়ে যায়। জানি সামনে বাদনা পরব, পরবে হাঁড়িয়া হবে, হাঁড়িয়া করতে হাঁড়ি লাগে। হঠাৎ রায়মুনি ফাগুনের হাত ধরে দেয় এক টান। ফাগুন সেই সুখের টানে ভেসে
চলে মেলার মাঠের পূব দিক থেকে পশ্চিমে। খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ে তারা এ ওর গায়ে। তারপর তারপর কোথায় গেল ওরা? কোথায় গেল? ওদের সরিয়ে রাখা হাঁড়িগুলো পড়ে রইল মাঠে। নেবে না হাঁড়িগুলো? আমি ছবি তুলতে তুলতে এ মাঠ সে মাঠ পেরিয়ে যাই। এদিক সেদিক ফাগুন খুঁজি। ভালোবাসা খুঁজি। আঁধার করছে তখন। আলো আঁধারির কেনাকাটা চলছে তখন পট, ডোখরা পেরিয়ে, গয়না গলিতে। এ দোকান ও দোকান ঘুরে দেখি ঐ তো রায়মুনি। শাড়ির খুঁট খুলে পয়সা মিটিয়ে দিচ্ছে গয়নাওয়ালাকে। ফাগুন কই দেখছি নাতো? রায়মুনি হাত বাড়িয়ে ফেরত পয়সা বুঝে নেয়। ঐতো ফাগুন দেখা দেয়। ফাগুন মাটিতে গুছিয়ে বসে রায়মুনির পায়ে মল পরিয়ে দিচ্ছে। অালো কমে আসে ছবি হয়না। মনের ক্যামেরায় ছবি তুলে রাখি। বলি বাহ বেশ লাগছে তোমায় রায়মুনি। রায়মুনি হাসে কিন্তু ফাগুন হাসে তার ঢের বেশী। তারপর রায়মুনি আর ফাগুন ফিরে যায় হাঁড়ির মাঠে। যাবার পথে ফাগুন তার গ্রামের নামধাম দিয়ে যায় আমায়। বাদনা পরবে হাঁড়িয়া খাবার নেমন্তন করে রাখে। আলো আঁধারিতে ওরা চলে যায়। মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। ভালোবাসারা অন্ধকারে অস্ত যায়।
এরপর এক শীতের বিকেলে পড়ন্তবেলায় বাদনা পরবে আমি যাই ফাগুনের ঘর। আরো একবার রাধাকৃষ্ণ প্রেমিক যুগলকে একসঙ্গে দর্শন করব বলে। অনেক খোঁজ করে ফাগুনের দেখা মেলে ওদের গ্রামে হাঁড়িয়ার ঠেকে। ফাগুনের ঘরের দাওয়ায় গিয়ে বসি। রাইমুনিকে খুঁজি। অনেক খুঁজেও রাইমুনির দেখা মেলেনা। যার দেখা মেলে সে “কালোমণি” ফাগুনের বৌ। ভারি মিষ্টি মেয়ে সে। আমি রাইমুনির লাল শাড়ি কালোমণিকে দিই আদর করি। কালোমণি একগাল হেসে আমাদের আদর আপ্যায়ন করে। হাঁড়িয়া দিয়ে যায়। চারপাশে ধামসা মাদোলে নাচগান চলে। অন্ধকার নিবিড় হলে, ভিড় হাল্কা হয়। ফাগুনকে একটু একা পেয়ে জিজ্ঞেস করি – “রাইমণি কেমন আছে ফাগুন?” ফাগুন ফ্যালফ্যালে চোখে আমার দিকে তাকায়। বলে – “ভালোই।” আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে থাকি ওর দিকে। বলি – “কিন্তু।” ফাগুন কথা বলে না মন দিয়ে হাঁড়িয়া খায়। আমার হাঁড়িয়া গলা দিয়ে নামে না।
খানিকবাদে নেশায় বুঁদ চোখে ফাগুন বলে ওঠে – “দুলোরদৌ বাহা লিকানা কানা ওরারে আগু লিখাইদো মাসুদ দোয়া।
(ভালোবাসাতো ফুলের মতো ঘরে নিয়ে এলেই মুর্ছা যাবে)। আমি দীর্ঘশ্বাস ফেলি হাসি, ফাগুন এক গাল হাসে। হাঁড়িয়া খায় বাদনার গান গুনগুন করে ভালোবাসার গল্প করে। ভালোবাসার গল্প তো ফুরোবার নয় পৌষ পূর্ণিমার চাঁদ পূব আকাশে আলো ঢালে। আমি বাড়ি ফিরব বলে নটে গাছটি কোনোমতে মুড়িয়ে উঠে পড়ি। ফাগুন ও উঠে দাঁড়ায় টাল খায়। আমার সঙ্গে হাঁটতে থাকে। আমি গাড়িতে ওঠার মুখে বলি – “ফাগুন তোর মনে আছে ঠিক কেন তোর রাইমুনিকে ভালো লেগেছিল।” ফাগুন সেই ভাঙা চাঁদ হাসি হেসে বলে- ” শুরে মুরুবাহা ঞেলতে দুলৌড় হুইয়েনা।”( ঘাড়ের খোপায় পলাশ ফুল দেখে ভালোবেসে ফেলেছিলাম)।
আজ ও সেই হারিয়ে যাওয়া পৌষমেলা আমার মনে ভালোবাসার তুফান তোলে। বিশ্বভারতীর হয়ে মনের সুখে মেলার মাঠ পরিষ্কার করতে গিয়ে খুঁজে পাই যখন একটা সোনালি ফুল। ভাবি কে ফেলে গেল এই কার দেওয়া ফুল? ফেলব না রাখব। ফেলতেই হয়। দুদিনে পরিষ্কার অভিযান শেষ হয়। আবার মেলার মাঠ ফিরে পায় তার আটপৌরে সুখ। প্লাস্টিক বিহীন মেলার মাঠে শীতের রোদ নিশ্চিন্তে খেলা করে। আবার জমে ওঠে ছোটছেলে মেয়েদের ক্রিকেট আসর। স্মৃতিরা মেলার মাঠে আলো আঁধারে আগামী সুখের স্বপ্ন দেখে। লোকে কে কি বলে জানিনা আমি নিশ্চিন্তে আগামী মেলায় ফাগুনের দেখা পাবার অপেক্ষার দিন গুনি।