সাপ্তাহিক ধারাবাহিক ঐতিহ্যে “কলকাতার চার্চ (কোম্পানীর যুগ)” (পর্ব – ৬) – লিখেছেন অরুণিতা চন্দ্র

বর্তমানে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে একটি মহিলা মহাবিদ্যালয়ে ইতিহাসের সহকারী অধ্যাপিকা পদে নিযুক্ত আছেন। ইতিহাসের অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়াও পুরাণ ও ভারতীয় সংস্কৃতিচর্চায় তিনি প্রবল আগ্রহী। বাঙালির জাতীয়তাবাদী ইতিহাস রচনা তাঁর স্বপ্ন। এছাড়া ভালোবাসেন ঐতিহাসিক স্থান ভ্রমণ করতে এবং লেখালিখির চেষ্টা করতে।
St. Andrews Church এর পর মহানগরীর দ্বিতীয় স্কটিশ চার্চ টি ছিল ডাফ চার্চ। রেভারেন্ড আলেকজান্ডার ডাফ ছিলেন প্রথম স্কটিশ মিশনারী যিনি ১৮৩০ খ্রিস্টাব্দে সস্ত্রীক কলকাতার বুকে পদার্পন করেন। এসময় ব্রিটিশ শিক্ষাব্যবস্থায় এক আমূল পরিবর্তন আসতে শুরু করেছিল এবং উচ্চবর্ণের হিন্দু বাঙালি যুবকদের মধ্যে ইউরোপীয় শিক্ষার প্রসার ও তাদের ধর্মান্ততরিত করতেও মিশনারীরা বিশেষ আগ্রহ দেখাতে শুরু করেছিলেন। ততদিনে হিন্দু কলেজ তথা বর্তমানের প্রেসিডেন্সি কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠা এবং ডিরোজিও ও তাঁর শিষ্যদের নব্যবঙ্গ আন্দোলন এলিট কলকাতা সমাজে শিক্ষার ক্ষেত্রে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল এই পরিস্থিতিতেই রেভারেন্ড ডাফ পশ্চিমী শিক্ষাব্যবস্থার সমর্থক ভারতের প্রথম আধুনিক মানুষ রামমোহন রায়ের সহায়তায় অধুনা কলেজ স্কোয়ারের নিকটে একটি বাসগৃহ ভাড়া নিয়ে বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। ১৮৩০ খ্রিষ্টাব্দেই হিন্দু কলেজে শিক্ষকতার পাশাপাশি রামমোহন রায়ের সহায়তায় তিনি General Assembly’s Institution নামক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। ইতিমধ্যে চার্চ অব স্কটল্যান্ড দুই ভাগে ভাগ হবার পর ১৮৪৩-৪৪ খ্রিষ্টাব্দ নাগাদ ডাফ ফ্রি চার্চ অব স্কটল্যান্ডে যোগ দেন এবং একটি পৃথক কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তাঁর নামানুসারে এর নাম হয় ডাফ কলেজ। পরে ১৯০৬ খ্রিষ্টাব্দে দুই কলেজ একত্রিত হয়ে তৈরি হয় আজকের ঐতিহ্যমণ্ডিত স্কটিশ চার্চ কলেজ।
১৮৪৩ খ্রিষ্টাব্দে ডাফ স্কটিশ ফ্রি চার্চে যোগ দিল তিনি ও তাঁর সহকারীরা কলকাতার স্কটিশ চার্চের অপর শাখা প্রেসবিটেরিয়ান দের সেন্ট এন্ড্রুজ চার্চ থেকেও বহিষ্কৃত হন। তখন ডাফ ও তাঁর সহকারীরা পৃথক একটি গীর্জা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। প্রথমে ওয়েলেসলি স্কোয়ার যার বর্তমান নাম হাজি মহম্মদ মহসীন স্কোয়ার সেখানে বর্তমান রফি আহমেদ কিদওয়াই রোডের উপর প্রথম ডাফ চার্চটি নির্মিত হয়। তবে ১৯৪২ খ্রিষ্টাব্দে এই চার্চটি সেন্ট এন্ড্রুজের সাথে মিশে যায় এবং তারও কিছু পরে এটি রোমান ক্যাথলিক চার্চে পরিণত হয়। এই ডাফ চার্চটি অবশ্য ইংরেজিভাষী খ্রিষ্টানদের জন্য নির্মিত হয়েছিল। কিন্তু ডাফের কর্মস্থল ছিল উত্তর কলিকাতা যেখানে নেটিভ বাঙালি ধর্মান্তরিত খ্রিষ্টানদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছিল স্কটিশ মিশনারী দের সৌজন্যে। তাই ডাফ নিজ বাসস্থানের কাছে কর্ণওয়ালিস স্কোয়ার অর্থাৎ বর্তমান আজাদ হিন্দ বাগ যা হেদুয়া নামেই বিখ্যাত তার নিকট একটি জমি ক্রয় করেন। এভাবেই ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে ১২৭, মানিকতলা স্কোয়ারে প্রতিষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় ডাফ চার্চ যার পূর্ববর্তী নাম ছিল United Free Mission Church। ডাফের সহকারী জর্জ স্মিথ চার্চটির নাম দেন দা বেঙ্গলি চার্চ কারণ বাঙালি খ্রিষ্টানদের জন্যই এটি নির্মিত হয়। ব্যস্ততার কারণে ডাফ শুধু রবিবার ইংরাজি ও বাংলায় প্রার্থনা পরিচালনা করতেন তাই Dr. David Ewart চার্চের প্রথম ক্লার্জি নিযুক্ত হন আর তাঁর মৃত্যুর পর এই পদ পান ডাফের প্রিয় শিষ্য এবং বাংলার নবজাগরণের আরেক উজ্জ্বল মুখ রেভারেন্ড লালবিহারি দে।
ডাফ চার্চের সম্পদ যার মধ্যে দুই বিঘা সমান জমি, চার্চ, চ্যাপেল ডাফের বাসস্থান, শ্রমিকদের থাকার জায়গা সবই অন্তর্ভুক্ত ছিল পূর্বে তার মালিক ছিল স্কটিশ মিশন ট্রাস্ট। ফ্রি চার্চ আর প্রেসবেটিরিয়ান চার্চ যখন বিংশ শতকে আবার মিশে যায় তখন এই ডাফ চার্চ টিই কলকাতার প্রধান প্রেসবিটেরিয়ান চার্চে পরিণত হয়। ১৮৫৬ খ্রিষ্টাব্দে Countess of Effingham যে চার্চের বিল্ডিং নির্মাণে এক বৃহৎ অংক দান করেন তা চার্চের একটি মার্বেল স্মৃতিফলক থেকে জানা যায়। আলেকজান্ডার ডাফ ও লালবিহারি দে র স্মৃতিবিজড়িত ডাফ চার্চ আজো উনিশ শতকের প্রথম ভাগে কোম্পানির কলকাতায় স্কটিশ মিশনারী কার্যকলাপ এবং পশ্চিমি শিক্ষাব্যবস্থা ও তার ফলশ্রুতিতে বাংলার নবজাগরণের সাক্ষ্য দিয়ে চলেছে।

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!