“এই শ্রাবণে আষাঢ়ে গপ্পো” বিশেষ সংখ্যায় অর্পিতা বোস

১৫ই আষাঢ় 

মোবাইলটা বেজে উঠল। অচেনা নম্বর। শুভ জানত আজ ফোনটা আসবেই। আজ যে ১৫ই আষাঢ়। অপেক্ষায় ছিল মোবাইলটা পাশে রেখে। রিসিভ করতেই ওপাশে সেই অদ্ভুত  নীরবতা। শুধু যেন কারো দীর্ঘশ্বাসের শব্দ। শুভর চোখটা চিকচিক করে ওঠে।
— অনু!
শুধুই দীর্ঘশ্বাসের শব্দ ভেসে আসছে। ফোনটা কানে চেপে ওপ্রান্তকে স্পর্শ করার বৃথা চেষ্টা করে শুভ।একসময় ফোনটা কেটে যায়। রিং ব্যাক করতেই বরাবরের মতো ভেসে আসে, “এই নম্বরটির অস্তিত্ব নেই।”
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অনুর ছবিটা টেনে নেয় শুভ।বাইরের বিদ্যুতের ঝলকে আবছা আলোকে অনুর মুখটা স্পষ্ট হয় । ছবির গায়ে হাত বুলিয়ে শুভ আপন মনেই বলে ওঠে,
— কেন কথা বলনা অনু? কেন হারিয়ে গেলে? আলোতে আসবেনা বলেই অন্ধকারের মাঝেই তো তোমার অপেক্ষায় থাকি। জানি আজ তুমি  আসবেই। আজ যে ১৫ ই  আষাঢ়। জানি তুমি  আসবেই।
চোখ বেয়ে দুফোঁটা জল ছুঁয়ে যায় অনুর ছবি আর সাথেসাথেই দমকা বাতাস ঢোকে জানালা দিয়ে। সেই  ঠাণ্ডা হাওয়া গায়ে মেখে চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দেয় শুভ। বাইরে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামে। বৃষ্টি যেন অনুর নুপূরের আওয়াজ জানান দেয়। জানালা দিয়ে ভেসে আসা জুঁইফুলের গন্ধেরা জানান দেয় অনুর গায়ের গন্ধ। শুভ অপেক্ষায় থাকে চোখ বুজে। জুঁইফুলের গন্ধটা আরও এগিয়ে  আসে। বৃষ্টিরা যেন আরও তীব্র নিক্কন তোলে অনুর পায়ে।শুভ অনুভব করে অনু এসেছে তার পাশে। খুব কাছে। বন্ধ চোখের পাতায় নেমে আসে এক শীতল স্পর্শ। হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরতে চায় শুভ তার অনুকে। কিন্তু চোখ মেলতেই হারিয়ে যায় জুঁইফুলের সুবাস। বৃষ্টিরা যেন অনুর সাথে সাথেই হারিয়ে যায়।
এভাবেই এসেও চলে যায় অনু, আজ এতগুলো বছর ধরে। শুভ শুধু ভাবে অনুর এই চলে যাওয়াতে তার   দায় আছেই। কেন একা যেতে দিয়েছিল অনুকে সেদিন। আজও স্টেশনে অনুর কথাটা কানে ভাসে,
—তুমি না আসলে আমি ঠিক চলে আসবো তোমার  কাছে।
কলেজে জুনিয়র ব্যাচের অনুমিতাকে প্রথম দেখেই  শুভর মন হারিয়েছিল। তারপর ধীরে ধীরে আলাপ। ক্রমশ দুটো মন অজান্তেই এক হয়েছিল। কলেজ শেষে চাকরি পেয়ে শুভ বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গিয়েছিল অনুমিতার বাড়িতে। কিন্তু অনাথ শুভকে বংশপরিচয় নিয়ে অপমান করেছিলেন অনুমিতার বাবা। সোজাসুজি মুখের উপর জানিয়ে দিয়েছিলেন এ বিয়েতে  তাঁর ও পরিবারের মত নেই। কিন্তু শুভর অপমান মেনে নিতে পারেনি অনুমিতা। তাই বাড়ির অমতেই নিজেদের প্রেমকে সম্মান দিতে বাড়ি ছেড়েছিল একে অপরের হাত ধরে। ১৫ই আষাঢ় বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছিল দুজনে। তারপর এই দিল্লিতেই কেটে গিয়েছিল অনেকগুলো বছর দুজনের ভালোবাসায়। কিন্তু এ সুখ যে ক্ষণস্থায়ী একথা সেদিন বোঝেনি কেউ।
একদিন ফোন এলো অনুমিতার বাবা খুব অসুস্থ। সব মান অভিমান ভুলে শুভ আর অনুমিতাকে একবার  দেখতে চাইছেন অনুমিতার বাবা। পারেনি কেউই আর অভিমান করে থাকতে।  গৌহাটির টিকিটও কাটা হলো দুজনেরই। কিন্তু শেষ মুহূর্তে অফিসের কাজে আটকে গেল শুভ। অভিমান করেছিল অনু খুব।
— বিবাহবার্ষিকীতে আমি  কি একা থাকব?
অভিমানী বউকে আদর করতে করতে কথা দিয়েছিল অফিসের কাজ সেরে দুদিন পরেই শুভ রওনা হবে অনুর কাছে যাওয়ার  জন্য।
পরের দিন স্টেশনে অনুকে ট্রেণে তুলে দিতে গিয়ে অজানা অকারণ আশঙ্কায় মনটা খুব অস্থির হচ্ছিল শুভর। তবুও মনের ভাব লুকিয়ে হেসে অনুকে বলেছিল ঠিক পৌঁছে যাবে বিবাহবার্ষিকীতে। স্টেশনে ভেজা দুচোখে অনু বলেছিল,
— মনে রেখো, পনেরো  তারিখ, তুমি না এলে আমি  কিন্তু….
— আমি না যেতে পারলে তুমি চলে এসো আমার কাছে। আমার তো তুমি ছাড়া  আর কেউ নেই অনু।
গলা ধরে এসেছিল শুভর। বুঝেই তার হাতে হাত রেখেছিল অনু। ভেজা চোখ মুছে মিষ্টি হেসে বলেছিল,
— জানি তো। তুমি না আসতে পারলে আমিই  আসবো তোমার  কাছে।
কথাগুলো শেষ হতেই ট্রেনটা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্ম ছেড়েছিল। একটু একটু করে মিলিয়ে যাওয়া অনুকে দেখতে দেখতে শুভর চোখটাও ঝাপসা হয়ে  গেছিল। মনে হচ্ছিলো যেন হারিয়ে যাচ্ছে অনু। অথচ দুদিন পরেই তার যাওয়ার  টিকিট।
বাড়ি ফিরে ফাঁকা ঘরটা খুব কষ্ট দিচ্ছিল। মনটাকে একটু অন্যদিকে ঘোরাতেই টিভিটা চালিয়ে ছিল শুভ। চ্যানেল বদলাতে বদলাতে হঠাৎ আটকে যায় চোখ ব্রেকিং নিউজে। দিল্লি-গৌহাটি রাজধানী এক্সপ্রেসের দুর্ঘটনা। তার আর পর নেই।
কথা রেখেছে অনু। প্রতি বিবাহবার্ষিকীতে এমন করেই আসে। ছুঁয়ে দিয়ে আবার হারিয়ে যায় নিরুদ্দেশের ঠিকানায়। তবু আসে বারবার পনেরোই আষাঢ়। আর অপেক্ষায় থাকে শুভ তার প্রিয়ার।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।