গল্পেসল্পে আলিনূর চৌধুরী (পর্ব – ২)

তুলির অন্তর্ধান-(২) অংশ
বিকেল ৫টায় মেলান্দহ রেল স্টেশনে পৌছলো। লোকাল ট্রেন আসার এখনও এক ঘন্টা বাকী। ৬টায় ট্রেন আসবে। অপেক্ষা ছাড়া উপায়ও নেই। সকলেই এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করছে । বর ও কনের কাছে থাকলো কনের বড় দুলাভাই সাবান আলী ও আফেল উদ্দিন মুন্সি, ভাবি মন্ডল শেখের স্ত্রী জয়গুন। ৬টায় ট্রেন আসলো। সকলে হুড়াহুড়ি করে ট্রেনে উঠলো। ভাগ্যিস ট্রেনে ভিড় ছিলো না। তাই বর কনের সিটের ব্যবস্থা করা গেলো । ৭টায় বাহাদুরাবাদ ঘাটে ট্রেন পৌছলো। ট্রেন থেকে নেমে যমুনা নদীর তীর ঘেসে কিছুদূর হাটা পথ। পায়ে হেঁটেই যেত হলো। বর কনেরও একই অবস্থা। সাঁকুয়া খেয়াঘাট আসতে আধাঘন্টা লেগে গেলো। সরকার বলে উঠলো এইতো গুদারাঘাট আইসা গেছি। নাও ঘাটেই ছিলো। সকলে উইঠা পড়েন, সাবধানে উইঠেন । নাও কাইত অইলে ডুইবা যাইবো। রাত্রি হলেও সে রাত্রি ছিলো চকচকে চাঁদনি রাত। চাঁদের আলোয় নদীর পানি চকচক করছিলো। দূরের গাঁও আবছা আবছা নীচু পাহাড়ের মত লাগছিলো। এ মনোরম দৃশ্য মুগ্ধতার ছোঁয়া লাগলো মনে।বরযাত্রি নিয়া গুদারা নাও নদীর বুক চিরে পশ্চিম দিকে ছুঁটে চললো।
নতুন বউ নিয়া যখন বাড়ি ফিরলো রাত তখন দশটা । তুলির শ্বশুর শাশুড়ি, ছেলের বউ বরণ করলেন। বর ও কণে দুজনকে এক গ্লাস দুধ খাওয়াইয়া ঘরে তুললেন। রাত বেড়েছে অনেক, তাই আর বাড়তি বেজাল করলেন না। তুলিকে তার শাশুড়ির ঘরে নিয়ে গেলো। টিনের চকচকে থালায় বউকে খেতে দেয়।
ভাতের সাথে পুটিমাছ ভাঁজা, হাসের গোস্ত, ও মাসের ডাল। তুলি লজ্জায় খেতে পারছিলো না। একে তো নতুন বউ , তাছাড়া খাওয়ার সময় অনেক লোক তার দিকে তাকিয়ে আছে, লজ্জায় গলায় ভাত সরছিলো না। শাশুড়ি ভাত না খাওয়া অবধি ছাড়লেন না। নুরল খেয়েই কেঁটে পড়লো। মা বললো – আইজ কোন খানে যাইওনা । আইচ্ছা বলেই বাহিরে চলে যায় নুরল।
পাশের ঘরটাতেই নুরল থাকে। সে ঘরেই বাসর সাজিয়ে রেখেছে। ছনের চাল , শোলার বেড়া ; তাতে কাঠের একটি চৌকি পাতা। মশারীর বালাই নেই। কাইসার ছনের সিলিং দেয়া । সিলিং এর সাথে সুতলিতে আঠা দিয়া লাগানো লাল , নীল হলুদ রঙিন কাগজে বাসর সাজিয়েছে। সেই ঘরে তুলিকে নিয়ে গেলো ননদ ও পাশের বাড়ির নুরলের ভাবি জমিলা। বউ ঘরে রেখে সবাই চলে এলো। তুলি পুতুলের মত একাকী জড়সড় হয়ে বসে আছে। বরের খবর নেই।
নুরল বাসর ঘরে যখন ডুকলো, তখন রাত চারটা। ভোর রাত, কিছুক্ষণ পরেই ফজরের আজান হবে। সূর্যের সোনালি আলো ছড়িয়ে পড়বে বসুন্ধরার বুক চিরে। জেগে উঠবে চির সবুজ তৃণলতা, জনারণ্য। মুখরিত হবে আকাশ নীলে বিচিত্র পাখির কোলাহল। ছড়িয়ে পড়বে দূর দিগন্তের প্রান্তর জুড়ে কৃষাণীর মাটির মায়া কাননে গভীর আলিঙ্গন।
নুরল ঘরে ডুকে দেখলো নতুন বউ, তুলি ঘুমিয়ে পড়েছে, চৌকির এক পাশে। ঘরে তখনো কুপি বাতি জ্বলছে। তুলি বাতি নিভায়নি, বর কখন আসে, তাই কুপি নিভায়নি।নিজের অজান্তেই কখন ঘুমিয়ে পড়ে বুঝতে পারেনি। নুরল ঘুম হতে তাকে আর জাগালো না। সেও এক পাশে ঘুমিয়ে পড়লো । কেউ জানলো না, তাদের বাসর হলো না।
যখন ফজরের আজান হলো, তুলি বিছানা ত্যাগ করলো। দরজা খুলে বাহিরে বের হয়েই দেখে শাশুড়ি উঠানে দাড়িয়ে। নতুন বউ উঠলো কিনা, খোজ নেয়ার জন্য অপেক্ষা করছিলো।
শাশুড়ি বাসর গোসলের জন্য আম পাতা, নিম পাতা, সাত কুঁয়ার পানি এনে জড়ো করে রেখেছে। এত সব তুলির ননদ, জা ওরাই করেছে। বউকে আদর করে কাছে নিয়ে বললো-বউ রাইতে তো ভালো ঘুম হয় নাই তোমার। আহো গোসল কইরা নেও, গোসল সাইরা খাইয়া নিবা। তারপর তুমি আঙ্গর ঘরে আরাম কইরা ঘুমাইবা। জলদি আহো । তুলি কিছু বলতে পারলোনা। বলতে পারলো না যে, গোসলের প্রয়োজন নেই। নিরুপায় তুলিকে গোসলের আয়োজনকে স্বাগত জানাতেই হলো।
ননদ, জা ওরা তুলিকে আমপাতা, নিমপাতা , সাত কুয়ার জল দিয়া ঘইসা মাইজা গোসল করাইল। কাপড় পড়াইয়া শাশুড়ির ঘরে উঠাইলো, খাবার দিয়া শাশুড়ি বললো-বউ খাওয়া শেষ কইরা বিছনায় শুইয়া ঘুমাও।
সকাল যায় যায় অবস্থা, বেলাও তরতর করে বাড়তে লাগলো। গাঁয়ের গৃহিণীরা বিয়ে বাড়ি ভিড় জমাতে লাগলো, সকলে নতুন বউ দেখার জন্য আসছে। তুলির শাশুড়িকে বলছে -তোমার বউ মা কই? দেখতে আইলাম। তোমার নুরলের বউ কেমন দেখি যাই।
বউ ঘুমাইতেছে, শাশুড়ি বললো।
ও মা! সে কি কথা। এত বেলা হইলো এহোনো ঘুম থাইকা উঠে নাই।
দেখার দিন তো আর শেষ হইলো না, আজ না হয় কাইল দেখবা। এখন আরাম কইরা একটু ঘুমাইতে দেও। ঘুম থাইকা ডাইকো না তোমরা।
আহা রে! নতুন বউয়ের প্রতি আদর যে দেখছি উছলে পড়ছে, এখনি এত সোহাগ। ডঙ দেখে বাঁচিনা। ডাকা যাইবে না! না দেখলে আমাগো বয়েই গেলো। গোসা কইরা চলে যায় তারা।
বিকালে আরেক চোট ভিড় পড়লো নতুন বউ দেখার। বউয়ের ঘোমটা খুলে, বউয়ের নাক, মুখ চোখ, চুল, সুন্দর নাকি কালো ইত্যাদি সব দেখার বিষয়; কেউ বললো সুন্দর বউ, কেউ বললো তেমন সুন্দর নয়। কারো পছন্দ হোক আর না হোক, তাতে যায় আসে না।
শাশুড়ির যে, বউ পছন্দ হয়েছে তা, তার ব্যবহারে বুঝা যায়। পরদিন কণে পক্ষ এলো, বর, কনে নিয়ে যায়। আবার যখন বরের বাড়ি নিয়ে আসে আর যেতে দেয়নি অনেকদিন। বড় ছেলের বউ সংসার তো তাকেই সামলাতে হবে। তাই এখন থেকেই সব বুঝে শুনে নিতে হবে। এখন তো আমার বিদায়, আর কত! অনেক তো সামলাইছি সেই যখন বউ সাইজা এ বাড়ি আইছি- বললো শাশুড়ি।
শাশুড়ি এখন কোন কাজে মনযোগ তেমন দেয়না, তুলিকেই সব কাজ দেখে শুনে করতে হয়।
চলবে