অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩২)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু

এই তো আমরা মতামতে, মন্তব্যে,
মিলতে চলেছি একটাই গন্তব্যে।
এই তো আমরা যুক্তি আর বিতর্কে ,
আপন করেছি বাইরে এবং ঘরকে ।

মিটিং শুরু হতেই আচমকা প্রথম বোমাটা ফাটালো একটু ছটফটে আর মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে তিথি। কোনো ভূমিকা না করে সরাসরি অমলেন্দুর দিকে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলো– আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার,আপনি আমার কাছে পিতৃতুল্য,প্রণম্য। কবিতার প্রতি আপনার ভালোবাসা ও ব্যক্তিত্বের টানে আমরা আজ সকলেই এখানে উপস্থিত হয়েছি ,তাতে কোনো সন্দেহের অবকাশ নেই ।কিন্তু আমি ব্যক্তিপুজোতে বিশ্বাসী নই।তাই , আপনার প্রতি মুগ্ধতাকে সরিয়ে রেখে সরাসরি কথা বলতে চাই ; যেহেতু , এটা আলোচনা সভা এবং আমরা সবাই স্বাধীন মতামতে বিশ্বাসী। আমি কি বলতে পারি ? খানিকটা থতমত খেয়ে অমলেন্দু অপ্রস্তুত উত্তর দিলো–হ্যাঁ,মানে আমরা তো এখানে মতামত বিনিময় করতেই এসেছি। নিজেকে একটু সামলে নিয়ে স্মার্টলি বললো–তুমি বলতে পারো বন্ধু। অম্ল মধুর তিক্ত কষায়– আমার অন্তত কোনো কিছুতেই আপত্তি নেই । প্লিজ, গো অন। বাদল মেঘ কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল,তাকে ইশারায় চুপ করিয়ে দিয়ে তিথি ঝর্ণার মতো কলকল করে বলে গেলো–আমার মনে হয় স্যার , আপনার এই পরিকল্পনাটা ঘোরতর অবাস্তব। Next to impossible ; আমার কেন জানিনা মনে হচ্ছে , I may be wrong , আপনি আপনার নিজস্ব রোমান্টিক তন্ময়তা থেকে আর পাঁচজনকেও তার মধ্যে জড়িয়ে নিচ্ছেন । এই বিতত বীতংসে আমরা ধরা পড়া পাখির মতো ক্রমশ ওষ্ঠাগত প্রাণ হয়ে উঠবো না তো ! কবিতাজন্মের কনসেপ্ট একদিন যদি নির্বোধের স্বর্গ বলে প্রমাণিত হয় , তখন আমরা যাবো কোথায় ? তখন আপনি বৃদ্ধ হলেও , আমরা তো যুবই
থেকে যাবো। আপনি আপনার সাংবাদিকতার অভিজ্ঞতা ভাঙিয়ে হয়তো নিজের ভাতরুটিটুকু জোগাড় করবেন; কিন্তু আমাদের তো আর চাকরি খোঁজার বয়স থাকবে না । বাদল আর আমার দু’ একজন সংসার বিমুখ বন্ধু আছে , ভালো কবিতা লেখে । তারা আপনার কবিতাজন্মের আশ্রয়ে এসে কুঁড়েমি আর আলস্যের দাসানুদাস হয়ে যাবে না তো ? আপনি তাদের কতদিন খাওয়াবেন ? আপনি কতদিন ধৈর্য ধরে থাকবেন স্যার ? কারণ , আমি জানি– আদর্শের ধুনি একবছর , দুবছর , পাঁচবছর পর্যন্ত জ্বালিয়ে বসে থাকা যায় ; কিন্তু, দশ বছর ,পনেরো বছর পর্যন্ত জ্বালিয়ে রাখা যায় কি ? সরাসরি একটা কথা বলি স্যার, আমি আর কবি বাদল মেঘ ভবিষ্যতে ঘর বাঁধবো বলে ঠিক করেছি । সেই ঘর কি কবিতা জন্মের তালবনে বাবুই পাখির নীড়ের মতো সুন্দর হতে পারে কখনও ? পেটে ভাত না জুটলে , আদর্শের ভরা জোছনা জানলা খোলা থাকলেও ঢোকে না স্যার । বেগম আখতারের গানের মতো,জোছনা আড়ি করে অন্য গলি দিয়ে শাড়ি লুটিয়ে চলে যায় । আমাকে ক্ষমা করবেন স্যার,আমি সাত জন্মেও আপনাদের মতো কবিতা লিখতে পারবো না । আমি বাদলের চোখের গভীরতায় আষাঢ়ের মেঘ আর আশ্বিনের রোদ একসাথে দেখেছিলাম বলেই ভালোবেসেছিলাম।যদি একটা ভদ্রস্থ চাকরি জুটিয়ে নিতে পারি,তাহলে আমাদের ভবিষ্যৎ সংসার জীবনে ওকে একটা মুক্ত দিগন্ত উপহার দেবো , কথা দিচ্ছি। সংসারের দায়িত্ব আমার ,ও শুধু লিখবে। কিন্তু , সেটা তো আমাদের ব্যক্তিগত ব্যপার। আমাদের এই কবিতাজন্মের কমিউনে সেটা কতখানি সম্ভব হবে স্যার ? আমি ব্যক্তি স্বাধীনতায় বিশ্বাসী। বিশ্বাস করি, বিবাহিত জীবনে নারী পুরুষ উভয়ের দায়িত্ব সমান।যারা মন দিয়ে সাহিত্য চর্চা করবে,আর আমরা ,যারা কমিউনের সংগঠনকে ধরে রাখবো, তাদের মধ্যে সমন্বয় ঘটাবে কে ? নিশ্চয়ই ভগবান নন।আমার ভয় হয় স্যার, অধিকাংশ বিবাহিত জীবনের মতো আমাদের সংসারযাপনটাও শেষ পর্যন্ত তিক্ত হয়ে যাবে না তো ? কবিতা শেষ পর্যন্ত ভালোবাসার বদলে অভিশাপ বর্ষণ করবে না তো ? এতক্ষণ একটানা বলে , কিছুটা জল খেয়ে ধাতস্থ হল তিথি। উন্মনা অন্যমনস্ক হবার ভান করছে নদীর দিকে তাকিয়ে।প্রলয় একটা ঘাসের ডগা ছিঁড়ে প্রায় বিজ্ঞানীর মগ্নতায় পর্যবেক্ষণ করছে।বাকিরাও যে যার নিজের মতো করে চুপ। অমলেন্দু খুব ধীরে ধীরে উচ্চারণ করলো — তুমি ঠিক বলেছো তিথি ।আমি যখন গ্রুপ থিয়েটার কর্মী ছিলাম,তখন দলে কোনো উজ্জ্বল তরুণ তরুণী যোগ দিতে এলে ,অভিজ্ঞ পরিচালকের নির্দেশে তাদের নিয়ে বাইরের চায়ের দোকানে গিয়ে বসতাম। মুখ দেখে বোঝবার চেষ্টা করতাম,কেন তারা থিয়েটারে যোগ দিতে চায়? তিলোত্তমা শিল্প নাটককে সত্যিকারের ভালোবেসে ? নাকি , স্টেজ, লাইট, মেক আপ ,পোষাক, হাততালি আর গ্ল্যামারের মোহে ছুটে এসেছে থিয়েটারের দলে যোগ দিতে।ঘন্টার পর ঘন্টা কথা বলে , তাদের মধ্যে অধিকাংশকেই বলতাম– লেখাপড়া শেষ করে, রুটিরুজির একটা ব্যবস্থা করে ,তারপর থিয়েটার করতে আসার জন্য। তারা তাৎক্ষণিকভাবে মনঃক্ষুন্ন হলেও শেষ পর্যন্ত মেনে নিতো আমার কথা‌। তিথি , তুমি কী অসামান্য ভাবে বললে কথাটা ! সত্যিই তো — আদর্শের ধুনি পাঁচ বছর জ্বালানো যায়। দশ বছর বা পনেরো বছর নয়। বাঃ! অসাধারণ! আমি তোমার যুক্তি সম্পূর্ণ মেনে নিচ্ছি।উন্মনা অসহিষ্ণুভাবে বলে উঠলো — বাঃ! তাহলে তো মিটিং এখানেই শেষ করে দিতে হয়। পেট ভরে ভাত খেয়ে ,আসছে বছর আবার হবে বলে , বিসর্জনের ঢাক বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরে যাই তাহলে ? এই কথাগুলো শোনবার জন্যেই কি আমি আমার বাচ্চা মেয়েটার লেখাপড়া , দেখভাল সব কিছু ফেলে দিয়ে এতদূর ছুটে এলাম ? বাঃ! চমৎকার !
আবার অকাল স্তব্ধতা নেমে এলো ওদের মধ্যে। অমলেন্দুর মুখে কথা জোগাচ্ছিল না । কবিতার নারী উন্মনা যে এভাবে খাপখোলা তলোয়ারের মতো রিঅ্যাক্ট করবে ,এটা ওর ধারনার বাইরে ছিল । উন্মনা ধীরে ধীরে নিজেকে ফিরিয়ে আনলো । আকাশের শূন্যতার দিকে তাকিয়ে যেন ঘোরের মধ্যে বলে চললো — সরি তিথি, তোমার সুচিন্তিত বক্তব্যে আমার এভাবে রেগে যাওয়া উচিৎ হয়নি। কিন্তু বাদ প্রতিবাদের মধ্যে থেকে তো কাজ করার সঠিক পথটা খুঁজে বার করতে হবে ,তাই না ? কবি প্রলয় টুক করে একটা আলগা মন্তব্য ছুঁড়ে দিলো — তুমি ঠিক বলেছো দিদি , আমাদের ইউনিভার্সিটির বন্ধু রক্তিম সেই স্কুলের এগারো বারো ক্লাস থেকে ভেবে আসছিলো রবীন্দ্রনাথের রক্তকরবী নিয়ে ও এমন একটা প্রযোজনা মঞ্চে নামাবে , যা নাকি পৃথিবীতে কেউ কখনও দেখেনি ! গোটা মেদিনীপুর জেলার কত শত চায়ের দোকানে,এই নিয়ে ওর নাটকীয় বক্তৃতার ঠেলায় দুর্বল কাঠের বেঞ্চিগুলো নড়বড় করে উঠলো; কিন্তু, রক্তকরবী আর করা হয়ে উঠলো না। শুনেছি , ওর বৌ তিস্তাকে নিয়ে ও নাকি ইদানিং একটা শ্রুতিনাটক করছে ,যার নাম — যে নাটক করা গেল না । অমলেন্দু হাসি চাপতে অন্য দিকে তাকালো । তিথি ওর ব্যাগের চেনটা প্রাণপণে ঠিক করতে লাগলো । বাদল মেঘ নিজের ব্যাগ থেকে কী একটা বই বার করে , পড়ার চেষ্টা করছিল। কবি শুভ নিজের খাতা মেলে ধরে পরপর কয়েকটা লাইন লিখে ফেললো।এইসব দেখতে দেখতে উন্মনা আবার ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলো– প্রলয় , এটা ঠাট্টার সময় নয়। বি সিরিয়াস। তিথি এসো আমরা কিছু একটা শুরু করি। ১৮৮৬ সালে গুরু রামকৃষ্ণদেব যখন চলে গেলেন ,যুবক নরেন ও তার বন্ধুদের সম্বল বলতে , তখন তো শুধুই শূন্যতা! একেবারে কপর্দকহীন অবস্থা। পরবর্তী কালে ,স্বামী বিবেকানন্দের নেতৃত্বে , সেই সন্ন্যাসীদল গুরুজির নামে রামকৃষ্ণ মিশন তৈরী করেছিলেন , শুধু ইচ্ছাশক্তির জোরে । তোমরা লক্ষ্য করে দেখো , স্বামীজি কিন্তু মিশন শব্দের কোনো বাংলা প্রতিশব্দ ব্যবহার করেননি । মিশন ও ইচ্ছাশক্তি এই শব্দ দুটো মিলেমিশে এমন একটি প্রতিষ্ঠান ডালপালা বিস্তার করলো , যা এখন আধুনিক পৃথিবীর দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়েছে। না বন্ধুরা,আমি আধ্যাত্মবাদের উপাসক নই , কিন্তু কর্মের পূজায় বিশ্বাসী। পেশীশক্তি ও ইচ্ছাশক্তি মিলেমিশে এই ট্রাক্টরের যুগেও আদ্যিকালের লাঙলকে বাঁচিয়ে রেখেছে। আমাদের দেশে স্বামীজি গান্ধীজি নেতাজি এই কর্ম ও ইচ্ছাশক্তির আদর্শকে এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন , যেখান থেকে আমাদের আর ফেরবার পথ নেই । আমাদের জীবনে সাফল্যের সঙ্গে পশ্চাদপসারণ‌‌ বলে কিছু নেই । কবিতার আদর্শকে নিশানের মতো তুলে ধরার জন্য কর্মহীন জীবন কাটাবো কেন আমরা ? নানারকম সৃষ্টিশীল কাজের মধ্যে থেকেও , আমরা কবিতার জীবনকে বাঁচিয়ে রাখবো । কবিতা তো সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ সম্পদ । কথাগুলো শুনতে শুনতে অমলেন্দু কোনো এক অনিবার্যতায় বলে উঠলো– স্বামীজির একটি ইংরেজি কবিতার বাংলা অনুবাদ —
সূর্য যদি মেঘাচ্ছন্ন হয় কিছুক্ষণ,
যদি বা আকাশ হের বিষণ্ণ গম্ভীর,
ধৈর্য ধরো কিছুকাল হে বীর হৃদয় ,
জয় তব জেনো সুনিশ্চয়…

সবাই মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে ছিল অমলেন্দু স্যারের দিকে। দূর থেকে পাগলা বিন্দাসের হাত নাড়া আর গানের আওয়াজ শুনে সবার চোখ চলে গেল সেই দিকে। পাগলটা ওদের কোনো কথাই তো শুনতে পাচ্ছিল না ; তবু , কেন ওর গলায় ভেসে আসছে এমন গান ? যেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ বাউল বেশে গেয়ে চলেছেন —
যদি আলো না ধরে , যদি ঝড় বাদলে আঁধার রাতে দুয়ার দেয় ঘরে ,
তবে বজ্রানলে ,আপন বুকের পাঁজর জ্বালিয়ে নিয়ে
একলা জ্বলো রে…
যদি তোর ডাক শুনে কেউ না আসে তবে একলা চলো রে….

পাগলা বিন্দাসের গান শুনে এই মুহূর্তে সবাই হতবাক।স্তব্ধতা ভেঙে পাগলটা বলে উঠলো — ও দিদিভাই, দুপুরে কি আজ খাওয়া বন্ধ? আমার পেট যে খিদেয় চুঁই চুঁই করছে…

(ক্রমশ)

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।