অথ শ্রী উপন্যাস কথায় আরণ্যক বসু (পর্ব – ৩৫)

শালজঙ্গলে বারোমাস ছয়ঋতু
আমরা তোমাকে খুঁজি,তোমাকেই বুঝি ;
নম্র ছায়ার বৃক্ষদেবতা মানি।
দীর্ঘ জীবন পথে, বৃষ্টির মতো,
তৃষ্ণার জলে তোমাকেই পাবো জানি।
বিস্ময় কাটিয়ে অমলেন্দু আবার বললো–হ্যালো ,তিথি ?
এত রাতে ফোন করলে ? ঘুমিয়ে পড়েছিলে নাকি ? কোনো জরুরি কথা ছিল ? ও প্রান্ত থেকে তিথির দ্বিধা জড়ানো উত্তর — স্যার, আমি রাত নটায় বাড়ি ফিরে আমার টিউশনের ছাত্রছাত্রীদের জন্য কিছু নোটস তৈরি করছিলাম। কোনোমতে ডিনার করে এসে আবার কাজে বসেছিলাম।কাজ শেষ করে নিজের মনের সঙ্গে লড়াই করছিলাম,এত রাতে আপনাকে ফোন করা উচিৎ হবে কিনা এই ভেবে । স্যার , আমি কি আপনাকে খুব ডিস্টার্ব করলাম ?
অমলেন্দু চুপ করে থাকে।
— স্যার , আপনি আমাকে কড়া ধমক দিচ্ছেন না কেন ?
অমলেন্দু নিরুত্তর।
—স্যার , আপনি কিছু বলুন,প্লিজ। প্লিজ , হ্যালো স্যার আপনি কি ঘুমিয়ে পড়লেন ?
অস্বস্তি কাটিয়ে অমলেন্দুর উত্তর — এত রাতে কেন ফোন করলে ? সকালে করতে পারতে তো !
— স্যার , আমার উঠতে উঠতেই ন’টা বেজে যায় । তখন তো আপনি কাজের দুনিয়ায় ঢুকে যান । আমারও ব্যাচ বাই ব্যাচ ছাত্রছাত্রী আসতেই থাকে। স্যার , প্লিজ আমাকে একটু অ্যালাও করুন । জানি, এসময় হয়তো অন্য কারোর ফোনের জন্য আপনি অপেক্ষা করেন , বা তার সঙ্গে কথা বলেন ,অথবা স্বাভাবিকভাবে ঘুমিয়ে পড়েন ; কিন্তু , আপনি বিশ্বাস করুন ,আমার অন্য কোনো উদ্দেশ্য নেই । আমি কিছুটা অসহায়ের মতো …
— অসহায় ? কেন ? তার জন্য এত রাতে ফোন করতে হল ?
ও প্রান্তে একটু গম্ভীর উত্তর –স্যার, একজন ম্যাচিওরড নারী বা পুরুষ, কোনো গুরুস্থানীয় মানুষকে বিশেষ প্রয়োজনে, দিনে রাতে যে কোনো সময় ফোন করতে পারে না কি ?
উত্তরে অমলেন্দু যেন একটু কঠোর — অবশ্যই পারে । হঠাৎ কোনো বিপদ আপদ হলে নিশ্চয়ই পারে । কিন্তু , আমার তো যথেষ্ট বয়স হয়েছে । এটা তো বিশ্রামের সময় ! আচ্ছা তোমার বন্ধু বাদল মেঘ জানে ,যে এত রাতে তুমি…
— না,আমরা কেউ কারোর ব্যক্তিগত ব্যাপারে মাথা গলাই না ।
—আচ্ছা বেশ বলো ,শুনছি ।
—আপনি কি উন্মনাদিকে বলে দেবেন, আমার ফোনের কথা ?
— আমি ওর কাছে কোনো কিছুই গোপন করিনা ।
— গোপন করেন না ,নাকি , বলতে বাধ্য হন ? অধিকার বোধ ?
— হতে পারে । ইনফ্যাক্ট আমার ভালো লাগে ওর কাছে সবকিছু উপুড় করে দিতে।
— আপনি উন্মনাদিকে ছাড়া আর কোনো মানুষকে ,পুরুষ অথবা নারী,অ্যালাও করেন ?
— কিসের অ্যালাওয়েন্স ?
— আমি আপনার বন্ধু হতে চাই স্যার । মানসিক সমস্যায় ভুগছি । আপনার সাতরঙা ব্যক্তিত্বের কাছে আমার অসহায় সমর্পন যদি থাকে , তাকে কি আপনি অস্বীকার করবেন ?
— তিথি, শোনো , আমার অনেক অপারগতা আছে । তোমার কোট আনকোট “সাতরঙা ব্যক্তিত্ব” দিয়ে তা মেকআপ করা যায় না । পু্রুষোচিত সাহসের অভাব আর পলায়নবাদী মনোভাব আমাকে এ পর্যন্ত সংসারী হতে দেয়নি। তিথি, আমি একজন পারফেক্ট এসকেপিস্ট।
— আমি আপনাকে জানতে চাই,বুঝতে চাই। নিজেকে লুকোবেন না স্যার , প্লিজ।
আপনি আর উন্মনাদি আপনাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবেননি কিছু ? আপনি তো একা । উন্মনাদির ডিভোর্সের পরে দুটি উন্মুখ প্রাণ তাদের কবিতাজন্মের সংসারভাবনা ভাববে না ? আমি মানি না যে, আপনি এসকেপিস্ট । আপনি সাম্যবাদী আর সাম্যবাদীরা কখনও পলায়নবাদী হয় না । আমার বাবার মধ্যে যে দৃঢ়তা, সচেতনতা দেখেছি , সেটা আপনার মধ্যেও…
— তিথি , অনেক রাত হয়েছে।ব্যক্তিগত প্রসঙ্গ থাক। ইনফ্যাক্ট , উন্মনা আর আমি আমাদের ভবিষ্যৎ নিয়ে কিছুই ভাবিনি। আমাদের সম্পর্কটা এখনো এতটা গভীর হয়েছে বলে আমি মনে করি না।
ও বিবাহিত। ও এখনও কারোর স্ত্রী । ডিভোর্স নেবে কিনা সেটা তো ভবিষ্যতের ব্যাপার । তাছাড়া ওর মা ও মেয়ে আছে । তাদের মতামতটাও তো জরুরি।একটা সংসার ভেঙে এসে আমার মতো একজন বাউন্ডুলের সঙ্গে ঘর করবে ? এ যেন টকের ভয়ে পালিয়ে গিয়ে তেঁতুলগাছে ওঠা !
তিথি এবার একটু যেন প্রগলভ–
আপনি বাউন্ডুলে ? ভ্যাগাবন্ড ? জোরে হাসলে বাবা মা শুনতে পাবে ,তাই চুপ করে আছি । আপনি জানেন না , আপনার ব্যক্তিত্বের কী সাংঘাতিক আকর্ষণ ! সেখানে ব্যক্তিত্বময়ী উন্মনাদিও খড়কুটো ।
অমলেন্দু নিঃশব্দে হাসে — তুমি আমার প্রায় মেয়ের বয়সী তিথি।
— জানি , সেন্ট পার্সেন্টের চেয়েও আরো টেন পার্সেন্ট বেশি জানি । তবুও , রক্তকরবীর বিদ্যুৎলতা নন্দিনীর কাছে নয় , আমার মতো একটি অতি সাধারণ মেয়ের কাছেও আপনি বিশু পাগল ! আপনি আমার রাতের তারা দিনের রবি হয়ে এমন করে আচ্ছন্ন করে দিলেন কেন স্যার ?
অমলেন্দু কি এই কথায় একটু নরম হয়ে গেল ?
আমি ? বিশু পাগল ?
অ্যাবসার্ড।গানই গাইতে জানি না। ও চাঁদ চোখের জলে লাগলো জোয়ার , আর সেই গানটা ? তোমায় গান শোনাবো , তাইতো আমায় জাগিয়ে রাখো …
নাঃ ! তিথি ! আই অ্যাম ভেরি সরি টু সে– আমার সম্পর্কে তোমার ব্লাইন্ডনেশ সেন্ট পার্সেন্টের ওপর আরও টোয়েন্টি পার্সেন্ট !
ও প্রান্ত থেকে তিথির কাঁপা কাঁপা ফিসফিস নিশীথ সঙ্গীত—এলো আঁধার ঘিরে ,পাখি এলো নীড়ে , তরী এলো ফিরে , শুধু আমার হিয়া বিরাম পায় না তো , ওগো দুখ জাগানিয়া তোমায় গান শোনাবো…
গান থামিয়ে ,কান্না জড়ানো গলায় তিথি বলে যায়– আপনি গান গাইতে জানেন না, কবিতা লিখতে পারেন না, তবুও এমন নিবিড়ভাবে ভালোবাসতে জানেন যে , নারী পুরুষ নির্বিশেষে সবাই আপনার ছায়ায় এসে দুদন্ড বসে। প্রাণের আরাম,আত্মার…
নাঃ , আত্মার কনশেপশন আমার নেই। আপনি আমাদের ছায়াবৃক্ষ , আপনি আমাদের চিরদিনের উদাসী আনমনা বিশু পাগল। জীবনানন্দের আট বছর আগের একদিনের সেই অশ্বত্থ গাছ নন , যেখানে আত্মহননের জন্য এক গাছা দড়ি নিয়ে ছুটে যায় কেউ।
বিশু পাগল , আপনি যেন টুপটাপ পাতা আর ফুল ঝরা জারুলের নিবিড় ছায়া ; যার কোটরে কাঠঠোকরার বাসায় আমার নারীজন্মের কোনো সাদা কালো স্বীকারোক্তি অনায়াসে লুকিয়ে রেখে বলতে পারি—
জারুল ,আমার একলা জারুল, ছায়ায় রেখো তাকে; হাজার বছর পার হয়ে ঠিক তেমন যেন থাকে…
সেই উচ্ছ্বাস,সেই কম্পন,তেমন ভালোবাসা ;
তারই মায়ায় বারে বারে মানুষ হয়ে আসা।
অমলেন্দু কি কিছুটা আচ্ছন্ন বোধ করছে ?
বাঃ! তিথি ! কী গভীর কবিতা ! তোমার ?
— হ্যাঁ বিশু পাগল ,আমার…
আমার কবিতা। লিখি কিন্তু খাতার বাইরে আলোর দুনিয়ায় আনি না ।
— কেন ?
— আমার বন্ধু বাদল মেঘ কোনো পত্রিকায় ওর কবিতার পাশাপাশি আমার কবিতা দেখলে , অস্বস্তি বোধ করে । ওর ধারণা, আমার কবি হবার ক্ষমতা নেই । আমি বড়জোর কবির সঙ্গী হতে পারি, বন্ধু হতে পারি । জানো বিশু পাগল, মিটিং এর মাঝপথে আমাকে ওর জীবন থেকে চলে যেতে বলে ও বোধহয় ঠিক করলো না ।
নারী ও পুরুষের একসঙ্গে লড়াই, বোধহয় পৃথিবীর সবথেকে সুন্দর চিত্র। নভেম্বর বিপ্লবে কমরেড লেনিনের সঙ্গে তাঁর স্ত্রীও ছিলেন । তোমাকে মিথ্যে বলেছি বিশু পাগল , বাড়ি ফিরে নোটস তৈরি করছিলাম না ; কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে , আমার প্রিয় জারুলের কোটরে রেখে আসার আগে শেষবারের মতো আমাকে লেখা বাদল মেঘের চিঠিগুলো বারবার পড়ছিলাম । কেমন যেন অহেতুক আর বর্ণহীন বলে মনে হচ্ছিল কবি বাদল মেঘের শব্দের উচ্ছ্বাসকে।সাবানের ফেনা মনে হচ্ছিল। শিলাবৃষ্টির মতো ক্ষণিকের অতিথি মনে হচ্ছিল। রামধনুর মতো মুহূর্তে বিলীন কোনো অলীক কল্পনা মনে হচ্ছিল । ও আমার মন ও শরীরের অন্তরঙ্গতার শেষ বিন্দু পর্যন্ত হয়তো জেনেছে , কিন্তু , ওর মতো উচ্ছ্বাসের কবি নারী হৃদয়ের নির্জনতম প্রবাল দ্বীপটার সন্ধান করে না কখনও। ইনফ্যাক্ট , করতে চায়ও না। বাংলা ছন্দের স্বরবৃত্তের দ্রুতগামীতাই ওর পছন্দ। মিশ্রকলাবৃত্তের গভীরতায় ও ঢুকতে চায় না । বিশু পাগল , তুমি আমাদের ভাঙা সম্পর্ক জোড়া দিতে পারবে ? কবিতাজন্মের মাথার ওপর তুমি থাকলে , আমরা আমাদের অনাগত সন্তানের স্বপ্নও হয়তো দেখবো। কিন্তু সে সব তো আমাদের উচ্ছ্বসিত জীবনকথা ! ও বিশু পাগল , তুমি কি আমাদের যৌথ জীবনে মিশ্রকলাবৃত্ত ছন্দের মতো , সরোদে দরবারীর আলাপের মতো মিশে থাকবে ? কবি জীবনানন্দের রূপসী বাংলার কবিতার মতো ?
হ্যালো , বিশু পাগল , শোনাবে একবার ? রূপসী বাংলার কবিতা ?
কিছুটা , নাকি অনেকটা মন্ত্রমুগ্ধ অমলেন্দু তার আবছা ব্যারিটোন কন্ঠে ধীরে ধীরে বলে যেতে লাগলো—
তোমার বুকের থেকে একদিন চলে যাবে তোমার সন্তান,
বাংলার বুক ছেড়ে চলে যাবে…
নিজের ফুঁপিয়ে কান্নাটাকে প্রাণপণে সংযত করলো তিথি। গভীর রাতের ফোনে তার দুটো থরথর কেঁপে ওঠা ঠোঁট শুধু দু’ একটা বাক্য উচ্চারণ করতে পারলো—
প্রিয় বন্ধু বিশু পাগল, তুমি আমার বাদল মেঘকে ফিরিয়ে দাও।আমরা যে দীর্ঘ জীবনপথ একসঙ্গে হাঁটবো ঠিক করেছি গো ! ওকে ছাড়া আমার জীবনের সব কিছুই যে মিথ্যে হয়ে যাবে বিশু পাগল , তুমি কি শুনতে পাচ্ছো ?
ক্রমশ