রম্য রচনায় অর্পিতা চ্যাটার্জী

আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ দেখে মনে পড়ল প্রদীপ নেভানোর একটা গন্ধ আছে। সেই গন্ধ নাকে গেলেই মনের জলে ভেসে ওঠে এক সুখের জলছবি। ছোটবেলায় আমরা তখন দশ পেরোয়নি। আট কি নয়। খেলে বেড়াই মাঠে ঘাটে। তবু খেয়াল করতাম প্রতিমাসের শুরুতে একটা তোড়জোড় চলত। সেসব মাসকাবারি দিনে ফর্দের খুব চল ছিল। আমার ঠাম্মা ছোটকাকুকে সঙ্গে নিয়ে ফর্দ লেখাতে বসত। ছোটকাকু তার মুক্তোর মত হাতের লেখায় ফর্দ লিখত। সে ফর্দের খাতা ভাঁড়ার ঘরের কোণে পানের বাটার পাশের কুলুঙ্গিতে রাখা থাকত। তারসঙ্গে দড়িতে বাধা থাকত একটা নীল ডটপেন। তারা মাসের শেষে মাসির বাড়ি বেড়াতে যেত। মাসকাবারি মাল আসত রিক্সা করে সঙ্গে সেই ফর্দের খাতাও আসত তারকদার দোকান থেকে । মাছওয়ালা খোকাদা তখন ছোট ওর বাবা তখন রিক্সা চালাতেন।জ‍্যাজ‍্যাকে দাদা ডাকতেন। তাই সেও ছিল আমাদের কাকা। বাবা কাকারা তাকে ভাইয়ের মত দেখতেন। নববর্ষে তারাপিসির শাড়ি সায়া ব্লাউজের সঙ্গে তারজন‍্যও আসত নতুন লুঙ্গি আর ধপধপে সাদা দুটো গেঞ্জি। সেই খোকাদার বাবা রিক্সা করে মাসকাবারি মাল দিয়ে যেতো তারকদার দোকান থেকে আমাদের বাড়িতে। শুধু বাড়িতে নয়। মাসকাবারি নামানোর একটা নির্দিষ্ট জায়গা ছিল আমাদের বাড়ির রান্নাঘরে। সেইখানে সব মাসকাবারি
মাল নামিয়ে গুছিয়ে রেখে যেতেন খোকাদাদার বাবা। তারপর একদিন দুপুরবেলা ছোটকাকিমা দেখতাম সেসব জিনিস ফর্দ মিলিয়ে তুলছে। প্রতিমাসেই কিছু ভুল থাকত। সেসব ভুল চুক ঠিক হলে একটা চটের বস্তা ভরা কি যেন দেখতাম কোণে রাখা থাকত দুতিন দিন। তারপর সে বস্তা নিয়ে পড়ত তারাপিসি। মাসের প্রথম দুতিনটে দিন সেই সব বস্তা থেকে সরষে বের করে ধুয়ে ছাদে শুকোতে দিত। সেই শুকনো সরষে আবার অন‍্য একটা ধোওয়া বস্তায় পাঠানো হত ঘানিতে। সেই ঘানিতে পেশা সরষের তেল বাড়িতে এলে ঠাকুমা দেখতাম দুপুরবেলা ঘরে দরজা দিতেন। কৌতুহলী মন ঠাকুমার ঘরের দরজা একটু ফাঁক করে দেখতাম কি হচ্ছে সেখানে। ঠাকুমার ঘরের দরজা দিয়ে উঁকি মেরে দেখতাম ঠাম্মা শাড়িটা হাঁটুর ওপর তুলে থাইয়ের ওপর তুলো ঘষে ঘষে অনেক অনেক সলতে পাকিয়ে একটা কাঠের বাক্সে জমিয়ে রাখছে। সেই কাঠের বাক্সের ওপর একটা সোনালি গোল। সেই সোনালি গোলে একটা সোনালি প্রদীপ আঁকা। শুনেছিলাম ঠাকুমার ঠাকুমাও নাকি ঐ বাক্সে সলতে পাকিয়ে রাখতেন তার ঠাকুমাকে দেখে। দরজার যখন মন দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখছি আর দেখছি ঠিক তখন তারাপিসি কাঁইমাই করে চীৎকার করতে করতে ঢুকত দরজা ঠেলে ঠাকুমার ঘরে আর বলত ” আর পারি না বাপু ভগবান দুটো বই হাত তো দিলে না মা দশহাত থাকলে দশদিক সামলাতাম। কি করব বুঝে উঠি না তোমার চোদ্দগুষ্টির এঁটো বাসন মাজব না তোমার ঠাকুরঘরের কাজ করব “। এসব চীৎকার করে বলতে বলতে তার ধবধবে সাদা কাপড়ে মুছে ঠং করে ঠাম্মার সামনে নামিয়ে দিত একটা সোনার প্রদীপ। সত‍্যি সোনার মত ঝকঝক করত সে প্রদীপ। পুবদিকের ঠাম্মার ঘরের লাল মেঝেতে তখন দুপুরের আলো খেলা করছে। সেই ঝকঝকে লাল মেঝের ওপর যেই তারাপিসি সেই সোনার প্রদীপ নামিয়ে রাখত আমরা দেখতাম দুটো সোনার প্রদীপ যেন রাখা। ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করতাম বল না ঠাম্মা এটা কি সত‍্যিই সোনার প্রদীপ। কোন উত্তর দিত কিনা মনে পড়েনা। মনে পড়ে সাধারণ করে পরা সাদা শাড়ির আঁচলটা মাথায় টানা পা ছড়িয়ে বসে মুচকি মুচকি হাসছে ঠাম্মা। হাসতে হাসতে ঠাম্মা তার নরম হাতের আঙ্গুল দিয়ে সেই কাঠের বাক্স থেকে চারটে সলতে নিয়ে সেই মাঝারি মাপের সোনার মত চকচকে আসলে পেতলের প্রদীপটার বুকে সাজিয়ে রাখত। তারপর পাশে রাখা ছোট পেতলের বাটিতে ছোটকাকুর ঘানিতে পিষিয়ে আনা সরষের তেল ঢালত সেই প্রদীপটার বুকে। সলতে গুলো ডুবে যেত। ঠাম্মা খুব আদর করে সলতে গুলোকে প্রদীপের মুখের কাছে এগিয়ে দিত ঠেলেঠুলে। সেই সরষের তেলের ঝাঁঝে চোখ যেত জ্বলে। সেই ঘানিতে পেষা সরষের তেলের গন্ধে নাক ঝাঁঝিয়ে উঠত। এরপর ঠাম্মা একটা টেক্কা দেশলাইয়ের বাক্স থেকে দেশলাই এর কাঠি বের করে জ্বালাত। টেক্কা দেশলাই তো দারুণ তাজা একবারেই জ্বলত দপ করে। টেক্কা দেশলাইয়ের একটা অদ্ভুত গন্ধ ছিল। তারপর সেই পেতলের সোনার প্রদীপ প্রথমে নিবু নিবু করে জ্বলে উঠত দপ করে। সোনার প্রদীপ জ্বালিয়ে ঠাম্মা উঠে পরত। এগিয়ে যেত দেরাজের কাছে দেরাজের মধ‍্যে থেকে বের করে আনত পেতলের ফুল পাতা আঁকা এত্ত বড় সোনার কাজললতা। সেই কাজললতা নাকি ঠাকুমার ঠাকুমার ঠাকুমা বিয়ের সারাদিন আগলে ছিলেন তারপর ঠাকুমার ঠাকুমাও আগলেছিলেন তারপর ঠাকুমাও আগলেছিলেন। সেই ফুলকাটা কাজললতার মস্ত কাজলবাটিটা তখন ঠাম্মা ধরত প্রদীপের শিখার মুখে অদ্ভুত একটা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ত সারা ঘরে। কাজললতার বাটিটা কালো হয়ে উঠত আর কাজললতাও উঠত গরম হয়ে। ঠাম্মা তার সাদা শাড়ির আঁচলটা পাকিয়ে কাজললতার হাতলটা ধরতেন। খুব আস্তে আস্তে প্রদীপের শিখা না নিবিয়ে ঠাম্মা সারা কাজললতার বাটিটা কালো ভুসো কালিতে ভরিয়ে তুলত। এদিকে চারপাশে যখন সেই প্রদীপের সলতে পোড়ার গন্ধ, ভুসোকালির গন্ধ, সেই গন্ধভরা ঘরে তারাপিসি নামিয়ে দিয়ে যেত এক ছোট্ট সোনার পেতলের বাটিতে ঠাম্মার হাতে বানানো একচামচ ঘি। সব গন্ধ যখন মিলেমিশে একাকার হয়ে যেত ঠিক তখন ঠাম্মা ঐ কাজললতার বাটিতে ভুসোকালির মধ‍্যে একটু ঘি দিয়ে সেটা অনেকক্ষন ধরে নাড়িয়ে চাড়িয়ে কাজল বানিয়ে তুলতেন বাড়ির মেয়েদের জন‍্য। ঠাম্মার কাজল বানানো হচ্ছে শুনে আজিনা এসে দাঁড়াতো দরজায় এক টুকরো কাগজ হাতে। ঠাম্মার একটা ছোট্ট পেতলের সোনার হামান দিস্তা ছিল। সেই হামানে ঠাম্মা একটু কপ্পুর দিয়ে ঐ ভুসোকালি খুব মিহি করে বারবার গুঁড়ো করে মেশাতেন। তারপর তা ঢেলে দিতেন আজিনার কাগজে। আজিনা ঐভুসো কালি পেয়ে নাচতে নাচতে চলে যেত। বিকেলবেলা টেনে চুল বেঁধে চোখভরা সুরমা পরে এসে ঠাম্মার সামনে দাঁড়াত হেসে। সেই হাসি থেকে ঝরে পরত একরাশ সুখ ঠাম্মা কুড়িয়ে নিতেন তারা সাদা ধুতি পার শাড়ির আঁচলে। থুতনি ধরে চুমু খেয়ে বলতেন রাণীর মত লাগছে। আমরা সবাই পরতাম ঠাম্মার বানানো ঐ কাজল। মায়েরাও পরত। সেই সোনার কাজললতা যখন ভরে উঠত ভুসো কালিতে সেই হামান যখন কপ্পুর আর ভুসো কালি মিহি হয়ে গুঁড়িয়ে যেত তখন ঠাম্মা কাজললতাটা কাপড়ে মুড়ে রেখে হাতে দুতিনবার বাতাস করে নিভিয়ে দিত প্রদীপটা। নিভে যাওয়া প্রদীপ ঘি এর বাটি চামচ হামান সব নিয়ে চলে যেত তারাপিসি মেজে রাখবে বলে। ঠাম্মা সাদা কাপড়ে মোরা কাজললতা কাঠের আয়নার সামনে সাজের জিনিসের তাকে তুলে স্নানে যেত চুলে জবাকুসুম মেখে। ঘরে পরে থাকত একটা অদ্ভুত গন্ধ। কি যে নাম দেব সে গন্ধের। সেটা ঠিক প্রদীপের গন্ধ না সেটা ঠিক বাড়ির বানানো ঘি এর গন্ধ নয় সেটা ঠিক কপ্পুরের গন্ধ না সেটা ঠিক জবাকুসুমের গন্ধ না। একটা একান্নবর্তী গন্ধ। ঠাম্মার বানানো কাজলে যেমন লেগে থাকত
সবারই মনের দুঃখ যেমন লেগে থাকত সবার মনের সুখ ঠিক তেমন সেই গন্ধেও ভরে থাকত একরাশ সুখ সেই গন্ধে লেগে থাকত একরাশ দুঃখও। কি হতে কি হল জানিনা আজ সকালের ঐ। আলাদিনের প্রদীপ কেমন করে যেন আমার মনের পালকিকে নিয়ে চলে গেল সেই সুখ দুঃখ মিশে থাকা একান্নবর্তী গন্ধের দেশে ফেলে আসা সোনার সংসারে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।